চূর্ণীকে লেখা চিঠি : শৈলীর অভিনবত্ব
সালেহা খাতুন
দুহাজার একুশের আগস্টে " চূর্ণীকে লেখা চিঠি"র প্রথম পর্বের সমালোচনা করেছিলেন ঋত্বিক ত্রিপাঠী এবং মায়া দে রিভিউ করেছিলেন দুহাজার বাইশের আগস্টে। দুটি আলোচনাই ছিল মূলত গ্রন্থের ভাব এবং ভাবনা নিয়ে। এখন অর্থাৎ দুহাজার ছাব্বিশের ফেব্রুয়ারিতে আমাদের হাতে এসেছে অরুণ দাসের "চূর্ণীকে লেখা চিঠি"র দ্বিতীয় পর্ব। এই বই হাতে তুলে নিয়ে মনে হলো এর ভাব নয় এর আঙ্গিকের দিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। কেননা প্রথম পর্ব থেকেই ইতোমধ্যে আমরা জেনে গেছি তিনি মূলত প্রেমকেই বিষয়রূপে গ্রহণ করেছেন। তবে সে প্রেম বিমূর্ত।
এমনিতেই কবিতা সাহিত্যের অন্যান্য শাখা উপন্যাস-ছোটোগল্প-নাটকের থেকে গুণগত দিক দিয়ে একটি ইউনিক ব্যাপার। কবিতার কাজ মূলত ব্যক্তিগত অনুভবকে বলা। কবি সে অনুভূতি নিজের অভিজ্ঞতা, অন্যের অভিজ্ঞতা এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইঙ্গিত থেকেও সংগ্রহ করেন। কবি সংবেদনশীল হওয়ায় কবির নিজের বক্তব্যের সঙ্গে অন্যেরা নিজেদের রিলেট করতে পারেন। কবি তাঁর অনুভবকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেন ভাষার মাধ্যমে। সে ভাষা অনেক ক্ষেত্রেই ইমোটিভ হয়। কবিকে শব্দ নিয়ে অনেক স্ট্রাগল করতে হয়। সৎ কবি কখনও নিজের অনুভবের সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করেন না। তাঁকে সাধনা করতে হয় নিজের শুদ্ধ অনুভবকে বাইরে আনার জন্য। শব্দ নিয়ে আঙ্গিক নিয়ে তাঁর পরীক্ষানিরীক্ষা লেগেই থাকে। আসলে কবি পাঠকের কাছে
পৌঁছনোর চেষ্টা করেন। তবে সবাই কবিতার পাঠক নন। পাঠকেরও অবশ্য কোনো দায় নেই যে কবির অনুভবকে বুঝতেই হবে! প্রাথমিকভাবে ভালো না লাগলে পাঠক কবিতার মধ্যে ঢুকবেন-ই না। আর ঢুকলেও সমানভাবে বুঝতে পারবেন এমনও না।
🍂
আমরা জানি "Style is the man himself"। তবে বুঁফোর আগেই অ্যারিস্টটল বলেছিলেন (Style) invented by the poet himself. গেটে বলেছিলেন লেখকের স্টাইল তাঁর আপন মনের বিশ্বস্ত প্রতিনিধি। লেখকের নিজস্ব স্টাইলের বিশেষ অনুশীলনকে ভালো লেখার অন্যতম শর্ত বলেছিলেন বেন জনসন। এই সব কথাগুলি মাথায় রেখে "চূর্ণীকে লেখা চিঠি"র কবি অরুণ দাসকে যদি দেখি শুধু কবিরূপেই নন অনন্য মানুষ রূপেও তিনি অধিকাংশ পাঠকের কাছে এক দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন।
কবি অরুণ দাস তাঁর কাব্যগ্রন্থে বিমূর্ত প্রেয়সী বা প্রেমিকার নামের ক্ষেত্রে 'চূর্ণী' শব্দটিকে নির্বাচন করেছেন। এই 'চূর্ণী' শব্দটি তাঁর কাছে এমনই শ্রেষ্ঠ শব্দ বলে মনে হয়েছে যে তিনি একবার চূর্ণীকে চিঠি লিখেই ক্ষান্ত হননি। দ্বিতীয় আর একটি কাব্যগ্রন্থে তাঁকেই বলা ভালো সেই শব্দটিকেই গ্রন্থনামে ব্যবহার করলেন। আর একটি শব্দ 'চিঠি'। এটিও গ্রহণের ক্ষেত্রে বা নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাঁর মনোভঙ্গি বা ব্যক্তিত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কতই তো চিঠি লেখে লোকে। কিন্তু "চূর্ণীকে লেখা চিঠি" একেবারে আলাদা। আচ্ছা এবার 'চিঠি' না করে কবি যদি 'চূর্ণীকে লেখা পত্র' বা 'চূর্ণীকে লেখা লিপিমালা' কিংবা 