চিত্রগ্রাহক - সুশোভন সর
আমড়া খাওয়ার গল্প
মানসী গাঙ্গুলী
সংসারের কাজ সেরে এতক্ষণে অবসর মিলল সুমিতার। এবার ও খেয়ে নেবে। ছেলেমেয়েদের স্কুল থেকে আসার সময় হল। ওরা আসার আগে না খেয়ে নিলে এরপর খাওয়ার সময় মেলা ভার। বাড়িতে তখন হইহই কান্ড শুরু হয়ে যাবে। নিজে খেয়ে নিয়ে ছেলের মাছটাও বেছে রাখবে নাহলে তাকে আর মাছ খাওয়ানো যাবে না। মাছ খাওয়ানোটা যে কী ঝকমারি! এর সঙ্গে বায়না জুড়বে, "টিভি দেখতে দেখতে খাবো।" আবার তাকে নিয়ে তার খাবার নিয়ে ড্রইংরুমে যেতে হবে তখন। অন্যমনস্ক হয়ে তাও খেয়ে নেয়। মেয়ের মাছটাও বেছে রেখে দেয়। তা-ও সুযোগ পেলেই মেয়ে টুক করে উঠে বাথরুমের জানলা দিয়ে বাছা মাছ ফেলে দিয়ে আসে। কাজের লোকটি একদিন আবিষ্কার করল সেটা বাইরে বাসন মাজার সময়। ওমনি হৈচৈ বাধিয়ে তুলল। "ও বৌদি, ওই দেখো, সোনামেয়ে মাছ ফেলে দিল।" কোন দিকে যে যায় সুমিতা! খাওয়া হলে দুজনকে নিয়ে শুতে গেল সে। এবার ছেলের বায়না, "গল্প বলো।" ছেলের জন্মের আগে মেয়েটাকেও এভাবে খাবার পর গল্প বলে ঘুম পাড়াতো সে। একদিন মেয়ের হাতে রাক্ষস খোক্কসের বই ধরিয়ে দিয়ে বলেছিল, "নিজে পড়। আমি তো পাশেই আছি, অসুবিধা হলে জিজ্ঞেস কোরো।" মেয়ে তা-ও বায়না জুড়ে দেয়, "না তুমি পড়।" এরপর নিজে পড়তে শুরু করলে, গল্পের বই পড়ায় মজা পেয়ে যায়। সেই থেকে সে নিজেই খাবার পর বই নিয়ে নিজের ঘরে চলে যায়। কিন্তু ছেলেটা সে-ধার মাড়াচ্ছে না। রাক্ষস খোক্কস, ছবিতে ছোটদের রামায়ণ মহাভারত সব পড়া শেষ। তা-ও বলবে, "আবার প্রথম থেকে পড়।" সব তার মুখস্থ। তখন বলবে, "তোমার ছোটবেলার গল্প বলো।" ওরা জানে ওদের মা ছোটবেলায় খুব দুষ্টু ছিল। তার অনেক কীর্তি আছে। এসব মামারবাড়িতে গিয়ে দিদানের কাছে জেনেছে। মা-ও যে দুষ্টু ছিল এতে ছেলে রন্টি খুব মজা পায়। তার মানে সে একাই দুষ্টু নয়। মায়ের ছোটবেলার দুষ্টামিগুলো খুব মজার। ওরা কোনোদিন এসব করতে পায় না আর পাবেও না। এদিকে গল্প বলতে বলতে সুমিতার চোখটা লেগে আসে কখনওবা। ঝিমকুনিটা ভাঙ্গলে দেখে ছেলে নেই পাশে। ঘুম ছুটে যায় ওর। খোঁজ লাগায় ছেলের। একটু না ঘুমালে রাতে পড়তে পারবে না। অতএব তখনই একটু অন্তত পড়িয়ে নিতে হবে। এদিকে একটু ঘুমাতে না পেরে মাথা ছিঁড়ে যায় যন্ত্রণায়। ছেলেটা ওইরকমই। একবছর বয়স থেকেই দুপুরে ঘুমায় না। এদিকে সুমিতার সারাদিন পরিশ্রম, রাত করে শোওয়া আবার অন্ধকার থাকতেই উঠে পড়া ছেলেমেয়ে দুটোকে পড়ানোর জন্য। ওরাই সুমিতার ধ্যানজ্ঞান। কীভাবে ছেলেমেয়ে দুটোকে মানুষ করা যায়। নিজের সখসাধ সব বিসর্জন দিয়েছে সে। শেষ কবে যে হলে গিয়ে সিনেমা দেখেছে তা তার আর মনে পড়ে না।
একদিন স্কুল থেকে ফিরে ছেলেমেয়ে দুজনেই ওকে চেপে ধরল, "ছোটবেলার গল্প বলো" বলে। পরদিন শনিবার, কাজেই পরপর দুদিন স্কুলের ছুটি। পড়ায় একটু ফাঁকি দিলেও চলবে। অনেক গল্পই ওদের জানা, তবে এই গল্পটা জানা ছিল না। সুমিতা শুরু করল। "তোমাদের যেমন ফেব্রুয়ারিতে অ্যানুয়াল পরীক্ষা হয়, আমাদের ছোটবেলায় ডিসেম্বর মাসেই সেই পরীক্ষা অর্থাৎ ক্লাসে ওঠাউঠির পরীক্ষা ও রেজাল্ট হয়ে যেতো। জানুয়ারিতে নতুন ক্লাস শুরু। অবশ্য সরস্বতী পুজোর আগে ক্লাসে পড়াশোনা তেমন হতো না। তাই চাপমুক্ত বেশ কিছুদিনের জন্য।" "আমাদের স্কুলে সরস্বতী পুজো হয় না তো", রন্টি বলে। "তোমাদের