জ্বলদর্চি

গুচ্ছ কবিতা/কমলিকা ভট্টাচার্য

গুচ্ছ কবিতা 
কমলিকা ভট্টাচার্য

বৃষ্টি ভেজা রাতে, দুই ঘর


বৃষ্টি ভেজা রাতে, দুই ঘর আলাদা আলোয় জেগে,
দু’জন মানুষ বসে থাকে—নিজ নিজ নীরবতার পাশে।
জানালার কাঁচে টুপটাপ শব্দ তোলে যে বৃষ্টি,
সে-ই কি গোপনে বয়ে আনে একে অপরের নাম?

দু’ঘরের মাঝখানে শহর ঘুমিয়ে পড়ে,
তবু মন দু’টি জেগে থাকে অদৃশ্য সেতুর ওপর।
কেউ কারও কাছে নয়, তবু অকারণে
হৃদয়ের ভেতর হালকা কম্পন ওঠে একই সঙ্গে।

হয়তো এই মুহূর্তেই তুমি পাশবালিশ জড়িয়ে বিছানায়,
আর আমি বইয়ের পাতায় আঙুল রেখে থেমে আছি—
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে সমান তালে,
ভেতরে পড়ছে অদেখা টান, নীরব অনুরাগ।

দূরে থেকেও কাছে থাকার যে অনুভব,
তার কোনো ঠিকানা নেই, কোনো ভাষা নেই—
শুধু বৃষ্টি ভেজা রাত জানে,
দুই ঘরবন্দি মানুষের মনের গোপন সেতুবন্ধন।


কথারা হারিয়ে গেলে

হঠাৎ মনে হচ্ছে
আমার কথারা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
যে কথারা একসময় ভিড় করত ঠোঁটের ধারে,
কলম ছুঁলেই ঝরে পড়ত কাগজের বুকে,
আজ তারা যেন দূরের কোনো অচেনা আকাশে উড়ে গেছে—
ডাকলেও আর ফিরে আসে না।

কবিতা লিখতে আর ভালো লাগে না।
শব্দগুলোকে সাজাতে গেলে
মনে হয়, তারা সবাই ক্লান্ত, অবসন্ন, অনিচ্ছুক—
ঠিক আমার মতোই।

চারপাশের মানুষগুলো কেমন
নিজের নিজের শর্তে আমাকে বেঁধে ফেলেছে।
কেউ সময়ের শর্তে,
কেউ সম্পর্কের শর্তে,
কেউ দায়িত্বের শর্তে,
কেউ প্রত্যাশার শর্তে।

শুধু আমার ভালোবাসাটাই ছিল শর্তহীন—
খোলা আকাশের মতো,
যেখানে আসা-যাওয়ার কোনো নিয়ম ছিল না,
ধরে রাখার কোনো জোর ছিল না।
হয়তো সেই জন্যই
কেউ তাতে বাঁধা পড়েনি কোনোদিন।

এখন আমি শুধু জীবনের শর্তটুকু মেনে চলি—
যা করতে হয় করি,
যা বলতে হয় বলি,
যেখানে থাকতে হয় থাকি।
নিজেকে আর কোথাও খুঁজে পাই না।

শুধু এক অদ্ভুত অপেক্ষা কাজ করে ভেতরে—
কিসের অপেক্ষা জানি না,
তবু অপেক্ষা।

হয়তো সেই দিনের,
যেদিন আমার কথার মতো
আমিও হারিয়ে যাব নিঃশব্দে,
কেউ টের পাবে না,
কেউ খুঁজবে না,
কেউ ডাকবে না নামে।
যেভাবে হারিয়ে গেছে আমার কথারা—
ঠিক সেভাবেই।


জলছাপ

তোমার ঐ চিন্তা মাখা মুখটা
আমার ভেতরের আকাশটাকে হঠাৎ মেঘলা করে দেয়।

দু’আঙুলে চোখের কোণ চেপে
যখন তুমি অশ্রুর নীরবতা লুকোও
আমি দূর থেকে সেই জলছাপ শুনতে পাই—
যেন শুকনো পাতার ওপর হঠাৎ বৃষ্টি পড়ছে।

তুমি মুখে কিছুই বলো না,
তবু তোমার নিঃশ্বাসের ভাঁজে ভাঁজে
দুঃখের অক্ষরগুলো স্পষ্ট হয়ে যায় আমার কাছে।
আমি ছুঁতে পারি তোমার নীরবতার কাঁপন,
অনুভব করি ভেতরে জমে থাকা অব্যক্ত ঝড়।

সেই মুহূর্তে বড় অসহায় লাগে নিজেকে—
তোমার কপালের ভাঁজে একটু শান্তি রাখতে না পারার অপরাধে
মনটা কুঁকড়ে যায়,
যেন দু’হাত বাড়িয়েও তোমাকে ছুঁতে পারছি না।

ইচ্ছে করে—
তোমার চোখের কোণে জমে থাকা সব ক্লান্তি
নিজের আঙুলে মুছে দিই,
তোমার মুখের চিন্তার রেখাগুলো
নিজের কপালে এঁকে নিই চুপচাপ।

