জ্বলদর্চি

প্রাসঙ্গিক /কমলিকা ভট্টাচার্য

প্রাসঙ্গিক 

কমলিকা ভট্টাচার্য 

ভাঙা শাঁখা

লোকে বলে— বড় দুঃখিনী সে যে!
স্বামীর মার খেয়ে ভেঙে গেছে হাতের শাঁখা। কিন্তু শাঁখা ভাঙলে কি সংসার ভাঙে?
পরদিনই নিজের কষ্টের রোজগারের কড়কড়ে আড়াইশো টাকা দিয়ে আবার একজোড়া শাঁখা কিনে এনেছে মাসি।

কাজের বাড়ির নতুন বউ অবাক হয়ে বলল, “পারো তুমি বটে, মাসি!”
তারপর একটু দৃঢ় গলায় বলল, “আমি কিন্তু এসব পরি না। আর কেউ যদি আমার গায়ে হাত তোলে— সোজা পুলিশ কমপ্লেন। তারপর ডিভোর্স।”

মাসি চুপ করে শোনে। চোখে তার এক অদ্ভুত শান্তি— যেন অনেক ঝড় দেখেও টিকে থাকা গাছ।
তারপর ধীরে বলে, “ডিভোর্স করলে বুঝি সব পাওয়া যায়?”
নতুন বউ বলল, “নিশ্চয়ই। ডিভোর্স করলে তো সবই পাওয়া যায়— পুরোনো জিনিসপত্র, এমনকি খোরপোষও।”
মাসি মৃদু হেসে বলল, “খোরপোষ নিয়ে আমি কী করব মা? আমি তো খেটেখুটেই পেট চালাই। যদি কেউ বলত— পুরোনো সোহাগটুকু ফিরিয়ে দেব, তাহলে ভালো হত। আমি তাতেই রাজি।”
একটু থেমে আবার বলল, “তোমার তো পড়াশোনা জানা। দেখো না মা, এমন একটা মামলা করা যায় কি— যাতে মানুষটা আবার মানুষ হয়ে ফিরে আসে।”

নতুন বউ হঠাৎ চুপ করে গেল। সে ভাবতে লাগল— মাসি আসলে কী চায়?
মাসি তো স্বাধীন— নিজের রোজগারে খায়, পরে। তাহলে কি শুধু সংস্কার, লোকলজ্জাই তাকে বেঁধে রেখেছে? 
না। যদি তাই হত, তাহলে তো মাসি মামলা করতে বলত না।
মাসি আসলে চায় একটা প্রকৃত মানুষের সত্তা— যে সত্তার উপর ভর করেই এই জগৎ সংসার দাঁড়িয়ে থাকে।

কিন্তু কজন সে কথাটা বোঝে ? লোকে শুধু বলে— বড় দুঃখিনী সে যে!


মরছে তো মানুষই

বাড়ির নতুন বউ বলল, “মাসি, টিভিটার সুইচটা একটু অন করে দাও না।” মাসি গিয়ে সুইচটা অন করে দিল। নতুন বউ চ্যানেল ঘুরিয়ে বিগ বস চালু করল।
মাসি একটু ইতস্তত করে বলল, “নতুন বউ, একটু খবরটা লাগাবে? কোথায় জানি খুব বড় ঝগড়া লেগেছে।”
বউ হেসে বলল, “কেন? এখানেও তো ঝগড়া হচ্ছে, দেখো—এনজয় করো!” মাসি ধীরে বলল, “এসব তো মিথ্যে ঝগড়া। তবে লড়াইও একটা মিথ্যে ঝগড়া জানি?”
নতুন বউ অবাক হয়ে বলল, “তাহলে ওটা দেখে কী লাভ?”
মাসি বলল, “এই যুদ্ধের জন্য নাকি গ্যাস সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। আমার কাছে একটা ভরা ছিল— পাশের ঘরের নিতাইকে দিয়ে দিয়েছি। সবে একটা খাবারের দোকান খুলেছিল। ঘরে ছোট ছোট বাচ্চা। দোকানটা বন্ধ হলে খাবে কী?”
নতুন বউ বলল, “তুমি তাহলে রান্না করবে কী করে?”
মাসি হেসে বলল, “আমি কাঠ জ্বালিয়ে করে নেব। ও আমার অভ্যাস আছে। গরিবের জন্য আবার যোজনা পেতেও কপাল, ভোগ করতেও কপাল।”
নতুন বউ এবার নিউজ চ্যানেল লাগিয়ে দিল। মাসি মাটিতে বসে খবর দেখতে লাগল। হঠাৎ অঝোর ধারায় তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।
নতুন বউ অবাক হয়ে বলল, “তোমার আবার কী হল গো?”
মাসি ধীরে বলল, “করোনার সময় মানুষ মানুষকে বাঁচানোর জন্য যুদ্ধ করেছিল। আর আজ মানুষ মানুষকে মারার জন্য যুদ্ধ করছে।”
নতুন বউ একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “তা তুমি কেন কাঁদছ? মরছে তো ওদের দেশের মানুষ।”
মাসি আঁচলে চোখ মুছে ধীরে বলল—
“মরছে তো মানুষই।”
🍂

