বিশিষ্ট কবি সিদ্ধার্থ সাঁতরার "লেবুফুল গন্ধরাজ তুমি" কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি হলো,“যদি ডাকে ঘূর্ণি”, “হাতছানি”, “পুরনো দিনের কথকতা”, “না লেখা কবিতা”, “ভ্রমণ ”, “জলট্যাঙ্ক স্টেশন মোড়”, “অভিমানী”, “লেবুফুল গন্ধরাজ তুমি” ।
সিদ্ধার্থ সাঁতরা একজন পরিচিত নাম। ওনার লেখার ধরন খুবই সহজ,কথ্য ভাষার মতো, কিন্তু তাঁর ভিতরে একটা গভীর বিষণ্ণতা আর স্মৃতিকাতরতা থাকে। গ্রামবাংলা, ছেলেবেলা, হারানো সম্পর্ক, একাকীত্ব এইগুলোই ওনার কবিতার মূল উপজীব্য।
তবে “লেবুফুল গন্ধরাজ তুমি” ওনার অন্যতম জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ। এই বইয়ের নাম থেকেই বোঝা যায়, কবিতায় প্রকৃতি আর স্মৃতির গন্ধ মিশে আছে।
ওনার কবিতা
“লেবুফুল গন্ধরাজ তুমি”
“হালকা শীতের পশম জড়ানো মুখ / স্বপ্ন দেখি হলুদরঙের হাসি / নরম, দাহক, জ্যোৎস্নামাখা চোখ”_ এই লাইনগুলোতে কবি একটা অনুপস্থিত মানুষকে প্রকৃতির মধ্যে খুঁজে পাচ্ছেন। লেবুফুল গন্ধরাজের গন্ধ যেন সেই মানুষটার উপস্থিতি বয়ে আনছে। কবিতার একটি লাইনে কবি বলছেন,
_“স্মৃতি হয়ে যাকে ছুঁয়ে আছ তুমি।”_
এটাই পুরো কবিতার সার। মানুষটা নেই, কিন্তু তাঁর স্মৃতিটা এখনও বেঁচে আছে। সেটাই এখন কবির কাছে সবচেয়ে বাস্তব। এই কবিতায় কবি দেখিয়েছেন, ভালোবাসা সবসময় শরীরী উপস্থিতিতে থাকে না, কখনও,কখনও একটা গন্ধ, একটা রং, একটা বিকেল, সেটাই হয়ে ওঠে ভালোবাসার সবচেয়ে বড় চিহ্ন। কবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, তার “না বলা কথা”। তিনি ছোট,ছোট মুহূর্ত দিয়ে পাঠকের মন ছুঁয়ে যান ।
"যদি ডাকে ঘূর্ণি”, “হাতছানি”, “পুরনো দিনের কথকতা”, “না লেখা কবিতা”, “ভ্রমণ ”, “জলট্যাঙ্ক স্টেশন মোড়”, “অভিমানী”, “লেবুফুল গন্ধরাজ তুমি”* একটা সূত্রে বাঁধা। সেটা হলো,স্মৃতির নদীতে ভেসে চলা একটা মন। এখানে বড় কোনো ঘটনা নেই, যুদ্ধ নেই, বিপ্লব নেই,আছে শুধু মানুষের ভিতরের ছোট, ছোট কাঁপন, যা আমরা রোজ অনুভব করি কিন্তু ভাষায় আনতে পারি না।
🍂
স্মৃতি, একমাত্র আশ্রয় আর একমাত্র বোঝা। প্রায় প্রতিটা কবিতাতেই অতীত ফিরে ফিরে আসছে। কিন্তু সেটা রঙিন, সুখের অতীত নয়। বরং ধুলো পড়া, খানিকটা অস্পষ্ট, আর তাই আরও বেশি টানে।
“পুরনো দিনের কথকতা” কবিতায় কবি লিখছেন:
_“মনে পড়ে কিছু কিছু অনেকদিন আগের কথা / ভেতর ভেতর ভালোলাগা সে সব ছবির মতো আঁকা ”_
