নায়ক সিনেমায় --- সত্যজিত---Top,Top & Top
তনুশ্রী ভট্টাচার্য্য
১৯৬৬ সালে সত্যজিতের নিজের কাহিনী চিত্রনাট্য মিউজিক ক্যামেরার সব রকম কৃৎকৌশল আর উত্তম শর্মিলার দুর্দান্ত অভিনয় নিয়ে নায়ক সিনেমা রিলিজ হয় । একটি সেমি ক্ল্যাসিক মুভি। সাফল্যের শীর্ষে থাকা এক নায়কের জীবন দর্শন গল্পের প্রতিপাদ্য। শূন্য থেকে শুরু করে 'টপে' ওঠার পিচ্ছিল পথের গল্প। কিন্তু গল্প বলার টেকনিকে সত্যজিৎ নতুন পথের দিশা দেখালেন বাংলা চলচ্চিত্রকে। কেন্দ্রীয় ফোকাসের পাশাপাশি পার্শ্ব চরিত্র গুলির পরত খুলে খুলে গেছেন।
বিশ্বে দ্রুততম জনপ্রিয় বিনোদন মাধ্যম চলচ্চিত্র। ১৯৬৬তে ভারতীয় তথা বাংলা সিনেমার বয়স হয়ে গেছে চল্লিশ প্লাস। আর বিশ্ব সিনেমার জগতের তাবড় তাবড় অভিনেতা অভিনেত্রীদের ব্যক্তিগত রসালো রোমাঞ্চ রোম্যান্টিক জীবন নিয়ে আমজনতার আকুল কৌতূহল এবং তুমুল গসিপ সম্বলিত সংবাদপত্রের কাটতি সিনেমাকে নিয়ে যাচ্ছে জনগনের অন্দরমহলে। বিশেষ করে নায়ক নায়িকার জীবনে উঁকিঝুঁকি দেওয়া এবং তাদের যাপনশৈলীর ব্যাকরণের খোঁজ খবর করার অভ্যেস তৈরী হয়ে গেছে জনগনের। এই অভ্যাসটিকে সম্মান দিয়ে সত্যজিৎ নায়ক সিনেমাটি বানালেন এবং গভীর থেকে তুলে আনলেন একটি জীবন দর্শন ---নায়ক কখন কোথায় নায়ক আর কখন কোথায় একজন মানুষ!
🍂
একটার পর একটা স্তর পেঁয়াজের খোসার মতো ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে তিনি পর্দায় তুলে এনেছেন। নায়কের জীবনের লড়াই, ব্যর্থতা, দ্বন্দ্ব,খোলস জীবন একাকীত্ব, স্বজন বিচ্ছেদ, খ্যাতি, গৌরব অর্থ, টাকার পাহাড়ে ডুবে যাওয়া,আবার নায়কোচিত গ্ল্যামারে নায়কের নিজের অবগাহন এবং জনগনের ভেসে থাকা ----সব কিছুই সত্যজিতীয় টেকনিকে ও ঘরানায় পর্দায় দেখেছি আমরা নায়ক সিনেমায়। যে স্বপ্ন দৃশ্যে টাকার পাহাড়ের শূন্যতায় নায়ক ডুবে যাচ্ছেন আর বাঁচার প্রাণপন আকুতি করছেন সেই দৃশ্যে শুরুটা যেমন ছিল রোম্যান্টিকতা শেষে এলো জীবনের ভয় --জাস্ট প্রাণের ভয় ----পৃথিবীর যে কোনো মানুষের মতো নায়কের আড়ালে থাকা এক মানুষের মরার ভয়। চিরসত্য এক অনুভূতিকে তিনি দেখালেন। টাকার পাহাড় কিন্তু বড় পলকা, চোরাবালির মতো , ক্রমশ ঢুকে যাচ্ছে গভীরে আঁধারে অতলে, নিষ্কৃতি নেই উঠে আসতে পারছে না। স্বজনকে দেখতে পাচ্ছে কিন্তু সে সাহায্য করছে না ,করবেও না কারণ সে চাইত না থিয়েটার বাদ দিয়ে অরিন্দম নাম অর্থ খ্যাতি যশের টানে রুপালি পর্দায় অভিনয় করুক আর সেদিনের অরিন্দমের প্রত্যাখ্যান আজ তার তরফ থেকে প্রত্যাখ্যান হয়ে ফিরে আসছে তাই সে হাত বাড়াচ্ছে না। অরিন্দম ডুবে যাচ্ছে টাকার পাহাড়ে রোম্যান্টিকতা মৃত্যু ভয়ে পরিণত হচ্ছে ---ট্রেনের জানলার কাঁচে ঘুমন্ত নায়কের হাতের তালু আছড়ে পড়ল---স্বপ্ন ভেঙে গেল, কপালে ,চিবুকে গালে ভীত স্বেদ বিন্দু চোখে অসহায়তা, মরণের সাক্ষাৎ পাওয়ার ছিন্ন চিত্র --মুহূর্তের এই দৃশ্য রচনায় অসাধারণ এক শিল্পবোধ যা বিশ্ব সিনেমায় বিরল। এখানে উত্তমের অভিনয় টিও বিশ্বসিনেমার সেরা অভিনয়ের একটি ।