যে মিশনারী স্কুল, যীশুই ওদের একমাত্র ঠাকুর। তাই খ্রীস্টমাসে তোমাদের স্কুলে কত প্রোগ্রাম হয়, যীশুখৃষ্টের মূর্তিকে কত সাজায়।" "হ্যাঁ রে ভাই, তোর মনে নেই আমাদের স্কুলে কত কী খাওয়ালো, কেক, লজেন্স কত রকমের", বলে সোনাই। "হ্যাঁ রে দিদি, মনে পড়েছে।" ভাই বোনের কথা হলে সুমিতা আবার বলতে শুরু করে। "এমনিতে পরীক্ষা হয়ে গেলেই তো লম্বা ছুটি। সারাদিন বাড়িতে। স্কুলে থাকলে পড়াশোনা, টিফিন পিরিয়ডে দৌড়াদৌড়ি করে খেলা, পরীক্ষার পর সেসব নেই। বাড়িতেও পড়াশোনার গপ্পো নেই সেইক'টা দিন। এনার্জি ক্ষয় হয় না কোনোভাবেই। অবশ্য গল্পের বই প্রচুর পড়তাম আমরা সেসময়। বেশিরভাগই তার গোয়েন্দা, রহস্য এইসব, নীহাররঞ্জন, শরদিন্দু, সে কী নেশা। পড়ার বই সরিয়ে সেসব পড়তে ইচ্ছে করত। এছাড়া বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র সব স্কুলে পড়ার সময়ই পুরো পড়া শেষ। কিন্তু তাই বলে সারাদিন তো আর গল্প বইয়ে মুখ গুঁজে থাকতাম না। খেলাধূলাও করতাম বিকালে। কিন্তু দুপুরগুলো যে আর কাটতে চায় না। চুপচাপ কি বাড়িতে থাকা যায়? তাই চলে নানারকম দুষ্টুমি। দুপুরে ঘুমানোর অভ্যাস ছিল না কোনোদিন। সেসময় তো স্কুলে থাকতাম। কিন্তু এই ছুটির দুপুরগুলোয় যখন অখণ্ড অবসর, বাড়ির বড়রা সারাদিনের কাজের পরে বিশ্রাম নিচ্ছেন, চলত আমাদের নানারকম দুষ্টুমি। একেক সময় একেক রকম দুষ্টুমি। ডিসেম্বরের ঠান্ডায় প্রধান দুষ্টুমি ছিল আমড়া খাওয়া। সেসময় আমড়া পাকত, গাছ থেকে টুপটাপ পাকা আমড়া ঝরে পড়ত বোঁটা থেকে খসে।"
"আমড়া কী গো মা? আমি কোনোদিনও খাইনি। আমাকে কিনে দেবে মা?" রন্টির কথায় মা হাসে। "মায়ের গল্পটা শেষ করতে দে না ভাই।" মেয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে মায়ের দুষ্টুমির গল্প শুনবে বলে। সুমিতা আবার বলতে শুরু করে। "আমি ও আমার মতো অনেক ছেলেমেয়েরাই, বিশেষ করে মেয়েরা পাড়ার যেখানে যেখানে আমড়া গাছ আছে তার নিচে গিয়ে হাজির হতাম। কারও বাড়ির গাছের আমড়া পুকুরের জলে পড়ত। কচিকাঁচার দল খানিকটা নেমে লাঠি দিয়ে টেনে আনার চেষ্টা করত সেই আমড়া। তবে আমার জন্য গাছের মালকিন আমড়া তুলে ঘরে রেখে দিতেন। আমি গেলেই আমার কোঁচড়ে ঢেলে দিতেন। অন্য ছেলেমেয়েরা হইহই করে উঠত, ‘ওকে দিলে, আমাদেরও দাও।’ জবাবে উনি বলতেন, ‘আগে ওর মত বছর বছর ক্লাসে ফার্স্ট হ, তারপর তোদের জন্যও তুলে রাখবো।’ বাকীরা চুপ করে যেতো তাতে।” এটুকু শুনে সোনাই বলে ওঠে, "দেখ ভাই, মা এই ফাঁকে কেমন নিজের ফার্স্ট হওয়ার কথাটা বলে দিল।" সবাই মিলে হেসে উঠল ওরা। "তোরা কি আমায় বাকিটুকু বলতে দিবি নাকি আমি ঘুমিয়ে পড়ব?" দুজনেই হৈহৈ করে উঠল, "বলো বলো" করে।
সুমিতা বলতে থাকে। "তা শুধু ওটুকুতে যে মন ভরত না, তাই আবার অন্যত্র ছুটতাম। আমাদের পাড়ারই শেষ প্রান্তে, একটু দূরে আমাদেরই একটা পুকুর ও তার পাশে বিশাল জমি ছিল। জায়গাটা ভাল নয়। পাছে বেদখল হয়ে যায়, সেই ভয়ে বাবা জমিটা বিক্রি করে দেন। পুকুরটা অবশ্য থাকল আমাদেরই।" "মা, আমি তোমাদের পুকুরটা দেখেছি। ছোটমামা আমায় নিয়ে গিয়েছিল। কত্ত বড় পুকুরটা।" সোনাইয়ের কথার পিঠে সুমিতা বলে, "আমাদের পুকুরের মাছও খুব মিষ্টি।" "এই দিদি দেখ, মা বলছে মাছ খুব মিষ্টি। মাছ আবার মিষ্টি হয় নাকি?" বলে রন্টি খুব হাসতে থাকে। মা ওকে বুঝিয়ে দেয়, "ওরে বোকা, এখানে মিষ্টি মানে সুস্বাদু, ভাল টেস্ট, রসগোল্লার মত মিষ্টি নয়।" "তাই বলো।" আবার শুরু করে বাকীটা
