উনিশের মে'র ভাষা আন্দোলন ও কমলা ভট্টাচার্য
অনিন্দিতা শাসমল
"আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি,আমি কি ভুলিতে পারি ?"
আমাদের সত্তায় মিশে গেছে এই গান। তাই ভাষা দিবস বলতেই আমরা বুঝি একুশে ফেব্রুয়ারি। ওপার বাংলার রক্তক্ষয়ী ভাষা আন্দোলন। এপারেও আসামের শিলচরে বাংলা ভাষাকে অন্যতম সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য একটি গণ আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল। ১৯৬১ সালের ১৯শে মে শিলচর স্টেশনে এগারো জনের আত্মবলিদানের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল মাতৃভাষার স্বীকৃতি। যে এগারো জন শহিদ হয়েছিলেন , তাঁরা হলেন --কানাইলাল নিয়োগী, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, হীতেশ বিশ্বাস, সত্যেন্দ্রকুমার দেব, কুমুদরঞ্জন দাস,সুনীল সরকার,তরণী দেবনাথ, শচীন্দ্রচন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর,সুকমল পুরকায়স্থ ও কমলা ভট্টাচার্য। এই নামগুলো থেকেই বোঝা যায়, এঁদের মধ্যে একজন ছিলেন মহিলা। হ্যাঁ। মাত্র ১৬ বছর বয়সী একজন কিশোরী। কমলা ভট্টাচার্য।
🍂
১৯৬১সালে বরাক উপত্যকায় ভাষা আন্দোলনকারীদের স্লোগান ছিলো -- ''জান দেবো, তবু জবান দেবো না"। সে আন্দোলন গ্রাস করেছিল কমলা ভট্টাচার্যকেও। সবার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়েছেন যিনি। ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গকারী একমাত্র নারী ভাষা শহিদ হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে কমলা ভট্টাচার্যের নাম।
জন্ম ১৯৪৫ সালে তৎকালীন আসাম প্রদেশের সিলেটে। বাবা রামরমণ ভট্টাচার্য ও মা সুপ্রবাসিনী দেবীর সাত সন্তানের মধ্যে পঞ্চম সন্তান তিনি। কমলারা ছিলেন তিন ভাই ও চার বোন। চার বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। শৈশবেই বাবাকে হারিয়েছিলেন কমলা। বাবা মারা যাওয়ার পর ভীষণ আর্থিক অনটনের মধ্যে দিয়ে দিন কাটতে থাকে কমলার পরিবারের। তার বয়স যখন দু'বছর, তখন দেশভাগ হয়। আর দেশভাগের সময় এক গণভোটের মাধ্যমে আসাম প্রদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয় সিলেট। কিন্তু ১৯৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন শুরু হলে, তার রেশ সিলেটেও এসে পড়েছিল। তাই একটা সময় দেশ ত্যাগ করে তাঁরা আসামে চলে গেলেন। আশ্রয় নিলেন আসামের কাছাড় জেলার শিলচরে। শিলচরে কমলারা থাকতেন শিলচর পাবলিক স্কুল রোডের কাছে একটি ভাড়া বাড়িতে।
শিলচরের ছোটেলাল শেঠ ইন্সটিটিউটেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় হাতেখড়ি হয়েছিল কমলার। তখন তার বয়স মাত্র ৫ বছর। পরিবারে আর্থিক অনটন। কমলার বড় বোন বেণু নার্সের চাকরি পেয়ে শিমূলগুড়ি চলে গিয়েছিলেন প্রশিক্ষণ নিতে। মেজো বোন প্রতিভা ছিলেন শিক্ষিকা। কমলার পরিবার অল্প বেতনে চাকরিরত শিক্ষিকা মেজো মেয়ের আয়ের ওপরেই নির্ভরশীল ছিল। একটা সময় স্কুলের পাঠ্যপুস্তক কেনারও ক্ষমতা ছিল না কমলার। একবার কমলা তার বড় বোন বেনু ভট্টাচার্যকে একটি অভিধান কিনে দিতে বললে, তিনি সেটাও কিনে দিতে পারেননি। কমলা পড়াশোনা চালাতো সহপাঠীদের কাছ থেকে ধার করে আনা বই দিয়েই । কিন্তু তাও তো একদিনের বেশি রাখা যায় না। তাই বাধ্য হয়ে পড়ার বিষয়বস্তু নিজের খাতায় লিখে রাখতেন কমলা। সাংসারিক টানাটানিতে বেশ কষ্টেই পড়াশোনা চলছিল কমলা ভট্টাচার্যের। বেশ মেধাবী হওয়ায় দ্রুত রপ্ত করতে পারতেন পড়া। মনযোগী ছাত্রী কমলা অবশেষে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় বসলেন। ১৯৬১ সালের এপ্রিল মাসে শুরু হলো ম্যাট্রিক পরীক্ষা। ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর কয়েক মাসের ছুটি ।এই সময়ের মধ্যে টাইপরাইটিং শিখে নেবেন তিনি, এই ছিল তার ইচ্ছে । ১৭মে তাঁর ম্যাট্রিক পরীক্ষা শেষ হয়েছিল। তখন স্বপ্ন বুনছিলেন কমলা। ১৮মে তিনি খবর পেলেন ,পরদিন শিলচর রেল স্টেশনে মাতৃভাষায় প্রাথমিক স্বীকৃতির দাবিতে একটি পিকেটিংয়ের ডাক দেওয়া হয়েছে। কমলা স্কুলে পড়ার সময় বাংলা ভাষা আন্দোলনের সব খবরই পেতেন। বিশেষ করে ৫ফেব্রুয়ারি কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদ নামক সংগঠনের জন্মের সময় সব খবর শুনেতেন স্কুলের এক বান্ধবীর কাছে। ১৪ এপ্রিল বরাক উপত্যকার তিনটি জেলা কাছাড় , হাইলাকান্দি ও করিমগঞ্জ (বর্তমান শ্রীভূমি) বাংলা ভাষাভাষীদের সংকল্প দিবসের কথাও উদগ্রীব হয়ে শুনেছিলেন তিনি। উপবাসও পালন করেছিলেন। ২৪ এপ্রিলের দীর্ঘ পদযাত্রা তাঁকে ভীষণভাবে উদ্দীপ্ত করেছিল। অন্যদিকে সত্যাগ্রহীরা যে গ্রামে গ্রামে ঘুরে প্রচার চালিয়েছিলেন, তাও কমলাকে উৎফুল্ল করেছিল দারুণভাবে।
দিনটি ছিল ১৯ মে, ১৯৬১। আগের দিনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেদিন সকালে কমলা পিকেটিংয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেন। সকালে আবদার করেই মেজো বোনের জন্য রাখা শাড়িটা পরে নেন কমলা। তাঁর মেজো বোন মিছিলে যেতে বারণ করলেও শোনেননি তিনি। এই সময় বাংলা ভাষা আন্দোলনের নেত্রী জ্যোৎস্না চন্দের নেতৃত্বে কুড়ি বাইশ জনের একটি মেয়েদের দল কমলাদের বাড়িতে আসে কমলাকে নেওয়ার জন্য। কমলার মা তাঁর মেয়ে, নাতিদের ছাড়তে রাজী নন। কারণ তাঁর কানে এসেছে, স্টেশনে ঝামেলা চলছে। কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে আসবেন, এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে কমলাসহ মঙ্গলা, বড় বোনের ছেলে বাপ্পা , কমলার মাকে রাজি করানোর চেষ্টা করলো। বাকি মেয়েরাও মাকে আশ্বস্ত করলে এবং দুপুরের মধ্যে ফিরে আসবে কথা দিলে, সুপ্রবাসিনী দেবী রাজি হলেন-- দুই মেয়েকে ,ছেলে ও নাতিকে ছাড়তে। এসময় তিনি কমলাকে এক টুকরো কাপড় দেন। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়লে যেন নিজেকে রক্ষা করতে পারে। কমলার সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে কমলার ছোট বোন মঙ্গলা, ছোট ভাই বকুল ও বড় বোনের ছেলে বাপ্পা। তারা স্টেশনে পৌঁছে দেখে, প্ল্যাকার্ড, ব্যানারে ভর্তি স্টেশন। লেখা-- "জান দেবো তবু জবান দেবো না, মাতৃভাষা জিন্দাবাদ, বাংলা ভাষা জিন্দাবাদ।" অবস্থান কর্মসূচিতে এসে দাঁড়ায় কমলাসহ বাকিরা। বেলা একটার দিকে কমলার মা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তিনি নিজেই গিয়ে হাজির হন রেলস্টেশনে। বকুল ও বাপ্পাকে আগে একবার পুলিশ ধরেছিল, আবার ছেড়েও দিয়েছে। মাকে দেখতে পেয়েই ছুটে আসেন কমলা। মাকে বুঝিয়ে বলেন বাড়ি ফিরে যেতে । ওরা আরেকটু পরেই চলে আসছে।