পথের পাঁচালীর যে দৃশ্যে ইন্দিঠাকরুণের মৃত্যু ঘটছে সত্যজিৎ দেখালেন তার জলশূন্য ঘটিটি গড়িয়ে গড়িয়ে গিয়ে জলে পড়ল --+একটি মৃত্যু দৃশ্য রচনা করলেন । এর আগে পর্যন্ত এমন মৃত্যু ব্যঞ্জনা কোনো ডিরেক্টর দেখাতে পারেন নি বলা ভাল সেই শৈল্পিক বোধ দেখাতে পারেন নি। এটি একেবারেই মৌলিক এক সৃষ্টি। নায়ক সিনেমাটিতে ঐ মৃত্যু ছুঁয়ে আসার দৃশ্যটিও অস্কার পাওয়ার যোগ্য এবং সত্যজিৎ এখানে টপ টপ এন্ড টপ।
শেক্সপিয়ার বলছেন অল দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ এ স্টেজ । আমরা প্রত্যেকে অভিনয় করে যাই। নায়ক সিনেমাতে দেখানো হয়েছে একজন অভিনেতার হাসি কান্না দু:খ ব্যথা বেদনা শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি, বিরক্তি, অসুস্থতা, বিষাদ নিদ্রাহীনতা থাকলেও তাকে জনসমক্ষে নায়ক হয়েই থাকতে হবে। সভ্য সমাজের অলিখিত নিয়মকানুন তাকে মানতেই হবে। যে দৃশ্যে অরিন্দম বেহুঁশ হয়ে বিছানায় একপ্রকার আছড়ে পড়ল এবং সহযাত্রী ভদ্রমহিলাটি স্নেহশীলা স্বজনের মতো তার গায়ে চাদরটি টেনে দিলেন তখন মনে হোল আসলে আমরা সবাই কোথাও একটা একেবারে মানুষ। কী ছোট্ট এক দৃশ্যে কী বৃহৎ অসাধারণ এক হিউম্যান টাচ দেখিয়েছেন সত্যজিৎ। আবার মহিলা রিপোর্টারের সামনে অরিন্দমের অসতর্কে বেরিয়ে আসা অশ্লীল শব্দের উচ্চারণের শেষটুকু বাকী রাখার মধ্যেও সংযম ও নায়কোচিত ব্যবহারের প্রকাশ । এই সব দৃশ্যগুলো ডিরেক্টর আর এ্যাক্টরের যৌথ প্রতিভার মেলবন্ধন।
বিশ্ব সিনেমার অঙ্গনে নায়ক একটি মাইলস্টোন। এখানে নায়কের বয়ানে একটি জীবনদর্শন দেখানো হলেও আসলে এটি প্রত্যেক সফল মানুষের কথা। রিপোর্টার তাই ইন্টারভিউ নিয়েও সেটি ছিঁড়ে ফেললেন। ছাপার প্রয়োজন অনুভব করলেন না। বরং তিনি অরিন্দমের এই লড়াই, গৌরব জনপ্রিয়তা অসহায়তাকে সম্মানের সঙ্গে মনে রেখে দেবেন যেটি সাধারণ সিনেমা প্রিয়, নায়ক-পাগল জনতার না জানলেও চলবে বলে মনে করলেন।
শেষ দৃশ্যে সত্যজিৎ খানিকটা সুররিয়ালিজেমের ছোঁয়া দিলেন। স্টেশনে অরিন্দম মুখার্জীর ফ্যান ফলোয়াররা যখন একের পর এক গোড়ে মালা পরিয়ে তাকে রিসিভ করছে উষ্ণ অভিনন্দনে তখন সারা যাত্রা পথের সঙ্গী সেই মহিলা রিপোর্টার পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছেন সেদিকে বিন্দুমাত্র দৃকপাত না করে। । অরিন্দম এত ভিড়ের মধ্যেও সেটি লক্ষ্য করলেন। এটি কি স্টারডমের অন্য:সারশূন্যতা দেখালেন সত্যজিৎ । নায়ক কিছু মানুষের কাছে নায়ক থাকেন সবার কাছে নয় ?
