জ্বলদর্চি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ২০৯

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ২০৯
সম্পাদক : স্বাগতা পাণ্ডে
চিত্র গ্রাহক: কৃষ্ণপ্রসাদ সংগ্রাম

সম্পাদকীয় 

প্রিয় বন্ধুরা, 
আশা করি  সবাই নিশ্চয়ই খুব ভালো আছো। পত্রিকা তোমাদের কেমন লাগছে? ভালো লাগছে নাকি মোটামুটি লাগছে?  কারো কারো কি একদম ই ভালো লাগছে না ? আচ্ছা একটা কাজ করা যাক, কার কেমন লাগছে সেটা আমাকে লিখে জানাও। আমি তোমাদের চিঠিপত্র নিয়ে বরং আর একটা নতুন বিভাগ শুরু করি । কি গো সবাই লিখবে তো ? অবশ্যই লিখে জানাবে কিন্তু। সেই সঙ্গে তোমাদের পরামর্শ চাই যে নতুন আর কি কি বিভাগ শুরু করা যায় আমাদের পত্রিকাতে। শুধু ছোটরা কেন , বড় রাও তাদের মতামত অবশ্যই জানান। 
আজ তাহলে এই পর্যন্তই, সবাই ভালো থাকো, সুস্থ থাকো। অনেক ভালবাসা নিও সবাই। 
ইতি - তোমাদের স্বাগতাদি


দূরের মায়া 

রোশেনারা খান

ঐ যে দূরে মাঠের কোনে ঝাঁকড়া যে এক গাছ,
তারই তলায় লতায় পাতায় হাজার পাখির নাচ।
সন্ধ্যা বেলা থামিয়ে খেলা পাখিরা যায় উড়ে,
অনেক দূরে সবুজডুরে ওখানে তার কুড়ে।
নামলে রাত,মাথায় হাত আঁধারে সব ঢাকা,
ঠিক যেন আকাশখানি ছাই রঙে মাখা।
অনেক রাতে চোখ খুলে যেই তাকায় আকাশ পানে,
কোথায় আঁধার? চাঁদের আলো ছড়িয়ে সবখানে।
দিনের আলো লাগে ভালো কত ফুল আর পাখি ,
রূপোর নদী,সোনালী ধান রোদে মাখামাখি।
দিনও ভালো রাতও ভালো ভালো সবাই জেনো,
ঈশ্বরের সৃষ্টি সবই  বিভেদ কর কেনো

ছড়া 

যায় ছড়িয়ে
চিন্ময় দাশ 

ছড়া   যায় ছড়িয়ে যায়
ছড়া   আকাশ খুঁজে পায় 
ছড়া   শঙ্খচিলের ডানা 
ছড়া   ভয় করতে মানা 
ছড়া   কু-ঝিক-ঝিক রেল 
ছড়া   অঙ্কে ডাহা ফেল 
ছড়া   বকুলতলীর মাঠ 
ছড়া   বিষুদবারের হাট 
ছড়া   শীতের তেলেভাজা 
ছড়া   মেলার কাঠিগজা 
ছড়া   বিষ্টি টাপুর-টুপুর 
ছড়া   শালুক-ফোটা পুকুর 
ছড়া   সাঁঝের তুলসিতলা 
ছড়া   দিদির শোলক বলা 
ছড়া   তাল পড়ল দু-উ-ম 
ছড়া   পড়তে পড়তে ঘুম।।

