আবীর ভট্টাচার্য্য চক্রবর্তী
একটি জীব-জন্মের জন্য যেমন প্রয়োজন উপযুক্ত পরিবেশ—জল, হাওয়া, মাটি ও আলো, তেমনই একটি মানুষের জন্ম ও বিকাশও গভীরভাবে নির্ভর করে তার পারিপার্শ্বিক প্রকৃতি, সমাজ ও সময়ের সমীক্ষায়। একটি মানুষের জীবন তাই কখনোই একক বা সবিশেষ নয়; তার প্রতিটি অনুভব,জীবন-অর্জন এবং জীবনভর সৃষ্টির মধ্যে অনুরণিত হয় তার যুগ বা সময়ের স্পন্দন। সুতরাং একটি জীবন বীক্ষণের অর্থ শুধু সেই জীবন বা ব্যক্তিত্বটিকেই পর্যবেক্ষণ নয়, বরং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা যুগটিকেও পুনরায় আলোয় ফিরে পাওয়া।
১৯২১ সালের ২ মে, এমনই এক নিদাঘতপ্ত বৈশাখে, বাংলার মননে জাগরণে ভাসছে যখন স্বাধীনতাকামী মনোবিকাশের অপরূপ সৃজনস্পন্দন— আবোল-তাবোলের কৌতুকছন্দ, রবীন্দ্রনাথের ভূবনপ্লাবী সুরমাধুরী, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তুলির সৌকর্য; মায়ের গলার গান এবং সর্বোপরি উনবিংশ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ নবজাগরণের অপরূপ আবেগ,দূরে-বহুদূরে এক নিঃসঙ্গ প্রকৃতিপ্রেমিক ধীরে ধীরে প্রস্তুত হচ্ছেন আগামীর কোন উত্তর সাধকের জন্য পথদেবতার অমোঘ ভাষ্য চিত্রায়িত করার…,
কলকাতার বিখ্যাত রায়চৌধুরী পরিবারে সেই সন্ধিক্ষণেই হয়তো জন্ম নিলেন এক যুগন্ধর প্রতিভা, পরবর্তীকালে যিনি তাঁর একান্ত ভারতীয় রুচিসৌষ্ঠবটিকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবেন নিজস্ব আঙ্গিকে,রচিত হবে এক নতুন ইতিহাস, পিতৃদত্ত নাম দেওয়া হবে তাঁর সত্যজিৎ।
বিখ্যাত পরিবারের ঐতিহ্য যেন জন্ম-মুহুর্ত থেকেই তাঁর সত্তায় মিশেছিল। পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছিলেন বাংলা শিশু-সাহিত্যের এক উজ্জ্বল দিকপাল, সাবলীল বাংলা রচনার নিপুণ গদ্যকার,চিত্রকর এবং প্রকাশক। পিতা সুকুমার রায় তাঁর অভিনব রসবোধ ও কল্পনাশক্তির জাদুতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে দিয়ে গিয়েছেন এক চিরকালীন অজর অভিনবত্ব।
লীলা মজুমদার,সুখলতা রাও,স্বামী রামানন্দ ভারতী …এবং আরও অনেকের নামই থাকতে পারে এই তালিকায়।
তবু এহেন পারিবারিক ঋদ্ধির মাঝেও বাবা-মায়ের একমাত্র এই আদর-সন্তানটির জীবনে, শৈশবের সূচনালগ্নেই নেমে আসে ব্যক্তিগত শোকের ছায়া—অতি অল্প বয়সেই পিতৃহীন হয়ে পড়েন সত্যজিৎ। ফলত চারপাশের আত্মীয় ও বন্ধুবেষ্টনীর মধ্যেও একলা মায়ের স্নেহ, সংগ্রাম ও একাগ্রতায় গড়ে ওঠে তাঁর অনমনীয় ব্যক্তিত্ব, যা পরবর্তীকালে তাঁকে করে তোলে গভীর সংবেদনশীল ও নিবিড় জীবনদ্রষ্টা।
শিক্ষাজীবনের প্রাথমিক পাঠ শুরু হয়েছিল কলকাতার বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে। পরবর্তী উচ্চশিক্ষা প্রেসিডেন্সি কলেজে অর্থনীতি বিষয়ে।তবু তাঁর সৃষ্টিশীল মন সবসময়েই আকৃষ্ট ছিল শিল্প,সাহিত্য ও সংগীতের তন্নিষ্ঠ অনুশীলনে। এবং এই অন্তরতম গহন টানই স্রোতের উজান যাত্রায় তাঁকে নিয়ে যায় শান্তিনিকেতনের মুক্ত শিক্ষাঙ্গনে, যেখানে তিনি পরিচিত হন রবীন্দ্রনাথ নামের এক হিমালয় সদৃশ স্হিতধি প্রজ্ঞা এবং প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের মিলিত শিল্পধারার সঙ্গে। নন্দলাল বসু ও বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের নিবিড় সান্নিধ্যে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ও শিল্পচেতনা হয়ে ওঠে আরও উন্নত এবং সূক্ষ্ম।
