চিত্রা ভট্টাচার্য্য
' বুকে ধরে তোমার রুমাল ' কবি সুমন রায় রচিত এই আকর্ষণীয় নামের আধুনিক কবিতার বইটি হাতে পেয়ে আমার কবিতা প্রেমী ,অনুসন্ধিৎসু মন বারংবার কাব্য গ্রন্থটির আদ্যপ্রান্ত উল্টে দেখতে গভীর আগ্রহ বোধ করলো। প্রথম কবিতা 'ঘূর্ণি 'থেকে শেষ কবিতা 'জীবনের মানে ' প্রায় পঞ্চাশ টি ছোট বড়ো কবিতা ও অনুকবিতা মিলিয়ে বিভিন্ন স্বাদের মন ছুঁয়ে যাওয়া শব্দ সম্ভারে রচিত অনুপম কবিতার মালায় বইটি নিখুঁত ভাবে সেজে উঠেছে। যেখানে প্রকৃতিরই রূপ রঙ রস প্রধান উপজীব্য করে কবিতা রচিত হয়েছে। কবি নীরব দ্রষ্টা তার দৈনন্দিন জীবনের সাক্ষী, পরিচিত পরিবেশ নদ নদী খালবিল বন পাখপাখালির সমাবেশ নিয়ে কবিতায় মগ্ন কবি।
অপার্থিব ও সাধারণ সৃষ্টি জগতের সৌন্দর্যে দুইয়ের ই সন্ধান পেলাম কবিতার মুক্ত ছন্দে। সুন্দর দুইমলাটের মধ্যে নির্ভুল ছাপার অক্ষরে কালোকালির আঁচড়ে বইটির নাম যেমন চেতনার আলো জ্বালিয়ে মন কে উদ্বেলিত করে তেমনি বইটির মলাট। শিল্পী সৌগত চট্টপাধ্যায়ের আঁকা প্রচ্ছদ টি ভারী দৃষ্টি নন্দন গৈরিক জমিনের ওপর মেরুন রক্তিম রঙ মিলিয়ে এক অপরূপ অঙ্গসজ্জা মন কেড়ে নেয়।
'আধুনিক কবির আবেগের একটি মুক্ত প্রবাহ, বুকে ধরে তোমার রুমাল যেখানে বেশিরভাগই দেখা যায় একটি অভ্যন্তরীণ ছন্দ, শব্দের বিন্যাসে সূক্ষ্ম সঙ্গীতের সুর।মনে অনুরণন তোলে বইটির প্রকৃতি নির্ভর বর্ণনা ও চিন্তার প্রকাশে ও যথেষ্ট উদ্ভাবনীয়তায়।
শুরুতেই বইটির প্রথম পাতায় লেখা লাইন টি প্রশ্ন জাগায় মনে, 'বলা না বলা সব কথা আজ তোমাকে না বলে ভাসিয়ে দিলাম স্রোতে।' কুবাই নদী কে নায়িকা করে কবির বুঝি এ এক অবর্ণনীয় প্রেমগাঁথা। পাঠক মন কে আন্দোলিত করে উৎসুক করে তোলে। শব্দের অপরূপ ব্যঞ্জনা মনকে স্নিগ্ধ করে। অপার কাব্যিক শক্তি ও প্রশ্ন জাগায়।🍂
কবি সুমনের এই কাব্য গ্রন্থটির প্রতিটি কবিতায় বাস্তবতা ও প্রকৃতির সঙ্গে আলাপ চারিতায় নিবিড় সংযোগ এবং সম্পর্কের প্রকাশ রয়েছে । প্রকৃতি-প্রেমের ' মধ্য দিয়ে কবি অপরূপ কাব্যিক বিশ্লেষণে জীবন কে ব্যাখ্যায়িত করেছেন। বইটির প্রথম কবিতা ঘূর্ণিতে লিখলেন '' সেই বাঁকে আজ ও দাঁড়িয়ে আছি ঝিম ধরানো ঝিঁঝিঁর ডাক খালপাড়ে জল থৈ থৈ করে। '' সুন্দর এক প্রাকৃতিক চিত্র কথায় ছন্দে প্রকাশ পেয়ে মনের পাতায় ভেসে ওঠে।
আধুনিক কবিতা রচনার ক্ষেত্রে দেখা যায় কবিদের কোন কঠোর বিন্যাস বা নির্দেশিকা সাধারণত থাকে না , সেই হিসেবে একটি কবিতা যে কোনও আকারে এবং যে কোনও বিষয়ে লেখা হতে পারে। কবির চোখে যা কিছুর সৌন্দর্য,যা কিছু সম্পর্কে আনন্দ অনুভব করা যায় তাই কবির কাব্যিক দার্শনিক মন প্রকাশের চিন্তার আতিশয্যে কবিতা রূপে ধরা দিতে পারে।
