জ্বলদর্চি

দর্শনের আলোকে সপ্তদশ পর্ব (শূন্যতা বনাম পূর্ণতা )/স্বাতী ভৌমিক

দর্শনের আলোকে 
সপ্তদশ পর্ব ( শূন্যতা বনাম পূর্ণতা )

স্বাতী ভৌমিক 


 জড়জগতে জীবের সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষার অলক্ষিত মূল উদ্দেশ্য হলো পূর্ণতালাভ। নিজেকে পূর্ণরূপে উপলব্ধি করার উদ্দেশ্যে জীবের তথা ব্যক্তির অবিরাম গতিময়তা। কিন্তু পূর্ণতার উপলব্ধি হয় ক'জনের! বাস্তবে দেখা যায় যে ধনী, সে গরিবের থেকেও বেশি আকাঙ্ক্ষী।

 পূর্ণতার নঞর্থক অর্থ বলা যেতে পারে, খালি না থাকা। আমরা খালি না থাকা তো তাকেই বলতে পারি,যেখানে শূন্যস্থান পূরণের জন্য অন্য কিছুর অপেক্ষা থাকে না। এখন প্রশ্ন হলো,এরকম পূর্ণতা কি সাধারণ ব্যক্তির পক্ষে- বলা ভালো, সাংসারিক ব্যক্তির পক্ষে লাভ করা সম্ভব? 

 উত্তরে বলা যায়- সম্ভব। তবে ব্যাপারটা আমার মতে একটু অন্যরকম। শূন্যতা ও পূর্ণতা আপাতদৃষ্টিতে একদম বিপরীত মনে হলেও আমার মনে হয়- যে যত বেশি শূন্যতার উপলব্ধি করতে পারে, সে তত বেশি পূর্ণতারও উপলব্ধি করতে পারে। 

 একটু ব্যাখ্যা করে বলা যায়, জগৎটা হলো বৈপরীত্যের খেলা। কোন কিছু চাওয়া তার অভাবকে সূচিত করে। দেখা যায়, সুখ চাইলে দুঃখ আসে আর যেখানে দুঃখ বেশি বলে মনে হয়, সেখানে মানুষ অবলীলাক্রমে দৃশ্যমান দুঃখের অন্তরালে কি করে যে সুখী থাকতে শিখে যায়-যা খুবই আশ্চর্যজনক মনে হয়।

 শূন্যতার অনুভূতি আসলে শূন্যতা নয়,পূর্ণতার সূচক। এই শূন্যতা এক অর্থে আকাঙ্ক্ষা শূন্যতা-ব্যাখ্যাশূন্যতা- জীবনটা ঠিক যেমন জীবনকে ঠিক সেই ভাবেই দেখা। কোন জিনিসকে ব্যাখ্যা করা মানে দীর্ঘায়িত করা। বাস্তব কোন ব্যাখ্যার উপর নির্ভরশীল নয়। Fact বা ঘটনা চলমান। ঘটনার ব্যাখ্যা প্রদানের মাধ্যমে আমরা সুখ-দুঃখ, হতাশা- আনন্দ, ভালো-মন্দ এসব আগন্তুক বিষয়গুলোর অবতারণা করি।  
🍂
 শূন্য মানে-যেখানে স্থিরতা থাকে, ঘটনা যেমন সেই ভাবেই গ্রহণের শক্তি থাকে, ক্ষমা থাকে,সহিষ্ণুতা থাকে। জগতে চরমভাবে ঠিক বা চরমভাবে ভালো বলে আদৌ কিছু থাকে কী! যদি থেকে থাকে তাহলে এত মতবিরোধ কেন! ঠিক- ভুল প্রমাণের এতো তাগিদ কেন!ব্যক্তিভেদে ঠিক ভুলের মানদন্ড আলাদা হয়ে যায়- এটাই বা হয় কী করে! প্রকৃতি জগতে তো এরকম হয়না। কারণ ওখানে ব্যাখ্যা করার মতো- সমর্থক বা বিরোধী ভাবার মতো জায়গা থাকে না। প্রকৃতিতে যা ঘটে আমাদের হয় তা মেনে নিতে হয়,অথবা যদি বদলানোর কোন ব্যাপার থাকে তো স্বীয় স্বীয় ক্রিয়া- কর্ম বদলে ফেলতে হয়। এটাই কৃত্রিম মানব সভ্যতা ও প্রকৃতির মধ্যে পার্থক্য।

 মানুষ ঘটমান ঘটনাগুলোর ব্যাখ্যা খুঁজে ফেরে। ঘটনাগুলোর মূলকে তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী পরিচালিত করার চেষ্টা করে। আসল বক্তব্য বিষয় হলো, ঘটনাকে ঘটনার মত নিয়ে তার মধ্যে অভিপ্রেত ব্যাখ্যা না খুঁজে শূন্য মনে পূর্ণতার উপলব্ধি করাই হলো আসল শান্তির অনুভব।