একটা সময় পরে, উপার্জনের প্রয়োজনে কলকাতায় ফিরে বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী সংস্থা, বিশেষত 'ডিজে কিমার' নামের বিখ্যাত ব্রিটিশ বিজ্ঞাপনী সংস্থায় ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট হিসেবে পেশা-প্রবেশের পাশাপাশি বিভিন্ন বইয়ের প্রচ্ছদ অঙ্কন ও গ্রাফিক ডিজাইনে নিজস্ব সৃষ্টির আনন্দস্বাক্ষর রাখতে শুরু করেন। এই সময়েই হয়তো তাঁর পরিচয় ঘটে বিশ্ব চলচ্চিত্রের সঙ্গে, বিশেষত ইতালীয় নব্য-বাস্তবতার ধারা এবং হলিউডের চেতনা বিকাশের ধারনা তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করে।
শিল্পের প্রতি তাঁর বহুমাত্রিক অনুরাগ তাঁকে এক নতুন কর্মসংস্থানের সন্ধান দেয়—তিনি মন দেন চলচ্চিত্র নির্মাণে।
🍂
তবে গতানুগতিক চলচ্চিত্র নয়,তথাকথিত বিনোদনের গন্ডী ডিঙিয়ে স্বপ্ন দেখেন এমন একটি ছবির,যেখানে গ্রামবাংলার সহজিয়া জীবন, চুড়ান্ত দারিদ্র্যের মধ্যেও জাগরুক প্রকৃতিবিলাস এবং মানবিকতার দীপ্তি ফুটে ওঠে অসামান্য সংবেদনশীলতায়। তথাকথিত মূলধারার নয়,তাই প্রাথমিকভাবে পরিবেশকের অভাব হলেও ১৯৫৫ সালে তৎকালীন রাজ্য সরকারের সহায়তায় তাঁর সেই স্বপ্নযাত্রা সার্থক হয়।জন্ম হয় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচনা অবলম্বনে “পথের পাঁচালী”; আধুনিক ভারতীয় চলচ্চিত্রের যা এক গৌরবোজ্জ্বল স্মারক।
বিশ্বের তাবৎ শিল্পপ্রেমী মানুষ ভূমিষ্ট লগ্ন থেকেই এই ব্যতিক্রমী সিনেমাটির অভিনবত্বে মুগ্ধ হয়ে অকুন্ঠ প্রসংশায় ভরিয়ে দেন। এবং এটি সেই বছরের Cannes Film Festival-এ ‘Best Human Document’ পুরস্কার লাভ করে।আর থামতে হয়নি।
মহাসমারোহে এগিয়ে চলে বিজয়রথ—অপু-ট্রিলজি, চারুলতা, মহানগর,জলসাঘর, কাঞ্চনজঙ্ঘা,ঘরে-বাইরে, আগন্তুক, শাখাপ্রশাখা...।দূর থেকে বহুদূরে বিস্তৃত হয় একটি মধ্যবিত্ত বাঙালি সত্তার অতিপ্রাকৃত দিব্যময়তা।
ছোটদের জন্যও তাঁর হাতে তৈরি হয় “গুপী গায়েন বাঘা বায়েন”এবং ফেলুদা-সিরিজের অনবদ্য সব সিনেমা যা
সম্পুর্ন রূপে ভারতীয় হয়েও আন্তর্জাতিকতায় সম্পৃক্ত।
ক্রমান্বয়ে,তাঁর সৃষ্ট প্রতিটি চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে সংবেদনশীল জীবনের গভীরতম সত্যপ্রতিষ্ঠার এক অমোঘ শিল্পভাষা। দেশভাগের ফলে উদ্বাস্তু জীবনের অসহায়তা,যুগযন্ত্রনার হাহাকার, সমাজের আবিলতা, মধ্যবিত্তের আশা-নিরাশা ও মূল্যবোধের দোলাচল, মনস্তাত্ত্বিক ব্যাকুলতা,অধরা স্বপ্নের সন্ধানে অনন্ত সংগ্রাম এবং সেখান থেকে উত্তরণের প্রতিচ্ছবি।
