বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১২৪
পার্থেনিয়াম
ভাস্করব্রত পতি
একসময় মার্কিন কংগ্রেসে একটি আইন গৃহীত হয়েছিল। আইনটি ছিল পি এল - ৪৮০ (Food for Peace) বা PUBLIC LAW 480। আসলে এটি ছিল U. S. Grain Theory। এই আইন মোতাবেক বিশ্বের বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে খাদ্যশস্য সাহায্য করা হত। তার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৫০ নাগাদ ভারতের জন্য পাঠানো হত গম। কেননা, সেসময় ভারতের বুকে গমের ঘাটতি ছিল। কৃষিতে তেমন উন্নত ছিলনা ভারত। সেই ঘাটতি পূরণের জন্য আমেরিকা থেকে ভারত গম আমদানি করা শুরু করে। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, এই গমের সাথেই ভারতে পার্থেনিয়ামের বীজ প্রবেশ করে। ধীরে ধীরে তা সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে এই গাছটি হয়ে ওঠে মাথাব্যথার কারন। যেহেতু মার্কিন কংগ্রেসের আইন মোতাবেক এই পার্থেনিয়াম সহ গম ভারতে এসেছিল, তাই পরবর্তীতে লোকমুখে এই ক্ষতিকর আগাছাটির নাম হয়ে ওঠে 'কংগ্রেস ঘাস'।
ফুল ফুটেছে পার্থেনিয়ামের
সূর্যমুখী উপজাতির পার্থেনিয়াম আজ পশ্চিমবঙ্গের পরিবেশ প্রকৃতিতে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যত্রতত্র জন্মানো এই গাছটি থেকে মুক্তি পেতে চাইছে সকলেই। এটি উড়ে এসে জুড়ে বসা উদ্ভিদ। একবর্ষজীবি এই আগাছাটির আদি বাসভূমি উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, উত্তর পূর্ব মেক্সিকো এবং ক্যারাবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ। ১৯৫১ তে মহারাষ্ট্রের পুনেতে অধ্যাপক এইচ. পি. পরাঞ্জপে ভারতের বুকে প্রথম এই পার্থেনিয়াম গাছের সন্ধান পান। এরপর ১৯৫৬ তে উদ্ভিদবিজ্ঞানী আর এস রাও নতুন উদ্ভিদ প্রজাতি হিসেবে পার্থেনিয়াম গাছের তথ্য লিপিবদ্ধ করেন।
বিজ্ঞানীদের অভিমত, ১৮৮৮ সালে দেরাদুনের বন গবেষণাগারের অধ্যক্ষ স্যার ডিইট্রিক ব্রান্ডিস (Father of Scientific Forestry, ১৮২৪-১৯০৭) যে হার্বেরিয়াম শিট তৈরি করেছিলেন, সেখানে পাওয়া গিয়েছে এই পার্থেনিয়ামের হার্বেরিয়াম শিট। আর পশ্চিমবঙ্গের বুকে এই গাছটির প্রথম সন্ধান মেলে ১৯৭৫ সালে হুগলির ডানকুনি রেল ইয়ার্ডে। সম্ভবত ওয়াগনে করে বিদেশ থেকে খাদ্যশষ্য আনার সময় এই পার্থেনিয়ামের বীজ এসে থাকতে পারে। সেগুলিই ডানকুনিতে ছড়িয়ে থাকতে পারে শষ্য আনলোডিংয়ের সময়। তারপর তা থেকে পার্থেনিয়ামের চারাগাছ জন্মেছে। যা পরবর্তীতে সারা পশ্চিমবঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে।
গুল্মজাতীয় এই ক্ষতিকর পার্থেনিয়াম বিভিন্ন এলাকায় পরিচিত স্টার উইড, গাজর ঘাস, চেতক চাঁদনী, হোয়াইট টপ ইত্যাদি নামেও। গ্রীক শব্দ Parthenos এর অর্থ হল কুমারী। তা থেকেই এসেছে পার্থেনিয়াম নাম। Asteraceae পরিবারের এই কুখ্যাত আগাছাটির বিজ্ঞানসম্মত নাম Parthenium hysterophorus। এই পার্থেনিয়াম প্রজাতিটি সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। এছাড়াও পার্থেনিয়ামের আরও বেশকিছু প্রজাতির দেখা মেলে, সেগুলি হল --
Parthenium integrifolium
Parthenium incanum
Parthenium cineraceum
Parthenium tomentosum
Parthenium confertum
Parthenium rollinsianum
Parthenium ligulatum
Parthenium alpinum
Parthenium fruticosum
