দূরদেশের লোকগল্প— ২৭৮
কার ঘটে কত বুদ্ধি
শ্রীলংকা (এশিয়া)
চিন্ময় দাশ
এক দেশে এক রাজা ছিল। ভারী দেমাগ সে রাজার। নিজেকে মহাজ্ঞানী আর মহাবুদ্ধমান লোক ভাবে সে। কিন্তু সত্যি কথাটা হলো, সাধারণ বুদ্ধিটুকুও নেই রাজার ঘটে।
বয়স হয়েছে রাজার। কিন্তু বুদ্ধি হয়নি তেমন। কিছুদিন হল, একটা ঝোঁক চেপেছে রাজার মাথায়। সাদা রঙের একটা ঘোড়া ছিল রাজার। রাজার ভারি প্রিয় সেই ঘোড়া। ঘোড়াটাকে ভীষণ ভালবাসেন রাজা মশাই। রাজা মশাইয়ের এখন ইচ্ছা হয়েছে, তার ঘোড়াকে কেউ কথা শিখিয়ে দেবে।
কিন্তু ঘোড়া কি আর কখনো কথা বলতে পারে? যে পন্ডিতকে ডেকে পাঠায়, সে-ই মাথা নেড়ে দিয়ে, রাজবাড়ি থেকে সরে পড়ে। এই ভাবেই চলতে লাগল অনেক দিন। মন্ত্রী-শান্ত্রী, উজির-নাজির সবাই বোঝাল রাজাকে, ঘোড়া কখনও কথা বলতে পারবে না।
কিন্তু রাজার জিদ কিছুতেই কমে না। বারে বারেই বলে—এতগুলো পণ্ডিত আমার রাজ্যে? তারা তাহলে পারেটা কী?
একবার ভিন রাজ্যের এক পন্ডিত এসেছে সেই তার রাজ্যে। কয়েকদিন না যেতে, ভারি নামডাক হয়েছে পন্ডিতের। সবাই তাকে বেশ মান্য করে, সবাই সম্মান দেয়।
বাইরের একজন পন্ডিত এসেছে-- রাজার কানে গেল কথাটা। রাজাকে মন্ত্রীও বলল—হ্যাঁ, রাজামশাই। ভারী পন্ডিত মানুষ। খুব গুণী। সবাই বলাবলি করছে। আমাদের রাজ্যে এমন গুণী মানুষ আর দুটি নেই।
রাজা শুনে ভারি খুশি। বলল-- তাই নাকি? তাহলে পণ্ডিতকেই তো কাজের ভারটা দিতে হয়। এত বড় একজন পণ্ডিত। সে নিশ্চয় আমার ঘোড়াকে কথা বলা শেখাবে পারবে।
সেদিনই রাজার সেপাই গিয়ে পন্ডিতের বাড়িতে হাজির।। চলো, রাজামশাই ডেকেছে।
পণ্ডিত এসেছে দরবারে। ভরা দরবার। রাজা বলল—শোন, পন্ডিত। তোমার খুব নামডাক শুনলাম। তাই তোমাকে ডাকা। আমার একটা কাজ করে দিতে হবে।
লম্বা করে একটা পেন্নাম ঠুকে, পন্ডিত বলল—বলুন, কী কাজ। পারলে, নিশ্চয়ই করে দেবো।
রাজা বলল-- পারা না পারার কথা নয়। সেটা তোমার ব্যাপার। কাজটা আমার হওয়া চাই।
পন্ডিত বলল-- তাহলে বলুন, কী কাজ।
--একটা ঘোড়া আছে আমার। আমার খুব প্রিয় ঘোড়া। ধরো, বাইরে কোথাও যাচ্ছি। যেতে যেতে দুটো খোশ গল্প করব তার, সেটা পারি না। ভারি খারাপ লাগে। ঘোড়াটাকে কথা বলা শিখিয়ে দিতে হবে তোমাকে।
রাজার কথা শুনে, পণ্ডিতের তো ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। ঘোড়াকে আবার কথা বলানো যায় না কি?
সে বলল-- কী অসম্ভব কথা বলছেন আপনি! ছাত্র পড়াই আমি। তাদেরকে মানুষও করে দিই। তাই বলে, ঘোড়াকে কথা বলানো? দুনিয়ার কেউ শুনেছে কখনো এমন কথা?