আসলে জীবন নানা অভিমুখগামী এক যাত্রা, এক জার্নি। ---এই সহজ সত্যকে আশ্রয় করে সত্যজিৎ নায়ক সিনেমার দৃশ্যপট রচনা করেছেন। সাধারন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে আজ নিজ অভিনয় দক্ষতায় নায়ক হয়েছেন, দিল্লী যাচ্ছেন পুরস্কার নিতে ---পথের কথা পথেই বলা হোল ,জার্নির ইতিহাস জার্নির মধ্যেই বলা সাঙ্গ হোল---এর পরেই আবার বাস্তব পরাবাস্তব আর অধিবাস্তবের মিশেলে জীবন ছুটবে --এই ইঙ্গিতে সিনেমা সমাপ্ত হোল কিন্তু আসলে সমাপ্ত হোল কি? দর্শকের এই প্রশ্ন জিইয়ে রাখাটা শ্রেষ্ঠ পরিচালকের শিল্পসৃষ্টির ফরম্যাট । আর এখানেই সত্যজিৎ আর পাঁচজন পরিচালকের থেকে এগিয়ে --টপ টপ এন্ড টপ।
নায়ক সিনেমাটি বয়সের হিসাবে ডায়মন্ড জুবিলির বছর এটি। ষাট বছর আগের সিনেমাটির গায়ে কোনো মেদ নেই---তরতর করে এগিয়ে এসেছে আজকের জেন জি প্রজন্মের কাছেও ----তেমনই গ্ল্যামার, টেকনোলজি, টেকনিক ,সংলাপ,অভিনয় আর সময়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া আধুনিকতম মেধাবী বাংলা চলচ্চিত্র হিসাবে। নায়কের খোঁজখবর আজো মানুষ রাখতে চায়। বর্তমান সিনেমা করিয়ে নতুন ছেলেমেয়েদের কাছে সিনেমা সিলেবাসের একটি টেক্সট হিসাবে গন্য হওয়া উচিত এটি। তৎকালীন খ্যাতির শীর্ষে থাকা উত্তমকুমারের খ্যাতি গসিপ গ্ল্যামার কে মূলধন করে তাকেই কেন্দ্রীয় চরিত্র কাস্ট করে সত্যজিৎ দু:সাহসের পরিচয় দিয়েছেন এবং উত্তম কুমারও এই চরিত্রে অভিনয় করাটাকে চ্যালেঞ্জ হিসাবে দেখেছেন। মাঝেমাঝেই মনে হয়েছে ছবিটা উত্তমকুমারের ,সত্যজিতের নয় ,আবার পরমূহূর্তেই মিউজিক, ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল সংলাপের ধার শুনে মনে হয়েছে এটাই সত্যজিৎ --- উত্তমকুমার 'ডিরেক্টরস চয়েস' । সমস্ত পার্শ্ব চরিত্রের উজ্জ্বল উপস্থিতে সত্তেও এই সিনেমা দুই প্রতিভা সৃষ্ট একটি টপ ক্লাস সিনেমা যার আবেদন আজো মুগ্ধ করে দর্শককে।
0 Comments