শ্রীজিৎ জানা
একজন ব্যতিক্রমী বাঙালি হলেন সত্যজিৎ রায়। উচ্চতায় তিনি ব্যতিক্রম। মননে ব্যতিক্রম এবং নান্দনিক- সৃষ্টিশীলতায় তিনি ব্যতিক্রম। উচ্চতায় গড়পড়তা বাঙালি যেখানে পাঁচ সাড়ে পাঁচ, সেখানে রায়বাবু তার থেকে অনেকটাই বেশি। প্রায় সাড়ে ছ ফুট এর কাছাকাছি। শুধু গঠনে নয়, রবীন্দ্র পরবর্তী যুগে এমন বহুমুখী প্রতিভার বিচ্ছুরণ কতিপয় বাঙালির মধ্যে দেখা গিয়েছে। সত্যজিৎ সেই সারণিতে এক উজ্জ্বলতম জায়গায় অবস্থান করেন। ইন্টালেকচুয়াল এবং ইন্টারন্যাশনাল বাঙালি বলতে সত্যজিৎ রায়কে অনায়াসে চিহ্নিত করা যায়। শুধুমাত্র 'ফিল্মমেকার সত্যজিৎ' -এই পেরিফেরির ( periphery) মধ্যে যদি তাঁকে আটকে রাখা হয়, তবে আমাদের সত্যজিৎ চর্চার দৈন্যতা প্রকাশিত হবে। তিনি একাধারে ফিল্ম ডিরেক্টর, প্রোডিউসার, স্ক্রিপ্ট রাইটার, লিরিসিস্ট,সিনেমাটোগ্রাফার,আর্টিস্ট এবং আরও কত কি! একইসাথে তাঁর বড় পরিচয় তিনি বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ছোট গল্পকার।দক্ষ পত্রিকা সম্পাদক এবং অসামান্য প্রচ্ছদ শিল্পী। 'আলসে বাঙালি'র দোষারোপ তাঁর গায়ে বিন্দুমাত্র চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন -"... দুপুরে বিশ্রাম করতেন না। সর্বসময় কাজ করতেন। এখানে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ওঁর মিল আছে। একটা মুহূর্তকে নষ্ট করেননি"। বুদ্ধিতেও তিনি যে প্রখর এই সম্পর্কেও সৌমিত্রবাবু ওই সাক্ষাৎকারে বলেন -"মানিকদা খুব বুদ্ধিমান ছিলেন। কম্পিউটারের মতো ব্রেইন ছিল তাঁর। "
চলচ্চিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে বাংলা ও বাঙালিকে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে বিরাট এক সম্মানের জায়গায় তিনি পৌঁছে দিয়েছিলেন। তাঁর ছবি দেখতে বসে একটা কথা দৃঢ়ভাবে মনে হয়, তিনি যেন রূপোলি পর্দার ক্যানভাসে চলমান পোট্রেট এঁকেছেন।এমন নিঁখুত, পরিশীলিত, পরিমিত এবং চিন্তার স্তরে তীব্র আলোড়নকারী বয়ন,বুনন ও উপস্থাপনের আয়োজন একমাত্র তাঁর চলচ্চিত্রে মেলে।কাহিনী -চিত্রনাট্যের সঙ্গে নেচার এবং ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ডের অদ্ভূত যুগলবন্দী সিনেপ্রেমীদের আবিষ্ট করে রাখে।সেই ফ্রেমে রেলগাড়ির দৃশ্য, বৃষ্টিস্নাত পল্লীর দৃশ্য, কাশফুল,অপু দুর্গার বৃষ্টিতে ভেজার দৃশ্য, ধোঁয়া ওঠা চিমনির দৃশ্য, বারাণসীর অলিগলির দৃশ্য বাঙালির স্মৃতির অ্যালবামে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে চিরদিন। কিংবা 'অপুর সংসার'এর বংশী বাদনরত সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং তোলা উনুনে কয়লা দিতে থাকা শর্মিলা ঠাকুরের আড়চোখের অসামান্য চাহুনি, 'অশনি সংকেত' ছবির সূচনা পর্বের নিসর্গ-কোলাজ বাঙালির অ্যাস্থেটিক রুচির পরিচয়কে বিশ্বের দরবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত করেছেন। চলচ্চিত্রের মেধাবী চর্চাকে তিনি অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছেন। স্বাভাবিকভাবেই গোয়েন্দা ফেলু মিত্রের প্রধান অস্ত্রই করেছেন মগজাস্ত্র।
