গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ
পর্ব- চব্বিশ
রতনতনু ঘাটী
আজ আশপাশের গ্রামের সকলেই শুনেছে গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট মাঠে কিছু একটা হচ্ছে! কেউ-কেউ মাঠে এসে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনকে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘হ্যাঁ গো, আজই কি স্কুলের সেই ক্রিকেট ম্যাচের ফাইনাল খেলা হবে নাকি? কই আগে তো শুনিনি?’
পাশের লোকটি গদগদ কণ্ঠে বলল, ‘না না। আজ ক্রিকেট কোচিং দেখতে আসছেন নবীনগঞ্জ জেলার ডি এম সাহেব। তাই এত সাজোসাজো! ওই তো দেখতে পাচ্ছেন না, ডি এম সাহেব হেডস্যারের পাশের চেয়ারে বসে আছেন?’
এতক্ষণে তিথিবকুল গ্রাম থেকে এসে অমূল্য ধর প্রথমে ডি এম সাহেবকে নমস্কার করলেন। তারপর নমস্কার করলেন নবনীতস্যারকে। তাঁর পিছন-পিছন এসে গেলেন কাঁকনকুষি গ্রামের একাদশী পাল। তাঁরই পিছনে এলেন ছোট জগৎপুর গ্রামের অভিরূপ দলুই। এবার সবুজ রঙের লতাপাতা আঁকা শাড়ি পরে এসে পৌঁছলেন মাধবগঞ্জের অঞ্চলপ্রধান সেঁজুতি সামন্ত। চোখে সরু সোনালি ফ্রেমের চশমা। কপালে মস্ত বড় লাল টিপ।
তক্ষুনি দর্শকদের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল লোকন। ইস, আজ দিদিকে আসতে মানা করে এলাম। দিদি এলে এই আনন্দের ভাগ পেত মনে-মনে। তক্ষুনি লোকন দেখতে পেল, ঘন্টিদাদু অঞ্চলপ্রধান সেঁজুতি সামন্তের পাশের চেয়ারে কাকে যেন বসতে বলছেন? ওই তো আমার দিদি! আমার কথা মান্য না করেই দিদি ঠিক চলে এসেছে আজকের ক্রিকেট কোচিং ম্যাচে। মনটা খুশিতে ভরে গেল লোকনের।
তখনই টস করলেন মুকুলকৃষ্ণস্যার। লোকন টসে হেড নিয়েছিল। টসে হেড পড়লও। দেবোপমস্যার লোকনকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কী নেবে লোকন, ব্যাটিং না বোলিং?’
কিচ্ছু না ভেবেই লোকন বলে দিল, ‘আমরা ব্যাটিং নেব স্যার!’
দেবোপমস্যার ঘোষণার ভঙ্গিতে বললেন, ‘আজকের খেলায় সি-সেকশান ব্যাটিং করবে। তা হলে রোরো, তোমাদের এ-সেকশানের বোলিং টিম সাজিয়ে ফ্যালো! আজকের খেলা হবে পাঁচ ওভার করে। প্রত্যেক ওভার হবে আগের দিনের মতোই তিন বলের ওভার।
তখনই হেডস্যার মাইকে ঘোষণা করলেন, ‘আমাদের ডি এম সাহেব আজকের প্রধান অতিথি। তাঁকে ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করে নিচ্ছে ক্লাস ফাইভের সাতনরী গায়েন।’
ডি এম সাহেব পুষ্পস্তবকটি নিয়ে ফের সাতনরীর হাতেই ফিরিয়ে দিলেন। দর্শকদের হাততালিতে মুখর হয়ে উঠল গগনজ্যোতি স্কুলের মাঠ। এবার হেডস্যার নবনীত মুখোপাধ্যায় ঘোষণা করলেন, ‘আজ ক্রিকেট কোচিংয়ের সূচনা হবে একটা গান দিয়ে। খালি গলায় সেই সূচনা-সঙ্গীতটি গাইবেন আমাদের ইংরেজির দেবারতি ম্যাম!’