🍂

গল্প  (ছোটদের জন্য)    
তারা-র চোর ধরা    
অসিতবরণ বেরা     

তারাপদ-র বাড়ির পাশেই থাকে পিলুজেঠু।  পিলুজেঠুর আসল নাম হরিপদ দাস। ছোটোবেলায়  পিলে হয়েছিল বলে সবাই 'পিলু' বলে ডাকত। ডাকত মানে নামের পাশে সম্পর্কটা বসিয়ে নিত। যেমন পিলুদা, পিলুকা, পিলুমামা, পিলুজেঠু -- এইরকম আর কী!    
পিলুজেঠুর ছিল একটা দোকান। দোকানের নাম 'হ-য-ব-র-ল'। ছোটো দোকান। নামের সঙ্গে তাল রেখে নানা মনোহারী জিনিসে ঠাসা। তারা-র কাছে লোভনীয় জিনিস  বলতে নারকেল নাড়ু,  তেলেভাজা বীট নুন দেওয়া চিনা বাদাম, কাবলি ছোলা ভাজা। এসব জিনিস পিলুজেঠিমা যত্ন করে নিজের হাতে তৈরি করে দিতেন। পিলুজেঠু কাঁচের জারে সেগুলো সাজিয়ে রাখত। তারাপদ তো বটেই স্কুলের ছেলেরাও  ঐসব জিনিসের লোভে পিলুজেঠুর দোকানে ভিড় জমাত। পিলুজেঠুর দোকানে দই চিড়ে খাওয়ার ব্যবস্থা যেমন ছিল তেমনই সাজা পানও বিক্রি হত।         
সেদিন তারাপদ বাদাম কিনতে গিয়েছিল।  পিলুজেঠু চুপচাপ ঠোঙা ধরিয়ে দিল তারা-র হাতে। তারা তো অবাক! হল কী পিলুজেঠুর! খদ্দেরের সঙ্গে বকরবকর করা পিলুজেঠুর স্বভাব। অথচ আজ হাসি নেই,  প্রশ্ন নেই, বকরবকরও নেই!        
তারাপদ আর পারল না। জিজ্ঞেস করল, "পিলুজেঠু, তোমার কী হয়েছে?"        
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পিলুজেঠু বলল,"আর বলিস না। প্রতিদিনই আমার দোকানে কিছু-না-কিছু জিনিস চুরি হচ্ছে।"        
"চুরি! কী জিনিস চুরি হচ্ছে?"        
"এই ধর, সুপারি, সাবান এইরকম আর কী!"        
"ভারি আশ্চর্য তো! তোমার চোখের সামনে থেকে নিয়ে যাচ্ছে অথচ ধরতে পারছ না?"        
"চোখের সামনে হলে কি আর ধরতে পারতাম  না? আসলে চুরিটা হচ্ছে চোখের আড়ালে।"        
"কী রকম শুনি?"        
"দোকানের ভিতরে মালপত্র রাখার একটা রুম আছে না? ওখান থেকে চুরিটা হচ্ছে।"       
"বাঃ, চোরটা তোমার সামনে  দিয়ে তোমার প্রাইভেট রুমে ঢুকে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। তুমি দেখছ, বুঝতে পারছ অথচ ধরতে পারছ না? বুঝেছি, আসলে জেঠিমা চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে বলে ধরছ না। তাই  তো জেঠু?"
"আমি মরছি চোরের জ্বালায় আর তুই আমার সঙ্গে রঙ্গ করছিস?"        
"না না, তোমার কথা এখনও আমার কাছে পরিষ্কার হচ্ছে না।"        
"শোন, দইওয়ালা, মুড়িওয়ালা--এইরকম কয়েকজন ভিতরে গিয়ে জিনিসপত্র রেখে আসে। এদেরই মধ্যেই কেউ নিশ্চয় মালপত্র সরায়। "        
"তাহলে ওদের প্রত্যেককে সার্চ করলেই ধরা পড়ে যাবে।"        
"যাকে সার্চ করলাম সে যদি কিছু না নিয়ে থাকে, তাহলে সে অপমানিত হবে না?"        
"চুরি না করে চোর অপবাদ পেলে অবশ্যই অপমানিত হবে।"        
"তাহলে? শতকরা একশো ভাগ নিশ্চিত না হয়ে সার্চ করা উচিত হবে না।"        
"ঠিক বলেছ পিলুজেঠু। মিথ্যে সার্চ  করলে তুমিও ওদের কাছে ছোট হয়ে যাবে। ঠিক আছে, আমি একবার ভেতরটা দেখব।"        
"যা দেখে আয়।"        
ছোট দরজা ঠেলে ভিতরের ঘরে ঢুকল তারাপদ।  গুমোট আবহাওয়া। নানা জিনিসের মিশ্র গন্ধে দম বন্ধ হওয়ার জোগাড়। আলোর সুইচটা টিপে তারা আলো জ্বালালো।  কম ওয়াটের বাল্ব। ভিতরে তাই অনুজ্জ্বল আলো। সেই অনুজ্জ্বল আলোয় তারা দেখল, নানা জিনিসপত্রে ঠাসা পিলুজেঠুর গোডাউন। শেষ প্রান্তে রয়েছে একটা কাঠের সিঁড়ি। কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠল সে। উপরে কাঠের পাটাতন দিয়ে একটা ছাদ করা হয়েছে। পিলুজেঠু সেখানে অব্যবহৃত ভাঙা জিনিসপত্রে ঠেসে দিয়েছে। তারা সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে। তারপর আলো নিভিয়ে বাইরে আসে।        
"কি রে তারা, কী বুঝলি?"        
"উঃ, তোমার ভিতরের ঘরটা যাচ্ছেতাই নোংরা, অপরিষ্কার।  উপরে ঝুল,ধুলো -- দম বন্ধ হওয়ার অবস্থা!"        
"তুই আবার কী করতে উপরে উঠলি? ওখানে তো কেউ ওঠে না।"        
"উঠবে কী করে? এত আবর্জনা জমিয়ে রেখেছ কেন? ওখানে তো আরশোলা ইঁদুরের বাসা। মনে হয়, আরশোলা, ইঁদুরগুলোই জিনিস নিয়ে পালায়। তুমি লোক লাগিয়ে পরিষ্কার করাও। আরশোলা, ইঁদুর মারার ব্যবস্থা নাও। দেখবে, আর জিনিসপত্র চুরি হচ্ছে না।"        
"বলছিস? ঠিক আছে, বৃহস্পতিবার বাজার বন্ধের দিন। ঐ দিন পরিষ্কার করব।"    
শনিবার পিলুজেঠুর দোকানে তারাপদ এলে পিলুজেঠু বলে, "তারা, তোর কথা মতো দোকান পরিষ্কার করলাম। কিন্তু চুরি যথারীতি চলছে।"        
"পিলুজেঠু,  তোমার মাল সাপ্লায়াররা ক'টার মধ্যে আসে?"        
"তা সবাই সকাল আটটা থেকে দশটার মধ্যে এসে যায়।"        
"ঠিক আছে পিলুজেঠু। আমার দু বন্ধুকে নিয়ে কাল আটটার মধ্যে চলে আসব। কাল রবিবার।  তোমার সাপ্লায়াররা সবাই আসবে তো?"        