"যারা জমিটা কেনেন, তারা জমিটা বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে দেন। জমির একপ্রান্তে বাড়ি করে থাকতে শুরু করেন। জমিতে নানারকম বড় বড় গাছ ছিল। একটা আমড়া গাছও ছিল। যেহেতু জায়গাটা ঘেরা ছিল, তাই আমড়াগুলো ঝরে মাটিতেই পড়ে থাকতো। আগে যখন আমাদের খোলা জমি ছিল তখন মাটিতে আমড়া পড়ে থাকত না। আশপাশের লোকজন কুড়িয়ে নিত। আমি যেহেতু মালিকের মেয়ে, তাই অবলীলায় সে বাড়ির বেড়ার গেট খুলে ঢুকে পড়তাম ভিতরে। ওরা কিছু বলতেন না আমাকে। আমার সঙ্গে দু'একজন বন্ধুও থাকত। একা কোনোসময়েই যেতাম না। তো এক শীতের দুপুরে আমি সঙ্গে এক বন্ধু নিয়ে গেছি সেই বাগানে আমড়া কুড়াতে। দু'জনে মিলে প্রচুর আমড়া কুড়িয়েছি সেদিন। কিন্তু নেবো কিসে? আমরা তখন ফ্রক পরতাম, ভিতরে টেপফ্রক ও ইজের। তো সেই টেপফ্রকটাকে তলা থেকে হাফ তুলে কোঁচড় করেছি, আর তার মধ্যে আমড়াগুলো নিয়ে ইজেরের কোমরে গুঁজে নিয়েছি। ওপর দিয়ে ফ্রকটা নামিয়ে দিয়েছি। আমাদের সেসময় ফ্রকের কোমরে কুচি থাকত। যার ফলে টেপফ্রকের কোঁচড়ে যে অত আমড়া রয়েছে তা বোঝবার উপায়ই নেই। নাহলে পাড়া দিয়ে আসার সময় আমারই মতো ছোট ছেলেপুলের দল আমড়া চাইবে। আর দুটো একটা করে দিতে দিতে সব শেষ হয়ে যাবে।" "ওরে বাবা, সে তো তাহলে অনেক আমড়া", রন্টির চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। বলি, "হুম, অনেকই তো।"
"আগলে আগলে সেসব নিয়ে বাড়ির কাছাকাছি এসে গেছি। সেদিন ছিল রবিবার। বাড়ির দরজার কাছে প্রায় এসে পড়েছি, বাবা বাড়ি থেকে বেরোলেন। পরনে লুঙ্গি গেঞ্জি। তার মানে পাড়াতেই বন্ধুর বাড়ি যাচ্ছেন। ছুটির দিনে সেখানে অনেক সময় তাসখেলা হয়। তা বাবার সামনাসামনি এসেই আমার কোঁচড়টি গেল খুলে। সেখানে প্রচুর আমড়া ছিল। সেই ভারেই গেল খুলে। ছড়ছড় করে একগাদা আমড়া রাস্তায় গড়াগড়ি খেতে লাগল। আমি ভয়ে ভয়ে বাবার দিকে তাকাই, আবার মনের দুঃখে জুলজুল করে আমড়াগুলোর দিকে তাকাই। বন্ধুটিও থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। বাবা গম্ভীরভাবে বললেন, ‘ও দুপুরবেলা তাহলে এইসব চলে আজকাল?’ আমি মুখ কাচুমাচু করে একবার বাবার দিকে, আর একবার গড়াগড়ি খাওয়া আমড়ার দিকে তাকিয়ে মনের দুঃখে বাড়ি ঢুকে পড়লাম। ভেবেছিলাম খুব বকুনি খাবো। কিন্তু না, বাবা সেদিন তত বকেননি। এখন বড় হয়ে মনে হয় আমার অবস্থা দেখে বাবারও সেদিন হাসি পেয়ে গিয়েছিল, তাই বিশেষ শাসন করেননি, কেবল গম্ভীর হয়ে ছিলেন। এমনিতে বাবা বকাবকি বিশেষ করতেন না বরং আমাদের গল্প বলে শোনাতেন, আমাদের সঙ্গে করে ছোট্ট বেলা থেকে কলকাতায় জামা কিনতে নিয়ে যেতন। তবে বাইরের আজেবাজে খাওয়া বাবার একদম পছন্দ ছিল না। নিজে সঙ্গে করে কলকাতায় বড় বড় রেস্টুরেন্টে খাইয়েছেন। আর আমি ছিলাম ছোট থেকেই ভোজনরসিক। তাই বাবাও আমাকে খাওয়াতে ভালবাসতেন। ছোটবেলার গল্প বলতে গিয়ে আজ কত কথা মনে পড়ে গেল। দৃশ্যগুলো যেন চোখের সামনে ভাসছে।" রন্টি দুষ্টুমি করে মায়ের চোখ টেনে দেখে কথাগুলো কোথায় ভাসছে।
"তাহলে হল তোমাদের গল্প শোনা? এবার চটপট বই নিয়ে বসে পড় দেখি। দুদিন ছুটি বলে পড়া তো একেবারে বাদ দেওয়া যায় না, তাই না?"