🍂
এমন বহুমুখী প্রতিভাধর সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে অবিভক্ত মেদিনীপুরের সম্পর্ক খোঁজার লোভ সংবরণ করা খুব মুশকিল এবং অবশ্য ভাবেই রোমাঞ্চকর। বিভিন্ন অনুষঙ্গে এবং কলাকুশলীদের প্রত্যক্ষ সংযোগের মাধ্যমে সত্যজিতের ছবিতে উঠে এসেছে অবিভক্ত মেদিনীপুরের প্রসঙ্গ। যেমন ধরা যাক ১৯৯১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'আগন্তুক' সিনেমার কথা। বিখ্যাত সেই সিনেমার একটি দৃশ্য যেখানে রয়েছেন উৎপল দত্ত, মমতাশংকর এবং শিশু শিল্পী। খাবার টেবিলে গৃহত্যাগী মামা উৎপল দত্তকে মমতাশংকর খাবার পরিবেশন করছেন। এখানেই উঠে এসেছে মেদিনীপুরের প্রসঙ্গ।
-"আপনাকে একটু নতুন জিনিস দেখাই
-সর্বনাশ! এ আবার কি?
-গয়নাবড়ি। মেদিনীপুরের বউ-ঝিয়েরা নিজেরা বাড়িতে তৈরি করে।
- আহারের এত বাহার শুধু বাংলাদেশেই সম্ভব।"
জানা যায় আশির দশকের গোড়ায় ময়নার পুলকানন্দ বাহুবলীন্দ্র সত্যজিৎ রায়কে দিয়েছিলেন ময়নার বিখ্যাত গহনাবড়ি। সত্যজিত সেই গয়নাবড়িকে ঠাঁই দিয়েছেন তাঁর ছবিতে।
এবার আসা যাক 'অশনি সংকেত' সিনেমায়। ১৯৭৩ সালে মুক্তি পায় এই সিনেমা।জানা যায় 'অশনি সংকেত' সিনেমার শ্যুটিং লোকেশন দেখতে এসেছিলেন ময়না রাজবাড়িতে এবং রাত কাটিয়েছিলেন মেদিনীপুর শহরে। যদিও বিভিন্ন অসুবিধার কারণে এখানের শ্যুটিং বাতিল করেন।
নাট্যাচার্য শিশির ভাদুড়ির সূত্র ধরে সত্যজিৎ এর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে মেদিনীপুরের।তাঁর অধিকাংশ সিনেমায় প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। যিনি আবার গুরু হিসেবে নাট্য ব্যক্তিত্ব শিশির ভাদুড়ীকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করতেন। সত্যজিৎ বাবুও শিশির ভাদুড়িকে সম্মান করতেন। বিশেষভাবে তিনি 'মহানগর' ছবিতে নায়িকার শ্বশুরমশাই প্রিয়গোপাল চরিত্রে শিশির বাবুকে চেয়েছিলেন। কিন্তু শিশির বাবু রাজি হননি। এ বিষয়ে সত্যজিৎ নিজেই লিখেছেন, 'প্রিয়গোপালের ভুমিকায় অভিনয় করার জন্য আমি শিশির ভাদুড়ী মশাইকে অনুরোধ করি। তার আগেই আমার শিশির বাবুর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। তিনি 'পথের পাঁচালী' দেখে আমাকে ডেকে ছবিটির খুব প্রশংসা করেন। আমার প্রস্তাব শুনে শিশির বাবু বলেন সিনেমায় তো অভিনেতা অভিনয় করে না। করে পরিচালক। তার মানে