এর পাশাপাশি শিশু ও কিশোর সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রেও তাঁর পারদর্শিতা দেখি মনোরম রহস্যময়তা এবং সহজ কথায় গভীর ভাবপ্রকাশের দক্ষতায়(ফেলুদা, প্রফেসর শঙ্কু,তারিণী খুড়ো)।এছাড়াও চিত্রনাট্য রচনার অনুপুঙ্খতায়, সঙ্গীত পরিচালনার দক্ষতায়, ক্যামেরার চোখ দিয়ে পরাবাস্তবতার সার্থক রূপায়ণে এবং অভিনব আঙ্গিকে ক্যালিগ্রাফি সৃষ্টিতেও তাঁর প্রতিভার অনন্য সাক্ষর জনমানসে স্বীকৃতি পায়।”সন্দেশ” পত্রিকার পুনর্জাগরণেও তাঁর ভূমিকা উল্লেখের দাবী রাখে।
ফুল ফোটার মতো প্রতিভাবিকাশের স্তরে স্তরে বহু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারেও তিনি সম্মানিত হন।
১৯৯২ সালে জাতীয় ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান “ভারতরত্ন” পুরস্কার এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে Academy Honorary Award (অস্কার সম্মানসূচক পুরস্কার) লাভ করেন, যা ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক গৌরবময় মুহূর্ত রচনা করে।
১৯৯২ সালের ২৩শে এপ্রিল তাঁর মরজীবনের অবসান হয়, কিন্তু তাঁর জীবনকৃত্য এবং জীবন-অর্জন আজও আমাদের চেতনার গভীরে ঝঙ্কার তোলে।
কতো সিনেমাই তো দেখি প্রতিদিন,তবু দার্জিলিঙের কুয়াশা ঘেরা পথের বাঁকে, পার্থিব বিত্তসুখের আড়ালে একটি নায়কের গোপন একাকীত্বে তলিয়ে যাওয়ায় দৃশ্য নির্মানে অথবা হঠাৎ আসা আগন্তুকের পরিচয় স্বীকৃতির দ্বিধাময়তায় অনুজের সংকোচে এখনও সেই এক এবং একমাত্র সত্যজিৎকেই মনে পড়ে কেন!
“শিল্পের জন্য শিল্প নয়, শিল্পের প্রয়োজন জীবনের জন্য”-আধুনিক শিল্প চেতনার এই ধারা প্রকৃত অর্থে সত্যজিতের সৃষ্টিশীলতার চাবিকাঠি,যার শুরু হয়েছিল পারিবারিক ভাবেই। এবং বহুমাত্রিক প্রতিভার আধার হয়ে তিনি তাঁর সেই ঋদ্ধ চেতনা শিল্পের প্রতিটি ক্ষেত্রে রোপন করে ভবিষ্যৎকে নতুন কর্মপথের দিশা দেখিয়েছেন। এই যে আজ ঋতুপর্ণ ঘোষ,অঞ্জন দত্ত, নাসিরউদ্দিন শাহ,আদূর গোপালকৃষ্ণন,শাহ্জি করুণ,গৌতম ঘোষ,জাহ্নু বরুয়াদের নাম এবং কাজ দেখে আমরা অনুপ্রেরণা পাচ্ছি,তার হোতা ছিলেন সত্যজিৎ।তাঁর প্রতিটি কর্মকান্ডের নিখুঁত নির্মাণ এবং সজ্জাবিন্যাস হয়ে উঠেছে মানবজীবনের গভীর উপলব্ধির এক অনন্য দলিল।
তাই বলা যেতে পারে,বাংলা তথা ভারতীয় সুস্থ সংস্কৃতি যতদিন সগৌরবে তার ডালপালা মেলে রাখবে, ততদিন সত্যজিৎ রায় তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে অমর হয়ে থাকবেন। শুধু একজন মহাপ্রতিভাবান চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে তাঁকে মুগ্ধতার অঞ্জলী দান নয়; তাঁর জীবন পাঠের উপযোগিতা হোক বরং তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে এক সম্পূর্ণ সময়, সমসাময়িক সংস্কৃতি এবং এক ঋদ্ধ মানবিক চেতনার গভীরে প্রবেশ করা; বর্তমান দ্বন্দ্ব সংঘাত মুখর পরিবেশে যা অ্যালবাট্রসের মুক্তিপাখার ইশারায় সংস্কৃতিকে অনন্ত উড়াল দেবে,তাকে পুষ্ট করবে ভগীরথের অমৃত ঐশ্বর্যে, এই প্রত্যাশায়।
0 Comments