ধারাবাহিক উপন্যাস
গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ
পর্ব ১৫
রতনতনু ঘাটী
গগনজ্যোতি স্কুলের মাঠটা আজ দর্শকে ভরতি। কখন থেকে আজকের জমজমাট ক্রিকেট কোচিংয়ের খবরটা ছড়িয়ে পড়েছিল শুধু পাথরকুসমা গ্রামেই নয়, পাশের তিথিবকুল, ছোটো জগৎপুর, কাঁকনকুষি গ্রামেও। ওই তো হেডস্যার এতখানি দূর থেকে দেখতে পাচ্ছেন, তিথিবকুল গ্রামের অমূল্য ধরকে। তিনি সামনের সারির চেয়ারের একেবারে মাঝখানের চেয়ারটায় বসে আছেন। স্যার দেখলেন, আজকের খবরের কাগজটা ভাঁজ করে মাথার উপর মেলে ধরে বিকেলের রোদ আড়াল করছেন অমূল্য ধর!
তাঁর পাশের হাতলওলা চেয়ারে বসে আছেন ছোটো জগৎপুরের অভিরূপ দলুই। অভিরূপ দলুই হলেন সেরকম একজন মানুষ, ছোটো জগৎপুর গ্রাম থেকে আই পি এল দেখতে ইডেন গার্ডেন্সের মাঠে ছুটে যান যে ক’জন মানুষ, তিনি তাঁদের মধ্যে একজন। পেশাদার টি-টুয়োন্টি ক্রিকেট লিগ দেখতে সবচেয়ে বেশিবার ইডেনের মাঠে গেছেন অভিরূপ দলুই!
ছোট জগৎপুর গ্রামের সকলেই বলাবলি করেন সেই কথাই! তাই কথায় কথায় সেদিন নবনীতস্যার স্কুলের মাঠের পাশ দিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছিলেন, কী মনে হতে বাঁ পায়ে ভর দিয়ে সাইকেলটা থামালেন। দূর থেকে নবনীতস্যার দেখলেন অভিরূপ দলুই আসছেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনাদের বিনয়ের তো এবার ক্লাস নাইন হল?’
‘হ্যাঁ, আমার নাতি বিনয় এবার নাইনে উঠেছে স্যার। কিন্তু কেন স্যার?’
‘ওর পড়ার পিছনে একটু নজর দিতে হবে। যা পড়াশুনো করছে, তাতে পাশ করতে পারবে কিনা সন্দেহ! আপনি একটু নজর রাখুন ওর উপর!’
‘এখন আই পি এলের সিজন চলছে! কবে-কবে ইডেনে খেলা পড়বে, সেই দিনগুলোতে আমি তো ছোটো জগৎপুরে থাকতেই পারব না স্যার! আমি ম্যাচের আগের দিন সন্ধেবেলা পৌঁছে যাব বেহালার বুড়োশিবতলায় আমার বোন মাধবীলতার বাড়িতে। আমার তো বিনয়ের পড়াশুনো দেখার অবকাশ হবে না স্যার! আমি আমার বড়োছেলে সুদীপনকে আপনার কথা বলব বাড়ি গিয়ে। ও-ই বিনয়ের পড়া দেখবে।’
উনি একটু এগিয়ে গিয়ে সাইকেল থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন ফের রাস্তার ধারে। রাস্তার পাশে অকুলেন্দু সামন্তের কচুরিপানা ভরতি বেশ বড় একটা পুকুর। সেই পুকুরের জলে একটা বড়ো মাছ ঘাই দিয়ে উঠল। সেদিকে তাকিয়ে অভিরূপবাবু চশমার কাচটা ধুতির খুঁটে মুছে নিলেন। তারপর চশমাটা চোখে পরে নিয়ে মুখ ঘুরিয়ে অভিরূপ দলুইকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আচ্ছা অভিরূপবাবু, আপনি সর্বমোট কতগুলো আই পি এল মাচ দেখেছেন এখন পর্যন্ত? কখনও গুনে দেখেছেন কি?’
অভিরূপবাবু চোখ থেকে চশমা খুলে মুখ তুলে বললেন, ‘সে অত কি আর গুনে রেখেছি স্যার? আমার ক্রিকেট খুব প্রিয় খেলা। কলকাতায় থাকলে হয়তো সব খেলাই দেখতাম! একটাও খেলা বাদ দিতাম না স্যার! কিন্তু এখন তো ছোটো জগৎপুর থেকে বাসে-ট্রেনে করে বুড়োশিবতলায় পৌঁছতে পৌঁছতে গোটা দিনটাই কাবার হয়ে যায়! পরদিন দুপুরে দুটো খেয়েই দৌড়ই ইডেনে। কলকাতায় থাকলে এত দৌড়ঝাঁপ পোয়াতে হত না। একটার পর একটা আই পি এলের ম্যাচ দেখতাম!’
একটু চুপ করে থাকার পর অভিরূপবাবু বললেন, ‘আসলে কী জানেন তো নবনীতস্যার, আমার ছোটো বোন মাধবীলতার বিয়ে হয়েছে বেহালার বুড়োশিবতলায়। দু’ হাজার আট সালে সেই আই পি এল শুরুর সময় থেকে শুভদীপ সেন আই পি এলের প্রাথমিক কমিটিতে জায়গা পেয়ে গেল। কলকাতায় যে দলেরই ম্যাচ থাকুক না কেন, শুভদীপ দুটো করে কম্পিমেন্টারি টিকিট পাবেই পাবে। তার একটা টিকিট মাধবীলতা রেখে দেয় আমার জন্যে, দাদা আসবে বলে! আই পি এল শুরুর দিন থেকে তাই এ পর্যন্ত অনেকগুলো আই পি এল-এর খেলা দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে!’
