জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকার /পঞ্চম খণ্ড: পর্ব - ৩/কমলিকা ভট্টাচার্য

বাঁচার উত্তরাধিকার 
পঞ্চম খণ্ড: পর্ব - ৩
কমলিকা ভট্টাচার্য 
 
নীরবতার ভেতরের সাড়া

আদরের বয়স তখন তিন। কথাবার্তা স্পষ্ট হচ্ছে, কৌতূহল আরও স্পষ্ট। সে প্রশ্ন করে কম, দেখে বেশি। যেন পৃথিবীকে আগে পড়ে নিতে চায়, তারপর জিজ্ঞেস করবে।
সকালে ইরা তাকে নিয়ে বারান্দায় বসে রোদ পোহাচ্ছিল। সামনে আকাশ, দু-একটা মেঘ ভাসছে। আদর হঠাৎ আঙুল তুলে বলল,
— “ওই মেঘটা যাবে কোথায়?”
ইরা হেসে বলল,
— “হাওয়া যেদিকে নিয়ে যাবে।”
আদর একটু ভেবে বলল,
— “তাহলে মেঘের নিজের ইচ্ছে নেই?”
ইরা থেমে যায়। — “হয়তো আছে। কিন্তু আমরা বুঝি না।”
দূরে দাঁড়িয়ে ঋদ্ধিমান নরম গলায় বলল,
— “কিছু কিছু সত্তা নিজের ইচ্ছে লুকিয়ে রাখে, পরিবেশের সঙ্গে মিলিয়ে নেয়।”
ইরা তাকায়, — “তুমি কি আদরকে বলছ, না নিজেকে?” ঋদ্ধিমান উত্তর দেয় না।
আদর খেলতে ভালোবাসে, কিন্তু তার খেলার ধরন অন্যরকম। ব্লক দিয়ে বাড়ি বানায় না—পথ বানায়। গাড়ি নিয়ে দৌড়ায় না—লাইন করে দাঁড় করায়। খেলনার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন তাদের ভেতর কিছু পড়ছে।
একদিন সে একটা পুরোনো রিমোট খুলে ফেলেছিল। স্ক্রুগুলো আলাদা করে সাজিয়ে রেখেছে আকার অনুযায়ী। অনির্বাণ দেখে থমকে গেল, — “ও এগুলো করল কিভাবে?” ইরা চিন্তিত, — “আমি তো পাশে ছিলামই না!” ঋদ্ধিমান বলল, — “ও বিশৃঙ্খলাকে সাজাতে ভালোবাসে।” অনির্বাণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে, — “ওকে কি আমরা থামাব?” ঋদ্ধিমান মাথা নাড়ে, — “না। শুধু দিক বদলে দেব। যাতে এটা খেলা থাকে, গবেষণা না হয়ে যায়।”
সেদিন রাতে আদর ঘুমোতে চাইছিল না। ইরা গল্প বলতে শুরু করল—মা যশোদা আর কৃষ্ণের গল্প। আদর মন দিয়ে শুনে জিজ্ঞেস করল, — “যশোদা মা কি সত্যি মা ছিল না?” ইরা মৃদু হেসে বলল, — “মা হওয়া শুধু জন্ম দেওয়াতে নয়, ভালোবাসায়।” আদর একটু চুপ করে থেকে বলল, — “তাহলে তুমি আমার যশোদা মা?” ইরার চোখ ভিজে উঠল। — “হ্যাঁ, আমি তোমার যশোদা মা।”
🍂
দূর থেকে নাতাশার নিস্তব্ধ শরীরের পাশে বসে অনির্বাণ সব শুনছিল। তার বুকের ভেতর টনটন করছিল। নাতাশা নিশ্চল, কিন্তু ভেতরে ঢেউ ওঠে প্রতিদিন।
আদরের কণ্ঠ শুনলে তার হৃদস্পন্দন সামান্য বদলে যায়। মনিটরে সেই সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঋদ্ধিমান খেয়াল করে। সে ধীরে বলে, — “ওর মস্তিষ্ক সাড়া দিচ্ছে।” অনির্বাণ এগিয়ে আসে, — “মানে?” — “নাতাশা শুনতে পাচ্ছে। অনুভব করছে।” অনির্বাণ খুব আস্তে নাতাশার হাত ধরে বলে, — “তোমার ছেলে আজ তোমাকে যশোদা মায়ের গল্প শোনাবে।” নাতাশার চোখের কোণে জল জমে।
এক বিকেলে বৃষ্টি নামছিল। আদর জানালার পাশে বসে বৃষ্টির ফোঁটা গুনছিল। — “এক… দুই… তিন… চার…” ইরা জিজ্ঞেস করল, — “তুমি কি গুনছ?” আদর বলল, — “ফোঁটা না। ফাঁকগুলো।” ঋদ্ধিমান চুপ করে তাকিয়ে থাকে। সে জানে, এই শিশুর চিন্তার দিক অন্যরকম। সে দৃশ্য না, অদৃশ্য দেখে।
সেই রাতে ঋদ্ধিমানের সিস্টেমে হালকা ত্রুটি দেখা দিল। সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল, যেন প্রসেসিং থেমে গেছে। অনির্বাণ খেয়াল করল, — “কি হলো?” ঋদ্ধিমান স্বাভাবিক গলায় বলল, — “সামান্য ল্যাগ।” কিন্তু তার চোখে ক্লান্তি স্পষ্ট। অনির্বাণ বুঝল—সময় খুব ধীরে কাজ শুরু করেছে।
আদর চার বছরে পা দিল। জন্মদিনে কেক কাটার সময় সে মোমবাতি নিভিয়ে বলল, — “আমি চাই মা সেরে উঠুক।” ঘরটা নিস্তব্ধ। ইরা কেঁপে উঠল। অনির্বাণ মুখ ঘুরিয়ে নিল। ঋদ্ধিমান ধীরে বলল, — “ইচ্ছে শক্তিশালী জিনিস।”
আদর নিষ্পাপ মুখে জিজ্ঞেস করল, — “মা কি ঘুমাচ্ছে?” ইরা কষ্টে হেসে বলল, — “হ্যাঁ সোনা, মা গভীর ঘুমে।” আদর মাথা নেড়ে বলল, — “তাহলে ওকে ডাকতে হবে না। ঘুম ভাঙলে নিজেই উঠবে।” এই সরল বিশ্বাসটাই যেন সবার বুক ভেঙে দেয়।
সেদিন রাতে অনির্বাণ বলল, — “ওর মধ্যে এমন কিছু আছে, যা আমাদের থেকেও বড়।” ঋদ্ধিমান উত্তর দিল, — “হ্যাঁ। কিন্তু ও যেন আগে শিশু থাকে।” ইরা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, — “আমি ওকে খেলতে শেখাব। দৌড়াতে শেখাব। প্রশ্ন না করতে শেখাব কিছুদিন।” ঋদ্ধিমান মৃদু হাসল, — “ও প্রশ্ন না করে থাকতে পারবে না।”
বিছানায় শুয়ে নাতাশা সব শুনছিল। তার ভেতরে একটাই অনুভূতি—আদর বড় হচ্ছে। সে দেখতে পাচ্ছে , ছুঁতে পারছে না, তবু অনুভব করছে প্রতিটি মুহূর্ত। তার নীরবতার ভেতরেও এক প্রবল সাড়া জেগে থাকে। আর সেই সাড়াই হয়তো একদিন তাকে ফিরিয়ে আনবে।

Post a Comment

0 Comments