জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকারতৃতীয় খণ্ডপর্ব ৬: বিশ্বাসঘাতকের মুখোশকমলিকা ভট্টাচার্য

বাঁচার উত্তরাধিকার
তৃতীয় খণ্ড
পর্ব ৬: বিশ্বাসঘাতকের মুখোশ

কমলিকা ভট্টাচার্য 


হাসপাতালের করিডোরে সেই মানুষটার চোখ অনির্বাণ কিছুতেই ভুলতে পারছিল না। ওই চোখে কোনো অপরাধবোধ ছিল না, কোনো ভয় ছিল না—ছিল শুধু এক অদ্ভুত নিশ্চিন্ততা। যেন সে জানে, এই জায়গার প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি ক্যামেরা, প্রতিটি মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস তার অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণে। যেন শেষ পর্যন্ত জয় তারই হবে। সেই দৃষ্টিটা অনির্বাণের মনের ভিতরে একটা অদৃশ্য কাঁটার মতো আটকে ছিল, যেটা তাকে প্রতি মুহূর্তে মনে করিয়ে দিচ্ছিল—তারা এখনও নিরাপদ নয়।
ইরা দৃঢ় গলায় বলল, তাদের সিকিউরিটি ফুটেজ দেখতে হবে। ঋদ্ধিমান ইতিমধ্যেই হাসপাতালের প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছিল। এই হাসপাতালের অস্তিত্ব কাগজে-কলমে নেই। এখানে যারা থাকে, তারা হয় রাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, নয় সবচেয়ে বিপজ্জনক গোপন সত্য। তাই এখানে সবকিছু রেকর্ড করা হয় না—ইচ্ছা করেই কিছু অংশ অদৃশ্য রাখা হয়।
তবুও, দুই ঘণ্টার চেষ্টার পর তারা সিকিউরিটি রুমে পৌঁছতে পারল। ছোট অন্ধকার ঘর, চারদিকে মনিটরের ঠান্ডা নীল আলো। ইরার চোখের মণি হালকা নীল হয়ে উঠছিল—তার হিউম্যানয়েড প্রসেসর ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে মানুষের চেয়েও দ্রুত গতিতে।
সময়—রাত ২:১৭। ঠিক যখন নাতাশা প্রথম জেগে উঠেছিল।
ইরা ফিসফিস করে বলল, সে পেয়ে গেছে।
স্ক্রিনে দেখা গেল ফাঁকা করিডোর। তারপর একজন ঢুকল। হাসপাতালের পোশাক, মাথা নিচু। লোকটা ধীরে হাঁটছিল, তার চলার ভঙ্গিতে একটা অস্বাভাবিক শান্তি। যেন সে জানে, কেউ তাকে থামাবে না।
হঠাৎ সে থামল।
ধীরে মাথা তুলল।
আর সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকাল।
অনির্বাণের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
“অসম্ভব…”
ঋদ্ধিমান জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি চেনো লোকটাকে?”
অনির্বাণের ঠোঁট শুকিয়ে গেল।
“মিস্টার টিমসন।”
ঘরের ভিতর নীরবতা নেমে এল।
মিস্টার টিমসন—হিউম্যানয়েড প্রজেক্টের প্রধান নিউরাল আর্কিটেক্টদের একজন। অনির্বাণের সহকর্মী। যার সঙ্গে সে বছরের পর বছর কাজ করেছে, বিশ্বাস করেছে।
ঠিক তখনই ইরার ল্যাপটপে একটা নতুন ফাইল ভেসে উঠল—
Unknown Upload
ভিডিও চালু হতেই তাদের বুকের ভিতর জমাট বাঁধল আতঙ্ক।
অন্ধকার ঘরের মধ্যে অচেতন নাতাশা শুয়ে আছে। তার মাথায় বসানো নিউরাল ডিভাইস থেকে ক্ষীণ আলো বেরোচ্ছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে মিস্টার টিমসন ঠান্ডা, আবেগহীন গলায় বলছে—
“Subject Natasha responding well. Neural mapping at 62 percent.”
অনির্বাণের ভিতরে যেন কিছু ভেঙে পড়ল।
ঠিক সেই মুহূর্তে তার হাত কেঁপে উঠল।
এক সেকেন্ডের জন্য তার আঙুলগুলো আধা স্বচ্ছ হয়ে গেল।
বাস্তবতা আর অবাস্তবের মাঝখানে আটকে থাকা একটা অস্তিত্ব।
ঋদ্ধিমান সেটা দেখল। খুব সূক্ষ্মভাবে।
