জ্বলদর্চি

হেরে গেলেন ভোলেবাবা (দ্বিতীয় পর্ব ) /সৌমেন রায়

 

হেরে গেলেন ভোলেবাবা 

(দ্বিতীয় পর্ব ) 

সৌমেন রায় 

চিত্র – কল্লোল মজুমদার 

(প্রথম পর্বের শেষ অংশ -বাবা অ্যায়সা ব্যাট হাঁকালো বল মেঘের মধ্যে হারিয়ে গেল। সবাই হাঁ করে একবার মেঘের দিকে দেখছে আর একবার শিবঠাকুরের দিকে। একটা ছেলে বলল, ‘বাপ রে! এতো সূর্যবংশীর বাবা’।)

বাবা  হলো ভোলেবাবা। স্বভাবে  যেমন  ভোলে ভালা,  ভুলেও যায়  সব। সে জানে গণেশ  আর  কার্তিক বলে তার দুই ছেলে আছে। সুর্যবংশী আবার কে? কিছুতেই  মনে  পড়ল  না। বাবা তাকালো ভৃঙ্গীর দিকে। 

ভৃঙ্গী বলল, ‘না না, ওই নামের একটা ছেলে এখন বোলারদের পিটিয়ে ছাতু করে দিচ্ছে। সে আপনার আপন ছেলে নয়। তবে সবাই তো আপনারই সন্তান’।

 খেলোয়াড়দের  মধ্য  থেকে একটা সিড়িঙ্গে মত ছেলে বলে উঠল, ‘এই কাকুকে খেলা নেওয়া যাবে না। বল হারিয়ে দিলে বল কোথায় পাবি?’ 

বেগতিক দেখে শিবঠাকুর ভৃঙ্গীকে ইশারা করতেই সে  মুহূর্তের  মধ্যে হিমালয়  পর্বতের  খাঁজে  আটকে থাকা  বলটা কুড়িয়ে ছুঁড়ে দিল। বলটা মেঘের ভিতর থেকে নেমে এলো। বাবা আবার ব্যাট হাতে দাঁড়ালো। কিন্তু সিড়িঙ্গে ছেলেটা  কিছুই শুনল না। 

’না না এই কাকু ম্যাজিক জানে। ম্যাজিক জানা লোকদের খেলায় নেওয়া যাবে না’।বলেই সে ব্যাটটা নিল কেড়ে।

অগত্যা  শিবঠাকুর আবার হাঁটতে লাগলো। কিছুদূর গিয়ে দেখে একটা আম গাছের ছায়ায় ঢোল বাজাচ্ছে কতগুলো ছেলে। ঠাকুর আমগাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে খানিকক্ষণ ওদের বাজনা শুনল। বোধহয় কম্পিটিশন হচ্ছে। একজন একজন  করে বাজাচ্ছে। বাজাচ্ছে মন্দ নয়। 

হঠাৎ ঠাকুর বলে উঠে, ‘আমায় দে, আমি একবার বাজাবো’।

 গলায়  ঢোলের দড়ি গলিয়ে বাজাতে লাগল ঠাকুর। তালে  তালে  সবাই  নাচতে লাগল। নাচতে  নাচতে  ভৃঙ্গি দেখে  কখন ষাঁড়  বাবাজিও এসে  নাচতে  শুরু  করেছে।

ভৃঙ্গি  তার  কাছে  গিয়ে  জিজ্ঞাসা  করল ,’ তুই ঘুমোবি  বললি  যে’?  ষাঁড়টা  কিছুই  বলল  না।  ভৃঙ্গিকে মুখ  ভেঙ্গিয়ে  আবার  নাচতে থাকল। বাজনার তালে নাচ যখন জমে উঠেছে তখনই হঠাৎ শিব ঠাকুরের ঢোলটা গেল ফেটে। 

বাচ্চাগুলো রেগেমেগে বলল, ‘তুমি খুব দুষ্টু লোক’।

 ‘দাঁড়া দাঁড়া, ঢোলটা এক্ষুনি সারিয়ে দিচ্ছি। আর তোদের সবাইকে একটা করে ঢোল দিচ্ছি’  বলে ব্যাপারটা  সামাল দেওয়ার  চেষ্টা করল  শিবঠাকুর ।

বাচ্চাগুলো শুনলই না। বলল, ‘না না, তোমায় ঢোল দিতে হবে না। বড়রা এইরকম অনেক মিথ্যে কথা বলে। এটা দেবো, ওটা দেবো ;  কিচ্ছু দেয় না। তুমি এক্ষুনি চলে যাও। না হলে  দেব তোমার গায়ে গোবর মাখিয়ে’। সত্যি সত্যি একটা ছেলে গোবর হাতে নিয়ে তাড়া করল  শিবঠাকুরকে ।