মাইক্রোফোন নিয়ে দেবারতি ম্যাম গান গাইলেন ‘আজ সবার রঙে রঙ মিশাতে হবে/ওগো আমার প্রিয়, তোমার রঙিন উত্তরীয়/পরো পরো পরো তবে।’
এদিকে ক্রিজে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে পড়ল সি-সেকশানের ক্যাপ্টেন লোকন দাস। ওদিকে ক্রিজে ব্যাট হাতে দাঁড়াল তাহিরা দত্ত।
ডি এম সাহেব হেডস্যারকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার ক্রিকেট টিম গড়েছেন ছেলেমেয়েদের একসঙ্গে নিয়ে?’
হেডস্যার বললেন, ‘হ্যাঁ, আমরা ছাত্রছাত্রীদের একসঙ্গে ক্রিকেটে উৎসাহিত করার কথা ভেবে এটা করেছি! আমাদের স্কুল তো কো-এডুকেশন। তা ছাড়া আমাদের ইন্ডিয়ার মেয়েদের ক্রিকেট টিম এবার বিশ্বকাপ জিতেছে। আমরা যদি স্কুল লেভেলে ছাত্রীদের উৎসাহ না দিই, তবে আগামী দিনে মেয়েদের মধ্যে থেকে নতুন ক্রিকেটার উঠে আসবে কেমন করে?’
মুকুলকৃষ্ণবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ, ঠিক কথা, তবে ডি এম সাহেব, আপনার ইন্টার স্কুল ক্রিকেট টুর্নামেন্টে কিন্তু ছেলেদের আর মেয়েদের আলাদা আলাদা টিম নিতে হবে। এখান থেকে মেয়েদের বিশ্বকাপের প্রাথমিক ক্রিকেটার বেছে নিতে হবে তো?’
এবার বোলিং করতে এগিয়ে এল এ-সেকশানের দীক্ষা সেন। দীক্ষা বাঁ-হাতি বোলার। তার আদর্শ ভারতের বাঁ-হাতি বোলার স্মৃতি মান্ধানা। স্মৃতির বাবা শ্রীনিবাস মান্ধানা এবং ভাই শ্রমণ দু’জনেই জেলা স্তরে ক্রিকেট খেলতেন। তাঁরাই স্মৃতি মন্থানার ক্রিকেটের প্রেরণা!
ওদিকে স্কোর বোর্ডের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে সি-সেকশানের বিপ্লব দলুই। এটা তার প্রিয় বিষয়। সে সব সময়ই স্কোর বোর্ডে খেলার আপডেট করতে থাকে।
দেবোপমস্যার হাত তুলে দীক্ষা সেনকে বল করতে নির্দেশ দিলেন। বাঁ-হাতি বোলারকে খেলতে অসুবিধে হয় লোকনের, এটা জানে এ-সেকশানের ক্যাপ্টেন রোরো। তাই লোকন দাসের বিরুদ্ধে বল করতে এনেছে দীক্ষাকে। তবে যে খেলতে পারে, সে সব ধরনের বলকে তার ব্যাটের নাগালে নিয়ে আসতে কোনও অসুবিধে হয় না। এবারও তাই হল। লোকন ব্যাট পেতে যেন দীক্ষার প্রথম বলটাকে ব্যাটের ডগায় এনে সজোরে হুক করে পাঠিয়ে দিল উইকেট কিপারের মাথার উপর দিয়ে বাউন্ডারির বাইরে।
দেবোপমস্যার বললেন, ‘দীক্ষা, তুমি ঘূর্ণি বল দাও! ইন্ডিয়ার বাঁ-হাতি স্পিনার রাধা যাদবের মতো বল করো!’
এর পরের বল করল দীক্ষা। স্পিন বল ছিল। লোকন পুরোপুরি বৈভব সূর্যবংশীর ঢঙে বলটাকে ছক্কা মারল সজোরে। দর্শকরা চেঁচিয়ে উঠল, ‘লোকন, সিক্সার চাই!’