রাজা বাজখাঁই গলায় বলে উঠল-- কেউ শুনেছে কি শোনেনি, এটা তোমার ভাবার বিষয় নয়। ও নিয়ে তোমার মাথা না ঘামালেও চলবে। তোমার কাজ হল, আমার ঘোড়াকে কথা বলতে শেখানো। ব্যাস।
পন্ডিত বলল-- সে কি কখনো সম্ভব?
রাজা গম্ভীর হয়ে বলল—ঐ যে বললাম, সম্ভব অসম্ভব তোমার ব্যাপার। আমার নয়। সাতদিন সময় দিলাম তোমাকে। তার মধ্যে এসে, আমাকে তোমার জবাব জানাবে। পারলে, ঘোড়ার ওজনে পুরস্কার দেব তোমাকে। আর, যদি না পারো, তোমার ঐ মুণ্ডু, যেটা ঘাড়ের উপর আছে, কেটে নেব আমি। এই শেষ বলে দিলাম। আর হ্যাঁ, মনে রেখো সাত দিন।
সারা রাস্তা টলতে টলতে বাড়ি ফিরেছে পণ্ডিত। সংসারে দু’জন মানুষ তারা। পন্ডিত নিজে, আর তার একটি মেয়ে। সেই সক্কালে রাজার পেয়াদা এসে ডেকে নিয়ে গেল বাবাকে। এত বেলা হোল, ফিরছে না কেন? দাওয়াতেই দাঁড়িয়েছিল মেয়েটা। পণ্ডিত ফিরতেই মেয়েটি বলল-- কী হয়েছে, বাবা? খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে তোমাকে। কিছু হয়েছে ?
--হতে আর বাকি কিছু নাই রে, মা। গুণে গুণে আর ৭ দিন আমার আয়ু।
মেয়েটা তো পড়ল আকাশ থেকে। হঠাৎ কী এমন হোল? এমন কথা কেন বলছে বাবা? সে জানতে চাইল-- কী হয়েছে, বাবা? খুলে বলো আমাকে। কিছুই তো বুঝতে পারছি না।
পণ্ডিত তখন মেয়েকে খুলে বলল সব কথা। সাত দিন বাদে জানাতে হবে, রাজার ঘোড়াকে কথা বলাতে পারব কি না। না পারলে, কোতল হতে হবে রাজার হাতে।
মেয়েটা জিজ্ঞেস করল—এ দেশের রাজার বয়সটা কেমন দেখলে তুমি?
পণ্ডিত জবাব দিল—বয়স তো অনেকই হয়েছে। কিন্তু বুদ্ধিটা হয়নি। সেটাই তো বিপদ।
শুনে মেয়েটার মুখে হাসি। বলল—এ তো দারুণ ব্যাপার। খুব মজা হবে। সাতদিন কিসের জন্য লাগবে? তুমি কালকেই আবার রাজার বাড়ি যাও। গিয়ে বলবে, আমি পারবো আপনার ঘোড়াকে কথা বলাতে।
পণ্ডিতের তো মাথায় কিছুই ঢুকছে না। এসব কী বলছে মেয়েটা! সত্যি সত্যি কি আর ঘোড়াকে কথা বলানো যায়? পণ্ডিত ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে মেয়ের দিকে।
মেয়ে বলল—কিচ্ছু ভাবতে হবে না তোমাকে। আমি যেটি বলে দেব তোমাকে, সেইটি কেবল রাজাকে গিয়ে বলে আসবে তুমি। ঐ বুদফধু বুড়োকে কেমন মজা দেখাই, বসে বসে দেখবে।
মেয়ের কথায় রাজি হয়েছে পণ্ডিত। পরদিন ধোপদুরস্ত জামা-কাপড় পরে, রাজার বাড়ি গিয়ে হাজির হয়েছে পন্ডিত। সাত দিন সময় দেওয়া ছিল। পরের দিনই দরবারে এসেছে দেখে, রাজা ভারী খুশি। সত্যিই এ পন্ডিত কাজটা পারবে বলেই ফিরে এসেছে আজ।
রাজা জিজ্ঞেস করল-- কি হে, পারবে আমার ঘোড়াকে কথা বলা শেখাতে?