'চূর্ণীকে পাঠানো লেফাফা' ইত্যাদি করতেন তাহলে কী হতো? বৈকল্পিক নির্বাচনের সুযোগ তো ছিল। আসলে এখানে 'চিঠি' শব্দের নির্বাচনে কবির একটি বিশেষ বোধ ক্রিয়াশীল ছিল। এবার আন্বয়িক নির্বাচনের দিকে নজর দেওয়া যাক - কবি তো "চিঠি লিখেছি চূর্ণীকে" করতে পারতেন। না তা তিনি করেন নি, আসলে কোন শব্দটি কার পাশে বসালে চমৎকার হবে তা নিয়ে অনেক স্নায়ুযুদ্ধ করেছেন তিনি। কাব্য মধ্যে অনেক পুনরুক্তি বা সমান্তরালতাও আছে - 'তোমাকে নির্মাণ করি/অভিমানী জ্যোৎস্নায়' অথবা 'তোমাকে নির্মাণ করি/আদর চাঁদে' কিংবা 'তোমাকে নির্মাণ করি/অবসর ঝরনায়', 'তোমাকে নির্মাণ করি/শান্ত শিশিরে'; 'তোমাকে নির্মাণ করি/ পরিযায়ী মেঘে' ইত্যাদি।
শৈলীর আর একটি যে বিশেষ দিক প্রমুখন "চূর্ণীকে লেখা চিঠি"র বিভিন্ন অংশে তার প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। অর্থবোধের আগেই বাক্যটির দিকে ফিরে ফিরে তাকাতে বাধ্য হবেন পাঠক - 'আজ স্বপ্ন যেন স্বপ্নহীন' কিংবা 'জীবন যেন/ শেখানো শব্দকোষ'।
শুরুতেই আমরা বলেছি কবি অনুভবকে পৌঁছে দেন ভাষার মাধ্যমে। এবার সেই ভাষার দিকে দৃষ্টি ফেরানো যাক। গদ্যের ভাষার থেকে কবিতার ভাষা আলাদা হয়ে যায়। মান্যভাষার থেকে কবিতার ভাষার বিচ্যুতি ঘটে। ভাষা প্রমুখিত হয়ে যায় - সাধু-চলিত মেলানো মেশানো শব্দ থাকলেও কাব্যপাঠে তা অনায়াস হয়ে ওঠে ---
'আজ প্রজাপতি হয়ে ছুঁয়ে যায় আগুন।অন্ধকার শেখে জোনাকী বর্ণ। মূর্ত বিমূর্ত নদী। মৃত শামুক লিখে রাখে সে সব সোহাগী পথ। স্বপ্নহীন স্বপ্নের পথ।'
অলংকার ব্যবহারেও কবির কৃতিত্ব অনস্বীকার্য -
' চূর্ণী, স্বপ্ন যেন শৈশবের ঘুম/
ফুলেল ভোরে/
শরীরী তুষারপাত/
মগ্ন আকাশে /
অন্ধ সোহাগ/
ছুঁয়েছে যে রাত।'
স্বপ্নকে কবি এখানে শৈশবের ঘুমের সঙ্গে তুলনা করলেন। উপমা অলংকারের নিদর্শনরূপে এটিকে গ্রহণ করা যেতে পারে।
ছন্দের ক্ষেত্রে গদ্য-পদ্য উভয়ের ব্যবহারই "চূর্ণীকে লেখা চিঠি"তে বিদ্যমান -
"অনায়াসে হেঁটে যাই পথহীন পথে। বুক সামলে নেয় মগ্ন ঝড়। নিভৃতে সেরে নেয় সমুদ্রস্নান। হেঁটে যাই,আকাশ চেনে মাটির কাছে। প্রতিটি শ্বাসের মধ্যে আজ, অনায়াসে ছুঁয়ে ফেলি তোমাকে...
(গদ্য কবিতা)
পদ্যে -
'তোর ঘামভেজা স্বপ্নক্ষণ/
মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকে/
যে জীবন।'
সর্বনাম ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভিন্নতা একটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। 'না বলেছে হৃদয়লীনা'য় তুমি/তোমাকে, 'হৃদয়ে লেখা ডায়েরি'তে তুই /তোকে আর 'চূর্ণী, সে সব মুগ্ধদিন।মুগ্ধ রাত।' তুই তুমি মেশানো।
আর সবথেকে বিস্ময় যেটি তা হলো প্রতিটি কবিতার পাশে বামদিকের মার্জিন অংশে Keywords এর মতো প্রায়ক্ষেত্রেই বোল্ড করে কবিতার শেষ পংক্তিদ্বয় উদ্ধৃত হয়েছে। যেন সারকথা ওখানেই বলে দেওয়া হয়েছে। দলিলপত্রের ক্ষেত্রে স্ট্যাম্প পেপারে যেমন অংশীদাররা সই করেন তেমনি এটি যেন কবির সিগনেচার হয়েছে। আলাদা একটি মাত্রা এনেছে। তবে এমন পরীক্ষা নিরীক্ষা আগেও হয়েছে। মনে পড়ছে রাধারাণী দেবীর কবিতার পংক্তিবিন্যাসে কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা ছিল।
0 Comments