পারুলমণি চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। সে তো বল দেখতে পাচ্ছে না। দর্শকদের চিৎকার শুনে পারুলমণি বুঝতে পারছে, ভাই এই বলে ছক্কা হাঁকিয়েছে। তার ভাই আজ দারুণ ফর্মে আছে।
এবার দীক্ষার এই ওভারের লাস্ট বল। এবার বাঁ হাতের ভেলকিতে লোকনকে কাবু করবে এমন মনোবল এনে বল করল দীক্ষা। বলটা ছিল গুগলি। এমন বল করল, যাতে লোকন রান তুলতে না পারে, অথবা আউট হয়ে যায়। কিন্তু লোকনকে সপাটে গুগুলি বল মারতে দেখে ডি এম সাহেব উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে বাহবা দিলেন লোকনকে। এবারও অবলীলায় ছক্কা তুলে নিল লোকন। এই ওভারে ষোলো রান চলে এল লোকনের সংগ্রহে।
মাথা ঝাঁকিয়ে দীক্ষা হতাশ হয়ে ক্রিজে দাঁড়িয়ে পড়ল। এবার বল করতে ডাকল রোরো বোলার হর্ষা মণ্ডলকে। দেবোপমস্যার হাততালি দিয়ে রোরোর ক্যাপটেন্সির প্রশংসা করলেন। হর্ষা এ-সেকশানের উইকেট কিপার। দীক্ষা বলটা ছুঁড়ে দিল হর্ষার দিকে। হর্ষা উইকেট কিপিংয়ের ঢঙে বলটা লুফে নিল। দু’ বার শ্যাডো প্র্যাকটিস করল হর্ষা। এবার বল করতে দৌড় শুরু করল।
ব্যাট হাতে স্থির হয়ে ক্রিজে দাঁড়িয়েছিল লোকন। বৈভব সূর্যবংশীর মতো তিনবার ব্যাটটাকে শূন্যে চালানোর ভঙ্গি করল। তারপর হর্ষা বল করল। বলটার উপর চোখ রেখে লোকন দু’ স্টেপ এগিয়ে গিয়ে বলটাকে মাটিতে পড়তেই দিল না। শূন্যে উড়িয়ে পাঠিয়ে দিল সিক্সার এরিয়ায়। দর্শকরা চিৎকার করে উঠল ‘লোকন, আরও সিক্সার চাই!’
মুকুলকৃষ্ণবাবু ডি এম সাহেবের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘কী স্যার, দেখলেন তো? আমি এই ছেলেটির কথাই আপনাকে বলছিলাম? ওর ব্যাট হাঁকানোটা দেখলেন? ঠিক যেন রাজস্থান রয়্যালসের বৈভব সূর্যবংশী আমাদের স্কুলের মাঠে খেলছে! কী, আমি ঠিক বলছি কিনা স্যার বলুন?’ বলে ডি এম সাহেবের মুখের দিকে তাকালেন মুকুলকৃষ্ণবাবু!’
হেডস্যার নবনীতবাবু আত্মতৃপ্তির গলায় বললেন, ‘আমাদের এই ছেলেটির মুখের দিকে আমরা তাকিয়ে আছি স্যার।’
ডি এম সাহেব বললেন, ‘আপনার স্কুলের ক্রিকেট কোচিং দেখতে না এলে দেখতেই পেতাম না, আপনি নীরবে কী সব রত্ন তৈরি করছেন!’
