কবি অরুণ দাসের সাম্প্রতিক কাব্য 'চূর্ণীকে লেখা চিঠি'-এর পাঠপ্রতিক্রিয়া
আবীর ভট্টাচার্য
একটা সময় ছিল বাঙালি জীবনে,যখন আবেগ প্রকাশের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম ছিল চিঠি।সব সম্পর্কের মানুষই যোগাযোগ রক্ষা করতো চিঠির মাধ্যমে।কতো যে না বলা কথা,স্নেহ,প্রীতি, ভালোবাসা প্রিয় কলমে ও কালিতে আঁকা হতো,তার ইয়ত্তা নেই।ক্রমে জীবন এগোয়,ব্যস্ততা বাড়ে,লেখা ছোট হতে হতে কথা শুরু হয় ল্যান্ডলাইনের তারে তারে, অপেক্ষার বালাই নেই, ইচ্ছে হলেই কন্ঠস্বরে যোগাযোগ, তাৎক্ষণিক আলাপন। আর এখন তো তাও পেরিয়ে সভ্যতা হাতের মুঠোর ফোনে বন্দী, মনখারাপ বা প্রয়োজন, কয়েকটি আঙুলের চাপেই তার নিরসন। তবে ঐ, বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ,কেড়েছে আবেগ।তাই ফোনে বা মোবাইলের যোগাযোগে কেজো আয়োজনটুকু যত দ্রুতই মিটুক না কেন,আবেগ প্রকাশিত হয় না ঠিকঠাক,এ আমরা সকলেই বুঝি।
আর মানুষের মন তো, সবসময়েই হৃদয়ের গভীরে আপন সত্ত্বার প্রকাশে উন্মুখ। নিজেকে খুঁজতে চেয়েই প্রিয়জনের অন্তরে সে অন্তরঙ্গতা খোঁজে। শত ব্যস্ততার মধ্যেও তাই যখন অলীক জোৎস্নার মায়াবিশরী আলো কর্মভারাতুর মুখে এসে পড়ে, উতল চৈত্র বায়ে দূর বনের মরসুমী পাতারা অলস বিসম্ভ্রালাপে ঝরে পড়ে, আকাশ জুড়ে মোহন রামধনু, বৃষ্টি মেঘের খেলা…আধুনিকতার স্বচ্ছন্দ ঘেরাটোপ থেকে উড়ে যাওয়া মৃদুল যাপনেও স্মৃতিমেদুরতার ছায়া ভাসে,মনে পড়ে কোন বিজন পরবাসে ছেড়ে এসেছিলাম যে মনটুকু,যে নিভৃত অবসর আসঙ্গটুকু,সে এখন কেমন আছে! আবার চাইলে কোথায় পাবো তারে!
তার অন্বেষণে হৃদয় বিধুর হয়। এবং তখনই হয়তো রচিত হয় চিঠি,যা কবিতার মতো,অথবা প্রেমের মতোই বড়ো নাজুক,বড়ো গহন।
ডিসেম্বরের হিম সকালে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপের চুমুকটির মতোই যা বড়ো মনোহরও।
🍂
হ্যাঁ। প্রেমপত্র সাহিত্যের এই বই হাতে নিয়ে এমন অনুভবটিই আমার প্রথম হয়েছিল। এবং পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে আদুরে এলোমেলো এমন কতো কিই যে মনে পড়লো! অতি ব্যস্ত যাপন ক্লেশের দুর্বিপাকে হাঁপিয়ে ওঠা মানুষের কাছে এ পাওয়া যে কতোখানি, ভুক্তভোগী মাত্রেই জানেন।
তাই,পাঠ প্রতিক্রিয়া দেবার আগে,ধন্যবাদ জানিয়েই স্বীকার করি,এ যেন শুধু লেখকের আত্মকথন বা স্মৃতি উন্মোচন নয়, আটষট্টি পাতার পাতলা বইটির পাতায় পাতায় আঁকা পাঠকেরও আবেগ রোমন্থন।কে যে কবে মনের গোঠে বাঁশি বাজিয়েছিল, কবে কোন কিশোরবেলার বাপ্পাদিত্য এক ঝুলনায় “আজ কি আনন্দ” গেয়েছিল,আবছায়া ধুসর আবহে কালো কালির আঁচড়ে রাধারানী দুর্লভ কিশোরী মুখশ্রী আঁকা প্রচ্ছদটি দেখে এসব,স—ব মনে পড়ে।
তাই,প্রেমের কবিতার বই বা প্রেম পত্রসাহিত্য সঙ্কলন হিসেবে না ধরে আমরা পুস্তিকাটিকে আলেখ্যমঞ্জরী হিসেবেও গন্য করতে পারি,ভারে না হলেও ধারে যা হৃদয় ছুঁয়ে যায়।মনে পড়ে, এই কবির লেখা “পরম চেতনার ম্যানিফেস্টো” গ্রন্থটির কথা। সেখানেও ভাব ও বাস্তব নিয়ে অদ্ভুত ছায়াবাজির খেলা দেখিয়েছিলেন মুন্সিয়ানার সঙ্গে,যা এখানেও বর্তমান।
