জ্বলদর্চি

বিশ্ব পরিবেশ দিবস/দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে

বিশ্ব পরিবেশ দিবস

দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 


আজ ৫ই জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস, পরিবেশ কাকে বলে, প্রাণী জগতে পরিবেশ দিবস পালনের গুরুত্ব কি, আসুন সবকিছুই বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
পরিবেশ হলো, আমাদের চারপাশের সমস্ত সজীব ও নির্জীব উপাদানের সমষ্টি,যা আমাদের জীবন ও প্রকৃতিকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করে। এর মধ্যে রয়েছে মাটি, বায়ু, জল, উদ্ভিদ, প্রাণী এবং মানুষ।
পরিবেশকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়, ১.প্রাকৃতিক পরিবেশ: প্রকৃতি থেকে পাওয়া উপাদান,যা মানুষ তৈরি করেনি,যেমন— পাহাড়, নদী, সমুদ্র, বনভূমি, সূর্যালোক এবং আবহাওয়া।২.মানবসৃষ্ট পরিবেশ: মানুষের তৈরি বা প্রভাবিত পরিবেশ,যেমন— বাড়ি, রাস্তা, গ্রাম, শহর,কলকারখানা এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থা।
প্রকৃতি ও পরিবেশ মানবজীবনের অস্তিত্বের অন্যতম ভিত্তি। বিশুদ্ধ বাতাস, নিরাপদ জল,উর্বর মাটি, বনভূমি এবং জীববৈচিত্র্য মানুষের জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য,কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ, শিল্পায়ন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে পরিবেশ আজ নানা সংকটের সম্মুখীন। বায়ুদূষণ, জলদূষণ, প্লাস্টিক দূষণ, বন উজাড় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সমস্যাগুলো শুধু একটি দেশ নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরতে এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে প্রতি বছর ৫ই জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়।
🍂
বিশ্ব পরিবেশ দিবসের সূচনা হয় ১৯৭২ সালে,সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের মানব পরিবেশ বিষয়ক সম্মেলনে পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব নিয়ে বিশ্বনেতারা আলোচনা করেন। সেই সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৫ই জুনকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ১৯৭৩ সাল থেকে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হতে শুরু করে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই দিবসটি বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে উদযাপিত হয়। পরিবেশ বিষয়ক আলোচনা, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, র‌্যালি, সেমিনার, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং শিক্ষামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষকে পরিবেশ রক্ষায় উদ্বুদ্ধ করা হয়।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল লক্ষ্য হলো, পরিবেশগত সমস্যা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সক্রিয় ভূমিকা পালনে উৎসাহিত করা। প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে দিবসটি পালিত হয়। এর মাধ্যমে পরিবেশের কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা বা চ্যালেঞ্জের প্রতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়,ফলে মানুষ শুধু সমস্যার কথা জানতে পারে না, বরং সমাধানের পথ সম্পর্কেও সচেতন হয়।
বর্তমান সময়ে পরিবেশ দূষণ মানবজাতির জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ। শিল্পকারখানা, যানবাহন এবং বিভিন্ন জ্বালানি ব্যবহারের ফলে বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হচ্ছে,এর ফলে বায়ুদূষণ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং মানুষের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগসহ নানা স্বাস্থ্যসমস্যা দেখা দিচ্ছে। একইভাবে নদী, খাল, বিল ও সমুদ্রে বর্জ্য ফেলার কারণে জলদূষণও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দূষিত জল মানুষের স্বাস্থ্য এবং জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্লাস্টিক দূষণ বর্তমানে বিশ্বব্যাপী অন্যতম আলোচিত পরিবেশগত সমস্যা। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক ব্যবহার করা হলেও এর একটি বড় অংশ পুনর্ব্যবহার করা হয় না। ফলে প্লাস্টিক বর্জ্য মাটি, নদী ও সমুদ্রে জমা হয়ে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। অনেক সামুদ্রিক প্রাণী প্লাস্টিককে খাদ্য মনে করে গ্রহণ করে এবং মৃত্যুর শিকার হয়। এমনকি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের শরীরেও প্রবেশ করছে,যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
পরিবেশের আরেকটি গুরুতর সমস্যা হলো, বন উজাড়। মানুষের বসতি স্থাপন, কৃষিজমি সম্প্রসারণ এবং শিল্পায়নের কারণে প্রতিনিয়ত বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে। গাছপালা কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। বন ধ্বংসের ফলে বায়ুমণ্ডলে কার্বনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে ত্বরান্বিত করছে। পাশাপাশি বহু প্রাণী তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল হারিয়ে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সংকটগুলোর একটি। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় হিমবাহ গলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এবং আবহাওয়ার স্বাভাবিক চক্রে পরিবর্তন ঘটছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা এবং তাপপ্রবাহের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আগের তুলনায় আরও ঘন,ঘন ও তীব্র হয়ে দেখা দিচ্ছে। ভারতের মতো নিম্নভূমি ও উপকূলীয় দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে বিশেষভাবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে শুধু সরকার বা আন্তর্জাতিক সংস্থার উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, ব্যক্তিগত পর্যায়েও সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন। আমরা যদি অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক ব্যবহার কমাই, বিদ্যুৎ ও জলের অপচয় রোধ করি, গণপরিবহন ব্যবহার করি এবং বেশি, বেশি গাছ লাগাই, তাহলে পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারি। ঘরের বর্জ্য যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা করা এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্যের ব্যবহার বাড়ানোও পরিবেশের জন্য উপকারী।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং গণমাধ্যম পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। শিশু ও তরুণদের মধ্যে পরিবেশবান্ধব অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে ভবিষ্যতে একটি দায়িত্বশীল ও সচেতন প্রজন্ম তৈরি হবে। পরিবেশ বিষয়ক শিক্ষা এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে,পৃথিবী আমাদের একমাত্র বাসস্থান এবং এর সুরক্ষা নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে উন্নয়নের পথ খুঁজে নিতে হবে। পরিবেশের ক্ষতি করে কোনো উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। তাই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস কেবল একটি দিবস নয়,বরং পরিবেশ সংরক্ষণের প্রতি বৈশ্বিক অঙ্গীকারের প্রতীক। একটি সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। আজকের সঠিক পদক্ষেপই আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও সুন্দর পৃথিবী নিশ্চিত করতে পারে। পরিবেশ রক্ষা মানেই মানবজাতির ভবিষ্যৎ রক্ষা।

Post a Comment

0 Comments