স্কোর বোর্ডে রান কারেকশান করে বিপ্লব ঠিক করে দিল, লোকনের রান হল, বাইশ। তখনই মুকুলকৃষ্ণবাবু ডি এম সাহেবকে বললেন, ‘জানেন স্যার, এই স্কোর বোর্ড আপডেশানের কাজটি বেশ কঠিন! সেবার কী যে ব্লান্ডার ঘটেছিল স্কোর বোর্ডের ভুলে! আমি সেবার একটা কাজে শ্রীলঙ্কায় ছিলাম দু’ হাজার বারো সালে। তখন শ্রীলঙ্কায় বন্দর নগরী গালেতে গালে দুর্গের কাছের আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে টেস্ট খেলা হচ্ছিল। আমি টিকিট কেটে পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ জাতীয় দলের বিরুদ্ধে টেস্ট ম্যাচ দেখতে ঢুকে পড়েছিলাম। টেস্টে শ্রীলঙ্কার কুমার সঙ্গকারা ১৯৩ রানে ব্যাট করছিলেন। তখনই একটা ছক্কা হাঁকান। তাঁর রান অ্যাকচুয়ালি তখন ১৯৯। কিন্তু স্কোরবোর্ডে ভুল করে ২০০ রান দেখাল। ডাবল সেঞ্চুরি হয়ে গেছে ভেবে সঙ্গকারা উদযাপন করতে শুরু করে দেন। তারপর আসলে যা ঘটল, কিছুক্ষণ পরেই দলের শেষ নুয়ান প্রদীপের উইকেট পড়ে যায়। এবং সঙ্গকারাকে ১৯৯ রানেই অপরাজিত থাকতে হয়।’
ডি এম সাহেব বললেন, ‘মুকুলকৃষ্ণবাবু, আপনি তো ক্রিকেটের দারুণ-দারুণ খবর রাখেন। একদিন সময় করে আপনার মুখ থেকে ক্রিকেটে এরকম অনেক সত্যি গল্প শুনব।’
এবার পরের বল খেলার আগে মাথা তুলে লোকন চারদিকে দর্শকদের দেখে নিল। হেডস্যার বলে উঠলেন, ‘দেখুন দেখুন, লোকন দর্শকদের চিয়ার্সটা ব্যাটে মেখে নিল। দেখি, এবারের বলটা কেমন খেলে?’
আসলে লোকন দর্শকদের মাঝে বসে থাকা তার দিদি পারুলমণিকে দেখে নিল একবার। মনে-মনে ঠিক করে নিল, দিদিকে খুশি করতে এবারও তাকে সিক্সার মারতেই হবে।
হর্ষার সেকেন্ড বল স্টাম্পের উপর ছিল। অনায়াসে লোকনের ছক্কা তুলে নিতে কোনও অসুবিধেই হল না। স্কোর বোর্ডে লোকনের রান হয়ে গেল আঠাশ।
মুকুলকৃষ্ণবাবু বললেন হেডস্যারকে, ‘লোকন মনে হয় একা পুরো পাঁচ ওভারই খেলবে। আর কাউকে ব্যাট করতে দেবে না!
এবার হর্ষার এই ওভারের লাস্ট বল। হেডস্যার বললেন, ‘দেখি, লোকন শেষ বলটা কেমন খেলে!’
ডি এম সাহেব হেডস্যারকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা নবনীতবাবু, এই তিন বলের ওভারের ব্যাপারটা তো বুঝতে পারলাম না?’
হেডস্যার বললেন, ‘কোচিং টাইমে বেশি ক্রিকেটারকে যাতে খেলার সুযোগ দেওয়া যায়, তাই এই নিয়মটা আমাদের স্পোর্টসের দেবোপমস্যারের ক্রিয়েশান!’
‘বাঃ! ব্যাপারটা বেশ ভাল!’ ডি এম সাহেব নড়েচড়ে বসলেন। তখনই হর্ষার ওভারের লাস্ট বলটা ছুটে এল লোকনের ব্যাটের দিকে। দারুণ ঘূর্ণি বল! পুরোপুরি পরাস্ত হল লোকন। নিমেষে উইকেট ভেঙে গেল। লোকন দু’ ওভারে আঠাশ রান করে আউট হয়ে গেল।
এবার ডি এম সাহেব বললেন, ‘নবনীতবাবু, আমি আজ চলি! অফিসে অনেক কাজ পড়ে আছে! আজ পুরো কোচিংটা দেখে যেতে পারলাম না! ফাইনাল খেলা হবে নিশ্চয়ই কোনও একটা রোববার। আমাকে আগেভাগে জানিয়ে দেবেন। সেদিন আমি পুরো সময়টা খেলা দেখব! হাতে কোনও কাজ রাখব না। ক্রিকেট আমার খুব প্রিয়!’
মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি এগিয়ে গেলেন গাড়ির দিকে ডি এম সাহেবকে নিয়ে। ফের বাকি খেলা শুরু করতে কিছুটা সময় নিলেন দেবোপমস্যার। এ-সেকশানের এখনও তিন ওভার বল বাকি। এ-সেকশানের ক্যাপ্টেন রোরো এখন একটু নিশ্চিন্ত হয়েছে। মাত্র আঠাশ রানে আউট করতে পেরেছে লোকন দাসকে।
(এর পর ২৫ পর্ব)
এবার রোরো বল করতে ডাকল ধৃতি নায়েককে। ধৃতি জোরে বোলার। আমাদের ইন্ডিয়ান ক্রিকেটের যশপ্রীত বুমরার মতো বল ঘোরাতে জানে। যেমন ব্যাটার বুঝতে পারে না, বুমরার বল উইকেটের উপর আছড়ে পড়বে, নাকি নো বল হবে! ধৃতির বলও ওরকম।
ওদিকে লোকনের জায়গায় ক্রিজে এসে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়েছে রকি দেববর্মা। রকির তত কবজিতে জোর নেই। তাই ছক্কা হাঁকাতে পারে না বটে, কিন্তু এক ওভারের তিনটে বলে তিনটে বাউন্ডারি মেরেছে, এমন উদাহরণ কম নেই। রকি ধৃতির প্রথম বলে জোরের সঙ্গে বাউন্ডারি মারল। এবার পরের বল ধৃতির। এবারও সপাটে বাউন্ডারি তুলে নিল রকি। সকলেই আশায় ছিল, তৃতীয় বলটাতেও রকি চার মারবে। না, তা হল না। রকি বলের নাগাল পেল না, ব্যাটেই লাগাতে পারল না বলটা। বল গড়িয়ে চলে গেল ফিল্ডারের হাতে। ধৃতির ওভার থেকে মোট আট রান হল রকির। এবার সি-সেকশানের চতুর্থ ওভারের ব্যাটিংয়ের জন্যে ক্রিজে দাঁড়িয়ে থাকল রকি। বল করতে এবার রোরো পাঠাল অরিত্র বর্মণকে।
অরিত্র প্রথম বলটা স্পিন করল। বলটা আস্তে করে উইকেট
এর পাশ দিয়ে চলে গেল উইকেট কিপারের হাতে। রকির এই বলে কোনও রান হল না! সেকেন্ড বলটা ক্রিজে খানিকটা আগে ড্রপ খেয়ে লাফিয়ে উঠে রকির ব্যাটে এসে লাগল। রকি ব্যাট চালাল বটে। তেমন ভাবে ব্যাটে বল লাগল না। ব্যাটের কানায় লেগে বল থার্ডম্যান অঞ্চলে মাঠেই থেমে গেল। দৌড়ে এই ফাঁকে দু’ রান তুলে নিল রকি দেববর্মা। এবার ওভারের শেষ বল করল অরিত্র। বলটা হুক করে নিজের মাথার উপর দিয়ে ঘুরিয়ে পাঠিয়ে দিল উইকিপারের পিছন দিয়ে। কোনও ফিল্ডার ছিল না। তাই বিনা বাধায় বল বাউন্ডারি সীমানা টপকে গেল। রকির সংগ্রহে চলে এল চার রান, নট আউট।
সি-সেকশান এবার লাস্ট ওভার ব্যাট করবে। রোরো একটু ভেবে নিল মিনিট তিনেক। নিজেদের ক্রিকেটারদের সঙ্গে কিছু একটা আলোচনা করে নিল।
তারপর সকলকে অবাক করে দিয়ে বল করতে এগিয়ে এল রোরো নিজেই। ওদিকে রকি দেববর্মাকে আউট করা যায়নি তখনও। এবার ক্যাপ্টেন হিসেবে নিজের কাঁধেই দায়িত্ব তুলে নিল রোরো।
মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি হেডস্যারকে গলা নামিয়ে বললেন, ‘আপনাদের এই রোরো ছেলেটি খুব ম্যাচিওর। ও দেখল, যখন কোনও মতেই উইকেট ফেলা যাচ্ছে না, তখন নিজেই ঝুঁকি নিয়ে বল করতে এগিয়ে এল। দেখি কেমন বল করে রোরো। শুনেছি রোরো খুব ভাল ব্যাটসম্যানও। তবে ভাল ব্যাটসম্যানও কিন্তু কখনও কখনও দুর্দান্ত বল করতে পারে। তার বড় উদাহরণ সচিন তেন্ডুলকর।’
হেডস্যার জানতে চাইলেন, ‘কীরকম?’
