বাঁচার উত্তরাধিকার: ষষ্ঠ খণ্ড
পর্ব -৩
কমলিকা ভট্টাচার্য
চেনা সুর অচেনা দেশে
তিন মাস যেন চোখের পলকে কেটে গেল।
ভিসা, কলেজ, কাগজপত্র, ইন্টারভিউ—সবকিছু মিলিয়ে বাড়িটা গত কয়েক মাস ধরে অদ্ভুত ব্যস্ত ছিল।
ডাইনিং টেবিলের উপর ছড়িয়ে থাকত documents, passport photocopy, university brochure।
রাত জেগে চলত discussion, planning, future নিয়ে হিসেব।
তার মাঝেও কোথাও একটা চাপা বিষণ্ণতা লুকিয়ে ছিল, যেটা কেউ মুখে আনত না।
যেন বাড়ির প্রত্যেকে জানত—একটা সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে।
অনির্বাণ আর ঋদ্ধিমান প্রথমে চেয়েছিল আদর আমেরিকায় যাক।
সেখানে robotics আর advanced engineering নিয়ে পড়ার সুযোগ বেশি।
নিরাপত্তার দিক থেকেও তারা সেটাকেই ভালো ভাবছিল।
কিন্তু আদর একদিন খুব শান্ত গলায় বলেছিল—
“আমি engineering পড়ব, ঠিক আছে। কিন্তু আমি লন্ডনে যেতে চাই।”
অনির্বাণ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল,
“লন্ডন কেন?”
আদরের চোখ তখন অন্যরকম উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল।
যে আলো তার চোখে ফুটে ওঠে শুধু তখনই, যখন সে নিজের সত্যিকারের কোনো ইচ্ছের কথা বলে।
“কারণ সেখানে Trinity College London আছে। Engineering-এর পাশাপাশি সেখানে music শেখার একটা সুযোগ পাব। যদি যেতেই হয়, তাহলে আমি এমন একটা জায়গায় যেতে চাই যেখানে আমি দুটোই বাঁচিয়ে রাখতে পারব।”
ঘরটা তখন কিছুক্ষণ চুপ হয়ে গিয়েছিল।
জানলার বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল ধীরে ধীরে।
সেই শব্দের মাঝখানে সবাই যেন নিজের নিজের মতো করে আদরকে নতুন করে চিনছিল।
ঋদ্ধিমান ধীরে আদরের দিকে তাকিয়ে ছিল।
কারণ সে জানত—আদরের ভিতরে বিজ্ঞান আছে, কিন্তু তার আত্মাটা শিল্পের দিকে হাঁটে।
শেষ পর্যন্ত সবাই রাজি হয়ে যায়।
ইরা শুধু হেসে বলেছিল,
“যেখানে আমার ছেলে ভালো থাকবে, সেখানেই যাক।”
কিন্তু কথাটা বলার সময় তার চোখের কোণে জমে থাকা জল সে খুব কষ্টে লুকিয়েছিল।
যাওয়ার দিন বাড়ির পরিবেশ অদ্ভুত ভারী।
সকালের আলো আজ যেন ফ্যাকাসে।
ঘরের প্রতিটা জিনিসে বিদায়ের গন্ধ।
ইরা সকাল থেকেই নিজেকে কাজে ব্যস্ত রেখেছে।
বারবার ব্যাগ খুলে দেখছে, জামা গুছিয়ে দিচ্ছে, আবার খুলছে।
কখনও medicines রাখছে, কখনও chocolate।
যেন ব্যাগের ভিতর একটু একটু করে নিজের ভালোবাসাও গুছিয়ে দিচ্ছে।
নাতাশা বাইরে থেকে খুব composed, কিন্তু তার হাত কাঁপছে।
অনির্বাণ কথাই কম বলছে।
শুধু আদরই সবাইকে হালকা রাখার চেষ্টা করছে।
“এমন behave করছ যেন আমি যুদ্ধ করতে যাচ্ছি!”