আমার পার্টটিতেও আসলে তুমি অভিনয় করবে। কাজেই সেখানে আর আমাকে নেওয়া কেন।" এই কথা সত্যজিৎ ভোলেননি। পরবর্তীকালে 'নায়ক' ছবিতে তিনি শিশির ভাদুড়ীর এই কথাকে সংলাপ হিসেবে ব্যবহার করেন। এ তো গেল শিশির ভাদুড়ি এবং সত্যজিৎ এর সম্পর্কের কথা। কিন্তু এখানে মেদিনীপুরের প্রসঙ্গ কোথায়? প্রসঙ্গ এখানেই যে নাট্যাচার্য শিশির ভাদুড়ী জন্মগ্রহণ করেন মেদিনীপুর শহরের ছোটবাজারে। যদিও তাদের পৈতৃক বাড়ি হাওড়ায়। মেদিনীপুর হল তাঁর মামার বাড়ি। মামা বাড়িতেই তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। এই সূত্রে মেদিনীপুরের মানুষ হিসেবে একটা গর্বের জায়গা থেকেই যায়।
'অরণ্যের দিনরাত্রি'( ১৯৭০) সিনেমার কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে শমিত ভঞ্জ এবং সিমি আগরওয়াল- এর অসামান্য কেমিস্ট্রির দৃশ্য। ছবিতে নায়ক হরি( শমিত ভঞ্জ) এবং আদিবাসী মেয়ে দুলির ( সিমি আগরওয়াল) ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের দৃশ্যে সিনেপ্রেমী বাঙালির বুকে আজও ঝড় তোলে। অমন বলিষ্ঠ সুঠাম দেহ এবং সুদর্শন চেহারার নায়ক শমিত ভঞ্জের বাড়ি পূর্ব মেদিনীপুর জেলার তমলুকে। বাবা প্রীতিময় ভঞ্জ কর্মসূত্রে থাকতেন জামশেদপুরে। সেখানেই তাঁর জন্ম কিন্তু বড় হয়ে ওঠা তমলুকে এবং পড়াশোনা হ্যামিলটন স্কুলে। 'অরণ্যের দিনরাত্রি' সিনেমায় তাঁর অভিনয় সহজে ভোলবার নয়।
'সোনার কেল্লা' সিনেমার ছোট্ট মুকুলকে চেনেন না এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সত্যজিৎ পরিচালিত 'সোনার কেল্লা' ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৭৪ এ। এই ছবিতে মুকুলের চরিত্রে অভিনয় করেন কুশল চক্রবর্তী। এমনকি ওই বছরই শ্রেষ্ঠ শিশু চলচ্চিত্র অভিনেতা হিসেবে জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন মুকুল ওরফে কুশল চক্রবর্তী। এই কুশল চক্রবর্তী এর পৈতৃক নিবাস হল দাসপুর -১ ব্লকের সেকেন্দারি গ্রামে। বাবা রুদ্রপ্রসাদ চক্রবর্তী, মা সুমতি দেবী। ঠাকুরদা কৃষ্ণকিশোর চক্রবর্তী কলকাতার আমহার্ট স্ট্রীট এলাকার এক জমিদার বাড়িতে পুজো করতেন। তিনি ছেলেকে( রুদ্রপ্রসাদ চক্রবর্তী) তাঁর কাছে রেখে পড়াশোনা করান। রুদ্রপ্রসাদ চক্রবর্তী হলেন একজন স্বনামধন্য নাট্য ব্যক্তিত্ব এবং তাঁর সন্তান কুশল চক্রবর্তী একজন বিখ্যাত অভিনেতা।