"রবিবারে সবাই আসে।"   
"বেশ, তাহলে কাল আসছি। দেখা যাক, তোমার চোর বাবাজীবনকে ধরতে পারি কি না।"
রবিবার সকাল আটটার একটু আগে তারাপদ তার দু বন্ধু সূর্য ও চন্দ্রকে নিয়ে পিলুজেঠুর দোকানে হাজির হল। তখন দোকানে কোন খদ্দের ছিল না। পিলুজেঠু একা বসে মালপত্তর সাজাচ্ছে। তারা চুপিচুপি বলে,"পিলুজেঠু, সূর্য চন্দ্র তোমার দোকানের সামনে বেঞ্চে বসে থাকবে। আমি ভিতরে গিয়ে লুকিয়ে থাকব। চোরকে মালসমেত ধরব। তুমি একটুও ঘাবড়াবে না। কেমন?"      
"আরে, শোন তারা, ভিতরে ছোট জায়গায় কীভাবে লুকাবি? তোকে দেখতে পেয়ে গেলে আবার একটা কেলেঙ্কারি হবে।"        
"আঃ, পিলুজেঠু! আমার উপর একটু ভরসা রাখো।"        
আর কথা না বাড়িয়ে পকেট থেকে ছোট চাইনিজ টর্চ বের করে তারাপদ দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে পড়ে। পিলুজেঠু চন্দ্র সূর্যকে বলে,"দেখ, তোরা সব ছোট ছেলে। কি করতে কী হবে কে জানে। আমার  তো ভয়ে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে।"        
সূর্য  বলে,"পিলুজেঠু, তারার কাছে প্ল্যানটা শুনে আমরা নিশ্চিত,  চোর আজ ধরা পড়বেই।"        
"দেখা যাক।" পিলুজেঠুর কণ্ঠে অবিশ্বাস!        
এমন সময় দইওয়ালা এসে হাজির। সে একটা হাঁড়ি পিলুজেঠুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বাকি আর একটা হাঁড়ি ভিতরে রাখতে যায়। সূর্য চন্দ্র নড়েচড়ে বসে। দু মিনিট পরে দইওয়ালা ফিরে এসে পিলুজেঠুর কাছ থেকে টাকা নিয়ে চলে যায়। সূর্য  চন্দ্র  পিলুজেঠু ভিতরের দরজার দিকে তাকিয়ে হতাশ হয়।        
এরপর পিলুজেঠুর দোকানে খদ্দেরদের চিড়ে-দই, মুড়ি-বাদাম, খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। এরই মাঝে চিড়েওয়ালা চিড়ে, পানওয়ালা পান রাখতে ভিতরে ঢোকে। আবার জিনিস রেখে টাকা নিয়ে চলে যায়। তবু তারার কোন সাড়া-শব্দ নেই।  শেষে পিলুজেঠুর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। আশঙ্কিত হয়ে পিলুজেঠু বলল," সূর্য, তারার সাড়া-শব্দ নেই। কী হল বলত?"        
"পিলুজেঠু, তোমায় জিনিস বিক্রি করতে আর কতজন আসবে বলতে পার?"        
"আর রয়েছে মুড়িওয়ালা। বহুদিন  ধরে মুড়ি দেয়। বয়স্ক,  ভারি ভালো লোক। তারার কী হল ভিতরে গিয়ে একবার দেখি, কী বলিস চন্দ্র?"        
"দাঁড়াও, দাঁড়াও জেঠু। মনে হয় তোমার মুড়িওয়ালা আসছে।"        
এই কথা বলে চন্দ্র চুপ করে বসে পড়ে। মুড়িওয়ালা মুড়ি বস্তা নিয়ে ভিতরে ঢোকে। কিছুক্ষণ পরে সে বেরিয়ে আসে। তার বস্তা তখন ছোট হয়ে গেছে। পিলুজেঠুর কাছ থেকে টাকা নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে আসে। এমন সময় ভিতর থেকে হুইসেলের আওয়াজ। সূর্য, চন্দ্র এতক্ষণ এই আওয়াজের জন্য অপেক্ষা করছিল। ওরা দুজনে মুড়িওয়ালাকে জাপটে ধরে। বয়স্ক মুড়িওয়ালা দুটি কিশোরের সঙ্গে পেরে ওঠে না। বলে,"আঃ, ছাড়ো ছাড়ো,  কী হল তোমাদের? এভাবে ধরছ কেন?"
পিলুজেঠু বলে,"চন্দ্র সূর্য, ছাড় ছাড়, বুড়ো মানুষ, লেগে যাবে যে!"        
চন্দ্র সূর্য একসঙ্গে বলে ওঠে,"এই লোকটাই  তোমার জিনিস চুরি করে, পিলুজেঠু। "        
"কী যা-তা বলছ খোকারা? আমি চোর? পিলুবাবু, আপনি কিছু বলছেন না কেন?"        
এমন সময় কালি-ঝুলি মেখে ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে তারাপদ।  বলে,"পিলুজেঠু, এই লোকটাই চোর। আজ তোমার দোকানের একটা সানলাইট সাবান, একটা লাক্স সাবান আর কিছু সুপারি নিয়েছে। সাবান দুটো মুড়ি বস্তায় আর ওর ট্যাঁকে রয়েছে সুপারিগুলো।"        
এই বলে তারা মুড়িওয়ালার  ট্যাঁক থেকে সুপারিগুলো বের করে পিলুজেঠুকে দেয়।        
পিলুজেঠু একরাশ ঘৃণা নিয়ে বলে,"আপনি আমার সঙ্গে এতদিন ব্যবসা  করছেন। ছি-ছি-ছি, আমার বিশ্বাসটাই ভেঙে দিলেন। আপনি কখ্খনো আমার দোকানে আসবেন না।"        
চন্দ্র সূর্য ও তারা একসঙ্গে বলে ওঠে,"পিলুজেঠু চোরকে মারতে পারলে নাকি দারুণ সুখ। একটু হাতের সুখ করে নিই।"        
"না-না, তাতে তাদের হাত অপবিত্র হয়ে যাবে।"        
ইতিমধ্যে ছাড়া পেয়ে মুড়িওয়ালা ভিড়ের মধ্যে দৌড়ে পালাল। মজা করে তিন বন্ধু বলে,"চোর-চোর-চোর, ধর-ধর-ধর।"          
পিলুজেঠু এবার বলে,"তারা, তুই  কোথায় লুকিয়েছিলি? চুরি করা কীভাবে দেখলি?"        
"পিলুজেঠু,  আমি সিঁড়ি  দিয়ে উপরে উঠে ঘাপটি মেরে শুয়ে উঁকি মেরে সব দেখছিলাম। যখন হাল প্রায় ছেড়ে দিয়েছি তখন দেখলাম, তোমার এই মুড়িওয়ালার কীর্তি! ও চুরি করে বেরিয়ে যাবার পর তো হুইসেল।"        
পিলুজেঠু তিনটে বড় ঠোঙায় তিন বন্ধুকে বাদাম ভাজা, ছোলা ভাজা আর নারকেল নাড়ু দিয়ে দারুণ লোভনীয় জলখাবার পরিবেশন করে।

