জ্বলদর্চি

অনন্ত সৃজনের জলছবি/দেবার্ঘ্য ঘোষ


অনন্ত সৃজনের জলছবি

দেবার্ঘ্য ঘোষ

বাঙালির মননলোকে তিনি এঁকেছেন জীবনের জলছবি।
তাঁর সৃষ্টির শিকড় মাটির গভীরে প্রোথিত, আর শাখা-প্রশাখা বিশ্বজনীন আকাশের নীলিমা স্পর্শ করেছে। সত্যজিৎ রায় কেবল একজন চলচ্চিত্রকার বা চিত্রনাট্যকার ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে স্রষ্টা এবং পর্যবেক্ষক। আগামী ২ মে তাঁর জন্মদিনকে সামনে রেখে যখন আমরা তাঁকে স্মরণ করি, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক দীর্ঘকায় মানুষের অবয়ব, যাঁর হাতে ধরা কলম আর ক্যামেরার লেন্স আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে জগতকে নতুন করে দেখতে হয়।

সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল যে হাত ধরে, তা হলো ‘অপু-দুর্গা’। বিভূতিভূষণের সাহিত্যকে তিনি যখন রুপোলি পর্দায় নিয়ে এলেন, তখন বিশ্ববাসী দেখল বাংলার নিভৃত এক পল্লীর ধুলোমাখা পথও কতটা কাব্যিক হতে পারে। অপুর বেড়ে ওঠা কেবল দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই নয়, বরং তা ছিল প্রকৃতির সঙ্গে এক অবিচ্ছেদ্য মিতালি। কাশবনের মধ্য দিয়ে ট্রেনের বাঁশি শোনার জন্য দৌড় দেওয়া, কিংবা বৃষ্টির দিনে দুবলা ঘাসের ওপর দিয়ে খালি পায়ে হেঁটে যাওয়া—অপু ও দুর্গার মধ্য দিয়ে সত্যজিৎ শিখিয়েছিলেন যে শিশুমন আর প্রকৃতি সমার্থক।
🍂
আজকের যান্ত্রিক যুগে যখন শিশুরা কংক্রিটের জঙ্গলে বন্দি, তখন সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালী’ আমাদের মনে করিয়ে দেয় পরিবেশ ও শিশুর সম্পর্কের কথা। তাঁর প্রতিটি ফ্রেমে গাছপালা, পুকুরঘাট এবং ঋতুর বদল একটি চরিত্র হিসেবে উপস্থিত থাকত। অপু কেবল একটি চরিত্র নয়, অপু হলো প্রকৃতির সেই সন্তান যে প্রতিটি ছোট ছোট বিস্ময়ের মধ্যে জীবনের সার্থকতা খুঁজে পায়।

 ফেলুদা, তোপসে ও মুকুল:

ছোটদের (এবং বড়দেরও) কাছে সত্যজিৎ মানেই ফেলুদা। তোপসে আর জটায়ুকে নিয়ে প্রদোষ চন্দ্র মিত্রের জয়যাত্রা বাঙালির কিশোরবেলার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফেলুদা কেবল অপরাধীকে ধরা নয়, বরং আমাদের শিখিয়েছে ‘মগজাস্ত্রের’ ব্যবহার। সত্যজিৎ যখন ফেলুদাকে নির্মাণ করেন, তিনি বাঙালির গোয়েন্দা সত্তার মধ্যে এক অদ্ভুত আভিজাত্য এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন।
তোপসের চোখে আমরা ফেলুদাকে দেখি। তোপসে হল সেই আদর্শ কিশোর, যে কৌতূহলী এবং শ্রদ্ধাশীল। আবার ‘সোনার কেল্লা’ ছবিতে মুকুল চরিত্রটির মাধ্যমে তিনি যে মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা দেখিয়েছেন, তা অতুলনীয়। রাজস্থানের তপ্ত মরুভূমি আর কেল্লার অলিগলিতে জাতিস্মর মুকুলের যাত্রা কেবল এক কিশোরের গল্প নয়, এটি আমাদের চেতনার গভীরে লুকিয়ে থাকা এক রহস্যের সন্ধান। মুকুল আমাদের শেখায় যে শিশুদের কল্পনাশক্তি কোনো সীমানা মানে না; তাদের চোখে পাথরও কখনো সোনা হয়ে ধরা দেয়।

