জ্বলদর্চি

দুটি অণুগল্প/সন্দীপ দত্ত


দুটি অণুগল্প

সন্দীপ দত্ত

একটি লাল গোলাপ


হাতে একটি লাল গোলাপ নিয়ে ছেলেটা ঠিক সেইখানটিতে দাঁড়িয়েছিল,যেখানে দাঁড়ালে কুহু তাকে দেখতে পাবে। উঠতি বয়েসের ছেলে। গায়ের রঙ কালো। গড়ন রোগাটে। নিষ্প্রভ মুখ। কদাকার।
          বেলা এগারোটা বাজলে কুহু রোজ ব‍্যালকোনিতে এসে দাঁড়ায়। সদ‍্য স্নানের পর কোমর ছুঁয়ে যাওয়া ভিজে চুল ছেড়ে সে ভেজা কাপড় মেলে ব‍্যালকোনিতে দাঁড়িয়ে।
          ছেলেটা জানে। কারণ,এ পথ দিয়ে সে  নিয়মিত যাতায়াত করে সাইকেলে। এ দৃশ‍্য তাই বহুবার দেখা।
          আজও সাইকেল নিয়েই এসেছে সে এ পথে। তবে আজ তাকে থমকাতে হয়েছে ওই লাল গোলাপটির জন‍্য। মিছিমিছি পার্সেল দেওয়ার নাম করে কুহুকে ডেকে ওটা দিতে হবে। দোতলার ব‍্যালকোনি থেকে নিচে নেমে গেট খুলে কুহু সামনে এসে দাঁড়ালে লাল গোলাপটি তার হাতে ধরিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে ছেলেটিকে বলতে হবে আই লাভ ইউ।
          বললেই কলকাতার নামী কলেজের সুরক্ষিত হস্টেলে তিনটি বছর থাকার জায়গা হবে ছেলেটির। নয়তো না।
            স্মার্ট,ব‍্যক্তিত্বময়ী,সাহসী,অতীব সুন্দরী কুহু। আজ পর্যন্ত কলেজের কোনও ছেলে যাকে প্রপোজ করতে পারেনি। এমনকি রাতুলও নয়।
          হস্টেলে রাতুলের সঙ্গে রুম শেয়ার করতে হবে ছেলেটিকে। গ্রামের ছেলে। সোজাসরল। বোকা। বাধ‍্য। ওরকম গোবেচারাগুলো যত সিক্কারই চড় খাক না কেন কুহুর হাতে,তাতে রাতুলের কী যায় আসে! সে মজা পেলেই হল। চালাক ছেলেদের নিয়ে তো মজা করা যায় না!

🍂


সেই সব দিন


ডিনারের পর অনিন্দ‍্য ছাদে উঠে এসেছিল আগেই। চম্পা এল আরও মিনিট তিরিশ বাদে। কিচেনের সমস্ত কাজ গুছিয়ে। আসবার ইচ্ছে একেবারেই ছিল না চম্পার। এখন ছাদে উঠে এসে অনিন্দ‍্যর কাছে দাঁড়ানো মানেই তো আবার সেই একগাদা কথা শোনা বাপের বাড়ির। একের পর এক বলে চলবে স্বামী আর সে মুখখানা বন্ধ রেখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চুপচাপ গিলবে। জামাইকে সম্মান জানাতে জানে না ওরা,জামাইয়ের পছন্দ অপছন্দের হিসেব রাখতে জানে না ওরা,ভিখিরির মতো আতিথেয়তা,এরকম কত কী দোষ! খুঁত যেন ফুরোবে না অনিন্দ‍্যর কাছে। ফুরোয় না ফি বছর জামাইষষ্ঠীর পর কলকাতায় ফিরে এলে। চম্পাকে যেন দাঁড়িয়ে থাকতে হয় বুক পেতে। তীরবিদ্ধ করবে অনিন্দ‍্য। হাসতে হাসতে হেলায় করবে। বিষ মেশাবে ইচ্ছেমতো। আসতে চম্পাকে হবেই। না এলে আবার সেই মারধর। প‍্যান্টের বেল্ট খুলে মার, জ্বলন্ত সিগারেট শরীরের উন্মুক্ত অংশে দিয়ে যন্ত্রণা,পুরুষালি হাতের চেটো তো আছেই। জামাইষষ্ঠীর পর কলকাতায় ফিরে এলে এই একটা আতঙ্কে ভোগে চম্পা। তীব্র গরমে খোলা ছাদে হাওয়া খেতে খেতে আবার কী বলবে অনিন্দ‍্য! সবই তো বলেছে সে। অপমানের আর কী বাকি আছে?
            খোলা ছাদে সিগারেট খেতে খেতে অনিন্দ‍্য চম্পাকে আজ এই প্রথম একটা অন‍্য কথা বলল। "ষষ্ঠীতে আজ দু'বছর পর তোমার বাপের বাড়িতে গেলাম চম্পা। জামাই হিসেবে তেমন আপ‍্যায়ণ আমি ও বাড়িতে কোনওদিন পাইনি ঠিকই,তবে আমরা বেরিয়ে আসার পরেও তোমার মায়ের ওই পথের দিকে তাকিয়ে থাকাটা এবারে আমি বড্ড মিস করলাম। এই আন্তরিকতাগুলো আজকাল হারিয়ে যাচ্ছে।"
         অনিন্দ‍্যর কথায় চম্পার চোখে জল এল। দেড় বছর হল মা মারা গেছে তার।

Post a Comment

0 Comments