প্রসঙ্গত বলি,বইটির অলঙ্করণে আছেন দীপ,প্রকাশক শ্রীলিপি। ভেতরের কবিতাংশগুলির মতোই নির্ভার, সময়োপযোগী সাজগোজ।মুদ্রন প্রমাদ চোখে পড়েনি,পাতার কোয়ালিটিও মানোত্তীর্ণ। আগেই বলেছি,ভারে না হলেও ধারে…
যাহোক,এবার আসি অন্দরে।সারা বই জুড়ে আছে মোটামুটি তিনটি কাব্য মন্ডলী :
১.না বলেছে হৃদয়লীনা
২.হৃদয়ে লেখা ডায়েরী
৩.চূর্ণী।সে সব মুগ্ধ দিন।মুগ্ধ রাত।
যার প্রথমটির শুরু হচ্ছে এইভাবে,
“আবার সেজে উঠলো জঙ্গল। রঙ-বেরঙের পাতা ও রামধনু রঙে। পাতার মাঝে রাখা, বর্ণহীন বুক। বুকের মাঝে পলাশ রঙা স্বপ্নের ক্ষরণ। সমুদ্রমন্থন শেষে কণ্ঠে নীলাকাশ মেখে নেমে এলো সেই নারী।
...শেষ বসন্তের নারী।
তোমাকে নির্মাণ করি অভিমানী জ্যোৎস্নায়
একদিন উড়তে উড়তে ছুঁয়ে ফেলি তোমায়। তোমার মনের গভীরে রাখা সে সব জ্যোৎস্না ভেজা রাত। আলতো আঁধার রাখি তোমার হাতে। ....যে আশ্রয় এঁকেছি শান্ত চোখে, স্বযত্নে তুলে রাখি চোখের জলে। তোমার মায়াময় মনের কাছে আমার আত্মত্মসমর্পণ। আমাকে ছুঁতে যাওয়া গাছেরা সাজে বৃষ্টিরঙে। সূর্যলীন রোদ্দুরে। নিভৃত ডানায় লুকিয়ে রাখি অভিমানী পৃথিবীর সব অন্ধকার।”
অথবা,
“....রাত গভীর হলে
চোখের জলে আবছা হয় বর্ণমালা মুখ লুকোয় সবুজ পালক…”
আহা!আহা!
এরপরে ক্রমান্বয়ে রূপকল্পের অবয়বে আসে কখনও আদর ঝর্না,অভিমানী জোৎস্না,নষ্ট প্রজাপতি, শান্ত শিশির,পরিযায়ী মেঘ ইত্যাদি ইত্যাদি।ছন্দেও অগাধ যাদুকরী,গদ্য ছন্দে কাব্যের উদ্ভাস,আর ছন্দবদ্ধ পদগুলির চোরাবালিতে তলিয়ে যাওয়ার অমোঘ ইশারা।
এ বই চর্মচক্ষে পাঠের চাইতেও ভাবচোখে পড়ার জন্য অধীর হয়ে থাকি মনে।মাত্রই কয়েকটি পাতা,কয়েকটি স্তবক, তবু তারই মধ্যে অনাদি উড়াল আঁকা। অসম্ভব সুপরিকল্পিত শব্দচয়ন, সুনির্ধারিত ভাব সঞ্চালন, বৌদ্ধিক কারুকৃতিকে উজ্জ্বল এই ক্ষীণদেহী কাব্য পুস্তিকাটি কবিকে অপরাপর আরো পাঁচজন কলমচীর চাইতে পৃথক করে তোলে।দূরে পড়ে থাকে বিখ্যাত প্রকাশনীর সুবিখ্যাত সব নাম,মনে জেগে থাকে অপুর্ব সব পঙতিমালা…
“চূর্ণী, তোকে ছুঁয়ে একডুব জংলি চুপকথা। আজ বৃষ্টি নামুক খেয়ালি ঠোঁটে।”
অথবা,
“একদিন শূন্য হবো জেনেও”
“একদিন শূন্য হব্যে জেনেও শূন্যতা নিয়ে বসে থাকি রোজ
তোর মনে পড়ে... অসংখ্য উদাস তারা আর নির্মেঘ আকাশের নিচে সে সব সবুজ আর্তনাদ?
পাহাড় জঙ্গল পাথর হয়ে ওঠা দুটি মানুষের হলুদ নিঃশ্বাস? সে সব একায় মৃত্যুলিপি?
চমৎকার চাঁদ আরো রহস্যময় হয়ে উঠেছিল তোর পলাশ শরীরের বিন্দুতে বিন্দুতে।
এই বোধহয় বিন্দুতে সিন্ধু খোঁজা....
এই বোধহয় সিন্ধুডুব ছমছমে জ্যোৎস্নায় আগুন শরীরে শীতসাঁতার।
আজ লিখি
আমাদের নগ্ন নির্জন শরীর জুড়ে অগুনতি চাঁদের চাদর। আর দীর্ঘশ্বাস
ভেজা সে সব পলাশমুখর দিনলিপি…”
আহা!কি অনুভব!প্রেমময়তার কি বিদগ্ধ অবগাহন!
ভাবতে অবাক লাগে, অহঙ্কারও হয় এইজন্য যে,মহানগরীর থেকে অনেক দূরে বসেও জেলার প্রকাশনা সংস্থাগুলি কি যত্নে এবং দায়িত্বে এইসব শক্তিশালী কলমকে লালন করেন। ধন্যবাদ অবশ্যই তাঁদেরও প্রাপ্য।
তবে এসব তো সমালোচকের কথা, বাস্তববাদী উপলব্ধি।পূনঃপৌনিক পাঠের পরে পাঠক কিন্তু আবারও থমকে যায় এই বাক্যবন্ধটিতে,
“তোমাকে লিখি,
শুধু স্পর্শে নয়
0 Comments