এদের পাতাগুলো খুব দর্শনীয়। চন্দ্রমল্লিকা গাছের পাতার মতো খাঁজযুক্ত। খুব কম সময়ের মধ্যেই ফুল ফোটে। সাদা রঙের ফুলগুলি বেশ ছোট। আর বীজগুলি খুব হালকা হওয়ার দরুন সহজেই একস্থান থেকে অন্যস্থানে ভেসে যেতে পারে। যেখানে গিয়ে পড়ে, সেখানে ফের নতুন চারাগাছ জন্মায়। আর এইভাবে ক্রমশঃ ছড়িয়ে পড়ছে পার্থেনিয়াম গাছের সংখ্যা। যা আজ পরিবেশবিদদের কাছে মাথাব্যাথার কারণ। ছোট অবস্থায় গাছটির কাণ্ড নরম থাকলেও একটু বড় হলেই তা শক্ত হয়ে যায়। তখন মাটি থেকে সহজে উপড়ে ফেলা বা ছেঁড়া সম্ভব হয়না।
আজ ভারতজুড়ে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে এই গাছটি। নদীর পাড়ে, রাস্তার ধারে, পার্কে সর্বত্র পার্থেনিয়ামের উপস্থিতি। একটা ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর উদ্ভিদ হিসেবে টিকে থাকলেও আমরা তেমনভাবে শঙ্কিত হচ্ছিনা। নজর দিচ্ছিনা। আশু বিপদ সম্পর্কে কেউই তেমন ওয়াকিবহাল নয়। আর এর নির্মূলিকরণে তেমন কোনো সরকারি উদ্যোগও চোখে পড়ছেনা। এক একটি পার্থেনিয়াম গাছ থেকে ৪০০০ - ২৫০০০ বীজ ছড়িয়ে পড়ে। ভাবা যায়! মাত্র ৩ -৪ মাস বেঁচে থাকলেও এইটুকু সময়কালে তিনবার ফুল ফোটে আর বীজ উৎপন্ন হয়। খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন মাধ্যমকে আশ্রয় করে। মানুষ, পশু, পাখির গায়ে লেগে এর রেণু ছড়িয়ে পড়ে দূরদূরান্তে। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় মাটি পরিবহন করলেও এই গাছের বীজ ঐ মাটির সঙ্গে মিশে থেকে স্থানান্তরিত হয়। ফলে ক্রমশঃ ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন এলাকায়।
পার্থেনিয়ামের রেণুর মধ্যে থাকে Sesquiterpene Lactones (SQL) জাতীয় এক প্রকার টক্সিন বা অতিবিষ 'পার্থেনিন'। এই পদার্থটি মানুষ, গবাদি পশু, পাখিদের ক্ষেত্রে খুবই ক্ষতিকর। এছাড়াও এর মধ্যে থাকে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ ক্যাফেইক অ্যাসিড, পি অ্যানিসিক অ্যাসিড ইত্যাদি। পার্থেনিয়াম যেখানে জন্মায়, সেই জমির উৎপাদন ক্ষমতা কমে যায় প্রায় ৪০ শতাংশ। আসলে যেখানে পার্থেনিয়াম জন্মায়, সেখানে অন্য কোনও গাছ জন্মাতে পারেনা। এর ফুলের রেণু খুব সহজেই আমাদের শ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে দেহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। যা মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে।
ত্বকের ক্যান্সার সৃষ্টিকারী এই গাছ। এর প্রভাবে মানব শরীরে ঘনঘন জ্বর, অসহ্য মাথা যন্ত্রনা, উচ্চ রক্তচাপ দেখা যায়। তাছাড়া ব্রঙ্কাইটিস, হাঁপানি, চর্মরোগ, এলার্জি, শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি হয়। আর গায়ে লাগলে ব্যাপক চুলকানি, চামড়া লালচে হওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়। আর গবাদিপশুর ক্ষেত্রে এই গাছের প্রভাবে শরীর ফুলে যাওয়া, জ্বর, বদহজম ইত্যাদি লক্ষন পরিলক্ষিত হয়।
এই গাছ নির্মূলীকরণের প্রধান পদ্ধতি হল ছোট চারাগাছকে (ফুল হওয়ার আগেই) উপড়ে শুকনো করে তৎক্ষণাৎ পুড়িয়ে ফেলতে হবে। ফলে বীজ উৎপাদিত হতে পারবে না। আর বংশবৃদ্ধিও হবে না। আরও বেশি বেশি করে মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে এই গাছের ক্ষতিকর দিকের প্রচার কর্মসূচি নিয়ে। এক্ষেত্রে বিজ্ঞানকর্মীদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারকেও প্রাধান্য দিতে হবে পরিবেশ থেকে পার্থেনিয়াম মুক্ত করতে। প্রাকৃতিকভাবে পার্থেনিয়ামের বৃদ্ধি রোধ করতে পর্যাপ্ত হারে Casia Tora এবং Casia occidentalis গাছ লাগানো যেতে পারে। এছাড়াও Zygogramma bicolorata কে 'বায়োকনট্রোল এজেন্ট' হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এরা হল Leaf Eating Beetle। এইভাবে এই গাছের বৃদ্ধি এবং প্রসার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
🍂
0 Comments