আর কথা বাড়ালেন না নবনীতস্যার। চোখ ঘুরিয়ে দেখলেন, তাঁর ঠিক পরের চেয়ারটায় বসে আছেন কাঁকনকুশি গ্রামের নিরাপদ মাইতি। দুটো হাতলওলা চেয়ার এখনও খালি পড়ে আছে। হেডস্যার বুঝতে পেরেছেন, এ দুটির একটি চেয়ার মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতির জন্যে রাখা আছে। আর একটি বলাই বাহুল্য তাঁর নিজের জন্যে।
খেলা তখনও শুরু হয়নি। হেডস্যার দেবোপমস্যারের কাছে গিয়ে বললেন, ‘ডি এম সাহেবের সঙ্গে মিটিং খুব ফলপ্রসূ হয়েছে দেবোপম। ম্যাচের পর সব তোমাকে সব বলব। তার আগে আমারা দু’জন, আমি আর মুকুকৃষ্ণস্যার আমার রুমে বসে এক কাপ করে চা খেয়েই চলে আসছি!’
আজ ক্লাস এইট এ-সেকশন মুখোমুখি হবে বি-সেকশনের সঙ্গে। দেবোপমস্যার বললেন, ‘আজ টস করে খেলা শুরু হবে। পিচে চলে এসেছে রোরো মজুমদার, মহিন দত্ত, ধৃতি, উইকেট কিপার হর্ষা, দীক্ষা, কাহ্ন ব্যানার্জি, অজিতাভ গুপ্ত, অরিত্র বর্মণ, তামস আর দেবল দাস। ক্যাপ্টেন রোরো টস করবে। ওদিকে কর্পূর গাছের দিক থেকে এগিয়ে আসছে বিজন বসুরায়, শানায়া, মায়ামি দেব, উইকেট কিপার তামান্না, অতিমান কুণ্ডু, অবনীশ দে, উজান বসু, চিত্রাক্ষ সেন, চেতন আর সুনীধি।
হেডস্যার আর মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি মাঠের ধারে গ্যালারির মতো করে সাজিয়ে রাখা খালি দুটো চেয়ারে এসে বসলেন। দেবোপমস্যার আগেই সকলকে বলে রেখেছেন। তবু হেডস্যার আসার পর ফের বললেন, ‘স্যার, আমাদের আজ ক্লাস এইট এ-সেকশনের সঙ্গে ক্লাস এইট বি-সেকশন মুখেমুখি হবে। খেলা হবে পাঁচ ওভারের। এখন আপনি মাঠের মাঝখানে আসুন একবার। আমারা টস করব, কারা ব্যাট পায় দেখি!’ বলেই মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতিকে ডাকলেন দেবোপমস্যার, ‘স্যার, আপনাকে আজকের খেলার টস করতে হবে! আপনি চলে আসুন!’
মুকুলকৃষ্ণ চলে এলেন মাঝমাঠে। দেবেপমস্যার একটা কয়েন পকেট থেকে বের করে মুকুলকৃষ্ণস্যারের হাতে দিলেন। মুকুলকৃষ্ণ জানতে চাইলেন, ‘এ-সেকশান কী নেবে? হেড না টেল?’
রোরো এগিয়ে এসে বলল, ‘আমরা হেড নেব স্যার!’
মুকুলকৃষ্ণস্যার কয়েনটি আকাশের দিকে ছুড়লেন। কয়েনকটা বাঁইবাঁই করে ঘুরতে ঘুরতে মাটিতে পড়ল। রোরো কৌতূহলী হয়ে দেখতে গেল, কী পড়েছে? বি সেকশানের বিজন বসুরায়ও টসের রেজাল্ট দেখতে এগিয়ে এল। দেখা গেল, এ সেকশানই হেড জিতেছে!
দেবোপমস্যার নিয়ম মতো রোরোকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা ব্যাটিং নেবে, নাকি বোলিং?’
তার আগে মাঠে নেমে পিচ ভাল করে দেখে নিয়েছিল রোরো। রোরো ভেবেই রেখেছিল, এই পিচে ব্যাটে রান আসবে। যখন টস জিতে গেল, তখন রোরো বলল, ‘আমরা স্যার ব্যাটিংই নেব!’
হেডস্যার এবং মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি তাঁদের চেয়ারে ফিরে গেলেন। ব্যাট হাতে ক্রিজে এসে দাঁড়াল রোরো। ওর জন্যে দাদু যে ব্যাটটা কাশ্মীর থেকে কিনে এনে উপহার দিয়েছেন, সেই ব্যাটটায় আজ ওপেন করবে রোরো। তাই ওর মনোবল আজ দ্যাখে কে! ওদিকের ক্রিজে এ সেকশানের কাহ্ন ব্যানার্জি ব্যাট নিয়ে প্রস্তুত। কাহ্ন দু’ বার পিচে ব্যাটটা ঠুকল বিরাট কোহলির ঢঙে। এর মানে, দর্শকরা দেখল, সে প্রস্তুত।
দেবোপমস্যারের হাত থেকে বল নিয়ে বাঁইবাঁই করে কিছুটা দৌড়ে এসে বল করার শ্যাডো করল বি-সেকশানের বোলার উজান বসু। দেবোপমস্যার উজানের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি এক ওভার বল করতে পাবে! এই ছ’টা বলে দেখি ক’টা উইকেট তুলে নিতে পারো?’
