পঞ্চম খণ্ড : পর্ব -২
কমলিকা ভট্টাচার্য
ছোটবেলার আলো
আদরের বয়স তখন এক বছর ছুঁইছুঁই। হাঁটতে শেখার চেষ্টা চলছে। ঘরের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্ত—দুই হাত ছড়িয়ে টলতে টলতে এগিয়ে আসে, আবার পড়ে যায়, আবার উঠে দাঁড়ায়। এই পড়ে যাওয়া আর উঠে দাঁড়ানোর মাঝখানেই যেন তার সমস্ত আনন্দ।
ইরা মেঝেতে বসে হাত বাড়িয়ে বলে,
— “আয় আদর… আয়, মা’র কাছে আয়…”
আদর টলতে টলতে এগোয়। হঠাৎ থেমে দেয়ালের ঘড়িটার দিকে তাকায়। কয়েক সেকেন্ড। তারপর আবার হাঁটা।
ঋদ্ধিমান সেটা লক্ষ্য করছিল। সে ধীরে বলল,
— “ও শব্দের সঙ্গে সময় মিলিয়ে দেখছে।”
ইরা হেসে বলল,
— “তুমি সবকিছুর মধ্যে বিজ্ঞান খুঁজে পাও!”
ঋদ্ধিমান চুপ করে থাকে। কারণ সে জানে, সে ভুল বলছে না।
ঘড়ির টিকটিক শব্দের সাথে আদরের পা ফেলার একটা অদ্ভুত মিল আছে। যেন সে সময়কে শুনে হাঁটছে।
অনির্বাণ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার চোখে এক অদ্ভুত দ্বৈততা—অগাধ ভালোবাসা আর গভীর উদ্বেগ। সে জানে, এই শিশুর ভেতরে যা লুকিয়ে আছে, তা পৃথিবী জানলে তাকে আর সাধারণ থাকতে দেবে না।
সে ধীরে বলে,
— “ওকে স্বাভাবিক থাকতে দিতে হবে। যেকোনো মূল্যে।”
ঋদ্ধিমান মাথা নাড়ে,
— “হ্যাঁ। ওর শৈশবটাই সবচেয়ে জরুরি।”
সেদিন বিকেলে ইরা আদরকে নিয়ে বাগানে যায়। রোদ নরম। গাছের পাতা নড়ছে। পাখির ডাক। আদর ঘাসের ওপর বসে একটা পিঁপড়ে দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে।
সে আঙুল বাড়িয়ে পিঁপড়ের পথ আটকায় না। শুধু দেখে।
ইরা অবাক হয়ে দেখে—এই বয়সের বাচ্চারা সাধারণত পিঁপড়েকে চাপা দেয়, ধরতে চায়। আদর তা করে না। সে পর্যবেক্ষণ করে।
ঋদ্ধিমান পাশে এসে দাঁড়ায়। বলে,
— “ও জীবনের প্রবাহ থামাতে চায় না। শুধু বোঝে।”
ইরা চুপ করে যায়।
রাতে, আদর ঘুমিয়ে পড়ার পরে, তারা তিনজন বসে থাকে লিভিং রুমে।
অনির্বাণ বলে,
— “আজ ও একটা অদ্ভুত কাজ করেছে। ব্লকের খেলায় পাঁচটা ব্লক দিয়ে ফিবোনাচ্চি সিরিজ বানিয়েছে।”
ইরা থমকে যায়,
— “ওটা তো আমরা কেউ শেখাইনি!”
ঋদ্ধিমান শান্ত গলায় বলে,
— “ও নিজে শিখছে। নিজের ভিতর থেকে।”
নীরবতা।
🍂
অনির্বাণ ধীরে বলে,
— “Timson…কি তাহলে?”
ঋদ্ধিমান চোখ নামিয়ে নেয়।
— “হ্যাঁ। সেই প্যাটার্ন, ওর ডিএনএ মডিফাইড,যাতে মানুষের সাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহাবস্থান আছে।”
ইরা উদ্বিগ্ন হয়ে বলে,
— “আমরা কি ওকে লুকিয়ে রাখব সারা জীবন?”
