জ্বলদর্চি

নতুন বছর / বাসবদত্তা কদম

গদ্য

নতুন বছর

বাসবদত্তা কদম 

চেন্নাইএর প্রবাসেও কিভাবে যেন একটা বাংলা ক্যালেন্ডার জুটেই যায়। সে ক্যালেন্ডারে পয়লা বৈশাখকে আমার মনে হয় সে বড় ১লা । রাস্তাজোড়া সেলের মার্কেট নেই, মিষ্টির বাক্স নেই, এ কেমন নববর্ষ? 

আমাদের ছোটবেলায় নববর্ষে একলা হবার সুযোগ ছিল না। 

সপ্তাহে দু-তিন দিন চৈত্রসেলের মার্কেটে ঘোরাটা মা-জেঠি-কাকিদের অবশ্য কর্তব্যের মধ্যে পড়তো। দোকানদারদের ঘাড় মটকানোর প্ল্যান হত।  

চৈত্রসেলের বাজারে দোকানীদের প্ল্যান তেনারা ‘ঠাওর করতে’ পারতেন না। ফলতং, জেঠিমার শাড়ি প্রথমবার জলে পড়তেই, গুলে এক বালতি হয়ে গেল। ‘এ বাবা! দেখেছ! লোকটা কি বদমাইশ’  বালতি থেকে উদ্ধার হল বড়সড় একখানা গামছা। গামছা মধ্যবিত্তের ঘট থেকে স্নান সর্বত্র লাগে, তাই সেও থেকে গেল। 

নতুন বছর আসবার আগে ঝুলঝাড়ু, ফুলঝাড়ু, বালতি ন্যাতা সহযোগে কাজের মাসিদের সঙ্গে বকাবকি চলত মা, জেঠি, মামি মাসিদের। আমাদের পড়ায় ফাঁকি দেওয়ার আদর্শ সময়। 

পয়লা বৈশাখ সকালে, বাবা মলয় চন্দন সাবানের প্যাকেট খুলে বাথরুমে রেখে আসত। অন্ধকার বাথরুম চন্দন গন্ধ মেখে সেদিন এস্পেসাল। এটাই বাবার বিলাসিতা মাসকাবারি ফর্দের বাইরে।

🍂

সেই সাবান মেখে চান করে নতুন জামা পরে চলত ঢিপঢিপ পেন্নামের পালা। লাইন দিয়ে বড়দের সব্বাইকে প্রণাম। তবে হ্যাঁ যেখানে পেন্নাম করলে একটা গোটা টাকা পার্বণী জুটে যেত সে পায়ে প্রণামের গরজই আলাদা।  পয়লা বৈশাখের অবশ্য গন্তব্য ছিল মামাবাড়ি। বাবা সেদিন ধুতি আর আদ্দির পাঞ্জাবিতে খাঁটি জামাই। মা’ও খুশি। বকা ঝকা কম। 

প্রথম গন্তব্য  বেহালার শ্রীদুর্গা মিষ্টান্ন ভান্ডার। অতঃপর মিষ্টির প্যাকেটসহ আমাকে চ্যাংদোলা করে বেহালা ট্রামডিপো। লক্ষ্য সাতাশ নম্বর ট্রাম। এই ট্রামে মামাবাড়ি যাওয়া যেত বলেই বোধহয় এতে চড়লেই মায়ের মুখে জমা হত একরাশ আলো। 

সাতাশ নম্বর ট্রামে সেদিন   উৎসবকালীন মেজাজ। অনেকেই বাবার মত ধুতি পাঞ্জাবী পরে, বৌ বাচ্চা, মিষ্টির বাক্স সহ ট্রামে উঠতেন আর কন্ডাক্টরকাকু  সকলের সঙ্গেই মিষ্টি হাসি আর কুশল বিনিময় করতেন।

মামাবাড়ি পৌঁছে দিদা দাদুকে প্রণাম করলেই হাতে আসত কড়কড়ে পাঁচ বা দশ টাকার নোট, যা তখন রাজ্য জয়ের চেয়ে কম নয়। আইসক্রিম। ফুচকা। ঝালমুড়ি। সব খেয়েও ফুরানো যায় না অত টাকা। কিন্তু প্রায়শই মায়েদের হাতে ডাকাতি হয়ে যেত এই অতুল সম্পদ। 