ওদিকে বি-সেকশানের মায়াবী দেব বাউন্ডারি লাইনের গা ঘেঁষে পজিশন নিয়ে তৈরি! মনে-মনে সে ঠিক করেই নিয়েছে, কোনও অবস্থাতেই একটা বলকেও বাউন্ডারি লাইন ছুঁতে দেবে না। উইকেটের পিছনে উইকেট কিপার তামান্না সেন গ্লাভস পরে প্রস্তুত। তার চোখে-মুখে চলকে পড়ছে কঠিন মনোবলের ছাপ।
দেবোপমস্যারের নির্দেশে প্রথম বল করল উজান। বলটা উইকেটের সামনে পড়ে একটু লাফিয়ে উঠেই গড়িয়ে গেল উইকেট কিপার তামান্নার নাগালের বাইরে দিয়ে। রোরো রান নেওয়ার জন্যে ডাক দিল না কাহ্নকে। কাহ্ন ব্যাটটা নিয়ে দৌড়নোর জন্যে তৈরিই ছিল। রোরোর ডাক পা?নি বলে সে রান নেওয়ার জন্যে দৌড়ল না। প্রথম বলে কোনও রান হল না।
এর পর সেকেন্ড বল উজানের হাত থেকে ছুটে এল রোরোর দিকে। এটা ফুলটস বল ছিল। রোরো ভাবেইনি, উজান সেকেন্ড বলটাই ফুলটস দেবে। তাই দেরি করল না বলটাকে সপাটে খেলে দিতে। দর্শকদের দিক থেকে ‘চার-চার’ বলে তুমুল চিৎকার উঠল। ততক্ষণে বল বাউন্ডারি সীমানা টপকে চলে গেল। রোরোর সংগ্রহে চলে এল চার রান!
দর্শক-গ্যালারি থেকে মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘রোরো, তুমি একদম বৈভব রাজবংশীর মতো ব্যটটা চালালে। সেদিন রাজস্থান রয়্যালসের সঙ্গে মুম্বই ইন্ডিয়ানসের খেলা তো দেখলাম! বৃষ্টির ম্যাচে রাজস্থান রয়্যালসের কাছে ২৭ রানে হেরে গেলেন হার্দিক পান্ডেরা। সেদিন তো বৈভবের প্রথম বলের ছক্কা হজম করার পর সরিয়ে নিতে হল বুমরাহকে। নেক্সট দলে ছক্কা চাই!’
তাঁর চিৎকারে থমকে তাকাল উজান রোরোর চোখের দিকে। এবারের বলটার স্পিড ছিল প্রায় এইটটি। রোরো ঠিকমতো বলটা দেখতে পেল না। শূন্যে ব্যাট ঘোরাল বটে রোরো। সামান্য ব্যাটের কানায় লেগে বলটা উইকেট কিপার তামান্না সেনের দু’ হাতের গ্রিপ থেকে ছিটকে বেরিয়ে গেল। রোরো আর কাহ্ন দৌড়ল প্রাণপণে। দু’ রান তুলে নিতে কোনও অসুবিধেই হল না রোরোদের। স্কোরবোর্ড মেইন্টেন করছে ক্লাস এইটের সি-সেকশানের বিপ্লব। স্কোরবোর্ডে রান লেখা হয়ে গেল ছয়।
হেডস্যারের চিৎকার শোনা গেল, ‘রোরো, রান তোলো ঝড়ের বেগে। এবারের বলটাকে আকাশে খুঁজতে চাই।’
চতুর্থ বলটা করল উজান সমস্ত শক্তি দিয়ে। এবার যেন এক অলীক শক্তি ভর করল রোরোর উপর। সে সপাটে ব্যাট ঘোরাল। বলটা দর্শকদের দৃষ্টির বাইরে দিয়ে নিজের জায়গা খুঁজে নিল বাউন্ডারি সীমানা পেরিয়ে মাঠের বাইরে। রোরোর ব্যাট থেকে এবার চলে এল ছ’রান। স্কোরবোর্ডে রান লিখল বিপ্লব বারো!
