নিমাই জানা
আকিরা কুরোসাওয়ারা বলেছিলেন "সত্যজিতের চলচ্চিত্র না দেখা আর পৃথিবীতে বাস করে চন্দ্র সূর্য না দেখা একই কথা " যদিও নিন্দুকেরা বলেছিলেন সত্যজিতের চলচ্চিত্রগুলো অত্যন্ত ধীরগতি যেন রাজসিক শামুকের মতো , তারা সত্যজিতের মানবতাবাদকে ভাবেন সরল মনস্কতার বহিঃপ্রকাশ আর তার কাজকে মনে করেন আধুনিকতা বিরোধী এমন সমসাময়িক পরিচালকের মতো নতুন অভিব্যক্তি কিংবা পরীক্ষা নিরীক্ষা দেখতে পাওয়া যায় না তার পরিচালিত চলচ্চিত্রের মধ্যে।
🍂
যদিও এইসব নিন্দুকদের ভিত্তিহীন কথাবার্তাকে উপেক্ষা করে গেলে সত্যজিৎ রায়ের মতো এমন এক মহান ব্যক্তিত্বের কার্যকলাপ সাহিত্যের ক্ষেত্রে, চিত্র পরিচালনা অথবা চিত্রাঙ্কনে যে ভয়ানক প্রভাব বিস্তার করেছে এবং দূরদর্শিতা পরিলক্ষিত হয়েছে তা সত্যি নতুন করে চিন্তার দাবি রাখে যেমন কন্ট্রোল ইউনিটের বাটন কন্ট্রোল করে সমগ্র মহাকাশযানের উৎক্ষেপণ প্রক্রিয়া পরিচালিত হয় ঠিক তেমনি সত্যজিৎ রায়ের চিন্তা চেতনা মানবিকতা বোধ চিন্তার গভীরতা প্রখর বুদ্ধিদীপ্তি কার্যকলাপ ছাপ রেখে গেছে তা সত্যি প্রশংসার দাবি রাখে , ১৯৮০ সালে ভারতীয় লোকসভার সদস্য তথা প্রাক্তন অভিনেত্রী নার্গিস দত্ত অভিযোগ করেছিলেন পথের পাঁচালী এবং অশনি সংকেত এই দুটি চলচ্চিত্রে তিনি দারিদ্র রপ্তানি করেছেন এবং দাবী করেছেন ভারতের ক্ষুধা ভারতের অর্থনৈতিক অভাব তিনি বাইরে দেশের কাছে ফুটিয়ে তুলেছেন আবার তিনি আরও দাবি করেছিলেন আধুনিক ভারতের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য এমন কিছু চলচ্চিত্র দেখানো হোক , চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে ৬০ এর দশকের সত্যজিৎ মার্কসবাদী চলচ্চিত্র করে মৃণাল সেনের সাথে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন বাণিজ্যিক অভিনেতা উত্তম কুমারকে ছবিতে সংযোজন করেছিলেন বলে মৃণাল ও সত্যজিতের সমালোচনা করেন বারবার।
সত্যজিৎ বারবার বলেন যে সহজ লক্ষ্য গুলোকেই তিনি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন তার চলচ্চিত্রের মধ্যে , অপু দুর্গার বৃষ্টির মধ্যে রেলগাড়ি দেখতে যাওয়া, ভাঙা ঘরে বাস করা, এক মুঠো ভাতের জন্য সংগ্রাম যেগুলোতে নির্দিষ্ট সংলাপের কোন প্রয়োজন হয় না অথচ তার হাতে থাকা ক্যামেরার লেন্সের বাই ফোকালোজির লেন্সের জুম ফিয়েচার্সের মাধ্যমে দৃশ্যপটগুলো কিভাবে জীবন্ত হয়ে উঠেছে তা আমরা তার কর্মকাণ্ডের মধ্যে স্পষ্ট নিখুঁত কাজের প্রমাণ পেয়ে থাকি , বৃদ্ধা ইন্দিরা ঠাকরুণের গলায় ""ওমা তোর জন্য দুটো রেখে দিলাম না ও দ্যাখো......."" দুর্গার চুরি