মধুবাবুর ১লা বৈশাখ
কমলিকা ভট্টাচার্য
মধুবাবু মানুষটা ভীষণ চিন্তাশীল। এমন সব চিন্তা করেন, যা সাধারণ মানুষ করলে বাড়ির লোক সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার ডাকত।
সেদিন সন্ধ্যেবেলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে পাখিদের উড়ান দেখতে দেখতে হঠাৎ তার মাথায় এক চিন্তা ঢুকে গেল—
“আমি যদি হঠাৎ একলা হয়ে যাই?”
না, দার্শনিক একলা নয়। একেবারে ব্যবহারিক একলা।
মানে, কল্যাণীদেবী যদি হঠাৎ না থাকেন—তাহলে?
মধুবাবুর বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে গেল। চোখ বন্ধ করতেই ভবিষ্যৎ ভেসে উঠল—
সকালবেলা কেউ বলছে না, “চা খাবে?”
দুপুরে কেউ বলছে না, “ভাত খাবে?”
রাতে কেউ বলছে না, “মশারিটা গুঁজে নাও!”
এই “কেউ বলছে না”-এর ভবিষ্যৎ কী রকম ভয়ংকর হতে পারে সেটা ভেবে তিনি শিউরে উঠলেন। তিনি স্থির করলেন—এর একটা রিহার্সাল দরকার।
পরদিন তিনি অকারণে কল্যাণীদেবীকে বললেন,
—“পয়লা বৈশাখে তোমার বাপের বাড়ি ঘুরে এসো না! কতদিন যাওনি!”
কল্যাণীদেবী ভুরু কুঁচকে তাকালেন।
—“তুমি ঠিক আছ তো?”
—“একেবারে ঠিক!”
—“তাহলে আমায় পাঠাচ্ছ কেন?”
—“তোমার ভালোর জন্য!”
—“আমার ভালো?”
—“আমার ভালো তোমার একা থাকার সঙ্গে কীভাবে জড়িত?”
—“তুমি বুঝবে না।”
যাওয়ার আগে কল্যাণীদেবী তিন পৃষ্ঠা নির্দেশিকা লিখে গেলেন।
মধুবাবু কাগজ দেখে বললেন,
—“এ তো সরকারি গেজেট!”
পয়লা বৈশাখের সকাল,
ঘুম ভাঙতেই তিনি বুঝলেন—বাড়িটা অস্বাভাবিক চুপচাপ।
চুপচাপ মানে নিস্তব্ধ নয়—খালি।
রান্নাঘরে ঢুকে দেখলেন ফ্লাস্কে চা, কাপ-প্লেট গুছানো। ভাবলেন, “কাল বানানো চা আজ আর গরম থাকবে?”
কাপে ঢেলে চুমুক দিতেই জিভ পুড়ে গেল।
তিনি থমকে দাঁড়ালেন।
ফ্লাস্কের গায়ে হাত দিলেন। গরম।
ধীরে ধীরে একটা ঠান্ডা অনুভূতি তার পিঠ বেয়ে নামতে লাগল। তবু ফ্লাস্কের গায়ে লেখা কোম্পানির নামটা পড়ে তাদের সুখ্যাতি মনে করে মনকে কিছুটা কন্ট্রোল করলেন।
🍂
দালানে বসতেই ভেসে এলো চন্দন সাবানের গন্ধ।
এই গন্ধ তিনি চেনেন।
এই গন্ধ মানেই—কল্যাণীদেবী স্নান সেরে ফুল তুলছেন।
তিনি হঠাৎ পিছনে তাকালেন।
কেউ নেই।
খবরের কাগজে চোখ রাখলেন। যুদ্ধ, ভোট, চিৎকারের ভিড়ে কোণায় ছোট্ট একটা খবর—এক মহিলার পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যু।
খবরটা এড়িয়ে তিনি উঠে গেলেন। আজ একলাই সব কাজ সারতে হবে—ঘরদোর পরিষ্কার, পুজো।
ঘরদোর ঝকঝকে। যেন সকালের মধ্যে কেউ মুছে দিয়েছে। খুব অবাক হলেন, কিন্তু মনকে বোঝালেন—কাল থেকে তিনি একলা, কে আর নোংরা করেছে!
স্নান করে বেরিয়ে আলমারি খুলতে যাবেন হঠাৎ দেখলেন নতুন পাঞ্জাবি বিছানায় ভাঁজ করা। একটু আগে তো ছিল না এখানে। তারপর নিজেই বললেন, “আজকাল আমার কিছু মনে থাকে না, নিজেই রেখেছি বোধহয়।”
পুজোর ঘরে ঢুকে দেখলেন প্রদীপ জ্বলছে। ধূপ থেকে ধোঁয়া উঠছে সরু সুতোর মতো।
এবার সত্যিই তার গা ছমছম করল।
কল্যাণী তো কাল বিকেলে গেছে।
তাহলে?...
ঠিক তখনই ডোরবেল।
নন্দিতা
নন্দিতা লুচি-আলুরদম দিয়ে গেল।
—“ কাকিমা যাওয়ার সময় বলেছিলেন, কাকু একলা হয়ে যাবে, একটু দেখে রাখিস।”
“কাকিমার এইভাবে অসময়ে চলে যাওয়া…”—বলতে গিয়ে থেমে গেল নন্দিতা।
মধুবাবু বললেন, “মানে?”