সৃজনশীল কবির হৃদয়ে নদীর জলের প্রবাহমানতা শব্দ ,তার কানে সুর বাজে ছলাৎ ছলাৎ --একি ডিঙির গায়ে জলের প্রতিঘাত ? খেয়ালি ভ্রম খেয়া না খোয়াব ?' কবির মননে ভরে আছে-- বৃষ্টি ভেজা ভোর /মেঘ কালো কাজল এলোকেশী রাতের স্বপ্নে ? প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে সহজিয়া সুরের ভাবে বিভোর কবি নিত্য দেখা নদীটির অফুরন্ত রসের ধারায় সৃজনশীল। অবগাহন কবিতায় তাই বুঝি কুবাই নদীর বর্ণনায় লিখলেন ,দিনদশেক আগেও তাকে দেখেছি কি অদম্য ,খরস্রোতা সে দূর্বার ---হাটখোলা যৌবনের আটপৌরে শাড়ির মত। তারপরে লেখেন কৈশোরের সেই স্নান বন্ধু ,কুবাই এখন ফিতের মতো বয়ে যায়। ---
-আধুনিক কবিতা অধিকাংশ ক্ষেত্রে যদিও বিংশ শতাব্দীর শিল্পায়ন, বিশ্বযুদ্ধ এবং নগরজীবনের বাস্তবতায় সৃষ্ট , যা প্রথাগত ছন্দ ও রোমান্টিকতাকে বর্জন করে ব্যক্তিমানুষের বিচ্ছিন্নতা, সংশয়, নৈরাশ্য এবং গভীর বাস্তবতাকে প্রকাশ করে। কিন্তু এক্ষেত্রে কবি তার কাব্যতে যথেষ্ট রোমান্টিকতার পরিচয় দিয়েছেন । এটি মুক্তছন্দ, প্রতীকবাদ সহজ সরল শব্দবিন্যাস ব্যবহার করে কাব্যের ভেতরের রূপটি কে সুন্দর ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন।কবি লিখলেন 'এ কার যত্নে তোলা, স্পর্শে রাঙা বাঙময় /এ কার স্বপ্নে বোনা বেহাগ বিহ্বল চকমকি ---
মননশীল কবি তার বর্ণে অক্ষরে লিখেছেন অনেক দিন ধরে গদ্য ধরা দিচ্ছিল না /অনেকদিন কোনো কথা মুখ দেখিনি /অন্ধকার রাতে কালচে সবুজ বন বিথী চোখে পড়েনি তাও --- পুরনো চিন্তাধারাকে আঁকড়ে না ধরে, নতুনত্বকে স্বাগত জানায় --সবাই পড়বে না ,তবু বলেন ,লিখুন কিছু জীর্ণ পাতায় কঠিন ছবি আঁকতে চান , মন পড়তে সময় লাগে এখন চমক কেবল সকালের লাজুক রোদে -- খুব সাধারণ সহজ ভাষায় কাব্যিক প্রকাশে প্রকৃতির বর্ণনা পাঠক মন স্পর্শ করে।
কবি শ্রোতা কে প্রশ্ন করেন 'তোমরা কখনো কুবাই নদীতে যাওনি ,তার মায়াবী পাড়ে আলো আঁধারে বসোনি কখনো ' বা ভোরের আলোয় টুসুর অভিমানী মুখ দেখোনি ',--- রোমান্টিক কবির মনে হয় একদিন অন্তত সুনীল আকাশে বুক পেতে অহেতুক তারাদের গল্প শুনতে চান। তার কবিতায় 'বাসাবাসির শেষ সিঁড়িতে বসে মানুষের না মেলানো অংক হয়তো মেলাতে চান --কত মানব মনের গোপন ইচ্ছের প্রাধান্য গুরুত্ব পায়। ঐতিহ্যবাহী রূপ থেকে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের প্রতিনিধিত্ব করে, যা খণ্ডিতকরণ, প্রতীকবাদ এবং উদ্ভাবনী ভাষা দ্বারা চিহ্নিত। পুরনো চিন্তাধারাকে আঁকড়ে না ধরে, নতুনত্বকে স্বাগত জানান কবি। কবিতায় সমাজের অগ্রগতির কথা বলেন। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সুখ-দুঃখ, সংগ্রাম, হতাশা নানা সুন্দরের সাথে অসুন্দরকে নিয়েই তার পথ চলা এ কাব্য ধারায় সম্পূর্ণ সার্থক বলা যায় ।
আধুনিকযুগের বেশিরভাগ কবিতার ভাষা বা কাব্যবোধ পাঠক মনে সুললিত ছন্দ শ্রবণ মাধুর্য বা শব্দের ঝঙ্কারে তেমন আবহ সৃষ্টি করেনা। কিন্তু কবি সুমন রায়ের এই বইটির কবিতা পাঠ করলে মন এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে ওঠে। বর্ণ , ধ্বনি ও শব্দের অনুভব মস্তিষ্ক ও হৃদয়ে সঞ্চারিত করে। বইটি পড়ার পর অনায়াসে মন কবির ভাষাতেই বলে ওঠে " অঞ্জলির আলো জ্বলে রইলো অন্তরে অন্তরায়ের মতো।"
0 Comments