এর পরেই আসতো লুচি-তরকারি আর দিদার হাতের ছানার পায়েস।

ঘামে চুপচুপে হয়ে লালখাতা আর কোলে সিঁদুর মাখা গণেশ, আর লক্ষ্মীকে নিয়ে মাসি ফিরত। ছোটমাসির শাড়ীর ব্যবসার হালখাতা। সন্ধেবেলার কাস্টমারদের জন্য লেবুজল, শিঙারা আর দানাদার। লাভ যেমন হোক, মাসির শাড়ির কাস্টমারদের জন্য বছরের পর বছর একই  মেনু।  

মন্দির থেকে এসেই বড়মামি দৌড়াত রান্নাঘরে। রান্নারা জমা হত। আসন, লেবু, জল ইত্যাদি পরিবেশনের বৃহৎ কাজের দায়িত্ব ছিল আমাদের বালখিল্যদের। 

লাল মেঝেয় লাইন দিয়ে পাতা হত দিদার তৈরি আসন। দাদু, মামা, বাবা, মেসো, দুএকজন নিমন্ত্রিত অতিথি বসার আগেই আমাদের কচি কাঁচাদের চটপট খাইয়ে দেওয়া হত। শেষ ব্যাচে মা, মাসি, মামি, দিদা আর মিনতি মাসি। বাবা, মামার হাতে ভার পড়ত আমাদের ঘুম পাড়ানোর, তাদেরই নাক ডাকতে শুরু করলে আমরা পা টিপে টিপে বিছানা থেকে নেমে পড়তাম। নইলে পরের ইভেন্ট যে মিস হয়ে যাবে।  

সন্ধের আগেই বড় মামী আর পাড়াতুতো মাসি, মামিদের গড়িয়াহাট অভিযান। এই অভিযানে বালখিল্যদের পাস পাওয়া যেত। আমি আর মামাতো ভাই ভিড়ের মাঝে ঢুকে পড়তাম।

সারা বছর যে সমস্ত দোকান থেকে জিনিস কেনা হত, নববর্ষের আগে আগে গিয়ে সেই সমস্ত জায়গা থেকে নিমন্ত্রণ সংগ্রহ করতে হত।  

মিষ্টির প্যাকেট আর মোড়ানো ক্যালেন্ডার হাতে দিয়েই দোকানদাররা প্রশ্ন করতেন, বৌদি, খাতাটা বার করি?

বাৎসরিক ধার শোধের সেদিন শুরু। এ প্রশ্নে মিষ্টি তেতো হয়ে যেত কি না সেটা বোঝার সঠিক বয়স ছিল না আমাদের। 

ফার্ন রোডের এক দোকান আইসক্রিম খাওয়াতো। আমার আর ভাইয়ের ঐ দোকানে যাবার আগ্রহ বেশি। হেঁটে হেঁটে আমাদের পায়ে ফোসকা। আইসক্রিম খেয়ে মামি আমাকে আর ভাইকে নিয়ে, বালিগঞ্জ স্টেশনের ওভারব্রিজ পেরিয়ে, রিক্সায় বসতো। 

বড়মামির ব্যাগ তখন উপচে পড়ছে মিষ্টির বাক্স আর ক্যালেন্ডারে। এক হাত দিয়ে পেটের কাছে আমাকে আর দু-পায়ের ফাঁকে ভাইকে আটকিয়ে হুকুম দিত ‘চলো’। আমাদের চোখ তখন ঢুলুঢুলু। 

একটা কাঁসার থালায় লম্বা চৌকো গোল সব মিষ্টি নিমকি সাজিয়ে ভাগ করা শুরু করতো দিদা। বাবা তৈরি হয়ে বারান্দায়। মা’ও। আবার রিক্সা। তারপর সাতাশ নম্বর ট্রাম না থাকলে ট্যাক্সি। অন্ধকার রাস্তা দিয়ে ঝিমনো আলো পেরিয়ে বেহালা। মায়ের ধাক্কায় ঘুম ভাঙতো।

সাতাশ নম্বর ট্রামকে লাইনশুদ্ধু উপড়ে নিয়ে চলে গেছে সময়। 

নববর্ষেরা আসে এখনও চৈত্রের পাতা ঝরার শেষে। বেহালা আর গড়িয়াহাটের মার্কেটে সেল, সেল করে গলা ফাটায় দোকানদার। 

মিষ্টির বাক্স আর ক্যালেন্ডার নিয়ে কেউ কি দাঁড়িয়ে থাকে আজো আমাদের অপেক্ষায়?

Post a Comment

0 Comments