এবার কেমন এক ঝটকা বাতাস কর্পূর গাছটাকে দুলিয়ে প্রায় শুইয়ে দিল মাঠের উপর। এই ওভারের শেষ বল করতে দৌড়ল উজান। এবার উজানের হাত থেকে ছুটে গেল ইয়র্কার। ওদিকে ঝড় উঠে পড়েছে। ভূতে পাওয়া ভঙ্গিতে রোরো আবার গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে ব্যাট চালাল। কিন্তু বলটা খেলতেই পারল না রোরো। এর ওভারে বারো রান নিয়ে থেমে গেল এ-সেকশান। আজকের কোচিং দেখার দর্শকদের ছুটিয়ে নিয়ে চলল তুমুল বৃষ্টি। হেডস্যার এবং মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি দৌড়লেন স্কুলের হেডস্যারের রুমের দিকে। কোত্থেকে তক্ষুনি দৌড়ে এল ঘন্টিদাদু সম্মতিচরণ দাস কারও একটা ছাতা নিয়ে। ঝড়ে ছাতাটা ঠিকমতো হেডস্যারের মাথায় ধরতে পারল না ঘন্টিদাদু। শাঁ করে উলটে গেল ছাতাটা। ওঁরা দু’জন ভিজতে-ভিজতে হেডস্যারের রুমে এসে ঢুকে পড়লেন।
অনুলেখাম্যাম এবং গীতিকাম্যাম ঘেঁষাঘেঁষি করে আশ্রয় নিলেন ক্লাস নাইনের নয়নাদিদির ছাতায়। তাতে শেষ রক্ষা হল না। একটা লেডিজ ছাতায় তিনজনেই ভিজে গেলেন। ওঁরা এসে ঢুকে পড়লেন অ্যাসেম্বলি হলে।
আজকের ক্রিকেট কোচিংয়ের ক্রিকেটাররা দেবোপমস্যারের নির্দেশ মতো বল আর উইকেট নিয়ে ছুটল স্কুলের চাতালের শেডের নীচে। দেবোপমস্যারও একেবারে ভিজে চুপ্পুস। পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছতে মুছতে কাহ্ন ব্যানাজিকে স্যার বললেন, ‘তোমরা কেউ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বাড়ি যাওয়ার চেষ্টা কোরো না কাহ্ন। বৃষ্টি একটু পরেই থেমে যাবে।’
রোরো ভেজা মাথা নিয়ে চোখ পিটপিট করে বলল, ‘স্যার, আজ আর কোচিং শুরু করা যাবে না বলে মনে হয়?’
‘দেখা যাক না!’ বলে দেবোপমস্যার হেডস্যারের রুমের দিকে এগিয়ে গেলেন। মনে হয় তাঁর মতামত নিতে। ততক্ষণে হেডস্যারের বার্তা নিয়ে ছুটে এলেন ঘন্টিদাদু, ‘স্যার, আজ কোচিং বন্ধ করে দিতে বললেন হেডস্যার!’
ছেলেমেয়েদের মধ্যে একটা কোলাহল ছড়িয়ে পড়ল। দেবোপমস্যার উইকেটটা হাতে নিয়ে মাঠ থেকে ছুটে এসেছিলেন। তিনি রোরোকে বললেন, ‘রোরো, তুমি ক্রিকেট বলগুলো নিয়ে আমার ক্রীড়াকৌমুদী রুমে এসো। আমি এখন উইকেট দুটো ওই রুমেই রাখতে যাচ্ছি। ভেবেছিলাম, আজ পুরো দশ ওভার কোচিং করাব। বৃষ্টির জ্বালায় সে আর হল না।’
ক্রীড়াকৌমুদী রুমে ঢুকে নিজের চেয়ারটায় বসে ঙাফ ছাড়লেন যেন। সকলকে বললেন, ‘তোমরা সক্কলে বেঞ্চটায় বোসো! বৃষ্টি থামুক, তারপর না হয় বাড়ি যেও তোমরা!’
তক্ষুনি ঘন্টিদাদু এসে বললেন, ‘স্যার, চায়ের ডাক এসেছে। এক্ষুনি চলুন চলুন! হেডস্যার অপেক্ষা করছেন।’
দেবোপমস্যার আর দেরি করলেন না। ঘন্টিদাদুকে বললেন, ‘তুমিও এসো!’ বলেই টং-টং করে চললেন হেডস্যারের রুমের দিকে।
ছেলেমেয়েরা সক্কলে জটলা করতে লাগল স্কুলের চাতালটায়। এখন বৃষ্টি থেমেছে একটুখানি। কিন্তু আকাশের মুখ তেমনই গোমড়া হয়ে আছে। দু’-একটা বিদ্যুতের ঝলক ওদের চোখে ঝিলিক দিয়ে গেল। রোরো বলল, ‘অ্যাই, সকলে ক্রীড়াকৌমুদী রুমের ভিতরে চল। বাজ পড়বে এক্ষুনি। বাইরে থাকা ঠিক হবে না!’
(এর পর ১৬ পর্ব)
রহস্যময় দরজা
অন্বেষা বেরা
অষ্টম শ্রেণি, জওহর নবোদয় বিদ্যালয়, পশ্চিম মেদিনীপুর
আমি মাঝে মাঝেই এক রহস্যময় কল্পনার জগতে ঢুকে পড়ি। আমি একটা আবাসিক স্কুলে পড়ি। একদিন মেসের কাছে দাঁড়িয়েছিলাম। এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতে একটা জংধরা টিনের দরজা দেখি। দরজাটা ঢাকা ছিল লতা-পাতায়, ও ফুল গাছে, যেন একটা ম্যাজিক্যাল দরজা। দরজার ফাঁক ফোকড় দিয়ে দেখা যাচ্ছিল অনেক অনেক কাগজ ফুলের গাছ। গোলাপি, সাদা, বেগুনী নানারঙের ফুল। কী সুন্দর দৃশ্য! আমি তখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে থাকি আর কী থাকতে পারে দরজার পিছনে। ভাবতে ভাবতে একটা অন্য জগতে ঢুকে গিয়েছি। আমি কল্পনাতে দরজাটা খুলে দেখতে পাই সুন্দর সুন্দর ফুলের গাছ, চারিদিকে সবুজ কচি কচি ঘাস, ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া বইছে, পাখি কিচমিচ করে গান গাইছে। আমি মগ্ন হয়ে যাই। ভাবি কোনো দিন অন্য গ্রহে পৌঁছে গেছি। কিছু দূরে এগিয়ে গিয়ে দেখতে পাই ঝরণা। ঝরণা মিশেছে নদীতে। সেই নদীতে অনেক পশু পাখী জল খেতে এসেছে।