করা ফল সর্বজয়ার রাগে দুঃখে ফেটে পড়া কিন্তু পরক্ষণেই নিজের সন্তানদের অভাব দেখে ভেঙে পড়েন অনুতাপে কান্নায় বোধহয় এখানেই প্রতিটা চরিত্র কেমন মর্মস্পর্শী হয়ে ওঠে , এমন চরিত্র চিত্রায়নে সত্যজিৎ বারবার একটা স্টেরোয়েডিয়াল ভূমিকা গ্রহণ করেছেন যেই কর্মকাণ্ডের মধ্যমাগুলো দেখলে ভাবতে হয় তিনি তখনকার সময়ের দুঃখ দারিদ্রতা আর্থসামাজিক অব্যবস্থাপনা সত্য হলেও অকপটে তিনি প্রকাশ করতে ছাড়েননি আসলে তিনি বারবার এমন এক বেদনা এমন এক অস্তিত্বকে উপস্থাপিত করেছেন যেগুলোকে কোনমতেই ফাঁকি দেওয়া যায় না , ব্যক্তিগত জীবনে তিনি চলচ্চিত্রের সংগীত ব্যবহার করার পক্ষে ছিলেন না তিনি সবসময় বলতেন সংগীত একটি অপ্রয়োজনীয় উপাদান। মানুষের সংগীত ছাড়া চলা উচিত। সঙ্গীত বিহীন চলচ্চিত্র তৈরীর জন্য তিনি আলাদা আলাদা মুহূর্ত তৈরি করেছেন যে মুহূর্তে মানুষ প্রাণ খুলে কাঁদতে পারে উন্মাদের হৃদয় নিয়ে হাসতে পারে চিরন্তন মুহূর্তগুলোকে মনের মনিকোঠায় ধরে রেখে চিরজীবন প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে পারে এক একটা দৃশ্যায়নে।
চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত সংগীত তিনির নিজেই রচনা করতেন যদিও সত্যজিতের চলচ্চিত্র গুলো সুদুর প্রসারী এবং শ্লেষাত্মক সুর দিয়ে তিনি অসামান্য পারদর্শিতা ও দেখিয়েছেন তা নয় তিনি সেখানে বিষাদ এবং আনন্দের সুর আধুনিকতার ছোঁয়া ব্যবহার করেছেন সুনিপুণ ভাবে যেভাবে "চারুলতা" চলচ্চিত্রকে একটা অনন্যতার শিখরে নিয়ে গেছেন ঠিক তেমনি হীরক রাজার দেশে ও সমসাময়িক সমাজের অভিশাপ বর্তমান করুন পরিস্থিতিকে ফুটিয়ে তুলেছেন প্রতিটি ছত্রে ছত্রে , তিনি নিজে চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত সংগীতের জন্য কোন পেশাদার সুরকারের উপর নির্ভর করতেন না। কারণ তিনি পেশাদার সুরকারের ওপর নির্দেশনা প্রদানকে তিনি অস্বস্তি বলে প্রকাশ করতেন তাই তিনি নিজেই সুরকার হিসেবে সংগীত পরিচালক হিসেবে অনন্যতার ছাপ রেখেছেন বহু ক্ষেত্রে , পথের পাঁচালী ও অপরাজিততে পণ্ডিত রবিশঙ্করের সাথে , জলসাঘরে ওস্তাদ বিলায়ত খান এবং দেবীতে আলি আকবর খানের মতো কালজয়ী ব্যক্তিত্বের সাথে সঙ্গীত পরিচালনার শিখরে নিয়ে গিয়ে তিনি শাস্ত্রীয় সংগীতের দক্ষ ব্যবহার করেছেন , গুপী গাইন ও বাঘা বাইন চলচ্চিত্রে সংগীত ও সঙ্গীত পরিচালনা ছিল তার সম্পূর্ণ নিজস্ব সৃষ্টি , যা শিশু কিশোর সব বয়সের মানুষের মনে ধরা দিয়েছে। চিরদিন মনে রেখেছে প্রতিটি সংগীতের এক একটা উপস্থাপনা , ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অতি