ডাক্তার বাবুর কলমে ২ 

ডাঃ এ সামন্ত 
MD হোমিওপ্যাথি 
কুইকোটা, মেদিনীপুর 


রাই দৌড়ে এসে কাঁদতে কাঁদতে তার মা কে বলল " মা মা দেখো দেখো আমি দিদির সঙ্গে খেলছিলাম, দিদি না আমাকে কেমন খামচিয়ে রক্ত বের করে দিয়েছে"। এই রকমের ঘটনার সম্মুখীন আমরা বাড়ীতে, স্কুলে, খেলার মাঠে প্রায়ই হয়ে থাকি। আর তাছাড়া যাদের হাতের নখ ভালোভাবে কাটা থাকে না তারা হাত ধোয়ার দশটি ধাপ মেনে চললেও নখের কোনায় লেগে থাকা জীবাণুরা সহজেই রোগ ছড়াতে পারে। তাই এইসব সমস্যা থেকে বাঁচতে আমাদের মনে রাখতেই হবে নিয়মিত নখ কাটা, স্বাস্থ্য বিধি ও পরিচ্ছন্নতার অন্যতম অংশ। নখ  সবসময় সোজা ও গোলাকার ভাবে কাটা বা ট্রিম করা উচিৎ। নখ একেবারে গোড়া থেকে কাটা বা ধারালো কোণ তৈরী করা একেবারেই উচিত নয়। এতে নখ দুর্বল হয়ে যেতে পারে, নেল বেডে আঘাত লাগতে পারে আবার নেল বেডে সংক্রমণের ফলে নখকুণি (paronychia) হতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে নখ মৃত কোষ দিয়ে তৈরী হলেও নেল বেড জীবিত কোষ দিয়ে তৈরী যা কিন্তু খুবই সংবেদনশীল। আর হ্যাঁ আর একটা কথা, দাঁত দিয়ে নখ একেবারেই কাটবে না , এতে মুখের ভেতরে ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করে ও দাঁতের গঠন নষ্ট হয়। যেহেতু শিশু দের নখ তাড়াতাড়ি বাড়ে , তাই ওদের নখ সপ্তাহে দুবার কাটা  যেতে পারে। নখ কাটার সময় খুব ছোট্ট  শিশুরা নড়াচড়া করার ফলে তাদের হাতের আঙ্গুল কেটে যেতে পারে, তাই ছোট শিশুদের  ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় তাদের নখ কাটা সবচেয়ে সহজ। স্নানের পরে বা গরম জলে হাত পা ভিজিয়ে রাখলে নখ নরম হয় তখন নখ কাটা সহজ হয়। নখ কাটার পর নখ শুকনো হলে তারপর  নেল ফাইল দিয়ে নখের ধারালো ও অসমান প্রান্ত গুলি ঘষে মসৃন করে নিতে হবে, এবং তারপর অবশ্যই সাবান দিয়ে হাত ভালো ভাবে পরিস্কার করে পর্যাপ্ত পরিমাণ জল দিয়ে হাত ধুয়ে নিতে হবে ও অ্যান্টিসেপটিক লোশন হাতে লাগিয়ে নিতে হবে। এই ভাবে নখের যত্ন নিলে নখের সৌন্দর্য ও স্বাস্থ্য ভালো থাকে।

 গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ 

পর্ব- চব্বিশ

রতনতনু ঘাটী 

   আজ আশপাশের গ্রামের  সকলেই শুনেছে গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট মাঠে কিছু একটা হচ্ছে! কেউ-কেউ মাঠে এসে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনকে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘হ্যাঁ গো, আজই কি স্কুলের সেই ক্রিকেট ম্যাচের ফাইনাল খেলা হবে নাকি? কই আগে তো শুনিনি?’

   পাশের লোকটি গদগদ কণ্ঠে বলল, ‘না না। আজ ক্রিকেট কোচিং দেখতে আসছেন নবীনগঞ্জ জেলার ডি এম সাহেব। তাই এত সাজোসাজো! ওই তো দেখতে পাচ্ছেন না, ডি এম সাহেব হেডস্যারের পাশের চেয়ারে বসে আছেন?’

   এতক্ষণে তিথিবকুল গ্রাম থেকে এসে অমূল্য ধর প্রথমে ডি এম সাহেবকে নমস্কার করলেন। তারপর নমস্কার করলেন নবনীতস্যারকে। তাঁর পিছন-পিছন এসে গেলেন কাঁকনকুষি গ্রামের একাদশী পাল। তাঁরই পিছনে এলেন ছোট জগৎপুর গ্রামের অভিরূপ দলুই। এবার সবুজ রঙের লতাপাতা আঁকা শাড়ি পরে এসে পৌঁছলেন মাধবগঞ্জের অঞ্চলপ্রধান সেঁজুতি সামন্ত। চোখে সরু সোনালি ফ্রেমের চশমা। কপালে মস্ত বড় লাল টিপ।

তক্ষুনি দর্শকদের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল লোকন। ইস, আজ দিদিকে আসতে মানা করে এলাম। দিদি এলে এই আনন্দের ভাগ পেত মনে-মনে। তক্ষুনি লোকন দেখতে পেল, ঘন্টিদাদু অঞ্চলপ্রধান সেঁজুতি সামন্তের পাশের চেয়ারে কাকে যেন বসতে বলছেন? ওই তো আমার দিদি! আমার কথা মান্য না করেই দিদি ঠিক চলে এসেছে আজকের ক্রিকেট কোচিং ম্যাচে। মনটা খুশিতে ভরে গেল লোকনের। 

   তখনই টস করলেন মুকুলকৃষ্ণস্যার। লোকন টসে হেড নিয়েছিল। টসে হেড পড়লও। দেবোপমস্যার লোকনকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কী নেবে লোকন, ব্যাটিং না বোলিং?’