SIR 

রাখহরির পড়েছে মাথায় হাত—
কাটে ঘুমহীন কত রাত।
চারদিকে একই খবর,
“SIR কর, SIR কর।”

ব্যাপার বড় গোলমেলে,
কেউ বলে না সব খুলে।
সবাই বলে— দরকার জানার,
কে হলো আসল ভোটার?

প্রমাণেই ভোটের অধিকার,
বাপ কার, ছেলে কার—
চারদিকে শুধু হাহাকার।
ভাগ্য ভালো লিস্টিতে নাম যার।

নাম না থাকলে লিস্টে,
শুনানীর লাইনে জীবন যাবে পিষ্ঠে।
SIR কিন্তু বড় জবর,
কেউ খুঁড়ছে বংশের কবর,
কারও মাথায় ট্রাঙ্কভরা কাগজ—
SIR এককথায় খাচ্ছে সবার মগজ।

রাখহরির বয়স প্রায় আশি,
আত্মীয়স্বজন সব গয়া-কাশী।
কে দেবে প্রমাণ এবার ,
এসেছে যে ডাক তার।

ভুলে গেছে সব বয়সের ভারে,
ভাবল— ডাকবে বাবাকে প্ল্যানচেট করে।
প্ল্যানচেটে বাবা রেগে ওঠে,
বলে— “নাম নেই আমার ভোটে!
মরে হলেও ভূত,
ভোটের দিনে দখল করি বুথ।
রাখ তোর SIR SIR—
জোর যার, মুলুক তার।”


ভয়ে কাঁপে রাখহরি,
বলে— “বাবা, বল খালি একবার 
এই দেশ কি তোমার আমার?”
বাবা হেসে বলেন—
“দেশ নয় কারুর সম্পত্তি বাবার।”


ভয়েতে বিনিয়োগ

এ দেয় হুমকির বজ্রনাদ, 
ও দেয় নোটিসে আগুনের স্বাদ,
আর মাঝখানে বসে নীরব কাল, ভয়ের বিজ্ঞাপনে ভরে বাজারের চাল।

যুদ্ধ এক বিশাল কারখানা আজ, যেখানে লাশই কাঁচামাল সমাজ,
কান্নার নেই কোনো ছুটি কিংবা মাফ, 
উঠে শুধু রক্তে আঁকা মুনাফার গ্রাফ।

খবরের পর্দায় তর্কের নাটক, শান্তির শিরোনামে বারুদের ঝাপট,
পর্দার আড়ালে বদলায় হাত, মিসাইলের রসিদে স্বাক্ষর কার রাত?

এখানে ভয় কোনো অনুভূতি নয়—এ এক সুপরিকল্পিত ব্যবসায়ী ক্ষয়,
যুদ্ধ এখানে ভুল বা দুর্ঘটনা নয়, এটা শেয়ারবাজারে তোলা বিনিয়োগ কয়।

আর আমরা ভয়ে বাঁধা,চলি পাশ কেটে,
যুদ্ধ ছোঁয় শুধু খালি পকেটে, ক্ষুধার প্লেটে।
ভিতরে ভয় ফুলে ওঠে হয় বিষাক্ত বোঝা,
আগুনের পরে যেমন থাকে ধোঁয়ার ঝাঁ ঝাঁ।

ভয়েতে বিনিয়োগ—লাভের সবচেয়ে সহজ যোগ,
রক্তে লেখা হিসাবের খাতায় মানুষ কেবল সংখ্যা মাত্র প্রয়োগ।

Post a Comment

2 Comments

  1. 🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏

    ReplyDelete
    Replies
    1. 🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏

      Delete