অনির্বাণ দৃঢ় গলায় বলে,
— “না। কিন্তু সময় না আসা পর্যন্ত, পৃথিবীকে ওর থেকে লুকিয়ে রাখব।”
এই সব কথার মাঝেই বিছানায় শুয়ে নাতাশা সব শুনছে।
তার চোখ বন্ধ। শরীর নিশ্চল। কিন্তু তার ভেতরে ঝড়।
সে অনুভব করে আদরের হাসি, ইরার স্নেহ, অনির্বাণের ভয়, ঋদ্ধিমানের বিশ্লেষণ।
তার চোখের কোণে জল জমে।
সে চায় উঠে বসতে। আদরকে কোলে নিতে। কিন্তু পারে না।
একদিন দুপুরে ইরা আদরকে নিয়ে নাতাশার পাশে বসে গল্প করছিল।
— “দেখো মা, আদর আজ নিজে নিজে দাঁড়িয়েছে।”
আদর হামাগুড়ি দিয়ে এসে মায়ের বিছানায় হাত রাখে। তারপর হঠাৎ খুব মনোযোগ দিয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
অনেকক্ষণ।
তারপর সে খুব আস্তে মায়ের হাত স্পর্শ করে।
ঋদ্ধিমান দূর থেকে সেটা দেখে। তার প্রসেসিং ইউনিট কয়েক সেকেন্ডের জন্য অস্বাভাবিক নীরব হয়ে যায়।
সে ফিসফিস করে বলে,
— “ও বুঝতে পারে…”
ইরা তাকায়,
— “কি?”
— “ও অনুভব করে, নাতাশা জেগে আছে।”
ইরার গায়ে কাঁটা দেয়।
সময়ের সঙ্গে আদর বড় হতে থাকে। দুই বছরে পা দেয়।
কিন্তু তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য—সে খুব কম কাঁদে।
সে বেশি দেখে। বেশি ভাবে।
একদিন সে কাগজে গোল গোল আঁকছিল। হঠাৎ সে এমন একটা চিহ্ন আঁকে, যা দেখে ঋদ্ধিমান থমকে যায়।
ওটা Timson-এর নিউরাল নোটেশনের একটা প্রতীক।
ঋদ্ধিমান চেয়ার ধরে বসে পড়ে।
— “অসম্ভব…”
অনির্বাণ ছুটে আসে,
— “কি হয়েছে?”
ঋদ্ধিমান কাগজটা দেখায়।
ইরা কিছুই বুঝতে পারে না। কিন্তু দুজনের মুখের অবস্থা দেখে ভয় পায়।
অনির্বাণ খুব ধীরে বলে,
— “ওর ভিতরে অতীত জেগে উঠছে।”
ঋদ্ধিমান বলে,
— “না। ও নিজের ভবিষ্যৎ আঁকছে।”
সেদিন রাতে অনির্বাণ অনেকক্ষণ নাতাশার পাশে বসে থাকে।
— “তুমি শুনতে পাচ্ছ তো? আমাদের ছেলে… সে আলাদা। কিন্তু আমি চাই না সে আলাদা হয়ে বড় হোক। আমি চাই সে দৌড়াক, পড়ে যাক, কাদায় মাখামাখি করুক…”
তার গলা কেঁপে ওঠে।
— “তুমি থাকলে ভালো হতো, নাতাশা…”
নাতাশার আঙুল সামান্য নড়ে।
অনির্বাণ থমকে যায়।
সে ফিসফিস করে বলে,
— “তুমি ফিরবে। আমি জানি।”
বাইরে বৃষ্টি নামছে।
ঘরের ভেতর আদর ঘুমিয়ে। তার মুখে শান্তি।
ঋদ্ধিমান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির শব্দ শুনছে।
সে ধীরে বলে,
— “এই শিশুকে শুধু বড় করা নয়… তাকে সুরক্ষিত রাখতে হবে তার নিজের মস্তিষ্ক থেকেও।”
ইরা জিজ্ঞেস করে,
— “মানে?”
ঋদ্ধিমান তাকায়,
— “ও খুব দ্রুত বড় হয়ে যেতে পারে। আমাদের ওকে ধীরে বড় করতে হবে।”
সেই রাতে তারা সিদ্ধান্ত নেয়—
আদরের জীবন হবে গল্পে, খেলায়, রোদে, বৃষ্টিতে, ছোট ছোট আনন্দে ভরা।
বিজ্ঞান থাকবে, কিন্তু আড়ালে।
কারণ সে শুধু এক অসাধারণ মস্তিষ্ক নয়—
সে এক শিশু।
আর তার ছোটবেলাটাই সবচেয়ে মূল্যবান।
বিছানায় শুয়ে নাতাশা সব শোনে, চোখের কোণে জল নিয়ে মনে মনে বলে—
“ওকে স্বাভাবিক রেখো… যতদিন পারো…”
0 Comments