এখানে স্মৃতি একটা ছবির মতো। যতই চেষ্টা করো, পুরোটা পরিস্কার হয় না। রাস্তার ভিড়, খেলনার দোকান এগুলো ছেলেবেলার খণ্ডচিত্র। কিন্তু সেই ছবিগুলো এখন আর ধরা যায় না। “বুকের ভেতর মস্ত এক আলমারি / দরজা খুলে অবাক হলাম সেকি।” মানে স্মৃতি একটা গুদামের মতো, যেখানে জমে আছে অগোছালো ইচ্ছে, ভুলে যাওয়া কথা। দরজা খুললেই সেগুলো গায়ে এসে পড়ে।
“না লেখা কবিতা” তে এই না বলা কথার যন্ত্রণাটা আরও তীব্র,“যে কবিতাটি সেবার, পড়বার কথা ছিল / সে কথাই ভাবি, লেখা হয়ে ওঠেনি আজও।”
কবি স্বীকার করছেন,কিছু কথা বলার সময় চলে গেছে। এখন সেটা শুধু মনের ভিতর ঘুরপাক খাচ্ছে। এটাই আমাদের সবার জীবন, কত কথা ভেবেও বলা হয় না, কত সম্পর্ক অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
একাকীত্ব আর নীরবতার কবিতা।এই কবিতাগুলোতে মানুষজন আছে,কিন্তু তারা একা। ভিড়ের মধ্যেও একা।
“হাতছানি” কবিতায়
_“সারাদিন এর-ওর কথা, নিস্পন্দ, একাকিত্ব অবশ্যম্ভাবী / অন্ধকার নিয়ত ঘিরে ধরছে ঘরবাড়ি”_
চারপাশে শব্দ আছে, মানুষ আছে, কিন্তু ভিতরটা নিস্তব্ধ। এই নীরবতাই সবচেয়ে ভয়ংকর। “তবু কারা যেন বলে ভাল আছি” এই একটা লাইনেই আধুনিক মানুষের মুখোশটা ধরা পড়ে। আমরা সবাই বাইরে থেকে বলি “ভাল আছি”, কিন্তু ভিতরে একটা শূন্যতা নিয়ে ঘুরি।
_“ভাঙাচোরা মানুষের মতো এক সাইকেল / একপাশে দাঁড়িয়েই আছে, সারাদিন মাথা নীচু টিং টিং বেল।”_
সাইকেলটা যেন একটা অবহেলিত মানুষ, যে চার দশক ধরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। কেউ তাকে ওজনের দরে কিনতে চেয়েছিল, কিন্তু সে যায়নি। এই জড়বস্তুরও যেন অভিমান আছে। কবি এখানে বলতে চাইছেন, আমরাও অনেক সময় সম্পর্ক বা স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে থাকি,যদিও তার কোনো মূল্য নেই। তবু ছাড়তে পারি না।
প্রকৃতি,মনের আয়না
কবি প্রকৃতিকে কখনও শুধু দৃশ্য হিসেবে ব্যবহার করেননি। বৃষ্টি, নদী, পাখি, বাতাস সবই মনের অবস্থার প্রতীক। “যদি ডাকে ঘূর্ণি” তে গ্রীষ্মকালে বৃষ্টি এসে শীতের পাখিকে উড়িয়ে নিয়ে যায়।
“গ্রীষ্মকালে বৃষ্টির কথা বলো / বৃষ্টি এলে উড়ে যায় শীতের পাখিটি”
এটা শুধু ঋতু বদল নয়। এটা সময়ের বদল, সম্পর্কের বদল। যা একসময় আপন ছিল, সময়ের সঙ্গে সেটাই দূরে চলে যায়। আর মাঝখানে পড়ে থাকে “বিষণ্ণ নদীটির নাম চূর্ণী” যার কোনো শব্দ নেই, শুধু প্রবাহ আছে।
“লেবুফুল গন্ধরাজ তুমি” কবিতাটা প্রেমের, কিন্তু এখানে প্রেমিক বা প্রেমিকা নেই। আছে শুধু তার গন্ধ।
“হালকা শীতের পশম জড়ানো মুখ / স্বপ্ন দেখি হলুদরঙের হাসি”
গন্ধটা এতই তীব্র যে মনে হয় মানুষটা এখনও পাশে আছে। কিন্তু সে আসলে নেই। শুধু স্মৃতিটা রয়ে গেছে। “স্মৃতি হয়ে যাকে ছুঁয়ে আছ তুমি।” এই একটা লাইনে পুরো কবিতার সারমর্ম।