   কিচ্ছু না ভেবেই লোকন বলে দিল, ‘আমরা ব্যাটিং নেব স্যার!’

   দেবোপমস্যার ঘোষণার ভঙ্গিতে বললেন, ‘আজকের খেলায় সি-সেকশান ব্যাটিং করবে। তা হলে রোরো, তোমাদের এ-সেকশানের বোলিং টিম সাজিয়ে ফ্যালো! আজকের খেলা হবে পাঁচ ওভার করে। প্রত্যেক ওভার হবে আগের দিনের মতোই তিন বলের ওভার।

   তখনই হেডস্যার মাইকে ঘোষণা করলেন, ‘আমাদের ডি এম সাহেব আজকের প্রধান অতিথি। তাঁকে ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করে নিচ্ছে ক্লাস ফাইভের সাতনরী গায়েন।’

   ডি এম সাহেব পুষ্পস্তবকটি নিয়ে ফের সাতনরীর হাতেই ফিরিয়ে দিলেন। দর্শকদের হাততালিতে মুখর হয়ে উঠল গগনজ্যোতি স্কুলের মাঠ। এবার হেডস্যার নবনীত মুখোপাধ্যায় ঘোষণা করলেন, ‘আজ ক্রিকেট কোচিংয়ের সূচনা হবে একটা গান দিয়ে। খালি গলায় সেই সূচনা-সঙ্গীতটি গাইবেন আমাদের ইংরেজির দেবারতি ম্যাম!’

    মাইক্রোফোন নিয়ে দেবারতি ম্যাম গান গাইলেন ‘আজ সবার রঙে রঙ মিশাতে হবে/ওগো আমার প্রিয়, তোমার রঙিন উত্তরীয়/পরো পরো পরো তবে।’

  এদিকে ক্রিজে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে পড়ল সি-সেকশানের ক্যাপ্টেন লোকন দাস। ওদিকে ক্রিজে ব্যাট হাতে দাঁড়াল তাহিরা দত্ত।

   ডি এম সাহেব হেডস্যারকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার ক্রিকেট টিম গড়েছেন ছেলেমেয়েদের একসঙ্গে নিয়ে?’

   হেডস্যার বললেন, ‘হ্যাঁ, আমরা ছাত্রছাত্রীদের একসঙ্গে ক্রিকেটে উৎসাহিত করার কথা ভেবে এটা করেছি! আমাদের স্কুল তো কো-এডুকেশন। তা ছাড়া আমাদের ইন্ডিয়ার মেয়েদের ক্রিকেট টিম এবার বিশ্বকাপ জিতেছে। আমরা যদি স্কুল লেভেলে ছাত্রীদের উৎসাহ না দিই, তবে আগামী দিনে মেয়েদের মধ্যে থেকে নতুন ক্রিকেটার উঠে আসবে কেমন করে?’

   মুকুলকৃষ্ণবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ, ঠিক কথা, তবে ডি এম সাহেব, আপনার ইন্টার স্কুল ক্রিকেট টুর্নামেন্টে কিন্তু ছেলেদের আর মেয়েদের আলাদা আলাদা টিম নিতে হবে। এখান থেকে মেয়েদের বিশ্বকাপের প্রাথমিক ক্রিকেটার বেছে নিতে হবে তো?’

   এবার বোলিং করতে এগিয়ে এল এ-সেকশানের দীক্ষা সেন। দীক্ষা বাঁ-হাতি বোলার। তার আদর্শ ভারতের বাঁ-হাতি বোলার স্মৃতি মান্ধানা। স্মৃতির বাবা শ্রীনিবাস মান্ধানা এবং ভাই শ্রমণ দু’জনেই জেলা স্তরে ক্রিকেট খেলতেন। তাঁরাই স্মৃতি মন্থানার ক্রিকেটের প্রেরণা!

   ওদিকে স্কোর বোর্ডের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে সি-সেকশানের বিপ্লব দলুই। এটা তার প্রিয় বিষয়। সে সব সময়ই স্কোর বোর্ডে খেলার আপডেট করতে থাকে। 

   দেবোপমস্যার হাত তুলে দীক্ষা সেনকে বল করতে নির্দেশ দিলেন। বাঁ-হাতি বোলারকে খেলতে অসুবিধে হয় লোকনের, এটা জানে এ-সেকশানের ক্যাপ্টেন রোরো। তাই লোকন দাসের বিরুদ্ধে বল করতে এনেছে দীক্ষাকে। তবে যে খেলতে পারে, সে সব ধরনের বলকে তার ব্যাটের নাগালে নিয়ে আসতে কোনও অসুবিধে হয় না। এবারও তাই হল। লোকন ব্যাট পেতে যেন দীক্ষার প্রথম বলটাকে ব্যাটের ডগায় এনে সজোরে হুক করে পাঠিয়ে দিল উইকেট কিপারের মাথার উপর দিয়ে বাউন্ডারির বাইরে।

   দেবোপমস্যার বললেন, ‘দীক্ষা, তুমি ঘূর্ণি বল দাও! ইন্ডিয়ার বাঁ-হাতি স্পিনার রাধা যাদবের মতো বল করো!’

   এর পরের বল করল দীক্ষা। স্পিন বল ছিল। লোকন পুরোপুরি বৈভব সূর্যবংশীর ঢঙে বলটাকে ছক্কা মারল সজোরে। দর্শকরা চেঁচিয়ে উঠল, ‘লোকন, সিক্সার চাই!’