মুকুলকৃষ্ণসেনাপতি বললেন, ‘১৯৯৩ সালে ইডেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে ইন্ডিয়ার ফাইনাল খেলা। আমি যথারীতি ক্লাব হাউসের পাশে জমিয়ে বসে খেলা দেখছিলাম। ভারত ওদের দিয়েছিল ২২৬ রানের টার্গেট। ওই রান তাড়া করতে নেমে শেষ ওভারে ক্যারিবিয়ানদের জয়ের জন্য দরকার ছিল ৬ রান, হাতে ছিল ৩ উইকেট। ভারতের অধিনায়ক মহম্মদ আজহারউদ্দিন তখন অবাক কাণ্ড করে বসলেন। শেষ ওভারে বল করার জন্যে বল তুলে দিলেন তরুণ ক্রিকেটার সচিন তেন্ডুলকরের হাতে।’
‘আমরা দর্শকরা মাথায় হাত দিয়ে ভেঙে পড়লাম। কিন্তু নির্ভীক চিত্তে সচিন বল করতে এগিয়ে এলেন। প্রথম বলটি ছিল ডট বল। কোনও রান হল না। দ্বিতীয় বল করলেন। এক রান নিলেন ব্রায়ান লারা। তৃতীয় বলে কেনি বেঞ্জামিন রান আউট হয়ে গেলেন। তখন ইডেন গার্ডেন্স উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছে। এবার চতুর্থ বল করলেন সচিন। এই বলে কোনও রান হল না! এবার পঞ্চম বল করলেন সচিন। রান আউট হয়ে গেলেন কার্টলে অ্যামব্রোস। এবার ওভারের শেষ বল করলেন সচিন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটাররা কোনও রান নিতে পারলেনই না। বরং রান আউট হয়ে গেলেন ইয়ান বিশপ। শেষ ওভারে মাত্র ৫ রান দিয়ে ইন্ডিয়াকে জিতিয়ে দিয়েছিলেন সচিন তেন্ডুলকর। সচিনের সেই দুরন্ত বেলিং কখনও ভুলতে পারিনি!’
রোরো প্রথম বলটা করল ডট বল। কোনও রান তুলতে পারল না রকি দেববর্মা। এবার রোরোর সেকেন্ড বল ছিল ঘূর্ণি বল। রকি চোখ বুজে মারতে গিয়ে সটান ফিল্ডার কাহ্ন ব্যানার্জির হাতে ধরা পড়ে গেল।
মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি বলে উঠলেন, ‘কী নবনীতস্যার? দেখলেন তো রোরো কী কাণ্ডটাই না করে ফেলল?’
হেডস্যার সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লেন। এবার লোকন দাস ব্যাট
করতে পাঠাল সারিন দাসকে। সারিন ক্রিজে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে পড়ল। তখনই লাস্ট বলটা রোরোর হাত থেকে বুলেটের মতো ক্ষিপ্র গতিতে এসে কিছু বুঝে ওঠার আগেই স্টাম্প ছিটকে গেল। শূন্য রানে আউট হয়ে গেল সারিন দাস।
সি-সেকশান পাঁচ ওভারের খেলায় এই ইনিংসে করল বাহান্ন রান। দেবোপমস্যার বিরতির বাঁশি বাজিয়ে দিলেন। ঘন্টিদাদু মুকুলকৃষ্ণবাবু, হেডস্যার আর অন্য স্যার এবং ম্যামদের চায়ের ব্যবস্থা করলেন। চা দিলেন অমূল্য ধর, একাদশী পাল, অভিরূপ দলুইক এবং মাধবগঞ্জের অঞ্চলপ্রধান সেঁজুতি সামন্তকে।
(এর পর ২৫ পর্ব)
0 Comments