জ্বলদর্চি

প্রকৃতি বাঁচলে তবেই বাঁচবে মানব সভ্যতা/পুলকরঞ্জন চক্রবর্তী

প্রকৃতি বাঁচলে তবেই বাঁচবে মানব সভ্যতা

পুলকরঞ্জন চক্রবর্তী

"পৃথিবীর পুরানো সেই অন্ধকার মেশা গন্ধের ভিতর—আমি চলে যাবো— তবু ইতিহাস র’বে তার নদীটির তীরে,মানুষ আসিবে আর মানুষের ঘরের প্রদীপগুলো জ্বেলে চলে যাবে—প্রকৃতি র’বে তার শান্ত, চিরন্তন মায়া নিয়ে ফিরে।"

মানব সভ্যতার ইতিহাস মূলত প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কেরই ইতিহাস। আদিম মানুষ নির্ভর করে ছিল প্রকৃতির ওপরেই। প্রকৃতিই তাদের লালন করেছিল লক্ষ লক্ষ বছর ধরে। আদিমকাল থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ তার প্রতিটি প্রয়োজনেই  নির্ভর করেছে প্রকৃতির ওপরেই।
প্রকৃতিই দিয়েছে খাবার, হিংস্র পশুর হাত থেকে বাঁচতে দিয়েছিল গুহার আশ্রয়, গাছের কোটর। মানব সভ্যতার জন্ম, বিকাশ এবং অস্তিত্বের মূলে ছিল প্রকৃতির অনন্ত সাহচর্য।  প্রকৃতি কেবল মানুষকে আশ্রয়ই দেয়নি, বরং মায়ের মতো স্নেহ ও যত্নে লালন-পালন করে সভ্যতার আলোয় আলোকিত করেছে।
আদিম যুগে মানুষ যখন সম্পূর্ণ অসহায় ছিল, তখন প্রকৃতিই ছিল তার একমাত্র ভরসা। 
🍂
সভ্যতার সবচেয়ে বড় আবিষ্কার ছিল 'আগুন' এবং 'চাকা' । মানুষ প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করেই পেয়েছিল সেই আগুন আর চাকার ধারনা। মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রূপান্তরটি ঘটেছিল কৃষিকাজের মাধ্যমে। উর্বর মাটি, অনুকূল আবহাওয়া এবং জলবায়ুর সাহায্য ছাড়া কৃষি উৎপাদন অসম্ভব ছিল। । নদী থেকে পাওয়া জল এবং পলিমাটি কৃষিকাজকে সহজ করে তুলেছিল, যা যাযাবর মানুষকে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শিখিয়েছে। সিন্ধু, মিসরীয়, মেসোপটেমিয়া বা হোয়াংহো—পৃথিবীর সব প্রাচীন ও শ্রেষ্ঠ সভ্যতাই গড়ে উঠেছিল কোনো না কোনো নদীর তীরে, যা প্রকৃতিরই দান।
একটি শিশু যেমন মায়ের  স্নেহে বড় হয়, মানব সভ্যতাও তেমনি প্রকৃতির উপাদানে পুষ্ট হয়েছে বছরের পর বছর ধরে। মাটি আমাদের ফসল দিয়েছে, যা সভ্যতার ক্ষুধা মিটিয়েছে। গাছের তুলা, পশুর চামড়া বা রেশম থেকে মানুষ বস্ত্র তৈরি করতে শিখেছে। গাছপালা প্রতিনিয়ত কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে আমাদের জন্য অক্সিজেন সরবরাহ করে চলেছে। অরণ্যের কাঠ, পাথর এবং খনিজ সম্পদ ব্যবহার করে মানুষ বহুতল ভবন থেকে শুরু করে আধুনিক পরিকাঠামো তৈরি করেছে। কয়লা, খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সভ্যতার চাকাকে রেখেছে সচল।

প্রকৃতি মানুষের কেবল শারীরিক চাহিদাই মিটিয়েছে এমন নয়, মানুষের মনের বিকাশও ঘটিয়েছে প্রকৃতি। প্রকৃতির শান্ত, স্নিগ্ধ ও রূপময় পরিবেশ মানুষকে চিন্তাশীল ও সৃজনশীল করে তুলেছে। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য, সংগীত, চিত্রশিল্প এবং দর্শন গড়ে উঠেছে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে। ঋতু পরিবর্তনের বৈচিত্র্য মানুষের উৎসব, সংস্কৃতি এবং জীবনযাত্রাকে সমৃদ্ধ করেছে।
সমস্যা হলো,  প্রকৃতি মানুষকে অকাতরে দান করলেও,  মানুষ কিন্ত সেই দানের মর্যাদা কখনও দেয়নি। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে মানুষ প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে আজ প্রকৃতি হয়ে উঠেছে বিপন্ন। নিজেদের 
বসতি স্থাপন এবং কলকারখানার জন্য নির্বিচারে বন কেটে সাফ করেছে মানুষ । বাতাস, জল এবং মাটি আজ মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে উঠেছে। প্লাস্টিক ও রাসায়নিক বর্জ্য নদী ও সমুদ্রের জীবনকে বিপন্ন করে তুলেছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বা গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এবং অসময়ে বন্যা ও খরা দেখা দিচ্ছে। জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের কারনে দেখা দিয়েছে বন্যপ্রাণীদের আবাসন সংকট।

প্রকৃতি যেমন শান্ত ও দয়াময়, তেমনি রুষ্ট হলে সে হতে পারে চরম ভয়ঙ্করও। মানুষ যখন প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করে, প্রকৃতি তখন রুদ্ররূপে প্রতিশোধ নেয়। সাম্প্রতিক সময়ে ঘনঘন ঘূর্ণিঝড়, দাবানল, ভূমিকম্প এবং অতিমারির প্রকোপ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির নিয়মের বাইরে গিয়ে মানব সভ্যতা টিকে থাকতে পারে না। প্রকৃতি ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না, কিন্তু মানুষ ছাড়াও প্রকৃতি নিজের মতো চলতে পারে।
মানব সভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষা করতে হলে আমাদের অবিলম্বে প্রকৃতির প্রতি যত্নশীল হতে হবে। টেকসই উন্নয়ন বা 'সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট' 
(Sustainable Development)
-এর নীতি গ্রহণ করতে হবে, যেখানে প্রকৃতির ক্ষতি না করে উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়।

আমাদের আরও বেশি করে গাছ লাগাতে হবে, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে হবে এবং নবায়নযোগ্য শক্তির যেমন সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি ইত্যাদির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
ভাবতে হবে, প্লাস্টিকের বিকল্প ব্যবহার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ নিয়ে। পরিবেশ রক্ষায় কঠোর আইন প্রণয়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও জরুরী। 

প্রকৃতি বাঁচলে তবেই বাঁচবে মানব সভ্যতা। আসলে , প্রকৃতি ও মানব সভ্যতা  একে অপরের পরিপূরক। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের যুগে দাঁড়িয়েও মানুষ প্রকৃতির বিকল্প তৈরি করতে পারেনি। তাই নিজের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই মানুষকে প্রকৃতির প্রতি যত্নবান হতে হবে। ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক স্তর পর্যন্ত পরিবেশ রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। মনে রাখতে হবে, প্রকৃতি মানুষের লোভের সামগ্রী নয়, বরং আগামী প্রজন্মের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। প্রকৃতি বাঁচলে তবেই বাঁচবে মানুষ, সচল থাকবে সভ্যতার চাকা। প্রকৃতির সঙ্গে শত্রুতা নয়, বরং বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থানের মাধ্যমেই মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হতে পারে।

Post a Comment

0 Comments