জ্বলদর্চি

বিকশিত ভারত শিক্ষা অধিষ্ঠান বিল ২০২৫- নতুন পরিচিতি নতুন ব্যাখ্যা/অন্তিম পর্ব /সজল কুমার মাইতি

বিকশিত ভারত শিক্ষা অধিষ্ঠান বিল ২০২৫- নতুন পরিচিতি নতুন ব্যাখ্যা

অন্তিম পর্ব 

সজল কুমার মাইতি


‘বিকশিত ভারত শিক্ষা অধিষ্ঠান বিল, ২০২৫’ (Viksit Bharat Shiksha Adhishthan Bill, 2025)  যা সম্প্রতি ভারতের সংসদে পেশ করা হয়েছে। এই বিলটিতে ভারতের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় এক আমূল পরিবর্তনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

​ এই বিলের প্রধান দিকগুলোর একটি  সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো:

​১. বিলের মূল লক্ষ্য

​এই বিলের প্রধান উদ্দেশ্য হলো ভারতের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান নিয়ন্ত্রণ কাঠামোকে ভেঙে একটি একক ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন করা। এটি জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP) ২০২০-এর সুপারিশ অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে।

​২. নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর অবলুপ্তি

​এই বিল পাস হলে বর্তমানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সংস্থা বিলুপ্ত হয়ে যাবে:

  • ​UGC (University Grants Commission / বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন)

  • ​AICTE (All India Council for Technical Education)

  • ​NCTE (National Council for Teacher Education)

​৩. ‘বিকশিত ভারত শিক্ষা অধিষ্ঠান’ (VBSA) গঠন

​উপরের তিনটি সংস্থার পরিবর্তে একটি কেন্দ্রীয় সংস্থা গঠিত হবে যার নাম হবে ‘বিকশিত ভারত শিক্ষা অধিষ্ঠান’। এর অধীনে তিনটি স্বশাসিত পরিষদ (Council) থাকবে:

ক. নিয়ন্ত্রণ পরিষদ (Regulatory Council): এটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর তদারকি এবং নিয়মকানুন রক্ষা করবে।

খ. অ্যাক্রেডিটেশন পরিষদ (Accreditation Council): এটি কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের মান যাচাই ও স্বীকৃতি (Accreditation) প্রদান করবে।

গ. মান নির্ধারণ পরিষদ (Standards Council): এটি পঠনপাঠনের মান এবং সিলেবাসের ন্যুনতম মানদণ্ড ঠিক করবে।

​৪. আওতার বাইরে যা থাকছে

​এই বিলের আওতা থেকে দুটি শিক্ষা বিষয়কে দূরে রাখা হয়েছে:

  • ​চিকিৎসা শিক্ষা (Medical Education)

  • ​আইনি শিক্ষা (Legal Education)

​৫. শাস্তিমূলক ব্যবস্থা

​যদি কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ম লঙ্ঘন করে বা প্রয়োজনীয় স্বীকৃতি ছাড়া কাজ করে, তবে তাদের ওপর ১০ লক্ষ থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

​ বর্তমান পরিস্থিতি

​বিলটি নিয়ে বিতর্ক চলায় এটি বর্তমানে যৌথ সংসদীয় কমিটির (JPC) পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যের অনেক রাজনৈতিক দল এই বিলের বিরোধিতা করেছে, কারণ তাদের মতে এটি উচ্চশিক্ষার ওপর কেন্দ্রের একাধিপত্য কায়েম করতে পারে এবং রাজ্যের ক্ষমতা খর্ব করতে পারে।

গবেষণা ও ঊদ্ভাবন

​বিকশিত ভারত শিক্ষা অধিষ্ঠান (VBSA) বিল, ২০২৫-এ উচ্চ শিক্ষায় গবেষণা ও উদ্ভাবনের (Research and Innovation) ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়ে বিলের প্রধান দিকগুলো আলোচনা করা হলো:

​১. ন্যাশনাল রিসার্চ ফাউন্ডেশন (NRF) এর সাথে সমন্বয়

​এই বিলের মাধ্যমে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণার সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এটি অনুসন্ধান ন্যাশনাল রিসার্চ ফাউন্ডেশন (Anusandhan NRF)-এর সাথে মিলে কাজ করবে, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান বা ফান্ডিং নিশ্চিত করা যায়।

​২. উদ্ভাবন ও শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগ (Industry-Academia Linkage)

​বিলের একটি অন্যতম লক্ষ্য হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে শিল্পের (Industry) সরাসরি যোগসূত্র তৈরি করা।

  • ​উদ্ভাবন (Innovation): নতুন নতুন আবিষ্কার এবং স্টার্ট-আপ তৈরিতে উৎসাহ দেওয়া হবে।

  • ​প্রযুক্তি হস্তান্তর: গবেষণাগারে যা আবিষ্কৃত হবে, তা যাতে সরাসরি বাজারে বা সাধারণ মানুষের কাজে লাগানো যায় (Technology Transfer), তার জন্য বিশেষ সেল তৈরির কথা বলা হয়েছে।

​৩. গবেষণা ভিত্তিক পাঠ্যক্রম

​বিলে প্রস্তাব করা হয়েছে যে, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরের পাঠ্যক্রম এমনভাবে তৈরি করতে হবে যেখানে মুখস্থ বিদ্যার বদলে গবেষণামূলক চিন্তাভাবনা এবং হাতে-কলমে শেখার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।

