তৃতীয় খণ্ড
পর্ব ৩: Facility 47-এর ভিতরে
কমলিকা ভট্টাচার্য
রাত তখন দুটো। এই সময়টাকে ইরা বলেছিল—সবচেয়ে দুর্বল সময়। কারণ এই সময় মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্লান্ত থাকে, আর মেশিন সবচেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী। রাতের শেষ প্রহরে পাহারাদারের চোখে ঘুম জমে, আর সিকিউরিটি সিস্টেম ধরে নেয় সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছে। সেই আত্মবিশ্বাসই তাদের সুযোগ। Facility 47-এর সামনে গাড়িটা থামিয়ে ঋদ্ধিমান ইঞ্জিন বন্ধ করল। ইঞ্জিনের শব্দ থেমে যেতেই চারপাশের নিস্তব্ধতা আরও ঘন হয়ে উঠল। দূরে কোথাও একটা কুকুর ডাকছিল—দীর্ঘ, টানা, সতর্কতাময়। অনির্বাণের মনে হল, এই ডাকটা যেন তার জন্যই—শেষবারের মতো সাবধান করে দিচ্ছে। ফিরে যাও। এখনও সময় আছে। কিন্তু সে জানে, তার জীবনে ফিরে যাওয়ার পথ অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। এখন সামনে শুধু একটাই রাস্তা—যার শেষে হয় মুক্তি, নয়তো ধ্বংস।
ইরা ধীরে বলল, “সবাই প্রস্তুত?” তার গলায় চাপা উত্তেজনা, কিন্তু হাত স্থির। ঋদ্ধিমান মাথা নাড়ল। সে ইতিমধ্যে চারপাশের অন্ধকার স্ক্যান করে নিয়েছে। অনির্বাণ শুধু বলল, “হ্যাঁ।” তার গলায় শব্দ কম, কিন্তু সংকল্প ঘন। তারা গাড়ি থেকে নেমে ছায়ার ভিতর দিয়ে এগিয়ে গেল। Facility 47-এর পিছনের সার্ভিস গেটটা সামনে দেখা যাচ্ছে। বাইরে থেকে এটা একটা সাধারণ মেইনটেন্যান্স এন্ট্রান্সের মতো, কিন্তু তারা জানে—এই দরজার ওপাশেই বন্দী আছে এক জীবন, এক ভালোবাসা, আর এক ভয়ংকর সত্য।
ইরা তার পকেট থেকে ছোট্ট একটা ডিভাইস বের করল। ডিভাইসটা দেখতে সাধারণ, কিন্তু তার ভিতরে লুকিয়ে আছে হাজারটা কোড, হাজারটা চুরি করা অনুমতি। সে সেটাকে সিকিউরিটি প্যানেলের সাথে লাগাল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিস্তব্ধতা আরও ভারী হয়ে উঠল। তারপর স্ক্রিনে একটা সবুজ আলো জ্বলে উঠল—Access Granted. একটা মৃদু ক্লিক শব্দ হল। দরজাটা খুলে গেল। এত সহজ? অনির্বাণ জানে—যে দরজা সহজে খুলে যায়, তার ওপাশেই সবচেয়ে কঠিন ফাঁদ অপেক্ষা করে।
ভিতরে ঢুকতেই একটা ঠান্ডা বাতাস তাদের গায়ে এসে লাগল। এই ঠান্ডা বাইরের রাতের ঠান্ডা নয়। এটা যন্ত্রের ঠান্ডা। জীবনহীন, অনুভূতিহীন। করিডোরটা সাদা—অস্বাভাবিক সাদা। যেন এখানে কোনো ইতিহাস নেই, কোনো স্মৃতি নেই, শুধু পরীক্ষা আর নিয়ন্ত্রণ। তাদের পায়ের শব্দ মেঝেতে চাপা প্রতিধ্বনি তুলছিল। প্রতিটি পদক্ষেপ হিসেব করে ফেলতে হচ্ছে, প্রতিটি শ্বাস আটকে রাখতে হচ্ছে। অনির্বাণের মনে হচ্ছিল সে যেন একটা জীবন্ত দুঃস্বপ্নের ভিতর হাঁটছে।
তারা এগিয়ে যেতে লাগল। করিডোরের একপাশে কাঁচের প্যানেল। অনির্বাণ এক ঝলক ভিতরে তাকিয়ে দেখল—একটা ঘরের মধ্যে একটা মানবদেহ শুয়ে আছে। তার মাথায় তার লাগানো। চোখ বন্ধ। নিঃসাড়। অনির্বাণ থেমে গেল এক সেকেন্ডের জন্য। তার মনে হল—এটা একটা গবেষণা কেন্দ্র নয়। এটা একটা সংগ্রহশালা। যেখানে মানুষকে বস্তু বানিয়ে রাখা হয়েছে।
“চল,” ঋদ্ধিমান ফিসফিস করে বলল। “সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে।”
তারা আবার এগোল। হঠাৎ করিডোরের ছাদের কোণায় একটা লাল আলো একবার ঝলসে উঠল। ইরা থেমে গেল। “মোশন সেন্সর রিক্যালিব্রেট হচ্ছে,” সে বলল। “স্থির থাকো।”
তিনজনই নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। কয়েক সেকেন্ড।
তারপর আলো নিভে গেল।