আসলে সেদিন সকালে রেল অবরোধ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবেই চলছিল । যদিও অবস্থানের সময়সূচি ছিল সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা, কিন্তু শেষ ট্রেনটি ছিল বিকেল ৪টে নাগাদ, যার ফলে গণ অবস্থান স্বভাবতই শিথিল হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু দুপুরের পর থেকেই আসাম রাইফেলসের জওয়ানরা জায়গাটিকে ঘিরে ফেলতে শুরু করে। বেলা ২টো ৩৫ মিনিটের সময়, বিনা প্ররোচনায় অবস্থানকারী ছাত্রছাত্রীদের নির্মমভাবে লাঠি ও বন্দুকের বাঁট দিয়ে পেটাতে শুরু করে পুলিশ। এলোপাথাড়ি লাঠিচার্জে অবস্থানকারী জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় ও দিকবিদিক জ্ঞানশুন্য হয়ে ,যে যেদিকে পারে পালাতে থাকে। কমলার ছোট বোন মঙ্গলা পুলিশের লাঠির ঘায়ে মাটিতে পড়ে যায়। সাহায্যের জন্য কমলার উদ্দেশ্যে চিৎকার শুরু করে। এর মধ্যে আসাম রাইফেলসের জওয়ানরা পলায়নরত জনতার উপর অতর্কিত গুলিবৃষ্টি শুরু করে। মঙ্গলাকে বাঁচাতে কমলা ছুটে গেলে একটি গুলি তাঁর চোখ ভেদ করে খুলিতে আঘাত হানে। ঠিক তখনই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন কমলা। ধরাধরি করে তাঁকে অন্য সব গুলিবিদ্ধ আন্দোলনকারীদের সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই শহিদ হন তিনি। কমলার বোন মঙ্গলাকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এক মাস বাদে তার জ্ঞান ফিরলেও বাকি জীবনটা সে শারীরিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু হয়ে কাটিয়েছে।
কমলা ভট্টাচার্যের মৃত্যুর কয়েক মাস পর প্রকাশিত হয়েছিল তার ম্যাট্রিক পরীক্ষার ফলাফল। সেখানে প্রথম বিভাগেই উত্তীর্ণ হয়েছিলেন কমলা ভট্টাচার্য।
বাংলা ভাষার জন্য, মাতৃভাষার জন্য নিজের প্রাণ উৎসর্গ করেছেন কমলা। মায়ের ডাক, বোনের ডাক উপেক্ষা করে তিনি গেছেন মিছিলে, সংখ্যাগুরু হওয়া সত্ত্বেও নিজের ভাষাকে রাজ্যের দাপ্তরিক ভাষা না করার প্রতিবাদে। মাত্র ১৬বছরের জীবন তাঁর। দু'চোখে অজস্র স্বপ্ন, নিত্য অভাবের সংসারে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্নে বিভোর এক কিশোরী নিজের মাতৃভাষার অপমান মেনে নেননি। উন্নতশির কিশোরী নিজের প্রাণ উৎসর্গ করে রেখে গেলেন মাতৃভাষার মান।
কমলা ভট্টাচার্য জায়গা করে নিলেন পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম নারী ভাষা শহিদ হিসেবে।কমলার অনেক বড় হওয়ার স্বপ্ন পূরণ না হলেও , একটি স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল। যে স্বপ্নের জন্য তিনি সেদিন রাস্তায় নেমেছিলেন, দাঁড়িয়েছিলেন শিলচর স্টেশনে, শহিদ হয়েছিলেন নির্মমভাবে গুলিবিদ্ধ হয়ে-- কমলাসহ এগারো জন শহিদদের রক্তে পরবর্তীতে বাংলাকে দাপ্তরিক ভাষা করার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিল আসাম সরকার।
কমলাসহ এগারো জন শহিদের আবক্ষ মূর্তিসহ একটি ব্রোঞ্জ ফলক রয়েছে শিলচর স্টেশনের শহিদ বেদির ওপর। শিলচর স্টেশনকে ভাষা শহিদ স্টেশন হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে। ২০১১সালে, ভাষা আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে কমলার স্কুল প্রাঙ্গণে, ছোটেলাল শেঠ ইন্সটিটিউটে কমলার একটি আবক্ষ ব্রোঞ্জমূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। শিলচরের পাবলিক স্কুলের গা ঘেঁষে চলে যাওয়া সড়কটির নামকরণ করা হয়েছে কমলা ভট্টাচার্য সড়ক।এই রাস্তার পাশেই ভাড়া থাকত কমলার পরিবার। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম নারী ভাষা শহিদ কমলা ভট্টাচার্য । ভাষা যতদিন থাকবে,তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন ততদিন। কমলা ভট্টাচার্যের এই আত্মত্যাগ, ১৯৬১সালে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষে শিলচরের আকাশ বাতাস মুখরিত করে,হয়তো ধ্বনি প্রতিধ্বনি তুলছিল--বিধির বাঁধন কাটবে তুমি এমন শক্তিমান, তুমি কি এমনি শক্তিমান !
0 Comments