উপসর্গ গুলোকে তিনি ফুটিয়ে রেখেছেন প্রতিটি শব্দ দিয়ে , হীরক রাজার দেশ চলচ্চিত্রে যে গানগুলো তিনি ব্যবহার করেছেন যে কথাগুলো ব্যবহার করেছেন তার মাধ্যমে বর্তমান তথা সেই সব রাজনৈতিক এবং সামাজিক বার্তা তিনি তার সংলাপের মধ্যে দিয়ে উপস্থাপনা করেছেন , নিজের কর্ম জীবন শুরু করেছিলেন বিজ্ঞাপন জগতের জুনিয়র ভিসুয়ালাইজার হিসেবে , তারপর জীবনের ক্রম পরিণতি গুলো কিভাবে এক জলসা ঘরের মতো এক মহানগরের মতো এক চরিত্র চিত্রনাট্যকার শিল্পনির্দেশক সংগীত পরিচালক ডিজাইনার কাহিনীকার হিসেবে নয়নের মনি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল বাঙালির মনে বাঙালি তথা বহিঃ বিশ্বের প্রতিটি মানুষের মনে , তিনি নিজের ছবির চিত্রনাট্য নিজেই লিখতেন এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাহিত্যিক যেমন বিভূতিভূষণ উপন্যাসের সার্থক ও রূপান্তর ঘটিয়েছিলেন আসলে গ্রামীণ বাংলা জগতের যে মানবিকতা তাতে মেলোড্রামা বা অতিরঞ্জন তিনি বর্জন করেছিলেন সাধারণ জীবনের দৈনন্দিন বাস্তবতা গুলোকে তুলে ধরার সময়, এক একটা চরিত্রের মধ্যে অসংখ্য উপ চরিত্রগুলো উপস্থাপিত হয়েছিল বাস্তববোধ মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি সাহিত্যের নির্ভরতায় অনুভূতির সূক্ষ্ম প্রকাশ ভঙ্গিমাগুলোকে গভীর থেকে আরো অতি গভীরে স্থান করে নিখুঁত দৃশ্যের মুভমেন্ট সামঞ্জস্যপূর্ণ দৃশ্যগুলিতে যেন বারবার মৃন্ময়ী থেকে চিন্ময়ী সত্তায় উপস্থাপিত হয়েছে বাঙালির তথা প্রতিটি দর্শকদের মনে , ১৯৪৯ সালে ফরাসি চলচ্চিত্র পরিচালক জঁ রনোয়ার কলকাতায় দ্য রিভার ছবির শুটিং করতে এসেছিলেন।
তিনি দেখা করেন এবং পরেই ১৯৫০ সালে লন্ডনে গিয়ে vettorio they siker , ladri the bichhickete (bicycle Thieves) ছবি দুটি দেখে চলচ্চিত্র পরিচালক হওয়ার প্রেরণা জুগিয়ে ছিল , প্রায় তিনি ৩৬ টি ছবি মোট পরিচালনা করেন ২৯টি ছিল কাহিনী চিত্র পাঁচটা ছিল তথ্যচিত্র এবং দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্য , সত্যজিৎ রায় পরিচারিত চলচ্চিত্র গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পথের পাঁচালী , অপরাজিত , পরশপাথর, জলসাঘর , অপুর সংসার , দেবী , তিন কন্যা ,পোস্টমাস্টার, মনিহারা , সমাপ্তি , কাঞ্চনজঙ্ঘা , অভিযান , মহানগর, চারুলতা , কাপুরুষ , মহাপুরুষ, চিড়িয়াখানা , গুপী গাইন বাঘা বাইন , অরণ্যের দিনরাত্রি , প্রতিদ্বন্দ্বী ,সীমাবদ্ধ, অশনি সংকেত , সোনার কেল্লা , জন অরণ্য, শতরঞ্জকে খিলাড়ি , জয় বাবা ফেলুনাথ , হীরক রাজার দেশে , ইত্যাদি অন্যান্য