জ্বলদর্চি

আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস/দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে

আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস

দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 

আজ ১৮ই মে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস। জাদুঘর কি, জাদুঘরের প্রয়োজনীয়তা কি এবং সমাজে এর গুরুত্বই বা কি আসুন,সব কিছুই জেনে নিই বিস্তারিতভাবে।
ইংরেজি 'Museum' শব্দটি গ্রিক শব্দ 'Mouseion' থেকে এসেছে, যার অর্থ 'মিউজেস' (শিল্প ও বিজ্ঞানের দেবী) বা বিদ্যার মন্দির,বাংলায় একে 'সংগ্রহশালা' বা 'আজব ঘর'ও বলা হয়ে থাকে।
জাদুঘর (Museum) হলো, এমন একটি প্রতিষ্ঠান বা স্থান যেখানে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, বৈজ্ঞানিক ও শৈল্পিক গুরুত্বসম্পন্ন নিদর্শনগুলো সংগ্রহ করে রাখা হয়, এর মূল কাজ হলো, মানবজাতি ও প্রকৃতির ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা এবং তা জনসাধারণের শিক্ষা ও বিনোদনের জন্য প্রদর্শন করা।
প্রতি বছর ১৮ই মে বিশ্বব্যাপী পালন করা হয়। এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো, জাদুঘরের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এবং ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে জাদুঘরের ভূমিকা তুলে ধরা। ১৯৭৭ সালে International Council of Museums (ICOM) এই দিবস পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এরপর থেকে বিশ্বের বহু দেশ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটি উদযাপন করে আসছে।
🍂
পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত ও উল্লেখযোগ্য কয়েকটি জাদুঘর হলো ,
ল্যুভর মিউজিয়াম (Musée du Louvre) – প্যারিস, ফ্রান্স: বিশ্বের বৃহত্তম ও সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পকলা জাদুঘর। এখানে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির বিখ্যাত 'মোনালিসা' চিত্রকর্মটি সংরক্ষিত আছে।
ব্রিটিশ মিউজিয়াম (British Museum) – লন্ডন, যুক্তরাজ্য: মানব ইতিহাস, শিল্প এবং সংস্কৃতির বিশাল সংগ্রহশালা।

মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অফ আর্ট (The Metropolitan Museum of Art) – নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র: পশ্চিমা গোলার্ধের বৃহত্তম শিল্পকলা জাদুঘর।
স্টেট হার্মিটেজ মিউজিয়াম (State Hermitage Museum) – সেন্ট পিটার্সবার্গ, রাশিয়া: বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম শিল্প ও সংস্কৃতির জাদুঘর।
ভ্যাটিকান মিউজিয়াম (Vatican Museums) – ভ্যাটিকান সিটি, রোম: ক্যাথলিক চার্চের মালিকানাধীন ও বিখ্যাত শিল্পকর্মের এক বিশাল সংগ্রহ।
জাদুঘর একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিল্প, বিজ্ঞান ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ ভান্ডার। প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, শিল্পকর্ম, পুরাতাত্ত্বিক আবিষ্কার কিংবা বিজ্ঞানভিত্তিক সংগ্রহ সবকিছুই জাদুঘরে সংরক্ষিত থাকে। এগুলো শুধু অতীতের স্মৃতি বহন করে না,বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিজেদের শিকড় সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে।
আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবসের প্রতিপাদ্য প্রতি বছর ভিন্ন হয়। বর্তমান বিশ্বের পরিবর্তন, প্রযুক্তি, শিক্ষা, পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে জাদুঘরের সম্পর্ককে সামনে রেখে প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়। এর মাধ্যমে মানুষকে বোঝানো হয় যে, জাদুঘর কেবল পুরোনো জিনিসের প্রদর্শনী নয়,এটি শিক্ষা, গবেষণা ও সংস্কৃতি চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
বর্তমান যুগে প্রযুক্তির ব্যবহারে জাদুঘরের কার্যক্রম আরও আধুনিক হয়েছে। অনেক জাদুঘরে ডিজিটাল প্রদর্শনী, ভার্চুয়াল ট্যুর ও অনলাইন আর্কাইভ চালু হয়েছে। ফলে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে মানুষ ঘরে বসেই বিভিন্ন জাদুঘরের সংগ্রহ দেখতে পারছে। এতে ইতিহাস ও সংস্কৃতির জ্ঞান আরও সহজলভ্য হয়েছে।
তবে অনেক জাদুঘর নানা সমস্যার মুখোমুখি। অর্থের অভাব, সংরক্ষণের দুর্বল ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত প্রচারের অভাব এবং মানুষের অনাগ্রহের কারণে অনেক মূল্যবান নিদর্শন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাই সরকার ও সমাজের সকল স্তরের মানুষকে জাদুঘর রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করাও দরকার।
আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষা করা একটি জাতির দায়িত্ব। জাদুঘর শুধু অতীতকে সংরক্ষণ করে না, এটি বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করে। তাই আমাদের উচিত জাদুঘরের গুরুত্ব উপলব্ধি করা এবং এগুলোর উন্নয়ন ও সংরক্ষণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা।

Post a Comment

0 Comments