বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১১৫
চিনাবাদাম
ভাস্করব্রত পতি
"পায়ের তোড়া হাতের বালা
থাকে যদি সিটি গোল্ডের চেন,
নিয়ে যাবেন
তাতে সমান সমান বাদাম পাবেন।
উ.....
বাদাম বাদাম দাদা কাঁচা বাদাম
আমার কাছে পাবে বুবু কাঁচা বাদাম।"
বীরভূমের বাদাম বিক্রেতা ভূবন বাদ্যকরের গাওয়া এই গানটি একসময় রীতিমতো ভাইরাল হয়েছিল। আর চিনাবাদামের জনপ্রিয়তাও আরও বেড়ে গিয়েছিল এই বাদাম বিক্রেতার সৌজন্যে। যাইহোক, ঝালমুড়ির মশলা কিংবা মুখরোচক চানাচুর, সুস্বাদু তরকারির বাটনা কিংবা মদের চাঁট -- চিনাবাদামের জুড়ি মেলা ভার। বলতে গেলে রসুইঘর থেকে শুঁড়িখানা সবেতেই চিনাবাদামের উপস্থিতি। আর সিনেমা হলের কোনের সিটে কিংবা পার্কের নির্জন জায়গায় প্রেমিক প্রেমিকার একান্ত ব্যক্তিগত সময় কাটানোর সঙ্গী খোলা সহ চিনাবাদামের ভাজা। যাত্রা কিংবা থিয়েটারের আসরে উন্মুখ দর্শকের মুখ চলে এই চিনাবাদামের ভাজাতেই।
চিনাবাদামের ক্ষেত
ভাজা চিনাবাদামের মাহাত্ম্য সত্যিই অভূতপূর্ব। একে পছন্দ করেনা এরকম লোকজনের দেখা পাওয়া বেশ কষ্টকর। ভাজা বাদামের ক্যারিশ্মা নিয়ে সবংয়ের শিল্পী কৃষ্ণেন্দু ভুঁইয়ার গাওয়া গান তো সুপারহিট। জনপ্রিয় এই 'কাঁচা বাদাম' গানটি প্রকারান্তরে বাদামের গুনকীর্তনই করে --
"আতা গাছে তোতা পাখি
ডালিম গাছে মৌ
আমার বাদাম খেয়ে প্রেমে
পড়ল কত বৌ।
বাদাম বাদাম, বৌদি কাঁচা বাদাম।
বৌদি বাদাম বাদাম....
চিক চিক করে বালি
কোথাও নেই কাদা
আমার কাঁচা বাদাম খেয়ে
পটবে বৌদি দাদা।
বাদাম বাদাম, বৌদি কাঁচা বাদাম।
বৌদি বাদাম বাদাম....
পার হয়ে যায় গরু
পার হয় গাড়ি।
খেলে আমার কাঁচা বাদাম
লাগে মজা ভারী।
বাদাম বাদাম, বৌদি কাঁচা বাদাম।
বৌদি বাদাম বাদাম....
হাট বসেছে শুক্রবারে
হয়না বাদাম ধারে।
না থাকিলে পয়সা দাদা
বদল নিতে পারে।
বাদাম বাদাম, বৌদি কাঁচা বাদাম।
চিনাবাদামের গাছ
চিনাবাদাম সম্পর্কে ১৭৫৩ সালে বিখ্যাত বিজ্ঞানী ক্যারোলাস লিনিয়াস তাঁর Species Plantaram বইতে প্রথম উল্লেখ করেছিলেন। একে বিভিন্ন স্থানের লোকেরা বলে মুংগফলী, মেটে বাদাম, মাটির বাদাম, পিনাট, আর্থনাট (Earthnut) ইত্যাদি। এর বিজ্ঞানসম্মত নাম Arachis hypogaea। এটি Fabaceae (Liguminosaea) পরিবারের অন্তর্গত। চিনাবাদামের কয়েকটি জনপ্রিয় উন্নত প্রজাতি হল টি জি ৫১, তুয়া দিন কাবিন (থাইল্যান্ডের জাত), গিরনার ৪, গিরনার ৫, বারি চিনাবাদাম ১০, বিনা চিনাবাদাম ৬, ডিএম ১ (ত্রিদানাবাদাম), ঝিঙ্গাবাদাম ইত্যাদি। এদের মূলের নোডিউলগুলিতে রয়েছে সিম্বিওটিক নাইট্রোজেন ফিক্সিং ব্যাকটেরিয়া। যা মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। ২০২৩ সালের হিসেব অনুযায়ী বিশ্বে সবচেয়ে বেশি চিনাবাদাম উৎপাদিত হয়েছে চিনে (১৯.২ লক্ষ টন)। এছাড়াও ভারত (১০.২ লক্ষ টন), নাইজেরিয়া (৪.৩ লক্ষ টন), আমেরিকা, সুদানেও প্রচুর উৎপাদন হয়।