চলচ্চিত্র পরিচালকের নির্মিত চলচ্চিত্রে সত্যজিৎ রায় ও যেগুলোতে বিশেষ অবদান রেখেছে তা ও অনস্বীকার্য সেরকম কিছু চলচ্চিত্র হলো a perfect day , the river , our children will know each other better , the tidal bore , the story of Tata Steel , creative articles of India Satyajit Ray , Shakespeare wala ,glimpses of West Bengal , house that never dies , Darjeeling Himalayan fantasy , the Brave do not die , the museum of Satyajit etc
এছাড়াও তিনি আরো কয়েকটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করতে চেয়েছিলেন এগুলোর মধ্যে হল দি এলিয়েন , এই ছবিটি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে স্টিভেন স্পিলবার্গ ১৯৮২ সালে E T ছবিটি নির্মাণ করেছিল , ওয়েস আন্ডারসন , মার্টিন স্কোরসেজি , জেমস আইভরি , ফ্রুফো ও কার্লোস সরার একাধিক বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের কর্তৃক অনুপ্রাণিত হয়েছিল ভারতীয় সেতার বাদক রবিশংকরের উপর একটি তথ্যচিত্র ভারতীয় মহাকাব্য মহাভারতের অবলম্বনে একটা চলচ্চিত্র ১৯২৪ সালে এডওয়ার্ড মরগ্যান ফ্রস্টারের লেখা এ প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া অবলম্বনে একটা ছবি তৈরি করতে চেয়েছিলেন যদিও এই ছবিগুলির কাজ শুরুর আগে ১৯৯২ সালে তার মৃত্যু ঘটে , ১৯৯২ সালের ৬৪তম একাডেমী পুরস্কার ১৯৮৪ সালে সত্যজিৎ রায় ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মাননা দাদা সাহেব পালকে পুরস্কার অর্জন করেন ১৯৯২ সালে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ভারতরত্ন লাভ করেছিলেন ।
মনে হয় একটি উক্তি বারবার তার চলচ্চিত্রে যেন হ্যামারিং করতে থাকে যেখানে অপু বলে চলেছে তার সেই বিশ্ব বিখ্যাত উক্তি "অনুশোচনা? না অনুশোচনা নয় , সে বড়ো সোজা জিনিস ওটা নিজেকে ফাঁকি দেওয়া। আমি চাই বেদনা এমন বেদনা যা আমার সমস্ত অস্তিত্বকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে" আসলে সত্যজিৎ রায় এমন মহানুভবতার চিত্র অংকন করতে করতে তিনি মহান চৈতন্যের এক মহা দ্যুত লোকে বিরাজ করেছেন বারবার তার চেতনার অনন্ত শীর্ষে গিয়ে তিনি যোগী পুরুষের মতো যোগারূঢ় অবস্থায় নিষ্কাম চরিত্রগুলোকে তার লেন্সের ভিজুয়ালাইজড ক্যামেরার প্রতিবিম্বকে আরো জীবন্ত করে তুলেছেন তাই তিনি আলোর পথিক হয়ে রয়ে গেছেন সর্বক্ষণ তাই তিনি এক জ্যোতিষ্ক মন্ডলীর এক অপূর্ব রহস্যময় নক্ষত্রপুঞ্জের মতো আকাশ গঙ্গায় বিরাজ করে চলেছেন সর্বক্ষণ। আসলে তিনি এক আলোক , মহালোক।
0 Comments