তারা আবার হাঁটতে শুরু করল।
ইরা ফিসফিস করে বলল, “বামদিকে।” তারা বাঁদিকে মোড় নিল। করিডোরের দেয়ালে মাঝে মাঝে কাঁচের জানলা, যার ওপাশে অন্ধকার ল্যাবরেটরি। কোথাও কোথাও মেশিনের নীল আলো জ্বলছে, যেন অন্ধকারের ভিতরে কোনো চোখ তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ একটা শব্দ হল—টিক। সবাই থেমে গেল। ঋদ্ধিমান হাত তুলে ইশারা করল—চুপ। করিডোরের শেষের একটা দরজা ধীরে খুলল। একজন বেরিয়ে এল। সাদা কোট পরা একজন ডাক্তার। তার চোখ ক্লান্ত, মুখ নিরাবেগ। সে অন্যদিকে হাঁটতে শুরু করল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য সময় থেমে গেল। যদি সে পিছনে তাকায়—সব শেষ। কিন্তু সে তাকাল না। সে চলে গেল। অনির্বাণ বুঝতে পারল, সে এতক্ষণ শ্বাসই নিচ্ছিল না। সে ধীরে নিঃশ্বাস ছাড়ল।
ইরা আবার এগিয়ে গেল। সে থামল একটা দরজার সামনে। দরজার উপর লেখা—N-17। ইরা খুব ধীরে বলল, “এটাই।” শব্দটা শুনেই অনির্বাণের শরীরের ভিতর একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। এই দরজার ওপাশেই নাতাশা। তার ভালোবাসা। তার অপরাধ। তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।
ইরা লক হ্যাক করতে শুরু করল। তার ডিভাইসের স্ক্রিনে সংখ্যা বদলাচ্ছে। ৩০ সেকেন্ড। ২৫। ২০। অনির্বাণের মনে হচ্ছিল তার হৃদস্পন্দন এত জোরে হচ্ছে যে বাইরে থেকে শোনা যাবে। ১০। ৫। তারপর—Access Granted.
দরজাটা খুলে গেল।
প্রথমে অনির্বাণ কিছুই দেখতে পেল না। ঘরটা আধো অন্ধকার। ইরা আলো জ্বালাল।
আর তারপর—
নাতাশা শুয়ে আছে একটা সাদা বেডে। তার শরীরের সাথে অসংখ্য তার জড়ানো। তার মাথায় লাগানো নিউরাল ইন্টারফেস। মনিটরে তার ব্রেইনওয়েভ ওঠানামা করছে। তার মুখ ফ্যাকাশে, ঠোঁট শুকনো। কিন্তু সে আছে। সে বেঁচে আছে।
অনির্বাণ ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। তার পা কাঁপছে। তার মনে হচ্ছিল সে কোনো স্বপ্নের ভিতর হাঁটছে। সে হাত বাড়িয়ে নাতাশার হাত স্পর্শ করল। ঠান্ডা। কিন্তু নিঃসন্দেহে জীবিত।
তার চোখ ভরে গেল।
“নাতাশা…” তার কণ্ঠ ভেঙে গেল।
ঠিক তখন—
নাতাশার আঙুল সামান্য নড়ল।
অনির্বাণ থেমে গেল।
তারপর ধীরে ধীরে নাতাশার চোখ খুলল।
তার দৃষ্টি ঝাপসা। বিভ্রান্ত। তারপর ধীরে ধীরে স্থির হল।
সরাসরি অনির্বাণের উপর।
অনির্বাণের হৃদস্পন্দন থেমে গেল।
সে অপেক্ষা করল।
নাতাশার ঠোঁট নড়ল।
একটা ভাঙা, ক্লান্ত শব্দ বেরিয়ে এল—
“অনির্বাণ…”
শব্দটা শুনে অনির্বাণ ভেঙে পড়ল। তার ভিতরের সব দেয়াল ভেঙে গেল। সে তার হাত শক্ত করে ধরল। “আমি এসেছি,” সে বলল, “আমি তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি।”
ঠিক সেই মুহূর্তে—
একটা তীক্ষ্ণ অ্যালার্ম বেজে উঠল।
লাল আলো জ্বলে উঠল।
ইরা চিৎকার করে বলল, “সিস্টেম আমাদের ধরেছে!”
করিডোরে পায়ের শব্দ ভেসে আসছে।
দ্রুত।
সংখ্যায় অনেক।
ঋদ্ধিমান দরজার দিকে তাকাল। তার চোখে প্রস্তুতি।
নাতাশা ভয়ে অনির্বাণের দিকে তাকিয়ে আছে।
অনির্বাণ তার হাত শক্ত করে ধরল।
সে ধীরে বলল—
“আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না।”
সেই মুহূর্তে সে জানত—
এখান থেকে বেরিয়ে আসা শুধু একটা মিশন নয়।
এটা একটা যুদ্ধ।
আর এই যুদ্ধে হার মানে—
চিরতরে হারিয়ে যাওয়া।
2 Comments
কি সাংঘাতিক। 🙏
ReplyDeleteঅত্যন্ত উত্তেজনার মধ্যে এ পর্ব শেষ হল। আশাকরি পাঠক আমার মতই পরের পর্বের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করবে।
ReplyDelete