সত্যজিতের সঙ্গে মেদনীপুরের নিবিড় সম্পর্ক যাঁর মাধ্যমে সব থেকে বেশি দৃঢ় হয়েছে তিনি হলেন স্থির আলোকচিত্রী পদ্মশ্রী নিমাইচাঁদ ঘোষ বা নিমাই ঘোষ।'গু.গা.বা.বা' থেকে শুরু করে 'আগন্তুক' সত্যজিতের সমস্ত ছবিতে যিনি মুখ্য ফটোগ্রাফারের ভূমিকায় ছিলেন, তিনিই নিমাই ঘোষ। আদি নিবাস দাসপুর-১ ব্লকের রাজনগর গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত দাদপুর গ্রাম। বাবা সতীশচন্দ্র ঘোষ ভাগ্য অন্বেষণে চলে যান কলকাতায়। সেখানে কোর্টে পেশকারের কাজ করতেন। সতীশ বাবুর পাঁচ ছেলে, নিমাইচাঁদ, নিতাইচাঁদ, চিত্তরঞ্জন, স্বদেশরঞ্জন এবং নিশীথরঞ্জন। তিনটি মেয়ে ছিল তাঁর অঞ্জলি, শেফালী এবং দিপালী। নিমাই বাবু ম্যাট্রিকুলেশন পর্যন্ত পড়াশোনা করেন গ্রামের বাড়িতে থেকেই। পরে বাবার কাছে চলে যান। আর সেখানে থেকেই উচ্চশিক্ষা এবং ফটোগ্রাফির দিকে ঝুঁকে পড়েন। সত্যজিৎ রায়ের অত্যন্ত প্রিয় পাত্র ছিলেন তিনি। তাঁর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয় 'গুপী গাইন বাঘা বাইন' সিনেমার সেটে। সেদিন নিমাই বাবুর ফটোগ্রাফি দেখে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন -"আপনি তো আমার অ্যাঙ্গেল মেরে দিয়েছেন মশাই।" এই নিমাই ঘোষের ছবির সংকলন যখন প্যারিসে প্রশংসিত হল এবং প্রস্তাবনা লিখলেন হেনরি কারটিয়ের ব্রেঁস, তখন সত্যজিৎ রায় নিজে ফোন করে জানান-" নিমাই বিশ্বজয় করেছে।" সত্যজিতের ছবি নিয়ে তাঁর ৭ টি বই রয়েছে। ঘোষ পরিবারের জনৈক সদস্য ( নিমাই বাবুর ভাইপো) পঁচাত্তোরর্ধ বয়স এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংককর্মী শ্রী সমীর ঘোষ জানাচ্ছেন, "আমি যখন কলেজে পড়ি তখন সত্যজিৎ বাবু এসেছিলেন মেদিনীপুরে। কোনো একটি স্থানে শ্যুটিং লোকেশন দেখতে এবং সেদিন কাকার সাথে আমাদের বাড়িতে সত্যজিৎ বাবু আসেন। যদিও তা কিছুক্ষণের জন্য। ঘাটাল -পাঁশকুঁড়া রোডের বেলতলা নামক বাসস্টপ থেকে তাঁকে রিক্সা করে আনা হয়।।"
এইসব টুকরো টুকরো ঘটনার অনুষঙ্গে জড়িয়ে আছে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে মেদনীপুরের আত্মীয়তা। একবার সৌমিত্র বাবু সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন -"তিনি যে কত বড় শিল্পী, এইরকম মাধ্যমের শিল্পী, সেইটা বিদেশ গেলে বোঝা যায়। আমরা যে তাঁর সঙ্গে থেকেছি, তাঁর ছবিতে কাজ করেছি, আমরা খুবই সৌভাগ্যবান সেইদিক থেকে।" আসলে আমরাও সৌভাগ্যবান সেইদিক থেকে যে, সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে মেদিনীপুরের টুকরো টুকরো প্রসঙ্গ এবং মেদিনীপুরের কলাকুশলীবৃন্দ তাঁর সিনেমায় অভিনয় করেছেন এবং নিজেদের প্রতিভার গুণে যুক্ত থেকেছেন তাঁর পরিচালিত ছবির সঙ্গে। একজন মেদিনীপুরবাসী হিসেবে তা নিয়ে গর্ব হয় বৈকি!
তথ্যঋণ -
১.সত্যজিৎ রায়-ক্যামেরার নেপথ্যে - পবিত্র মুখোপাধ্যায়
২.বন্ধ সিনেমা হলের কথা - পশ্চিম মেদিনীপুর -শ্রীজিৎ জানা
৩. চলচিত্রের অনুষঙ্গে অবিভক্ত মেদিনীপুর( প্রবন্ধ) -ভাস্করব্রত পতি
৪.শ্রী সমীর ঘোষ ( কলকাতা)
৫.আন্তর্জাল
1 Comments
খুব সুন্দর হয়েছে লেখাটা
ReplyDelete