পন্ডিত গলা তুলে বলল-- কেন পারব না? অবশ্যই পারবো। কত রাজার গাধা-ছেলেকে মানুষ করে দিলাম। আর এ তো আপনার ঘোড়া। অবশ্যই পারবো। তবে, দুটো কথা আছে।
ঘোড়াকে কথা বলাতে পারবে শুনে, রাজা তো আহ্লাদে আটখানা। বসে বসে পা দুটো দোলাতে লেগেছে। বলল—বলো, তোমার কী কথা।
পন্ডিত বলল—রাজামশাই, এর আগে দুটো রাজবাড়িতে পণ্ডিতি করেছি আমি। রাজার ছেলেদের শিক্ষা দিয়ে এসেছি। সময় লেগেছে সাত বছর করে। ওই সাত বছরই সময় নেব আপনার কাছেও। কথা দিলাম, আপনার ঘোড়াকে কথা বলিয়ে দেব। তবে, সাত বছরের কম সময়ে হবে না। সেটা কিন্তু আগাম বলে রাখলাম।
রাজা তো বেজায় খুশি। বলল—সে তো লাগবেই। ঘোড়াকে কথা বলানো কি আর চাট্টিখানি বিষয়? ঠিক আছে, তাই হবে। সাত বছর সময় দিলাম তোমাকে। এবার বলো, তো,আর দ্বিতীয় কথাটা কী?
পন্ডিত বলল-- হুজুর, ঘোড়া কিন্তু থাকবে আমার কাছে। তবেই না আমি তাকে শেখাতে পারবো? অনেক মেহনতের কাজ।
--সে কথা কি বলতে আছে। সে তো থাকবেই। ঘোড়া আমি পাঠিয়ে দেব তোমার বাড়িতে। হোল তো?
পণ্ডিত মাথা চুলকে বলল—ঘোড়া তো আমার ঘরে থাকবে। কিন্তু তার খাওয়া-দাওয়ার কী হবে। গরীব মানুষ আমি।
রাজা বলল—ও নিয়ে ভাবতে হবে না তোমাকে। আমার সবচেয়ে প্রিয় ঘোড়া। তাকে খাওয়াবার দায়িত্ব আমার। তাছাড়া, রাজার ঘোড়ার খাওয়াও রাজকীয়। তোমার মুরোদে কুলোবে না। প্রতি মাসে মাসোহারা পৌঁছে যাবে তোমার বাড়িতে। ঘোড়া আর তার পণ্ডিতের খাওয়ার দায়িত্ব আমি নিলাম। এবার কাজে লেগে পড়ো দেখি।
আবার লম্বা করে এক্তা পেন্নাম ঠুকল পণ্ডিত—তাহলে ঐ কথা রইল রাজামশাই। সাত বছর।
রাজার হুকুম হয়েছে। সেপাই এসে ঘোড়া পৌঁছে দিয়ে গেল পন্ডিতের ঘরে। ঘোড়া পেয়ে, পন্ডিতের মেয়ে বেজায় খুশি। দু’দিন যেতে না যেতে, ঘোড়ায় চড়া রপ্ত করে ফেলল মেয়ে। এর পর বাবা মেয়ে দুজনে ঘোড়ায় চড়ে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়। কাজেরও অনেক সুবিধা হয়। শখ আহ্লাদ ও মেটে।
একদিন পণ্ডিত মেয়েকে প্রশ্ন করেছিল—কিন্তু মা, সাত বছর পরে কী হবে? রাজার হাতে মারা পড়তে হবে যে আমাকে।
মেয়ে তো হেসে অস্থির—তুমি দেখে নিও। সাত বচ্চর কি কম সময় না কি? ততদিনে তোমার ঐ বুড়ো রাজাই অক্কা পেয়ে যাবে।
--আর, যদি বেঁচে তাকে?
--তা হলেও, ভাবনার কিছু নাই। ঠিক এক দিন আগে, এই ঘোড়ায় চড়েই সটকে পড়ব আমরা। পাশের রাজ্যে গিয়ে ঢুকে পড়ব। রাখো তো। অত চিন্তা করতে হবে না তোমকে।
আবার খিলখিল হাসি সে মেয়ের।
0 Comments