শিবঠাকুর ফাটা ঢোল গলা থেকে খুলে দিয়ে ছুটতে লাগলো। ছুটতে ছুটতে তার জল তেস্টা পেয়ে গেল। দেখল তারই ভক্তরা এক জায়গায় মাটির হাড়িতে লাল সালু বেঁধে জল খাওয়াচ্ছে  সক্কলকে । লাইনে দাঁড়িয়ে জল খেল  ঠাকুর। খাসা বানিয়েছে, লেবু আর জলজিরা দিয়ে। ঠিক পাশেই  মঞ্চ  বেঁধে হচ্ছিল একটা  ক্যুইজ কম্পিটিশন। বিষয় ‘শিবের গাজন’। একজন প্রশ্ন করছে আর বাচ্চাগুলো সব পটাপট উত্তর দিচ্ছে। শিবঠাকুরের শ্বশুর ঘর কোথায় ? স্ত্রীর নাম কি! এসব নানা প্রশ্ন। ক্যুইজ মাস্টার একটা প্রশ্ন করল, ‘প’ দিয়ে শিবঠাকুরের একটা নাম বল। একটা ছেলে  পট করে  বলে  দিল  পিনাকপানি। ঠাকুর মনে মনে বিড়বিড় করল, ‘ভোলানাথ, মহাদেব, মহেশ্বর, ভোলেবাবা  এগুলো শুনেছি। কিন্তু এই  পিনাকপানি নামটা আবার রাখল কে’?দেখেশুনে ভোলে বাবারও ক্যুইজ খেলতে  মন  করল।

 এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘আমিও খেলব’। 

উদ্যোক্তারা খুব আল্লাদিত। শিব খেলবে শিবের ক্যুইজ   । লাউড স্পিকার হাতে দাঁড়ালো শিবঠাকুর। প্রশ্ন শুরু করলো ক্যুইজ মাস্টার। প্রথম  প্রশ্ন  হলো শিবের শ্বশুরের নাম কি? ঠাকুর গেল ভেবলে। তার তো কিছুই মনে থাকে না । মনে পড়ল বিয়ে হয়েছিল বটে। কিন্তু শ্বশুরের নাম --  মনে তো নেই। নন্দী  অদৃশ্য  হয়ে  কানে কানে বলে গেল হিমালয়। শিবঠাকুর বলে উঠল , ‘ হ্যাঁ, হ্যাঁ --- হিমালয় , হিমালয়’। এই রকম দু’চারটে প্রশ্নের  পর  ক্যুইজ  মাস্টার প্রশ্ন করল, 

‘শিবের ছোট ছেলের নাম কি’? 

এবার ভোলেবাবা  ফটাক করে বলে দিল, ‘সবাই জানে  - সূর্যবংশী ‘!

হো হো করে হাসির রোল উঠল চারিদিকে। ভোলেবাবা  ভয় পেয়ে ঘামতে শুরু করল। কি ভুল  হল বুঝতেই  পারল  না ।আবার কিনা কি প্রশ্ন করবে এই ভেবে  বাবা  বলে উঠল,  ‘আ ---আমি আর খেলব না বাবা’। 

 ক্যুইজ মাস্টার  মহা  আনন্দে  বারবার মাইকে ঘোষণা করতে লাগলো, ‘ হেরে গেলেন  ভোলেবাবা, নিজের ক্যুইজ নিজেই হেরে গেলেন  ভোলে- এ- এ- এ- বা  বা -আ আ ’।

স্টেজ থেকে নেমে বাবা নন্দী আর ভৃঙ্গীকে বলল, ‘এ তো দেখছি এরা আমার ব্যাপারে আমার থেকেও বেশি জানে! কি  চনমনে ছেলেপুলে  রে সব !  চল, আর গা সেঁকে কাজ নেই। মন্দিরেই  বরং গ্যাঁট হয়ে বসি’।  তিনজনে হাঁটা  লাগাল মন্দিরের দিকে।

🍂

Post a Comment

7 Comments

  1. বড্ড মজার.
    এটার নাট্যরূপ ভীষণ মজার হবে.

    ReplyDelete
    Replies
    1. AnonymousJuly 10, 2026

      ধন্যবাদ 🙏

      Delete
  2. AnonymousJuly 10, 2026

    ভোলে বাবার এই হলো সমস্যা। উনি বলেন এক আর করেন আর এক।অথচ এমন‌ই এক মানুষের থুড়ি দেবতার ফলোয়ারের সংখ্যা কতো! শ্বশুর মশাইয়ের নাম ভুলে যাওয়া তেমন অমার্জনীয় অপরাধ হয়তো নয়,তা বলে নিজের ছোটো ছেলের নাম বলতে গিয়ে হোঁচট খেতে হবে কেন? গল্পকার একদম ঠিক কাজ করেছেন তেনাকে একেবারে মন্দিরের দরজা দেখিয়ে।
    আরে বাপু! সমস্যার জট এভাবে পাকালে চলবে?
    কথাকারের কথা সচল থাকুক।

    ReplyDelete
    Replies
    1. AnonymousJuly 10, 2026

      সময় ব্যয় করে পড়েছেন এটাই পাওয়া।🙏

      Delete
  3. AnonymousJuly 10, 2026

    বড় মজার লেখা

    ReplyDelete
    Replies
    1. AnonymousJuly 10, 2026

      ধন্যবাদ।আপনারা পড়ে দেখছেন এই আমার পাওয়া।🙏

      Delete
  4. AnonymousJuly 10, 2026

    সুন্দর রম্য রচনা। ছোটদের কল্পনার জগত কে সমৃদ্ধ করবে। মনের জড়তা কাটিয়ে ছন্দে ফিরতে সাহায্য করবে। গল্প লেখার আনন্দে ও নানা সৃষ্টিশীল কাজে পাবে প্রেরণা। অভিনন্দন জানাই এই সুখকর লেখার জন্য।

    ReplyDelete