একাদশ পর্ব
স্বাতী ভৌমিক
(সুখের কাহিনী )
সাধারণত মানবজীবনে- মানব মনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে একটাই অন্বেষণ অবিচ্ছিন্নরূপে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত চলতে থাকে।তা হোলো- সুখ। সমস্ত জড়জাগতিক চাহিদা, সমস্ত বিনিদ্র কর্মপ্রচেষ্টার একটাই মূল কারণ তা হোলো সুখী হওয়া।
কিন্তু ব্যক্তি কি নিরবিচ্ছিন্নভাবে সুখী হতে পারে? উত্তরে বলা যায়, সম্ভবতঃ এই জড়জাগতিক চাহিদার চাওয়া-পাওয়ার জোয়ার-ভাটায় জীব কখনো চিরসুখী হতে পারে না।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, এই "সুখান্বেষী" মনোভাব কখনো কখনো ব্যক্তিকে তার জীবনের বিপরীতে পরিচালিত করে। ব্যাখ্যা করে বলা যায়, ব্যক্তি সবসময় নিজে সুখী হতে চায়। তার আত্মীয়- পরিজনদেরও সুখী দেখতে চায়। কারণ তাদের সুখে নিজেকে ব্যক্তি সুখী বলে অনুভব করে। কিন্তু জাগতিক কামনা- বাসনা ব্যক্তিকে প্রায়শঃই লোভী- বিবেকহীন- বিচার -বুদ্ধিহীন পন্ডিতমূর্খ বানিয়ে ফেলে। এই চাহিদার একটি নিষ্পত্তি হতে না হতেই অন্য কোন জাগতিক চাহিদা এসে মানসপটে হাজির হয়। এভাবে চলতে চলতে ব্যক্তি অনেক সময় নিজের জীবনকে নিজের অজান্তেই সুখ লাভের একটি মাধ্যম হিসেবে ভেবে নেয়। তথাকথিত সুখী হতে না পেরে বা সুখী হওয়ার জন্য তার চাহিদার বিষয়টি না পেয়ে অনেক সময় ব্যক্তি 'আত্মহত্যার' পথ বেছে নেয়। তখন তার এইটুকু সাধারণ জ্ঞান থাকে না যে, জীবন শুধুমাত্র কোন সুখ লাভের মাধ্যম নয়। জীবনের নিজস্ব মূল্য রয়েছে। জীবন স্বতঃমূল্যবান।
জীবনে এই সুখঅন্বেষন থেকে বিরত হয়ে শান্তি লাভ করার প্রচেষ্টা করা উচিত। কারণ সুখ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু শান্তি ক্ষণস্থায়ী সুখের বিচ্ছেদকে অসহনীয় হতে দেয় না। শান্তভাবে পরিস্থিতির স্রোতে ভেসে না গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের ও পরীক্ষণের মানসিক শক্তি প্রদান করে।
শান্তি শান্ত থাকার কৌশল শিখিয়ে দেয়। কিন্তু সমস্যা হোলো, শান্তি তো বাহ্যিক কোন ব্যাপার নয়। শান্তি হল মানসিক ব্যাপার। বাহ্যিক অন্বেষণে শান্তি মেলে না। শান্তি থাকে অন্তর্দৃষ্টির ক্ষমতায়- শান্তি থাকে চিন্তনের গভীরতায়- শান্তি থাকে সময়োপযোগী স্থিরতায়- শান্তি থাকে নীরব বিচারের আত্মলীনতায়।
জগতের বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে কখনোই সুখী হওয়া যায় না। জগতের পরিবর্তনশীলতা জগতের-জীবনের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতনতা, ব্যক্তি মনকে শক্তিশালী ও সহনশীল করে তোলে।
সংযত না হলে শান্তি লাভ হয় না। মনকে সংযত, নিজেকে ধীর- স্থির করার বিভিন্ন পন্থা আমাদের হিন্দু দর্শনে রয়েছে। শরীরকে সুস্থ রাখার জন্য যেমন ব্যায়াম, শরীর চর্চার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়, ঠিক তেমনি মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য মানসিক কিছু সুচিন্তার চর্চা ও অনুশীলনের প্রয়োজন রয়েছে।
মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক থাকলে, তখন আর ব্যক্তি বাহ্যিক জড়জাগতিক ব্যাপারে জীবনের সুখ-শান্তি খোঁজে না। নিজে পরিস্থিতির শিকার না হয়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যক্তি নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে পারে। জীবনকে সুচালিত করার ক্ষমতা তখন ব্যক্তির নিজের মধ্যেই থাকে।
ব্যক্তির সুখ শান্তি লাভের পথে প্রধান অন্তরায় বা বাধা হোলো ব্যক্তি নিজে।বাহ্যজগতে নিজের প্রত্যাশার জন্য, অনেক সময় অন্যের মতো হওয়ার আশায় নিজের দুঃখের কারণ ব্যক্তি নিজেই হয়ে ওঠে। প্রকৃতি চলবে প্রকৃতির মত- অন্য জীব চলবে তার মত। কিন্তু স্বীয় প্রত্যাশা অনুরূপ সবকিছু পাওয়ার কামনায় ব্যক্তি নিজে নিজের দুঃখের পটভূমি রচনা করে। জীবনে অনেক সময় ব্যক্তি অন্যের সাথে নিজের তুলনা করে নিজে নিজের সুখ-শান্তি লাভের ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। প্রত্যেকের জীবনের কাহিনী আলাদা,প্রত্যেক জীব অনন্য- তাহলে কারোর মতো জীবনে কোন কিছু আশা করাটা কি উচিত কর্ম নাকি বুদ্ধিমানের পরিচায়ক!
সুখ শান্তি অনুভূতিমূলক। নিজের অনুভূতি নিজের দায়িত্ব। ব্যক্তি ভুল এটাই করে, নিজের দায়িত্ব অন্যের ওপর বা অন্য কিছুর উপর দিয়ে হালকা হতে চায়। কিন্তু এতে ব্যক্তিমনের সুখ-ও, পরিস্থিতি-পরিবেশ সবকিছু বাহ্যিক ব্যাপার অনুযায়ী স্থায়ী হয়। ব্যক্তির উপর পরিবেশ পরিস্থিতির প্রভাব এসে পড়ে- এটা অনস্বীকার্য। তবে সেই অনুযায়ী মানসিক দিক থেকে নিরাপত্তাহীনতার পরিচয় দিয়ে বাইরের ঝড় ঝঞ্ঝাকে অতীব সহজে নিজ অন্তর মধ্যে ঝড় তুলতে দেওয়াটা সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান জীব হিসেবে কখনোই ব্যক্তির শোভা পায় না।
0 Comments