   পারুলমণি চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। সে তো বল দেখতে পাচ্ছে না। দর্শকদের চিৎকার শুনে পারুলমণি বুঝতে পারছে, ভাই এই বলে ছক্কা হাঁকিয়েছে। তার ভাই আজ দারুণ ফর্মে আছে। 

   এবার দীক্ষার এই ওভারের লাস্ট বল। এবার বাঁ হাতের ভেলকিতে লোকনকে কাবু করবে এমন মনোবল এনে বল করল দীক্ষা। বলটা ছিল গুগলি। এমন বল করল, যাতে লোকন রান তুলতে না পারে, অথবা আউট হয়ে যায়। কিন্তু লোকনকে সপাটে গুগুলি বল মারতে দেখে ডি এম সাহেব উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে বাহবা দিলেন লোকনকে। এবারও অবলীলায় ছক্কা তুলে নিল লোকন। এই ওভারে ষোলো রান চলে এল লোকনের সংগ্রহে।

   মাথা ঝাঁকিয়ে দীক্ষা হতাশ হয়ে ক্রিজে দাঁড়িয়ে পড়ল। এবার বল করতে ডাকল রোরো বোলার হর্ষা মণ্ডলকে। দেবোপমস্যার হাততালি দিয়ে রোরোর ক্যাপটেন্সির প্রশংসা করলেন। হর্ষা এ-সেকশানের উইকেট কিপার। দীক্ষা বলটা ছুঁড়ে দিল হর্ষার দিকে। হর্ষা উইকেট কিপিংয়ের ঢঙে বলটা লুফে নিল। দু’ বার শ্যাডো প্র্যাকটিস করল হর্ষা। এবার বল করতে দৌড় শুরু করল।

   ব্যাট হাতে স্থির হয়ে ক্রিজে দাঁড়িয়েছিল লোকন। বৈভব সূর্যবংশীর মতো তিনবার ব্যাটটাকে শূন্যে চালানোর ভঙ্গি করল। তারপর হর্ষা বল করল। বলটার উপর চোখ রেখে লোকন দু’ স্টেপ এগিয়ে গিয়ে বলটাকে মাটিতে পড়তেই দিল না। শূন্যে উড়িয়ে পাঠিয়ে দিল সিক্সার এরিয়ায়। দর্শকরা চিৎকার করে উঠল ‘লোকন, আরও সিক্সার চাই!’

   মুকুলকৃষ্ণবাবু ডি এম সাহেবের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘কী স্যার, দেখলেন তো? আমি এই ছেলেটির কথাই আপনাকে বলছিলাম? ওর ব্যাট হাঁকানোটা দেখলেন? ঠিক যেন রাজস্থান রয়্যালসের বৈভব সূর্যবংশী আমাদের স্কুলের মাঠে খেলছে! কী, আমি ঠিক বলছি কিনা স্যার বলুন?’ বলে ডি এম সাহেবের মুখের দিকে তাকালেন মুকুলকৃষ্ণবাবু!’ 

   হেডস্যার নবনীতবাবু আত্মতৃপ্তির গলায় বললেন, ‘আমাদের এই ছেলেটির মুখের দিকে আমরা তাকিয়ে আছি স্যার।’

   ডি এম সাহেব বললেন, ‘আপনার স্কুলের ক্রিকেট কোচিং দেখতে না এলে দেখতেই পেতাম না, আপনি নীরবে কী সব রত্ন তৈরি করছেন!’

   স্কোর বোর্ডে রান কারেকশান করে বিপ্লব ঠিক করে দিল, লোকনের রান হল, বাইশ। তখনই মুকুলকৃষ্ণবাবু ডি এম সাহেবকে বললেন, ‘জানেন স্যার, এই স্কোর বোর্ড আপডেশানের কাজটি বেশ কঠিন! সেবার কী যে ব্লান্ডার ঘটেছিল স্কোর বোর্ডের ভুলে! আমি সেবার একটা কাজে শ্রীলঙ্কায় ছিলাম  দু’ হাজার বারো সালে। তখন শ্রীলঙ্কায় বন্দর নগরী গালেতে গালে দুর্গের কাছের আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে টেস্ট খেলা হচ্ছিল। আমি টিকিট কেটে পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ জাতীয় দলের বিরুদ্ধে টেস্ট ম্যাচ দেখতে ঢুকে পড়েছিলাম। টেস্টে শ্রীলঙ্কার কুমার সঙ্গকারা ১৯৩ রানে ব্যাট করছিলেন। তখনই একটা ছক্কা হাঁকান। তাঁর রান অ্যাকচুয়ালি তখন ১৯৯। কিন্তু স্কোরবোর্ডে ভুল করে ২০০ রান দেখাল। ডাবল সেঞ্চুরি হয়ে গেছে ভেবে সঙ্গকারা উদযাপন করতে শুরু করে দেন। তারপর আসলে যা ঘটল, কিছুক্ষণ পরেই দলের শেষ নুয়ান প্রদীপের উইকেট পড়ে যায়। এবং সঙ্গকারাকে ১৯৯ রানেই অপরাজিত থাকতে হয়।’

   ডি এম সাহেব বললেন, ‘মুকুলকৃষ্ণবাবু, আপনি তো ক্রিকেটের দারুণ-দারুণ খবর রাখেন। একদিন সময় করে আপনার মুখ থেকে ক্রিকেটে এরকম অনেক সত্যি গল্প শুনব।’  

   এবার পরের বল খেলার আগে মাথা তুলে লোকন চারদিকে দর্শকদের দেখে নিল। হেডস্যার বলে উঠলেন, ‘দেখুন দেখুন, লোকন দর্শকদের চিয়ার্সটা ব্যাটে মেখে নিল। দেখি, এবারের বলটা কেমন খেলে?’