এমন সময় আমার মনে হল আমার সময় চলে যাচ্ছে, আমাকে খেতে হবে। তখন ভাবলাম খেয়ে ফেরার সময় দরজাটা ঠেলে খুলে দেখব তার পিছনে কি আছে। কিন্তু ফেরার সময় আর খুঁজে পেলাম না দরজাকে। অনেক সিনিয়ারকে জিজ্ঞেস করলাম। তারাও বলতে পারল না দরজার কথা।
জ্বলদর্চি ছোটোবেলা ১৯৮ এর পাঠপ্রতিক্রিয়া
মলয় সরকার
দেখতে দেখতে অনেকদিন হয়ে গেল, আমার সাথে পরিচয় এই জ্বলদর্চি ছোটবেলা আর তার সম্পাদিকা লেখিকা মৌসুমী ঘোষের সঙ্গে। এর মধ্যে অনেক জল গঙ্গা দিয়ে গড়াল,অনেকবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে ফেলল আমাদের সবুজ পৃথিবী।আস্তে আস্তে কখন যেন ওরা, সবাই আমার ঘরের মানুষ, নিজের আত্মীয় হয়ে গেছে খেয়ালই করি নি। মাঝে যখন কিছুদিন বন্ধ ছিল পত্রিকার প্রকাশ, তখন কি মন খারাপ।
যাক, আবার শুরু হতে নিশ্চিন্ত।
এবারের ১৯৮ সংখ্যার পত্রিকাটি পেয়ে প্রথমেই দেখি, দুষ্টু দুষ্টু জিজ্ঞাসা নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে মিষ্টি একটি বিড়াল। তার চোখে কিন্তু শিশুর সরলতা আর অনন্ত জিজ্ঞাসা, যা একটি শিশুর মত। আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, যে কোন শিশু এই সুন্দর বিড়ালটিকে দেখে মুগ্ধ হবেই।এখানেই শিল্পী মৃণাল ঘোষের কৃতিত্ব।
এর পর, পাতা ওল্টালেই দেখতে পাই, অর্থিতা মণ্ডলের গুলতির আজব নামা। গুলতি এই নামটিই বড় মজাদার। তার সঙ্গে বাঘমামার কথাবার্তাও বেশ মজার। তবে বুঝতে পারি, এটি নিশ্চয়ই সুন্দরবনের বাঘ, তাই তার বাংলাপ্রীতি বা বাঙালীপ্রীতি এত প্রবল। তাই তার গরম ভাতে ঘি আর পোস্ত এত প্রিয়।তা ছাড়া সে যে আজকালকার বিয়েবাড়ির ভোজ খুব পছন্দ করে না, বরং পুরানো দিনের মেনুটিই বিশেষ পছন্দ বোঝা গেল।অর্থাৎ ইনি বাঘ মামা না হয়ে আমার মত বুড়ো বাঘ দাদু নিশ্চয়ই।
তারপরেই অবশ্য গুলতি চলে গেছে অন্য জায়গায় অন্য পটভূমিকায়। সেখানে সে ভালবাসার রাজত্বে নতুন বন্ধুদের সঙ্গে ভালবাসার বীজ ছড়ানোর খেলায় মেতেছে। সবটাই ভাল। তবে এই আকস্মিক পট পরিবর্তনটা কেমন খাপছাড়া লাগল।
ওদিকে রতনতনু বাবু তো এই গগনজ্যোতি স্কুলের ম্যাচের ভণিতায় ক্রিকেট জগতের অনেক কিছু তথ্য জানিয়ে যাচ্ছেন। এটা একদিকে ভাল, যে সমস্ত ছেলেমেয়েরা এই ক্রিকেট দুনিয়ার খবর খুব একটা রাখে না, এর মাধ্যমে তারা কিছু সত্যি ক্রিকেটের খবরও জেনে যাবে।চলুক এই ম্যাচ , আজকের টোয়েন্টি- টোয়েন্টি না হয়ে আগেকার পাঁচ-ছ’ দিনের ম্যাচ হয়ে। ব্যাট করতে থাকুন জয়সীমা , ফারুখ ইঞ্জিনীয়ার কিংবা পতৌদির নবাবেরা।
অস্মিতা ঘোষ সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী। কিন্তু তার গল্পের নায়ক অর্কের বয়স মাত্র পনেরো বছর। শুধু তাই নয়, তার মধ্যে দিতে সে যে বড় সত্যটা দিয়েছে, এটা এই এতটুকু মেয়ের কাছ থেকে পাওয়া , আমাদের কাছে আশাতীত।খুব ভাল। আরও লিখুক অস্মিতা।
অনুশ্রুতি মণ্ডলের বাবা সাহেব আম্বেদকরের ছবি ভালই।
সব শেষে, যা প্রতিবার বলে থাকি মৌসুমীর জ্বলদর্চি ছোটবেলা আরও সুন্দর এবং বেশি লেখা আঁকায় ভরে যাক, এটাই প্রার্থনা। এখন কি ছোটোরা কম লিখছে বা আঁকছে! নিশ্চয়ই তা নয়। তবে এখানে আরও বেশি করে সবাই আত্মপ্রকাশ করুক এটাই চাই। মৌসুমী যে প্রচেষ্টা নিয়ে প্রায় ২০০ সংখ্যার দোরগোড়ায় পৌঁছেছে , তার জন্য অবশ্যই কৃতিত্বের দাবী তো রাখেই।
0 Comments