তুমি বলো না,
তবু আমি জানি—
তোমার দুঃখ আমার ভেতরে এসে বাসা বাঁধে,
আর তোমার একটু স্বস্তির জন্য
আমার সমস্ত অস্থিরতা প্রার্থনা হয়ে ওঠে।


আস্তিক প্রেম

আমরা একে অপরকে দেখি না—
তবু দৃষ্টির ভিতরে এক নীরব দীপ জ্বলে।

আমরা কথা বলি না—
তবু নীরবতার কপালে জেগে থাকে উচ্চারণ।

আমরা শুনি না—
তবু হৃদয়ের গহীনে কারও পায়ের শব্দ বাজে।

আমরা স্পর্শ করি না—
তবু বাতাসের ভাঁজে ভাঁজে ত্বকের স্মৃতি রয়ে যায়।

চুম্বনের স্বাদ নিই না—
তবু ঠোঁটের কোণে লেগে থাকে অচেনা মধুর আভাস।

আমরা লিখি না একে অপরকে,
পড়িও না—
তবু দু’জনের অক্ষর মিলে যায় অদৃশ্য কোনো শাস্ত্রে।

এই প্রেম
কোনো সাক্ষাতের নয়,
কোনো উচ্চারণের নয়,
কোনো দেহের নয়—
এই প্রেম
ঠিক পূজার মতো—
যেখানে দেবতার মুখ দেখা যায় না,
তবু প্রদীপ নিভে গেলে মন কেঁপে ওঠে।

এই প্রেম
একতরফা অর্ঘের মতো—
যেখানে ফুল ঝরে পড়ে,
কিন্তু মন্দিরের দরজা কখনও খোলে না।

তবু আমি প্রেমে বড় আস্তিক—
কারণ না-দেখার মধ্যেই আমি সবচেয়ে স্পষ্ট দেখি,
না-পাওয়ার মধ্যেই সবচেয়ে গভীরে পাই,
আর না-থাকার মধ্যেই
সবচেয়ে নিবিড় হয়ে থাকো তুমি।


ভালোবেসে চাই

ভালোবাসলে
যা যা দেওয়া যায়,
আমি তার সবটাই চাই।
কেন চাইব না?

আমি ভালোবেসেছি হাসব বলে,
কাঁদব বলে নয়।

তুমি তো কখনও বলোনি
তুমি ভগবান—
শুধু অনুভব করলেই চলবে।

আমি মানুষ,
তাই আমার ভালোবাসার
সবটুকু সুখই চাই।

আবার প্রেম

পাহাড়ের চূড়ায় জমছে মেঘ
ঠিক যেমন করে অজানা মেঘ জমছে মনে।

দূর চলতে থাকা রাস্তায়
পিছনে সরে যায় সবুজ
একটা মুখ ভেসে ওঠে।
আচ্ছা সেও কি ভাবছে কিছু ?

অকারণ একটা ভাব,
কিছু নয় তবু কিছু যেন।

গাড়ির কাঁচে দুচার ফোঁটা জল,
তারপর  দূরে থেকে মেঘটাকে এগিয়ে আসতে দেখি
আমি শুনতে পাচ্ছি
নতুন বৃষ্টি ভেজার গল্প।

বাতাস ভরা ভাবনা
বন্ধ কাঁচে কুয়াশা আঁকছে।
তবে কি প্রেম
আমাকে আবার খুঁজে নিচ্ছে?

🍂

Post a Comment

12 Comments

  1. AnonymousMay 21, 2026

    অপূর্ব লেখিকার কসম মধুক্ষরা

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাMay 22, 2026

      কসম সে...

      Delete
  2. AnonymousMay 21, 2026

    ভালোবাসার সবটুকুই চাই। চেই চাওয়াটাই শেষ কথা। সেটা মন হতে পারে বা ফুলের বৃন্ত। ভালো লাগল।

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাMay 22, 2026

      কিম্বা খোলা বারান্দা ও হতে পারে। ধন্যবাদ

      Delete
  3. AnonymousMay 21, 2026

    Eto kobita noy,jeno premomoy antoratmar boye jawa srot,pathok keu bhasiye niye jay.
    Ashadharon🙏

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাMay 22, 2026

      অনেক ধন্যবাদ 🙏

      Delete
  4. AnonymousMay 21, 2026

    খুব সুন্দর

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাMay 22, 2026

      Thank you 🙏

      Delete
  5. চমৎকার কবিতা. ভারি ভালো লাগলো

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাMay 22, 2026

      অনেক ধন্যবাদ।আগেও পড়বেন ,share করবেন।জ্বলদর্চিতে আরো অনেক লেখা বিভিন্ন লেখক লেখিকারা লেখেন সেগুলোও পড়বেন ।ভালো লাগবে।চাইলে অ্যাপ ডাউনলোড করতে পারেন ফ্রী ।
      🙏

      Delete
  6. মুকুল মুখার্জীMay 22, 2026

    অপূর্ব কবিতাগুলো! প্রেম প্লাবিত হৃদয়ের দলিল

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাMay 22, 2026

      অনেক ধন্যবাদ 🙏

      Delete