জ্বলদর্চি

বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস/দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে

বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস

দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 

আজ ১৫ই জুন, বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস। আমাদের দেশ তথা সারা বিশ্বে প্রবীণদের উপরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বেড়েই চলছে,এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সচেতনতা দিবসটি পালন করা হয়। আসুন এই সম্পর্কে সবকিছুই জেনে নিই।
বিশ্ব প্রবীণ সচেতনতা বলতে মূলত, প্রবীণ বা বয়স্ক ব্যক্তিদের প্রতি শারীরিক, মানসিক, আর্থিক নির্যাতন ও অবহেলার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং তাঁদের অধিকার নিশ্চিত করাই এই দিবসটির প্রধান লক্ষ্য।
মানুষের জীবনের শেষ অধ্যায় হলো,বার্ধক্য। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা,ত্যাগ,পরিশ্রম ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবীণরা পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে থাকেন, অথচ জীবনের এই পর্যায়ে এসে অনেক প্রবীণই অবহেলা, অপমান, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। এই উদ্বেগজনক বাস্তবতা সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করতে প্রতি বছর ১৫ই জুন পালিত হয় বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস।
২০০৬ সালে, এই দিবস পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ২০১১ সালে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটির স্বীকৃতি দেয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, প্রবীণদের প্রতি সব ধরনের নির্যাতন ও বৈষম্য বন্ধ করা এবং তাঁদের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা।
প্রবীণ নির্যাতন বলতে, শুধু শারীরিক আঘাতকেই বোঝায় না। এটি বিভিন্ন রূপে প্রকাশ পেতে পারে। শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি মানসিক নির্যাতন, অর্থনৈতিক শোষণ, অবহেলা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং কখনও, কখনও যৌন নির্যাতনও এর অন্তর্ভুক্ত। অনেক প্রবীণকে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেই অপমানজনক কথা শুনতে হয়, তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না কিংবা তাঁদের সম্পত্তি ও সঞ্চয় জোরপূর্বক আত্মসাৎ করা হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রবীণদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, খাদ্য বা সঙ্গ থেকেও বঞ্চিত করা হয়।
🍂
বর্তমান সমাজে প্রবীণ নির্যাতনের অন্যতম কারণ হলো, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তন। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে। কর্মব্যস্ত জীবনে অনেকেই বয়স্ক বাবা-মায়ের জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রা ও প্রজন্মগত দূরত্বও প্রবীণদের একাকিত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে। অর্থনৈতিক চাপ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং সচেতনতার অভাবও প্রবীণ নির্যাতনের কারণ হিসেবে কাজ করে।
প্রবীণ নির্যাতনের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। এটি শুধু তাঁদের শারীরিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে না,বরং মানসিক সুস্থতাকেও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। নির্যাতিত প্রবীণরা প্রায়ই বিষণ্নতা, উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসহীনতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হন। অনেকেই নিজেদের পরিবারের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন। ফলে তাঁদের জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় পাওয়া যায় সে সমাজ তার প্রবীণদের কতটা সম্মান ও মর্যাদা দেয়, তার মাধ্যমে। প্রবীণরা আমাদের পরিবারের অভিভাবক, সংস্কৃতির ধারক এবং অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার। তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি মানবিকতারও দাবি। তাই প্রবীণ নির্যাতন প্রতিরোধে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করতে হবে।
পরিবারের সদস্যদের উচিত প্রবীণদের সময় দেওয়া, তাঁদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া। সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার শিক্ষা দিতে হবে। সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং গণমাধ্যমকেও সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে হবে। একই সঙ্গে প্রবীণদের সুরক্ষার জন্য কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রবীণরা বোঝা নন, বরং তাঁরা আমাদের জীবনের অমূল্য সম্পদ। তাঁদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান এবং ভালোবাসা সমাজকে সমৃদ্ধ করে। তাই তাঁদের প্রতি অবহেলা বা নির্যাতনের কোনো স্থান থাকতে পারে না। আসুন, আমরা সবাই প্রবীণদের সম্মান করি, তাঁদের পাশে দাঁড়াই এবং এমন একটি সমাজ গড়ে তুলি যেখানে প্রত্যেক প্রবীণ নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সুখী জীবনযাপন করতে পারেন। এটাই হবে বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস পালনের প্রকৃত তাৎপর্য।

Post a Comment

0 Comments