ইরা জোর করে হাসে।
“মা-দের কাছে ছেলেরা পাঁচ মিনিট দূরেও গেলে যুদ্ধেই যায়।”
এয়ারপোর্টে পৌঁছনোর পর মুহূর্তগুলো আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
Announcement-এর শব্দ, trolley-র চাকা, মানুষের ভিড়—সবকিছুর মাঝেও তাদের চারজনের ছোট্ট পৃথিবীটা আলাদা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
আদর একে একে সবার দিকে তাকায়।
তারপর হঠাৎ ইরাকে জড়িয়ে ধরে বলে,
“যশোদা মা… কাঁদবে না কিন্তু।”
ইরা আর ধরে রাখতে পারে না।
ঋদ্ধিমান শুধু আদরের কাঁধে হাত রাখে।
তার চোখে অদ্ভুত গভীরতা।
“নিজেকে হারিয়ে ফেলো না।”
আদর হেসে বলে,
“আমি তো নিজেকেই খুঁজতে যাচ্ছি।”
লন্ডনে পৌঁছে প্রথম কয়েকদিন আদরের একদম ভালো লাগত না।
শহরটা সুন্দর।
আলো ঝলমলে।
সবকিছু নিখুঁত।
তবু ভীষণ একা।
রাতে হোস্টেলের জানলার পাশে দাঁড়িয়ে সে কলকাতার কথা ভাবত।
ইরার ডাকার আওয়াজ।
অনির্বাণের বকুনি।
ঋদ্ধিমানের নীরব হাসি।
নাতাশার গায়ের গন্ধ।
লন্ডনের ঠান্ডা জানলার কাঁচে কপাল ঠেকিয়ে তার মনে হত—
মানুষ পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলে যেতে পারে, কিন্তু নিজের মানুষগুলোর অভ্যাসগুলোকে সঙ্গে করেই নিয়ে যায়।
এদিকে ইরার অবস্থাও খুব ভালো ছিল না।
আদরের পুরোনো খেলনা, আঁকার খাতা, ছোটবেলার জামা—এসব গুছিয়ে গুছিয়ে সে নিজেকে ব্যস্ত রাখত।
কখনও কাপড়ে মুখ চাপা দিয়ে লুকিয়ে কাঁদত।
একদিন রাতে অনির্বাণ আর ঋদ্ধিমান তাকে আর নাতাশাকে ল্যাবে ডাকে।
পুরোনো chamber-এর সামনে দাঁড়িয়ে আছে তারা।
ঘরের আলো কম।
মেশিনের ক্ষীণ শব্দ শোনা যাচ্ছে।
হালকা নীল আলো কাঁচের উপর পড়ে অদ্ভুত আবহ তৈরি করেছে।
কাঁচের ভিতরে বসে আছে—আরেকজন আদর।
একদম একই মুখ।
একই চোখ।
একই শান্ত অভিব্যক্তি।
Humanoid Ador.
ইরা প্রথমে চমকে ওঠে।
তার বুকের ভিতর কেমন ঠান্ডা হয়ে যায়।
অনির্বাণ ধীরে বলে,
“এখন এর ভিতরে emotional content ভরার দায়িত্ব তোমাদের।”
নাতাশা তাকিয়ে থাকে।
তার scientist মন আর মায়ের অনুভূতি যেন একে অপরের সঙ্গে লড়াই করছে।
ইরা ধীরে humanoid-এর গালে হাত ছোঁয়ায়।
তার বুকটা হঠাৎ কেঁপে ওঠে।
কারণ এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়—
আদর সত্যিই সামনে বসে আছে।
ওদিকে আদর ধীরে ধীরে আরও একা হয়ে পড়ছিল।
কলেজে সবাই ভালো।
ক্লাসও interesting।
তবু সে যেন কোথাও connect করতে পারছিল না।
সবাই কথা বলে, হাসে, future plan করে।
কিন্তু আদরের মনে হত সে যেন একটা কাঁচের দেয়ালের ওপারে দাঁড়িয়ে সব দেখছে।
একদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে হঠাৎ তার কানে ভেসে আসে এক অদ্ভুত melody।
সুরটা খুব ধীরে ধীরে উঠছে।
শীতের বাতাসে ভেসে আসা কোনো পুরোনো স্মৃতির মতো।
আর সেই মুহূর্তেই আদরের বুক কেঁপে ওঠে।
কারণ এই সুর সে আগে শুনেছে।
না—শুনেনি।
সে নিজেই অজান্তে বাজাত।
ঠিক একই ওঠানামা।
একই বিষণ্ণতা।
আদর থেমে যায়।
তারপর অদ্ভুত টানে সুরটার দিকে হাঁটতে শুরু করে।
রাস্তার কোণে একটা ছোট crowd।
কেউ দাঁড়িয়ে শুনছে, কেউ video করছে, কেউ coins ফেলছে।
ভিড় ঠেলে সামনে গিয়ে সে থমকে দাঁড়ায়।
একটা মেয়ে বসে ভায়োলিন বাজাচ্ছে।
স্নিগ্ধ, শান্ত মুখ।
কোঁকড়ানো চুল কাঁধ ছুঁয়ে আছে।
ঠোঁট দুটো গোলাপের পাপড়ির মতো নরম।
বয়স খুব বেশি হলে তার সমান।
সে চোখ বন্ধ করে বাজিয়ে চলেছে।
সামনে একটা ছোট পাত্র রাখা।
লোকজন তাতে কয়েন ফেলছে।
কিন্তু আদরের মনে হয়—
এই সুরের মূল্য এর চেয়ে অনেক বেশি।
ধীরে ধীরে ভিড় কমে যায়।
তবু মেয়েটি বাজিয়েই চলে।
রাস্তার আলো তার মুখে পড়ছে।
তার violin bow-এর movement এত শান্ত, যেন সে বাজাচ্ছে না—প্রার্থনা করছে।
আদর অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে।
তার ইচ্ছে করে কিছু বলতে।
কিন্তু পারে না।
শেষ পর্যন্ত চুপচাপ ফিরে আসে।
সেই রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঝলমলে শহরের দিকে তাকিয়ে থাকলেও তার মাথার ভিতরে শুধু সেই সুর ঘুরতে থাকে।
মনে হচ্ছিল—
শহরের হাজার আলো, হাজার শব্দের মাঝেও কোথাও একটা অচেনা মানুষ তার ভিতরের কোনো গোপন দরজায় আলতো টোকা দিয়ে গেছে।
ঠিক তখনই ফোন আসে।
ইরা।
🍂
“আমার আদরের মন খারাপ কেন?”