​৪. আন্তঃবিভাগীয় গবেষণা (Inter-disciplinary Research)

​গবেষণার ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান এবং কলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা যাতে মিলেমিশে কোনো নতুন বিষয়ে গবেষণা করতে পারে, সেই পরিকাঠামো তৈরি করা হবে।

​৫. গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড বা আন্তর্জাতিক মান

​ভারতীয় গবেষণার মান যাতে আন্তর্জাতিক স্তরের হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য একটি 'মান নির্ধারণ পরিষদ' (Standards Council) গঠন করা হবে। এই কাউন্সিল গবেষণার নীতি-নৈতিকতা (Ethics) এবং গুণমান পর্যবেক্ষণ করবে।

​৬. পিএইচডি (PhD) ও উচ্চতর গবেষণার সংস্কার

​পিএইচডি ডিগ্রি প্রদানের প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ এবং শক্তিশালী করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ভুয়ো বা নিম্নমানের গবেষণা প্রবন্ধ (Research Paper) রুখতে কঠোর নিয়মাবলি তৈরির কথা বলা হয়েছে।

​সংক্ষেপে:

এই বিলটি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধুমাত্র 'ডিগ্রি দেওয়ার কারখানায়' সীমাবদ্ধ না রেখে সেগুলোকে 'গবেষণার কেন্দ্রে' রূপান্তর করতে চায়। লক্ষ্য হলো ভারতকে একটি বৈশ্বিক জ্ঞান অর্থনীতি (Global Knowledge Economy) হিসেবে গড়ে তোলা।

অনুদান বা স্কলারশিপ

বিকশিত ভারত শিক্ষা অধিষ্ঠান (VBSA) বিল ২০২৫ ভারতের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে একটি আমূল পরিবর্তনের প্রস্তাব এনেছে। এই বিলে গবেষণা অনুদান ও স্কলারশিপ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো আলোচনা করা হলো:

​১. অনুদান (Grants) ও ফান্ডের নতুন কাঠামো

​এই বিলের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থায়নকে আলাদা করা।

  • ​UGC-এর ক্ষমতা বদল: আগে ইউজিসি (UGC) একইসাথে নিয়ম তৈরি করত এবং অনুদান (Grant) বিতরণ করত। নতুন বিল অনুযায়ী, প্রস্তাবিত VBSA মূলত মান নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি করবে, কিন্তু সরাসরি অর্থ বা গ্র্যান্ট বিতরণ করবে না।

  • ​মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা: গবেষণা ও অন্যান্য আর্থিক অনুদান এখন সরাসরি শিক্ষা মন্ত্রণালয় (Ministry of Education) বা তাদের তৈরি বিশেষ মেকানিজমের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। অর্থাৎ, গবেষণা প্রকল্পের জন্য অর্থের আবেদন বা বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে।

​২. গবেষণায় উৎসাহ ও লক্ষ্য

​বিলের মূল উদ্দেশ্য হলো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে গবেষণা ও উদ্ভাবনে (Innovation) বিশ্বমানের করে তোলা।

  • ​বহুমুখী বা মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি গবেষণা: বিলটিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বহুমুখী (Multi-disciplinary) গবেষণা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

  • ​পারফরম্যান্স-লিঙ্কড ফান্ডিং: গবেষণার গুণমান এবং কর্মসংস্থানের হারের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, যে ল্যাব বা বিভাগ ভালো গবেষণা করবে, তারা বেশি অনুদান পাবে।

​৩. স্কলারশিপ ও শিক্ষার্থী সহায়তা

​শিক্ষার্থীদের জন্য স্কলারশিপের ক্ষেত্রে বিলটি নিচের বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে চায়:

  • ​একক জানালা (Single Window): স্কলারশিপের আবেদন প্রক্রিয়া সহজ করতে একটি অনলাইন পোর্টাল বা ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।

  • ​সামাজিক অন্তর্ভুক্তি: SC, ST, OBC এবং আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া (SEDG) শিক্ষার্থীদের জন্য স্কলারশিপের সুবিধা আরও শক্তিশালী করার প্রস্তাব রয়েছে।

  • ​ক্রেডিট ট্রান্সফার: জাতীয় শিক্ষা নীতি (NEP 2020)-এর সাথে সংগতি রেখে শিক্ষার্থীদের গবেষণার ক্রেডিট এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের সুযোগ থাকবে, যা গবেষণার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সাহায্য করবে।

​৪. বর্তমান পরিস্থিতির ওপর প্রভাব

  • ​পুরানো আইনের বিলুপ্তি: এই বিলটি পাস হলে UGC (1956), AICTE (1987) এবং NCTE (1993) আইনগুলো বাতিল হয়ে যাবে। তবে বর্তমান যারা স্কলারশিপ বা ফেলোশিপ (যেমন- JRF/SRF) পাচ্ছেন, তাদের ওপর তাৎক্ষণিক কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না; বরং প্রক্রিয়াটি আরও আধুনিক করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

​সংক্ষেপে: VBSA বিলে গবেষণার মান বাড়ানোর জন্য কঠোর নিয়ম আনা হয়েছে এবং অনুদান দেওয়ার দায়িত্ব সরাসরি সরকারের হাতে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি বর্তমানে যৌথ সংসদীয় কমিটির (Joint Parliamentary Committee) পর্যালোচনায় রয়েছে।

সমাপ্ত


Post a Comment

0 Comments