জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকার/তৃতীয় খণ্ড/পর্ব ৭: নাতাশার স্মৃতির ভিতরে/কমলিকা ভট্টাচার্য


বাঁচার উত্তরাধিকার
তৃতীয় খণ্ড
পর্ব ৭: নাতাশার স্মৃতির ভিতরে

কমলিকা ভট্টাচার্য 


ICU-র আলো সবসময় একই রকম থাকে—না খুব উজ্জ্বল, না খুব অন্ধকার। একটা অদ্ভুত মধ্যবর্তী অবস্থা, ঠিক নাতাশার চেতনার মতো। সে পুরোপুরি ফিরে আসেনি, আবার পুরোপুরি হারিয়েও যায়নি। অনির্বাণ তার পাশে বসে ছিল গত চার দিন ধরে, প্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে। তার নিজের শরীরও এখনও দুর্বল। মাঝে মাঝে হঠাৎ তার হাত কেঁপে ওঠে, মাঝে মাঝে কয়েক সেকেন্ডের জন্য সে চারপাশের সব শব্দ হারিয়ে ফেলে—শুধু একটা শূন্যতা, একটা নিস্তব্ধ অন্ধকার। সে জানে, ডিসপ্লেসমেন্ট তাকে পুরোপুরি ছেড়ে যায়নি। তার ভিতরে এখনও সেই ছায়া রয়ে গেছে। ঋদ্ধিমান দূর থেকে সবকিছু লক্ষ্য করছিল। টিমসনের মস্তিষ্কে বসানো নিউরাল ট্র্যাকার এখন নিয়মিত সিগন্যাল পাঠাচ্ছে, আর সেই সিগন্যাল বিশ্লেষণ করতে করতেই সে বুঝতে পারছিল—সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।
ঠিক তখনই নাতাশার ঠোঁট নড়ল। খুব ক্ষীণ কণ্ঠে সে বলল, “অনির্বাণ…” অনির্বাণ সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকে পড়ল। “আমি এখানে,” সে ধীরে বলল। নাতাশার চোখ আধখোলা, ক্লান্ত, কিন্তু সচেতন। সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “তারা কোথায়?” অনির্বাণ বুঝতে পারল—তার মন এখনও Facility 47-এর অন্ধকারে বন্দি। সে তার হাত শক্ত করে ধরে শান্ত গলায় বলল, “তুমি নিরাপদ। আমরা দেশে ফিরে এসেছি।” নাতাশার চোখ দিয়ে ধীরে জল গড়িয়ে পড়ল। “তুমি… সত্যি এসেছিলে…”—এই কথার ভিতরে অভিযোগ, ভালোবাসা আর ভাঙা বিশ্বাসের মিশ্রণ ছিল। কিছুক্ষণ পর সে কাঁপা গলায় বলতে শুরু করল, “ওরা আমার মাথার ভিতরে ঢুকেছিল… একটা মেশিন দিয়ে… ওরা বলত এটা পরীক্ষা… কিন্তু এটা পরীক্ষা ছিল না… ওরা আমার স্মৃতি দেখত… প্রতিদিন… ঘন্টার পর ঘন্টা… ওরা খুঁজছিল চেতনা… মানুষের ভিতরের আসল জিনিসটা…” কথাগুলো বলতে বলতে তার শ্বাস ভারী হয়ে উঠছিল। অনির্বাণ তার হাত চেপে ধরে তাকে স্থির রাখার চেষ্টা করছিল।
হঠাৎ নাতাশা আবার ফিসফিস করে বলল, “মিস্টার টিমসন…” নামটা শুনেই অনির্বাণের শরীর শক্ত হয়ে গেল। “সে সেখানে ছিল,” নাতাশা বলল, “সে ওদের সাহায্য করছিল… সে আমাকে চিনত… সে তোমার কথা জানত…” অনির্বাণ বুঝতে পারল—এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, এটা অনেক আগে থেকেই পরিকল্পিত। কিন্তু নাতাশা হঠাৎ তার হাত শক্ত করে ধরে আতঙ্কিত গলায় বলল, “সে একা ছিল না… আরেকজন ছিল… আমি তার মুখ দেখতে পাইনি… কিন্তু সে তোমার নাম জানত… সে বলেছিল—অনির্বাণই চাবি…” কথাটা শেষ করেই নাতাশা ক্লান্ত হয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
ঠিক সেই মুহূর্তে অনির্বাণের মাথার ভিতরে একটা তীব্র ঝলক দেখা দিল—একটা ঘর, একটা অদ্ভুত মেশিন, আর সেই মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ। অনির্বাণ হঠাৎ পিছিয়ে গেল। তার শ্বাস দ্রুত হয়ে উঠল। ইরা, যে এতক্ষণ অদৃশ্য অবস্থায় ছিল, দৃশ্যমান হয়ে তার পাশে এসে দাঁড়াল। “কি হয়েছে?” সে জিজ্ঞেস করল। কিন্তু অনির্বাণ কোনো উত্তর দিতে পারল না। কারণ সে নিজেই বুঝতে পারছিল না—ওটা তার নিজের স্মৃতি, না কারও বসানো মিথ্যে ছবি।