সমাজ ও শিশুর মনস্তত্ত্বকে মিলিয়ে দিয়ে সত্যজিৎ তৈরি করেছিলেন ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’। বাহ্যত এটি একটি রূপকথা বা ফ্যান্টাসি মনে হলেও, এর গভীরে ছিল যুদ্ধবিরোধী বার্তা এবং ক্ষমতার দম্ভের বিরুদ্ধে এক সূক্ষ্ম প্রতিবাদ। গুপি আর বাঘা যখন রাজার সামনে দাঁড়িয়ে গান গেয়ে যুদ্ধ থামিয়ে দেয়, তখন তা কেবল গান থাকে না—তা হয়ে ওঠে শুভবুদ্ধির জয়গান।

সত্যজিৎ বিশ্বাস করতেন, শিশুদের জন্য যা কিছু তৈরি করা হবে, তা যেন বড়দের বুদ্ধিবৃত্তিকে অবমাননা না করে। তিনি সমাজকে দেখতেন একজন সহমর্মী মানুষের চোখে। ‘হীরক রাজার দেশে’ ছবিতে তিনি যে রাজনৈতিক সচেতনতা আর স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন, তা আজও সমসাময়িক। শিশুদের জন্য তৈরি ছবির মোড়কে তিনি বড়দের জন্য রেখে গিয়েছিলেন সমাজ পরিবর্তনের গভীর মন্ত্র।

সত্যজিতের চলচ্চিত্র কেবল দৃশ্য নয়, তা শ্রুতিও বটে। নিজের ছবির আবহসংগীত নিজেই তৈরি করতেন তিনি। ‘সন্দেশ’ পত্রিকার জন্য তাঁর আঁকা অলংকরণ কিংবা তাঁর সৃষ্টি করা ‘রে রোমান’ ফন্ট আজও আমাদের শিল্পচেতনার অংশ। একজন সার্থক চিত্রশিল্পী হিসেবে তিনি জানতেন কম্পোজিশনের গুরুত্ব। তাঁর প্রতিটি স্কেচ এবং চলচ্চিত্রের ফ্রেম জ্যামিতিক নিখুঁততায় মোড়া থাকত।

শিশুদের জন্য তিনি যখন লিখতেন, তাঁর কলম হয়ে উঠত সহজ কিন্তু শক্তিশালী। তাঁর প্রতিটি লেখায় বা ছবিতে এক ধরনের স্বচ্ছতা ছিল। তিনি মনে করতেন, শিশুকে শিক্ষিত করার শ্রেষ্ঠ উপায় হলো তাকে আনন্দ দেওয়া। তাঁর সৃষ্টিতে কোনো উপদেশ ছিল না, ছিল কেবল অনুসন্ধিৎসার এক অবারিত পথ।

বর্তমান পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তন এবং সামাজিক অস্থিরতার মধ্যে দাঁড়িয়ে সত্যজিৎ রায়ের চিন্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি পরিবেশকে ভালবাসতে শিখিয়েছেন, সমাজকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছেন এবং শিশুদের মনের সারল্যকে আগলে রাখতে শিখিয়েছেন। সত্যজিৎ মানে কেবল সিনেমার সেলুলয়েড নয়; সত্যজিৎ মানে একটি সংস্কৃতি, একটি দৃষ্টিভঙ্গি।

আজ যখন আমরা তাঁকে স্মরণ করি, তখন বুঝতে পারি তাঁর প্রাসঙ্গিকতা কখনও ম্লান হবে না। কারণ অপু-দুর্গার সেই কাশবনের দৌড় কিংবা ফেলুদার মগজাস্ত্রের লড়াই আসলে মানুষের অনন্ত কৌতূহল আর অজেয় সাহসেরই প্রতীক। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন কীভাবে মাটির কাছাকাছি থেকেও আকাশের দিকে দৃষ্টি রাখা যায়।

সত্যজিৎ রায় আমাদের হৃদয়ে থেকে যাবেন তাঁর সৃজনশীলতার বহুমুখী ধারায়। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন যে জগতটা সুন্দর এবং রহস্যময়, আর সেই রহস্য উন্মোচনের চাবিকাঠি হলো আমাদের নিজস্ব কল্পনাশক্তি। অপু, দুর্গা, ফেলুদা, তোপসে, মুকুল কিংবা গুপি-বাঘা—এরা তো কেবল চরিত্র নয়, এরা আমাদেরই চেতনার এক একটি অংশ। এই মহান শিল্পীর প্রতি আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণাম, যাঁর হাত ধরে আমরা বিশ্বজগতকে চিনেছি অন্য এক আলোয়।

Post a Comment

0 Comments