সে কিছু বলল না। কিন্তু বুঝে গেল—অনির্বাণ ভেঙে পড়ছে।
ভিডিও বন্ধ হয়ে গেল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল—
TRUST IS THE BIGGEST WEAPON
ঠিক তখন দরজা খুলে মিস্টার টিমসন ভিতরে ঢুকল।
শান্ত মুখ। হালকা হাসি।
“অনির্বাণ, তুমি ফিরে এসেছো।”
তার গলায় কোনো বিস্ময় নেই। যেন সে আগেই জানত।
কিছুক্ষণ পর সে চলে গেল। কিন্তু তার উপস্থিতি একটা অদৃশ্য ছায়া রেখে গেল।
ঠিক তখনই ICU থেকে অ্যালার্ম বেজে উঠল।
নাতাশা জেগে উঠে কষ্ট করে বলল—
“মিস্টার টিমসন… সে একা নয়…”
এই কথাটা যেন একটা বিস্ফোরণ।
ঋদ্ধিমান বুঝল—শত্রু একজন নয়। একটা নেটওয়ার্ক।
সেই রাতেই সে তিলকবাবার দেওয়া নিউরাল হ্যাকিং ডিভাইস ব্যবহার করল। ইরা অদৃশ্য হয়ে টিমসনের কাছে পৌঁছাল। ডিভাইস সক্রিয় হতেই ভেসে উঠল কিছু ছবি—
Facility 47
কিছু অচেনা মুখ।
আর একটা নাম—
PROJECT-ANI
ইরাই টিমসনের ঘাড়ে বসিয়ে দিল মাইক্রো নিউরাল ট্র্যাকার।
টিমসন কিছুই টের পেল না।
সেই রাতেই প্রথম সিগন্যাল এল।
লোকেশন—শহরের বাইরে একটা পরিত্যক্ত গবেষণা কেন্দ্র।
স্ক্রিনের উপর লাল বিন্দুটা স্থির হয়ে জ্বলছিল, যেন অন্ধকারের ভিতর থেকে কেউ নিঃশব্দে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
ঋদ্ধিমান চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তার পাশে ইরা, অদৃশ্য অথচ সম্পূর্ণ সজাগ।
এই প্রথমবার তারা শত্রুর অবস্থান জানে।
তবুও এই জ্ঞান তাকে স্বস্তি দিল না।
বরং আরও বড় এক অজানা ভয়ের দরজা খুলে দিল।
কারণ যারা এতদিন ছায়ার আড়ালে থেকেছে, তারা এত সহজে ধরা পড়ার মতো দুর্বল নয়।
আর ICU-র ভিতরে অনির্বাণ বসে আছে নাতাশার পাশে, তার হাতটা নিজের হাতে ধরে।
বাইরে থেকে তাকে শান্ত দেখাচ্ছে।
কিন্তু তার ভিতরে প্রতিটি সেকেন্ডে একটা অদৃশ্য যুদ্ধ চলছে।
মাঝে মাঝে তার আঙুল কেঁপে উঠছে।
মাঝে মাঝে তার দৃষ্টি শূন্য হয়ে যাচ্ছে।
যেন সে এই বাস্তবতার সঙ্গে নিজের সংযোগ ধরে রাখার জন্য লড়াই করছে।
সে বুঝতে পারছে—সে হারিয়ে যাচ্ছে।
তবুও সে চুপ।
কারণ সে জানে—সে দুর্বল হলে সবকিছু ভেঙে পড়বে।
ঋদ্ধিমান জানালার ওপাশ থেকে সেই দৃশ্যটা দেখছিল।
একদিকে টিমসন—একজন বিশ্বাসঘাতক।
অন্যদিকে অনির্বাণ—তার বন্ধু, যে ধীরে ধীরে অস্তিত্ব হারাচ্ছে।
এই দুই বিপদের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে সে নিজে।
সে বুঝল—
এই যুদ্ধ শুধু একজন বিশ্বাসঘাতকের বিরুদ্ধে নয়।
এটা একটা জালের বিরুদ্ধে।
যেটা অনেকদিন ধরে ছড়িয়ে আছে।
আর এখন সেই জাল তাদের চারপাশে শক্ত হয়ে আসছে।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সত্য—
সময় খুবই কম।
তাকে খুব দ্রুত, কিন্তু নিখুঁতভাবে কাজ করতে হবে।
একটুও ভুল করা চলবে না।
কারণ টিমসন যদি বুঝতে পারে—
তাহলে তারা সবাই টার্গেটে পরিণত হবে।
ঋদ্ধিমান ধীরে নিজের মুঠো শক্ত করল।
এই মুহূর্ত থেকে—
সে আর শুধু একজন পর্যবেক্ষক নয়।
সে এই যুদ্ধের একজন সক্রিয় অংশ।
আর অন্ধকারের ভিতরে—
শিকার আর শিকারির সীমারেখা ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে।

ক্রমশ ...

Post a Comment

2 Comments

  1. সুন্দর গতিময়তা বজায় রইল। খুব ভালো লাগছে।

    ReplyDelete