আদর অবাক হয়ে যায়।
“তুমি কি করে জানলে?”
ইরা হেসে বলে,
“মায়েরা সব টের পায়। আর আজকের মন খারাপটা একটু অন্যরকম।”
আদর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,
“না… সেইরকম কিছু না। কলেজের চাপ।”
কিন্তু সে নিজেই বুঝতে পারে—সে মিথ্যে বলছে।
পরদিন আবার সে সেই জায়গায় যায়।
মেয়েটি আজও একইভাবে বসে বাজাচ্ছে।
তারপর আবার।
তারপর আবার।
দিনগুলো অদ্ভুতভাবে বদলে যেতে থাকে।
আদর বুঝতে পারে না কেন সে প্রতিদিন সেখানে ছুটে যাচ্ছে।
সে শুধু জানে—মেয়েটির সুর শুনলে তার ভিতরের অস্থিরতা একটু শান্ত হয়।
একদিন সে মেয়েটির একটা sketch আঁকে।
খুব যত্ন করে।
চোখ বন্ধ করে ভায়োলিন বাজানোর মুহূর্তটা।
চুলের এলোমেলো রেখা, ঠোঁটের কোণের শান্তি—সব।
তারপরও সাহস হয় না এগিয়ে যাওয়ার।
সে শুধু লক্ষ্য করে—সবাই চলে যাওয়ার পরও মেয়েটি বাজাতে থাকে।
যেন সে কারও জন্য বাজাচ্ছে না।
শুধু সুরের জন্য বাজাচ্ছে।
অবশেষে একদিন আদর সাহস করে।
সবার চলে যাওয়ার পর সে ধীরে এগিয়ে যায়।
তার হাত কাঁপছে।
সে ছবিটা বাড়িয়ে দেয়।
“আমি আদর্শ… from India.”
মেয়েটির মুখে উজ্জ্বল হাসি ফুটে ওঠে।
“I am Drishti. India is my birthplace too.”
তারপর সে খুব আস্তে ছবিটার উপর হাত বুলিয়ে বলে—
“এটা কার ছবি?”
আদরের বুকের ভিতরটা হঠাৎ কেঁপে ওঠে।
তার চোখ নেমে যায়।
সে বুঝতে পারে—
দৃষ্টি আসলে দৃষ্টিহীন।
কয়েক সেকেন্ড সে কোনো কথা বলতে পারে না।
তার মাথার ভিতর যেন সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়।
যে মেয়েটি এত সুন্দর করে পৃথিবীকে সুরে দেখতে পারে,
সে নিজে পৃথিবীটাকে কোনোদিন চোখে দেখেনি।
দৃষ্টি আবার ডাকে,
“Hello? Adarsh?”
কিন্তু আদর হঠাৎ পিছিয়ে যায়।
তারপর প্রায় দৌড়ে সেখান থেকে চলে যায়।
পিছন থেকে দৃষ্টির কণ্ঠ ভেসে আসে—
“Hello! Adarsh!”
4 Comments
হঠাৎ মোচড়। গল্প এবার অন্য পথে। অপেক্ষায় থাকলাম।
ReplyDeleteকালকের আবার নতুন মোচড় তৈরি থাকুন, লিখতে লিখতে নিজের চোখেই জল এসে গিয়েছিল। অনেক ধন্যবাদ স্যার।
Deleteমাথা ঘুরছে। গল্পের তুলকালাম। লেখককে অভিনন্দন 🙏
ReplyDeleteলেখকই অভিনন্দনটুকু রাখুক,লেখিকা মনে মনে খুশি।😊
Deleteঅনেক ধন্যবাদ।🙏