জ্বলদর্চি

অয়ন মুখোপাধ্যায়ের পাঁচটি কবিতা

অয়ন মুখোপাধ্যায়ের পাঁচটি কবিতা


নিঃসঙ্গতার বজ্রবিদ্যুৎ ভর্তি খাতা

রাত্তিরে হঠাৎ শুনি—
আমার বিছানার নিচে একটা নদী গুনগুন করছে।
আমি কিন্তু ভয় পাইনি,
কারণ একাকিত্ব এতদিনে
আমার শরীরের ভেতর একটা আস্ত ঘর বানিয়ে ফেলেছে।

টিচার্স রুমের চেয়ারে বসে থাকতে থাকতে দেখেছি,
আমার ছায়া হাঁটতে হাঁটতে বেরিয়ে গেল ক্লাসরুমের দিকে।
সে ব্ল্যাকবোর্ডে কাছে গিয়ে এঁকে দিল আগুন।আর বলল—
“তুই আমার সাথে না থাকলেও আমি কিন্তু তোর সঙ্গে থাকব।”

আমি তখন নিজের মাথার ভেতর
একটা জানলা খুলে দিলাম।
ওই জানলা দিয়ে ভেসে এল আকাশ
পাখির বদলে মেঘ,
তারার বদলে কয়েকটা শূন্য চোখ।

আমি তখন হাত বাড়ালাম তোমার দিকে,
 দেখলাম তোমার আঙুলে লেগে আছে অচেনা অন্ধকারের গন্ধ—
যেন শূন্যতার একটা শরীর
যে আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে।

আর তখনই বুঝলাম—
একাকিত্ব মানে শুধু ফাঁকা ঘর নয়,
একাকিত্ব মানে—
একটা বজ্রপাতের জন্ম।

🍂

বজ্রবিদ্যুৎ ভর্তি সাদা পাতা

আজ জানলার কাঁচে দেখি—
আমার মুখ ভেসে উঠছে বৃষ্টির মতো,
ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে,
তবু কোথাও একটা দাগ থেকে যাচ্ছে চুপচাপ।

আমি সেই দাগের ওপর আঙুল দিতেই
বজ্রের গন্ধ ভেসে উঠলো 
 আমি বুঝতে পারি ,প্রতিটি নিঃসঙ্গতার একটা আলাদা আলাদা ইতিহাস  আছে।

রাত্রে যখন সমস্ত আলো নিভে যায় তখন আমার বুকের ভেতর 
 আস্ত একটা গ্রাম জেগে ওঠে—
যার রাস্তাগুলো গাছগুলো আমাকে চেনে তার বাড়িগুলো আমার নাম ধরে ডাকে। বলে বুটুন আয়...


আমি দেখলাম ওই গ্রামে আমি একা নই, আমার সঙ্গে
 হাঁটছে আমার ছায়া
অন্ধকারের কাঁধে  কাঁধ মিলিয়ে।

আমি তাকে জিজ্ঞেস করি—
“এই, আমরা কি এখনো বেঁচে আছি ?”
সে হেসে বলে,
“না, আমরা শুধু আলো কে বাঁধবার জন্য অনুশীলন করছি।”


নিঃশব্দতার হৃৎপিণ্ড

রাত্তিরে হঠাৎ দেখি—
আমার বুকের ভেতর কেউ হাঁটছে আস্তে আস্তে,
তার পায়ের কোনো শব্দ নেই,
তবু প্রতিটি পা ফেলার সময় কেঁপে উঠছে
মস্ত বড় দালান আর বাতাসে দুলতে থাকা জানালা গুলো।

কিন্তু বিশ্বাস করুন আমার হাত দিয়ে যে সমস্ত শব্দ ঝরে পড়ে সেগুলো ঠিক আমার নয়
সে আমার ভিতরে ঘুমিয়ে থাকা অন্য কোনো মানুষের শব্দ,
যে মানুষটা চায় শুধুমাত্র শব্দকে ছুঁয়ে থাকতে।

বালিশে মুখ রাখতেই
বজ্রের গন্ধ ভেসে আসে,
যেন কারুর কান্না মিশে যাচ্ছে বিদ্যুতের আলোয়।

আমি হাত বাড়ালেই
ধরতে যাই নিঃশব্দতাকে—
সে কেন জলের মত ফস্কে যায় ।

তখন মনে হয়,
হয়তো নীরবতাও এক প্রকারের চিৎকার,
যা শুধু ভিতর থেকে শোনা যায়।


 অন্ধকারের ক্যালেন্ডার

আজ দেয়ালে টাঙানো ক্যালেন্ডার গুলোর দিকে তাকাই

সব তারিখ ঝরে গেছে,
শুধু রয়ে গেছে কিছু কালো চিহ্ন,
যেখানে আলো একদিন এসে বসেছিল।

আমি সেই তারিখ গুলো কে গুনে গুনে নিজেকে খুঁজতে থাকি,
যেন নিজেরই ছায়ার কাছে নিজের জন্মদিন ভুলে গেছি।

রাত বাড়ে, ঘড়ির কাঁটা নিঃশব্দে
চলে যায় ঘুমন্ত গ্রামের করোটির ভেতর।

আমি তখন এক কাপ নিঃসঙ্গতা বানাই,
তাতে একটু চিনি দিই, একটু অন্ধকার।
তারপর ধীরে ধীরে চুমুক দিই
নিজেরই তৈরি করা নীরবতার ভেতর ।

হঠাৎ বজ্রপাতের মতো বুঝতে পারি—
সময়ও আমার মতো আজ একা,
সে শুধু শিখেছে
আমাদের মতোই অপেক্ষা করতে হয়।


ছায়ার মেশিন

আজ সকালে ছায়া পড়া বন্ধ হয়ে গেল।
বলে রাখিনি, তবু সে চলে গেল
ঠিক সেই মুহূর্তে,
যখন জানলার বাইরে আমার মুখে প্রথম আলো পড়ল।

আমি ছায়াকে ডাকলাম— “আয় আয়”—
সে আসে না।
চেষ্টা করলাম ছায়া বানাতে—
আলো কমালাম, চোখ মুছলাম,
কিন্তু সে আর এলো না।

তখন আমি মাথার ভেতর একটা মেশিন চালু করলাম,
যে আজকাল স্মৃতি থেকে ছায়া বানায়।
তাতে ভরে দিলাম নীরবতার রঙ,
আর কয়েক ফোঁটা বজ্রের শব্দ।

মেশিনটা গুনগুন করল কিছুক্ষণ,
তারপর থেমে গেল।

আমি তখন দেখলাম, টেবিলে পড়ে আছে
একটা নতুন ছায়া—
যার মুখ আমার মতো,
কিন্তু চোখে ঝলক দিচ্ছে বজ্রের গায়ে কাটা চিহ্ন।

Post a Comment

0 Comments