 এই শূন্যতার উপলব্ধি শুনতে খুব সহজ মনে হলেও, এর জন্য প্রয়োজন গভীর মনসংযোগ ও বাস্তববাদী চেতনার তথা দৃঢ় মনোভাবের-যা যথেষ্ট অভ্যাস ও সাধনালব্ধ বিষয়। তবে ইচ্ছে থাকলে সবই সম্ভব। জীবনে সুখ চেয়ে দুঃখের পথ প্রশস্ত করার থেকে, শূন্য মনে তথা নির্লিপ্ত মানসিকতা নিয়ে শান্তির পথে এগিয়ে যাওয়া বেশি করণীয় ব্যাপার হওয়া উচিত।

 তাই বলা যায়, শূন্যতা ও পূর্ণতা বিপরীত নয় বরঞ্চ এদের মধ্যে একটা নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। যে সম্পর্ক হলো সামঞ্জস্যবিধানের ও মননের সম্পর্ক। শূন্যতা নিছক শূন্য নয় পরিপূর্ণতার পূর্ণ সম্ভাবনা থাকে শূন্যতার মাঝে ----
      রহস্যময় এই বিশ্বের
      কতটুকুই বা জানি!
   ভাবি যখনই কিছু বুঝেছি......
 জীবন তখন বোঝায়......বোঝার এখনো বাকি অনেক খানি।
 দেখার থেকে অদেখা জগত,
        বৃহৎ- অনেক বৃহৎ।
    বলার থেকে না বলা কথাই,
   কখনো হয় বেশি মহৎ।
   পূর্ণ যখনই ভাবি কিছু,
         শূন্যতা দেখি তায়-
  শূন্যতা যখন বুঝি, ঠিক তখনই-
       জীবন পূর্ণতা পায়।।

 জড় জগতে বিষয় অনন্ত। মানব মন কখন কোন বিষয়ের প্রতি মনোযোগী হয় তার কোন নিশ্চয়তা আছে! আর যে বিষয়ের প্রতি আসক্তির কারণে সেই বিষয়ের অনুপস্থিতিতে শূন্যতার উপলব্ধি হয়, সময়ের প্রবহমানতার স্রোতে একদিন সেই শূন্যতার উপলব্ধি অন্তর্হিত হয়ে যায়। জীবনের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোতে আমাদের ইচ্ছের ভূমিকা থাকে কতটুকু! অনেক বিষয়ই এমন থাকে যা আমাদের নিরুপায় ভাবে মেনে নিতে হয়। ভাগ্য বলে মনকে সান্ত্বনা দিতে হয়। তাহলে শুধু শুধু যেখানে কিছু করার থাকে না, সেখানে শূন্যতাকে দুঃখের পরিভাষা না করে, স্থিরতার পরিভাষা করে দিলে তো সমস্যা অনেক হালকা হয়ে যায়। সেখানে শূন্যতা মানে অজানা এক স্থিতিশীলতা,যা ঘটে যাওয়া ঘটনার দর্শকসুলভ মানসিক চেতনার উৎসস্বরূপ।যেখানে কিছু করার থাকে না,সেখানে অযথা ব্যাখ্যা না খুঁজে, মনকে দুঃখ- সুখের চিন্তারূপ নৌকোয় না ভাসিয়ে, শান্ত-নির্বিকার দৃষ্টিতে ঘটনার প্রবহমানতাকে নিরীক্ষণ করাই হলো পূর্ণতার প্রতিফলন।

 জীবনে কর্মময় থাকাটা খুব জরুরী। প্রকৃতিজগতে যেহেতু কোন অতিরঞ্জনের জায়গা নেই, ব্যাখ্যার জায়গা নেই, তাই প্রকৃতিতে একরূপতা দেখা যায়। প্রকৃতি সমঅবস্থায় সম আচরণই করে। তাই প্রকৃতির রূপরেখায় বিস্ময়ের মধ্যেও নিশ্চয়তা থাকে। কিন্তু মানবসভ্যতা আলাদা। মানবের ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা আছে, মননের মান্যতার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে জীবনের গতিবিধি। তাই ব্যক্তি ভেদে সমঅবস্থায় সমআচরণ হয় না। আচরণের পার্থক্য থাকে। কারণ ভাবনার- ব্যাখ্যা প্রদান ক্ষমতার পার্থক্য থাকে। এই ব্যাপারটা স্বাভাবিক। কোন কিছু স্বীয় ভাবনামতো না হলেই অন্য ব্যক্তির ভাবনার ঠিক- ভুল বা সেই সাপেক্ষে নিজ ভাবনার ঠিক- ভুল বিচারের টালমাটাল অবস্থায়, ব্যক্তি অনেক সময়ই বেসামাল হয়ে পড়ে। এই ক্ষেত্রে শূন্য অর্থাৎ স্থিরচিত্তে দর্শকের ভূমিকায় নিজেকে রেখে যদি এই সকল বিষয় অনুধাবন করার প্রচেষ্টা করা যায়, তাহলে এই বেসামাল অবস্থাটা আসে না-কোন ঘটনা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় না- ঘটনা শুধুমাত্র ঘটনাই থাকে। কোন ঘটনাই মনের শান্তি খুব সহজে তখন আর বিঘ্নিত করতে পারে না।।

 ক্রমশঃ....

Post a Comment

0 Comments