চিনাবাদামের ফুলের বৈশিষ্ট্য অন্যদের চেয়ে আলাদা। মাটির ওপরে ফুল হয় কিন্তু মাটির তলায় ফল হয়। এই গাছের হলুদ রং এর ফুলে পরাগ সঞ্চার হওয়ার পর ফুলের পাঁপড়িগুলি খসে যায় এবং ডিম্বাশয়টি ফুলে ওঠে। একে পেগ (PEG) বলে। এটি ক্রমশঃ লম্বা হয়ে ওঠা একটি দন্ড সহ হটাৎই নিচের দিকে বেঁকে যায়। অবশেষে তা মাটির নিচে ঢুকে যায়। এবং সেখানেই চিনাবাদামের গুচ্ছাকার ফল জন্মায়। আমরা যা বাদামের ফল বলে থাকি, আসলে তা ডিম্বাশয়ের প্রাচীর পরিপক্ক হওয়ার সময় শক্ত হয়ে যাওয়া অংশ। শক্ত খোলার মধ্যে থাকে দুটি, তিনটি, চারটি বা পাঁচটি করে বাদাম।
প্রথম দিকে ১৮৭০-১৯৩০ পর্যন্ত এগুলি পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হত। পরবর্তীতে এটি মানুষের খাদ্য হিসেবে স্থান পায়। উনিশ শতকে উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন মেলায় এবং বাজারে ভ্রাম্যমাণ ঠেলাগাড়ির চালকরা চিনাবাদাম বিক্রি করত। তবে উনিশ শতকের শেষদিকে এবং বিংশ শতকের শুরুতে মার্কিন কৃষি বিভাগ চিনাবাদামের উৎপাদন মাত্রা বাড়িয়ে জনমানসের মধ্যে চিনাবাদামের ব্যবহার বাড়াতে উৎসাহিত করার চেষ্টা শুরু করে।
গোরাচাঁদ ব্যানার্জির লেখা ও সুর করা একটি গানে কন্ঠ দিয়েছেন 'কাঁচা বাদাম' খ্যাত শিল্পী ভূবন বাদ্যকর। সেই গানে তিনি এই কাঁচা বাদামের উপর ভিত্তি করে নিজের শিল্পীসত্বার বিকাশ ঘটাতে চেয়েছেন -
'বীরভূমেতে বাড়ি আমার
নামটি হয় ভূবন
আমার বাদাম কেড়ে নিল
বিশ্ববাসীর মন।
শিল্পী হতে চাই গো বাবু
জানাই প্রনাম।
বাদাম বাদাম গো বুবু
কাঁচা বাদাম।'
চিনাবাদামের মধ্যে থাকে ফসফরাস, জিঙ্ক, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, প্রোটিন, ভিটামিন ই, ভিটামিন সি, রিবোফ্লাভিন (বি২), প্যানটোথেনিকঅ্যাসিড (বি৫), নায়াসিন (বি৩), থায়ামিন (বি১), ভিটামিন বি৬, ফোলেট (বি৯) ইত্যাদি। চিনাবাদামের মধ্যে পাওয়া যায় পলিফেনল, ফাইটোস্টেরল, মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট, পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট ইত্যাদি। এর খোসায় থাকে রেসভেরাট্রল। নিয়মিত চিনাবাদাম খেলে হাড়ের রোগের সমস্যা মেটে। পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করে। বুদ্ধি ভালো হয়। মস্তিষ্কের বৃদ্ধি ভালো হয়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। রক্তচাপ ও ওজন নিয়ন্ত্রণ করে। হজম ক্ষমতার বৃদ্ধি করে। একদিকে স্বাস্থ্য রক্ষার সহযোগী, অন্যদিকে এই চিনাবাদাম এখন গানের অন্দরমহলে ঢুকে পড়েছে। অত্যন্ত সুস্বাদু এবং উপকারী চিনাবাদাম নিয়ে বীরভূমের শিল্পী ভূবন বাদ্যকরের কন্ঠে আজ ধ্বনিত হয় -
'বাদাম বাদাম দাদা কাঁচা বাদাম,
আমার কাছে নাই গো বুবু ভাজা বাদাম,
আমার কাছে পাবে শুধু কাঁচা বাদাম'।
🍂
2 Comments
ভালো লাগলো বেশ।
ReplyDeleteধন্যবাদ🙏💕
ReplyDelete