—“না না, আজ পয়লা বৈশাখ, বছরের শুরু… আমি চলি, কাকু।”
মধুবাবু মনে মনে ভাবলেন—আজকালকার ছেলেমেয়েদের ভাষাজ্ঞান খুবই দুর্বল। এমন করে বলছিল যেন কল্যাণীর কিছু একটা হয়ে গেছে!
হঠাৎ করে তার মনে হলো—আচ্ছা, তিনিও তো সত্যি কল্যাণীর অবর্তমানে নিজের অবস্থা কী হবে তার অভিজ্ঞতা নিতে চাইছিলেন।
লুচি খেতে বসে মধুবাবুর মনে হলো—এ যেন কল্যাণীর হাতের রান্না।
খাওয়ার পর টিভি দেখতে দেখতে তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন।
হঠাৎ টুংটাং শব্দে ঘুম ভাঙল।
রান্নাঘর থেকে চুড়ির শব্দ।
খুব চেনা শব্দ।
তিনি ধীরে ধীরে রান্নাঘরের দিকে গেলেন।
কেউ নেই।
কিন্তু উনুনের ওপর হাঁড়িতে ভাত, পাশে ডাল—গরম।
ঢাকনা খুলতেই ভাপ উঠে তার মুখে লাগল।
এইবার তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল।
ফোন করলেন কল্যাণীকে। নট রিচেবল।
দুপুরে হঠাৎ এলেন মিস্টার ব্যানার্জি। দাবা খেলতে খেলতে মধুবাবু স্পষ্ট শুনতে পেলেন—নূপুরের টুংটাং।
মধুবাবু জিজ্ঞাসা করলেন,
—“শুনছেন?”
—“কি?”
—“ওই… শব্দ…”
—“কিছুই তো না!”
মধুবাবু উঠে ঘরে ঢুকে দেখলেন—বিছানায় কাচা জামাকাপড় ভাঁজ করা। ড্রেসিং টেবিলে কল্যাণীর ছবিতে টাটকা মালা।
ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন।
ছুটে বাইরে এসে ব্যানার্জিকে নিয়ে এসে দেখাতে গেলে—মালা নেই।
মধুবাবুর গলা শুকিয়ে কাঠ।
ব্যানার্জি বাবু বললেন,
—“আপনি খুব ক্লান্ত মনে হচ্ছে। একটু বিশ্রাম নিন।”
ব্যানার্জি চলে গেলে তিনি কল্যাণীর ভাইকে ফোন করলেন।
উত্তর এল—
“দিদি তো এখানে আসেনি!”
এইবার তার মাথার ভেতর যেন কিছু ভেঙে পড়ল।
হঠাৎ সকালের খবরের কাগজের খবরটা মনে পড়ল।
দৌড়ে গিয়ে খবরটা পড়লেন।
বর্ণনা—কল্যাণীর মতো। দুর্ঘটনা—বেহালায়।
তার চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে এল।
তিনি সোফায় বসে কাঁদতে লাগলেন।
মনে হচ্ছিল—কেউ আছে। খুব কাছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে না।
ঠিক তখনই দরজা খোলার শব্দ।
কল্যাণীদেবী ঢুকলেন। হাতে মিষ্টির বাক্স, ক্যালেন্ডার।
বললেন—
“ এই কয়েকটা দোকানের হালখাতার নিমন্ত্রণ সেরে এলাম।
ওমা! এমন হাঁ করে দেখছ কেন? বাক্সগুলো ধরো।”
মধুবাবু তাকিয়ে আছেন। দেখছেন কল্যাণীদেবীর মাথায় সেই টাটকা ফুলের মালাটা।
কল্যাণী বললেন—
“কি ভেবেছ? আমি মরে গেছি?”
তারপর হেসে বললেন—
“তুমি একা থাকার অভিজ্ঞতা নেবে, আর আমি সত্যিই মরে যাব—এটা হতে পারে নাকি! তবে জেনে রাখো, আমি মরে ভূত হলেও তোমার ঘাড়ে চেপে থাকব!”
মধুবাবু কাঁপা গলায় বললেন,
“তাহলে তুমি কোথাও যাওনি?”
কল্যাণী মুচকি হেসে বললেন—
“সত্যি গেলে কি তোমার সত্যি অভিজ্ঞতা হত?”
“শুভ নববর্ষ। এখন মিষ্টি খাও।”
মধুবাবু মিষ্টি খেতে খেতে ভাবলেন—
6 Comments
খুবই পরিণত ও শীলিত কৌতুকী। খুব সুন্দর❤️
ReplyDelete♥️
Deleteজমাটি।বাস্তবের রিহার্সাল হয়না।
ReplyDeleteধন্যবাদ🙏
Deleteশুভ নববর্ষ!! দাম্পত্যের খুব সুন্দর ছবি আঁকা হল কথা দিয়ে।
ReplyDeleteধন্যবাদ 🙏
ReplyDelete