   আসলে লোকন দর্শকদের মাঝে বসে থাকা তার দিদি পারুলমণিকে দেখে নিল একবার। মনে-মনে ঠিক করে নিল, দিদিকে খুশি করতে এবারও তাকে সিক্সার মারতেই হবে।

   হর্ষার সেকেন্ড বল স্টাম্পের উপর ছিল। অনায়াসে লোকনের ছক্কা তুলে নিতে কোনও অসুবিধেই হল না। স্কোর বোর্ডে লোকনের রান হয়ে গেল আঠাশ।

   মুকুলকৃষ্ণবাবু বললেন হেডস্যারকে, ‘লোকন  মনে হয় একা পুরো পাঁচ ওভারই খেলবে। আর কাউকে ব্যাট করতে দেবে না!

   এবার হর্ষার এই ওভারের লাস্ট বল। হেডস্যার বললেন, ‘দেখি, লোকন শেষ বলটা কেমন খেলে!’

   ডি এম সাহেব হেডস্যারকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা নবনীতবাবু, এই তিন বলের ওভারের ব্যাপারটা তো বুঝতে পারলাম না?’

   হেডস্যার বললেন, ‘কোচিং টাইমে বেশি ক্রিকেটারকে যাতে খেলার সুযোগ দেওয়া যায়, তাই এই নিয়মটা আমাদের স্পোর্টসের দেবোপমস্যারের ক্রিয়েশান!’

   ‘বাঃ! ব্যাপারটা বেশ ভাল!’ ডি এম সাহেব নড়েচড়ে বসলেন। তখনই হর্ষার ওভারের লাস্ট বলটা ছুটে এল লোকনের ব্যাটের দিকে। দারুণ ঘূর্ণি বল! পুরোপুরি পরাস্ত হল লোকন। নিমেষে উইকেট ভেঙে গেল। লোকন দু’ ওভারে আঠাশ রান করে আউট হয়ে গেল। 

   এবার ডি এম সাহেব বললেন, ‘নবনীতবাবু, আমি আজ চলি! অফিসে অনেক কাজ পড়ে আছে! আজ পুরো কোচিংটা দেখে যেতে পারলাম না! ফাইনাল খেলা হবে নিশ্চয়ই কোনও একটা রোববার। আমাকে আগেভাগে জানিয়ে দেবেন। সেদিন আমি পুরো সময়টা খেলা দেখব! হাতে কোনও কাজ রাখব না। ক্রিকেট আমার খুব প্রিয়!’

   মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি এগিয়ে গেলেন গাড়ির দিকে ডি এম সাহেবকে নিয়ে। ফের বাকি খেলা শুরু করতে কিছুটা সময় নিলেন দেবোপমস্যার। এ-সেকশানের এখনও তিন ওভার বল বাকি। এ-সেকশানের ক্যাপ্টেন রোরো এখন একটু নিশ্চিন্ত হয়েছে। মাত্র আঠাশ রানে আউট করতে পেরেছে লোকন দাসকে। 

(এর পর ২৫ পর্ব)

এবার রোরো বল করতে ডাকল ধৃতি নায়েককে। ধৃতি জোরে বোলার। আমাদের ইন্ডিয়ান ক্রিকেটের যশপ্রীত বুমরার মতো বল ঘোরাতে জানে। যেমন ব্যাটার বুঝতে পারে না, বুমরার বল উইকেটের উপর আছড়ে পড়বে, নাকি নো বল হবে! ধৃতির বলও ওরকম।

   ওদিকে লোকনের জায়গায় ক্রিজে এসে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়েছে রকি দেববর্মা। রকির তত কবজিতে জোর নেই। তাই ছক্কা হাঁকাতে পারে না বটে, কিন্তু এক ওভারের তিনটে বলে তিনটে বাউন্ডারি মেরেছে, এমন উদাহরণ কম নেই। রকি ধৃতির প্রথম বলে জোরের সঙ্গে বাউন্ডারি মারল। এবার পরের বল ধৃতির। এবারও সপাটে বাউন্ডারি তুলে নিল রকি। সকলেই আশায় ছিল, তৃতীয় বলটাতেও রকি চার মারবে। না, তা হল না। রকি বলের নাগাল পেল না, ব্যাটেই লাগাতে পারল না বলটা। বল গড়িয়ে চলে গেল ফিল্ডারের হাতে। ধৃতির ওভার থেকে মোট আট রান হল রকির। এবার সি-সেকশানের চতুর্থ ওভারের ব্যাটিংয়ের জন্যে ক্রিজে দাঁড়িয়ে থাকল রকি। বল করতে এবার রোরো পাঠাল অরিত্র বর্মণকে।

   অরিত্র প্রথম বলটা স্পিন করল। বলটা আস্তে করে উইকেট

এর পাশ দিয়ে চলে গেল উইকেট কিপারের হাতে। রকির এই বলে কোনও রান হল না! সেকেন্ড বলটা ক্রিজে খানিকটা আগে ড্রপ খেয়ে লাফিয়ে উঠে রকির ব্যাটে এসে লাগল। রকি ব্যাট চালাল বটে। তেমন ভাবে ব্যাটে বল লাগল না। ব্যাটের কানায় লেগে বল থার্ডম্যান অঞ্চলে মাঠেই থেমে গেল। দৌড়ে এই ফাঁকে দু’ রান তুলে নিল রকি দেববর্মা। এবার ওভারের শেষ বল করল অরিত্র। বলটা হুক করে নিজের মাথার উপর দিয়ে ঘুরিয়ে পাঠিয়ে দিল উইকিপারের পিছন দিয়ে। কোনও ফিল্ডার ছিল না। তাই বিনা বাধায় বল বাউন্ডারি সীমানা টপকে গেল। রকির সংগ্রহে চলে এল চার রান, নট আউট।

   সি-সেকশান এবার লাস্ট ওভার ব্যাট করবে। রোরো একটু ভেবে নিল মিনিট তিনেক। নিজেদের ক্রিকেটারদের সঙ্গে কিছু একটা আলোচনা করে নিল।