এই সময় অন্য ঘরে বসে ঋদ্ধিমান সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে টিমসনের নিউরাল ট্র্যাকার মনিটর করছিল। হঠাৎ স্ক্রিনে নতুন লোকেশন ভেসে উঠল—Facility 47-এর বাইরের একটা সেকেন্ডারি বেস। তার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল। সে তিলকবাবার দেওয়া উন্নত নিউরাল হ্যাকিং প্রোটোকল সক্রিয় করল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে টিমসনের নিউরাল সিগন্যাল তার সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেল। প্রথমবার সে শুধু পর্যবেক্ষণ নয়, নিয়ন্ত্রণও নিতে পারল। টিমসনের চোখ দিয়ে সে দেখতে পেল একটা অন্ধকার কনফারেন্স রুম, কয়েকজন অচেনা মানুষ, আর একটা প্রজেকশন—PROJECT ANI: PHASE FINAL। তাদের কথোপকথন থেকে স্পষ্ট হয়ে গেল—অনির্বাণই তাদের শেষ লক্ষ্য। কারণ অনির্বাণের ডিসপ্লেসমেন্ট ক্ষমতা চেতনা ও বাস্তবতার সীমা ভেঙে দিতে পারে। ঋদ্ধিমান দ্রুত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করল। তার হাত ঘামে ভিজে গিয়েছিল, কিন্তু তার চোখে তখন আর দ্বিধা ছিল না। সে বুঝে গেছে—শত্রু এখন তার নাগালের মধ্যে।
সে সঙ্গে সঙ্গে তিলকবাবার সঙ্গে যোগাযোগ করল। সব শুনে তিলকবাবা ধীরে বললেন, ডিসপ্লেসমেন্ট শরীর ও মস্তিষ্কের উপর মারাত্মক চাপ ফেলে, আর অনেক ক্ষেত্রে সেই ক্ষতি স্থায়ী হয়ে যায়। তবে যদি অনির্বাণকে কিছুদিন গভীর ঘুমে রাখা যায়, তাহলে তার মস্তিষ্ক নিজেকে কিছুটা পুনর্গঠন করার সুযোগ পাবে। ফোন রেখে ঋদ্ধিমান ICU-র দিকে তাকাল। কাঁচের ওপাশে অনির্বাণ আর নাতাশা হাত ধরে বসে আছে—দুজনেই ভাঙা, কিন্তু জীবিত; ক্লান্ত, কিন্তু পরাজিত নয়। সে ভিতরে গিয়ে শান্ত গলায় অনির্বাণকে বলল কিছুদিন বিশ্রাম নিতে। সে আশ্বাস দিল—এদিকে সবকিছু সে সামলে নেবে।
পরবর্তী কয়েক দিনে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে শুরু করল। নাতাশার শরীর সাড়া দিতে লাগল, তার কণ্ঠে শক্তি ফিরল, তার চোখে আবার জীবনের আলো জ্বলে উঠল। অনির্বাণের ডিসপ্লেসমেন্টও কিছুটা স্থিতিশীল হল, যদিও তার ভিতরের অস্থিরতা পুরোপুরি যায়নি। কিন্তু ঋদ্ধিমান জানে—এই শান্তি সাময়িক। এক রাতে সে একা বসে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল। টিমসনের চোখ দিয়ে সে আবার সেই গোপন বেসটা দেখছিল। একটা ভারী দরজা। দরজার উপর লেখা—ANI CORE। সেই শব্দ দুটো তার ভিতরে ঠান্ডা একটা অনুভূতি ছড়িয়ে দিল। সে বুঝল—এটাই সেই জায়গা, যেখানে এই যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিণতি অপেক্ষা করছে।
ICU-র ভিতরে অনির্বাণ নাতাশার দিকে তাকিয়ে ছিল। নাতাশা দুর্বল হাসি দিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “আমরা কি জিতব?” অনির্বাণ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তার হাত শক্ত করে ধরল। তার চোখে ক্লান্তি ছিল, ভয় ছিল, কিন্তু তার থেকেও বেশি ছিল ভালোবাসা। সে ধীরে বলল, “আমরা এখনও হারিনি।” বাইরে দাঁড়িয়ে ঋদ্ধিমান সেই দৃশ্যটা দেখছিল। তার চোখে তখন এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। কারণ এখন সে জানে—শত্রু কে, শত্রু কোথায়, আর শত্রু কিভাবে আঘাত করবে। তাই বিপদ আসার আগেই তাকে থামানোর পথও সে খুঁজে পেয়েছে। এই মুহূর্ত থেকে সে আর শুধু একজন পর্যবেক্ষক নয়—সে এই যুদ্ধের নিয়ন্ত্রক। আর অন্ধকারের ভিতরে, নিঃশব্দে, চূড়ান্ত সংঘর্ষের সময় ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে।

ক্রমশ...

Post a Comment

0 Comments