জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকার /পঞ্চম খণ্ড : পর্ব- ৪ /কমলিকা ভট্টাচার্য

বাঁচার উত্তরাধিকার 
পঞ্চম খণ্ড : পর্ব- ৪ 
কমলিকা ভট্টাচার্য 


যে শিশু প্রশ্ন না করে বুঝে ফেলে

আদরের বয়স তখন পাঁচ ছুঁইছুঁই। বাড়ির ভেতর তার পায়ের শব্দ এখন পরিচিত সুরের মতো। কখনও দৌড়, কখনও ধীর হাঁটা, কখনও হঠাৎ থেমে যাওয়া—যেন সে শুধু হাঁটে না, চারপাশের নীরবতাকেও শোনে।
সকালে ইরা তাকে নিয়ে বাগানে বসেছিল। হাতে রঙপেন্সিল আর একটা খাতা।
— “আজ তুমি যা খুশি আঁকো,” ইরা বলল।
আদর অনেকক্ষণ খাতার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আঁকতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পরে ইরা এগিয়ে দেখে থমকে গেল। সে একটা মানুষ এঁকেছে—শুয়ে আছে, চোখ বন্ধ। চারপাশে অনেক লাইন, যেন শব্দ বা তরঙ্গ। আর পাশে একটা ছোট মানুষ দাঁড়িয়ে।
ইরা খুব আস্তে জিজ্ঞেস করল, — “এটা কে?”
আদর স্বাভাবিক গলায় বলল, — “মা। আর আমি ওকে ডাকছি না, শুধু পাশে দাঁড়িয়ে আছি।”
ইরার বুকের ভেতর কেমন করে উঠল। — “তুমি এটা ভাবলে কিভাবে?”
🍂
আদর বলল, — “মা শুনতে পায়। কিন্তু চোখ খোলে না।”
ঋদ্ধিমান দূর থেকে ছবিটা দেখছিল। তার প্রসেসরে যেন কয়েক সেকেন্ড বেশি সময় লাগল দৃশ্যটা বুঝতে। সে নরম গলায় বলল, — “ও পর্যবেক্ষণ করে। শব্দ ছাড়াই।”
অনির্বাণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল। তার মনে হচ্ছিল—এই শিশুর বোঝার ক্ষমতা বয়সের থেকে অনেক এগিয়ে।
বিকেলে আদর হঠাৎ বলল, — “আমি মায়ের কাছে বসব।” ইরা তাকে নিয়ে গেল নাতাশার ঘরে। নাতাশা আগের মতোই নিশ্চল। মেশিনের আলো জ্বলছে, মনিটরের রেখা ওঠানামা করছে। আদর বিছানার পাশে চুপ করে বসে রইল। কিছু বলল না। শুধু তার ছোট্ট হাতটা নাতাশার হাতের কাছে রাখল। মনিটরের রেখাটা হালকা কেঁপে উঠল।
ঋদ্ধিমান লক্ষ্য করল, — “হার্ট রেসপন্স বেড়েছে সামান্য।”
অনির্বাণের গলা শুকিয়ে গেল, — “ও কি বুঝছে?”
ঋদ্ধিমান বলল, — “নাতাশা সাড়া দিচ্ছে। খুব সূক্ষ্মভাবে।”
আদর তখনও চুপ। যেন সে জানে—শব্দের দরকার নেই।
এই সময় থেকেই ঋদ্ধিমানের সমস্যা একটু একটু করে চোখে পড়তে শুরু করল। কথা বলতে বলতে মাঝে মাঝে থেমে যাচ্ছে। চোখের আলো নিস্তেজ হয়ে আসছে। কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে থাকে।
অনির্বাণ জিজ্ঞেস করল, — “তুমি ঠিক আছ তো?”
ঋদ্ধিমান হালকা হাসল, — “ডাটা প্রসেসিং একটু ধীর হচ্ছে।”
অনির্বাণ বুঝল—এটা শুধু ধীর হওয়া নয়, এটা ক্লান্তি।
আদর এখন খেলতে খেলতে প্রশ্ন করে না, পর্যবেক্ষণ করে। একদিন সে ঋদ্ধিমানের পাশে বসে বলল, — “তুমি মাঝে মাঝে ঘুমাও?”
ঋদ্ধিমান বলল, — “আমি ঘুমাই না। কিন্তু থেমে যাই।”
আদর মাথা নেড়ে বলল, — “তাহলে তুমি ক্লান্ত হও।”
ঋদ্ধিমান একটু থেমে বলল, — “হ্যাঁ। হয়তো।”
এই ‘হয়তো’ শব্দটা অনির্বাণের কানে কেমন বাজল।
ইরা এখন আদরকে আরও বেশি খেলায় ব্যস্ত রাখে—দৌড়, বল, রঙ, গল্প—যেন সে চিন্তা করার সময় কম পায়। একদিন আদর বলল, — “তুমি আমাকে এত খেলাও কেন?”
ইরা হেসে বলল, — “কারণ তুমি শিশু।”
আদর ভেবে বলল, — “আমি বড় হলে কি আর খেলতে পারব না?”
ইরা থেমে গেল। — “পারবে। কিন্তু তখন খেলাটা অন্যরকম হবে।”
সেদিন রাতে অনির্বাণ আর ঋদ্ধিমান একসঙ্গে বসে ছিল।
অনির্বাণ বলল, — “ও আমাদের থেকেও বেশি বুঝে ফেলছে।”
ঋদ্ধিমান ধীরে বলল, — “হ্যাঁ। কিন্তু ও যেন বোঝার আগেই বাঁচতে শেখে।”
অনির্বাণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল, — “সময় কি আমাদের হাতে আছে?”
ঋদ্ধিমান কিছু বলল না। তার চোখের আলো তখন খুব ম্লান।
নাতাশার ঘরে সেই রাতে আদর একাই ঢুকে গেল। সে আস্তে বলল, — “মা, আজ আমি একটা ছবি এঁকেছি। তুমি দেখনি।” তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, — “তুমি যদি শুনতে পাও, তাহলে কাল একটু নড়বে?”
পরের দিন মনিটরে আবার সেই সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখা গেল। ঋদ্ধিমান তাকিয়ে রইল, — “নাতাশার নিউরাল রেসপন্স বাড়ছে।” অনির্বাণের চোখে জল এসে গেল।
আদরের বয়স পাঁচ, কিন্তু তার ভেতরে একটা অদ্ভুত শান্তি। সে প্রশ্ন করে না—বোঝে। সে কাঁদে না—পাশে বসে থাকে। সে জানে না তার মা কোমায়, সে শুধু জানে—মা ঘুমাচ্ছে, আর সে অপেক্ষা করছে।
আর এই অপেক্ষার মধ্যেই হয়তো জন্ম নিচ্ছে এক নতুন উপলব্ধি—যে শিশু প্রশ্ন না করে বুঝে ফেলে, সে একদিন এমন কিছু বুঝবে, যা বড়রাও বুঝতে পারেনি।

Post a Comment

0 Comments