   তারপর সকলকে অবাক করে দিয়ে বল করতে এগিয়ে এল রোরো নিজেই। ওদিকে রকি দেববর্মাকে আউট করা যায়নি তখনও। এবার ক্যাপ্টেন হিসেবে নিজের কাঁধেই দায়িত্ব তুলে নিল রোরো। 

   মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি হেডস্যারকে গলা নামিয়ে বললেন, ‘আপনাদের এই রোরো ছেলেটি খুব ম্যাচিওর। ও দেখল, যখন কোনও মতেই উইকেট ফেলা যাচ্ছে না, তখন নিজেই ঝুঁকি নিয়ে বল করতে এগিয়ে এল। দেখি কেমন বল করে রোরো। শুনেছি রোরো খুব ভাল ব্যাটসম্যানও। তবে ভাল ব্যাটসম্যানও কিন্তু কখনও কখনও দুর্দান্ত বল করতে পারে। তার বড় উদাহরণ সচিন তেন্ডুলকর।’

   হেডস্যার জানতে চাইলেন, ‘কীরকম?’ 

   মুকুলকৃষ্ণসেনাপতি বললেন, ‘১৯৯৩ সালে ইডেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে ইন্ডিয়ার ফাইনাল খেলা। আমি যথারীতি ক্লাব হাউসের পাশে জমিয়ে বসে খেলা দেখছিলাম। ভারত ওদের দিয়েছিল ২২৬ রানের টার্গেট। ওই রান তাড়া করতে নেমে শেষ ওভারে ক্যারিবিয়ানদের জয়ের জন্য দরকার ছিল ৬ রান, হাতে ছিল ৩ উইকেট। ভারতের অধিনায়ক মহম্মদ আজহারউদ্দিন তখন অবাক কাণ্ড করে বসলেন। শেষ ওভারে বল করার জন্যে বল তুলে দিলেন তরুণ ক্রিকেটার সচিন তেন্ডুলকরের হাতে।’

   ‘আমরা দর্শকরা মাথায় হাত দিয়ে ভেঙে পড়লাম। কিন্তু নির্ভীক চিত্তে সচিন বল করতে এগিয়ে এলেন। প্রথম বলটি ছিল ডট বল। কোনও রান হল না। দ্বিতীয় বল করলেন। এক রান নিলেন ব্রায়ান লারা। তৃতীয় বলে কেনি বেঞ্জামিন রান আউট হয়ে গেলেন। তখন ইডেন গার্ডেন্স উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছে। এবার চতুর্থ বল করলেন সচিন। এই বলে কোনও রান হল না! এবার পঞ্চম বল করলেন সচিন। রান আউট হয়ে গেলেন কার্টলে অ্যামব্রোস। এবার ওভারের শেষ বল করলেন সচিন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটাররা কোনও রান নিতে পারলেনই না। বরং রান আউট হয়ে গেলেন ইয়ান বিশপ। শেষ ওভারে মাত্র ৫ রান দিয়ে ইন্ডিয়াকে জিতিয়ে দিয়েছিলেন সচিন তেন্ডুলকর। সচিনের সেই দুরন্ত বেলিং কখনও ভুলতে পারিনি!’

   রোরো প্রথম বলটা করল ডট বল। কোনও রান তুলতে পারল না রকি দেববর্মা। এবার রোরোর সেকেন্ড বল ছিল ঘূর্ণি বল। রকি চোখ বুজে মারতে গিয়ে সটান ফিল্ডার কাহ্ন ব্যানার্জির হাতে ধরা পড়ে গেল।

   মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি বলে উঠলেন, ‘কী নবনীতস্যার? দেখলেন তো রোরো কী কাণ্ডটাই না করে ফেলল?’

   হেডস্যার সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লেন। এবার লোকন দাস ব্যাট

 করতে পাঠাল সারিন দাসকে। সারিন ক্রিজে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে পড়ল। তখনই লাস্ট বলটা রোরোর হাত থেকে বুলেটের মতো ক্ষিপ্র গতিতে এসে কিছু বুঝে ওঠার আগেই স্টাম্প ছিটকে গেল। শূন্য রানে আউট হয়ে গেল সারিন দাস। 

   সি-সেকশান পাঁচ ওভারের খেলায় এই ইনিংসে করল বাহান্ন রান। দেবোপমস্যার বিরতির বাঁশি বাজিয়ে দিলেন। ঘন্টিদাদু মুকুলকৃষ্ণবাবু, হেডস্যার আর অন্য স্যার এবং ম্যামদের চায়ের ব্যবস্থা করলেন। চা দিলেন অমূল্য ধর, একাদশী পাল, অভিরূপ দলুইক এবং মাধবগঞ্জের অঞ্চলপ্রধান সেঁজুতি সামন্তকে। 

(এর পর ২৫ পর্ব)

ক্যুইজ: ৮  

১. পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কোনটি? 
2.  কোন লোকসঙ্গীতে   একতারা প্রধান বাদ্যযন্ত্র? 
৩. পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্য বাহী সূচীকর্ম "কাঁথা সেলাই" মূলত কোন অঞ্চলের লোকশিল্প? 
৪. ছৌনাচ পশ্চিমবঙ্গের কোন জেলার ঐতিহ্য বাহী নৃত্য? 
৫. পশ্চিমবঙ্গের টেরাকোটা বা পোড়ামাটির কাজে তৈরী বিষ্ণুপুরের মন্দির গুলি কোন রাজার আমলে তৈরি?  


গত সপ্তাহের ক্যুইজ এর উত্তর

১. কলকাতা 
2. ভাগীরথী-হুগলী 
৩. ১৯৮৭ 
৪. পদ্মজা নাইডু  
৫. স্বামীনাথন পুরস্কার

  

Post a Comment

0 Comments