সময় আর মৃত্যুর ছায়া
“ভ্রমণ ” কবিতায় একটা সূক্ষ্ম মৃত্যুচেতনা আছে।
_“মৃতদেহে শুয়ে আছে রকমারি ফুল / চন্দন টিপ ধূপের গন্ধ প্রশ্নের চোখ অবাক দিন ”
এখানে মৃত্যুকে ভয়ংকরভাবে দেখানো হয়নি। বরং এটাকে জীবনেরই একটা অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। কাঁসাই নদীর তীরে বটগাছের নিচে মানুষের আনাগোনা, প্রতিবেশী নৌকো,সব কিছুই চলছে। মাঝখানে একটা মৃত্যু এসে সবকিছু থামিয়ে দেয়। কিন্তু তারপরও জীবন থামে না। “কথা বলেনি শুন্যতা, রেখে গেছে পিছুটান অমোঘ প্রতিশ্রুতি।” মৃত্যুর পরেও শিশুর জন্ম হয়, জীবন এগিয়ে চলে।
এই কবিতাগুলোর ভাষা খুব সহজ, আটপৌরে। কোনো জটিল শব্দ বা দুরূহ উপমা নেই। “রাস্তার ভিড় খেলনা দোকান”, “জল ট্যাঙ্কি স্টেশন মোড়” একেবারে চেনা দৃশ্য। কিন্তু এই চেনা দৃশ্যের ভিতরেই কবি অসাধারণ একটা বিষণ্ণতা ঢুকিয়ে দিয়েছেন।
আরেকটা বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তিন বিন্দু “ এর ব্যবহার। এটা কবিতাকে অসমাপ্ত করে তোলে। যেন কবি কথা শেষ করেও করলেন না।
“জলট্যাঙ্ক স্টেশন মোড়” কবিতাটা একটু আলাদা। এখানে কবি একটা জায়গাকে কেন্দ্র করে গোটা একটা জীবনচিত্র এঁকেছেন।
_“স্কুলবেলাতে ছুটির পর হুররে জীবন শহর জুড়ে / যাবি কোথায় দ্রুত চল, পাড়ার দাদা স্কুলের স্যার / কে আর কাকে মানছে তখন।”_
স্টেশন মোড় হলো, একটা মিলনস্থল। এখানে স্কুলের স্যারও ছুটছেন । এখানে কোনো শ্রেণি নেই, কোনো বয়স নেই। সবাই সময়ের সঙ্গে দৌড়চ্ছে। কিন্তু দিনের শেষে সবাই আবার বাড়ি ফেরে। “বাড়ি ফেরার নিয়মাবলি ভাঙছি সবাই অহরহ” মানে আমরা সবাই নিয়ম ভেঙে বাঁচতে চাই, কিন্তু শেষে সেই নিয়মের ঘরেই ফিরতে হয়।
এই কবিতাগুলো পড়ে একটা কথাই মনে হয়,না পাওয়ার মধ্যেই একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে। যা পেয়ে গেছি, সেটা নিয়ে আমরা খুব একটা ভাবি না। কিন্তু যা পাইনি, যা বলতে পারিনি, যা হারিয়ে গেছে সেটাই আমাদের মনকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়।
কবি কোথাও চিৎকার করছেন না, কান্নাকাটি করছেন না। তিনি শুধু মোমবাতির মতো নীরবে জ্বলছেন আর গলে যাচ্ছেন। আর সেই আলোয় আমরা নিজেদের মুখ দেখতে পাচ্ছি।এই কবিতাগুলো আসলে আমাদের সবার কথা। আমাদের সেই সব কথা যা আমরা কাউকে বলতে পারিনি, সেই সব দিন যা আর ফিরবে না, সেই সব মানুষ যারা এখন শুধু স্মৃতি। আর সেই স্মৃতিকেই কবি এত যত্ন করে শব্দে বেঁধে রেখেছেন।
1 Comments
দারুণ আলোচনা কিন্তু 'ওনার' শব্দটি কি অভিধান স্বীকৃত ?
ReplyDelete