ষষ্ঠপর্ব
কলি সাহু চৌধুরী
রাতে শুয়ে একটাই কথা বারবার মনে হচ্ছিল—এবার তাহলে প্যাংগং লেকে পৌঁছব কীভাবে? শুনলাম, রাস্তার মাঝে বড় ল্যান্ডস্লাইড হয়েছে। খবরটা শুনে আমাদের সবার মনটাই খারাপ হয়ে গেল। কী করব, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।
আবার লেহ ফিরে গিয়ে প্যাংগং যাওয়ারও উপায় নেই। অনেক হিসেব করে ফ্লাইটের টিকিট কেটেছি। প্যাংগং লেকের ধারে যে হোটেলটা বুক করা, সেটাও নির্দিষ্ট দিনের জন্য। একদিন পিছিয়ে গেলে আবার হোটেল পাব কি না, তারও ঠিক নেই। এসব ভাবতে ভাবতেই মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল। সারাদিন এমনিতেই খুব ধকল গিয়েছিল। এক রাশ মন খারাপ নিয়ে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, নিজেই জানি না।
আমার আবার একটা অভ্যাস আছে। যেখানেই যাই না কেন, ভোরে আমার ঘুম ভেঙেই যায়। বাড়িতে যেমন, বেড়াতেও গিয়েও ঠিক তেমনই। উঠে ফ্রেশ হয়ে এক কাপ চা খাই, তারপর একটু হাঁটতে বেরোই। হোটেলের ঘরেই টি-ব্যাগ আর গরম জলের কেটলি রাখা ছিল। তাই নিজের মতো করে চা বানিয়ে নিলাম।
সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই দেখি সব ড্রাইভার ভাইয়ারা একসঙ্গে বসে চা খাচ্ছেন। আমাকে দেখেই কর্মা ভাইয়া হাসিমুখে বলল, "গুড মর্নিং, ম্যাম! একটা খুব ভালো খবর আছে। প্যাংগংয়ের রাস্তা খুলে গেছে। সারারাত সেনাবাহিনী কাজ করেছে। একটু আগেই খবর এসেছে। সবাইকে তাড়াতাড়ি উঠে রেডি হতে বলুন। ব্রেকফাস্ট করে লাগেজ গুছিয়ে নিন। আজ নুব্রা থেকে বেরিয়ে পড়ব। এই হোটেলে আর ফেরা হবে না। প্যাংগং দেখে তারপর সোমোরিরি, চুমাথাং হয়ে আবার লেহ ফিরব।"
কথাগুলো শুনে কী যে ভালো লাগল, বলে বোঝাতে পারব না। মনে হচ্ছিল, এতক্ষণ ধরে বুকের ওপর চাপা পড়ে থাকা একটা বড় পাথর যেন সরে গেল। যাক বাবা! সব চিন্তা দূর হলো। আবার আমাদের প্যাংগং যাওয়া হচ্ছে।
🍂
আমি আর এক মিনিটও দেরি করলাম না। দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে এক এক করে সবার ঘরের দরজায় নক করতে লাগলাম। সবাইকে বললাম, "উঠে পড়ো... সুখবর! রাস্তা খুলে গেছে। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও। আজ আমরা প্যাংগং লেকের পথে যাছ্ছি।
যে মনখারাপ নিয়ে আগের রাতে ঘুমিয়েছিলাম, সকালে সেই মনটাই আনন্দে ভরে গেল।
সকাল ৯টার মধ্যেই আমরা সবাই তৈরি হয়ে হান্ডার রেসিডেন্সি হোটেলের সামনে কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম। তারপর ব্যাগপত্র গুছিয়ে আবার বেরিয়ে পড়লাম, হোটেল থেকে বেরোতেই চোখ বারবার আটকে যাচ্ছিল। প্রায় সব বাড়ির প্রাচীরঘেরা বাগানে টুকটুকে পিচ ঝুলছে, কোথাও ছোট ছোট সবুজ আপেল, কোথাও আবার বিশাল আখরোট গাছ। দু'পাশে সারি সারি পপলার গাছ, হালকা হাওয়ায় পাতাগুলো শির- শিরানি শব্দ তুলে দুলেই যাছছে। মনে হচ্ছিল, এই রাস্তা যেন শেষই না হয়, চারিদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ।
আজকের সকালটা নিয়ে আমাদের আরও একটা আলাদা উত্তেজনা ছিল। নুব্রা ছাড়ার আগে হান্ডারের বিখ্যাত দু'কুঁজওয়ালা ব্যাকট্রিয়ান উটে একবার না চড়লে যেন সফরটাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ছবিতে অনেকবার দেখেছি, কিন্তু সামনে থেকে কখনও দেখিনি। মনে মনে ভাবছিলাম, উটটা দেখতে কেমন হবে? সত্যিই কি দুটো কুঁজ? আর একটু পরেই তার পিঠে চড়ব! ছোটদের মতো উৎসাহ নিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম।
প্যাংগং লেক
ঘাটের পাশ দিয়ে ধীরে ধীরে যেতেই কিছুক্ষণ পরেই সামনে রাস্তা একটু ঢালু হয়ে নেমে গেল, আর তারপরই চোখের সামনে ধরা দিল এক আশ্চর্য দৃশ্য। চারদিকে উঁচু উঁচু পাহাড়, আর তাদের মাঝখানে বিস্তীর্ণ সোনালি বালির প্রান্তর! প্রথম দেখায় বিশ্বাসই হচ্ছিল না। এতক্ষণ বরফঢাকা পাহাড়ের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম, আর হঠাৎ যেন মরুভূমিতে এসে পড়েছি! প্রকৃতি যে কত রকমের বিস্ময় লুকিয়ে রাখে, হান্ডারে না এলে হয়তো বিশ্বাসই হত না।
দূর থেকে মনে হচ্ছিল, যেন পাহাড়ের মাঝে হঠাৎ করে একটা ছোট্ট মরুভূমি এসে বসেছে! প্রথম দেখাতেই জায়গাটা মন কেড়ে নিল।
সকাল ৯টায় টিকিট কাউন্টার খুলে যায়, এর মধ্যেই পর্য্টক দের ভীড় জমে গেছে। টিকিট কেটে আমরাও অপেক্ষা করতে লাগলাম। এখানে উটে চড়ানোর ব্যবস্থাটাও খুব সুন্দর। প্রতিটি পরিবারকে একসঙ্গেই উটে বসানো হয়। একজন উটচালক সামনে থাকেন, আর একটার সঙ্গে আরেকটা উট দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকে। তারপর ধীরে ধীরে সবাই একসঙ্গে চলতে শুরু করে। উটগুলোর চলার মধ্যে কোনও তাড়া নেই, কোনও অস্থিরতা নেই। শুধু ধীর, নিশ্চিন্ত পদক্ষেপে তারা এগিয়ে চলে বালির ওপর দিয়ে।
উটের পিঠে বসে চারপাশে তাকাতে তাকাতেই মনে হচ্ছিল, এই পথ দিয়েই তো একসময় ইতিহাস হেঁটে গেছে। আজ যেখানে আমরা আনন্দ করে ঘুরছি, বহু শতাব্দী আগে সেই পথেই ভারত আর মধ্য এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য চলত। পশম, রেশম, শুকনো ফল, মশলা—কত কী যে এই দু'কুঁজওয়ালা ব্যাকট্রিয়ান উটের পিঠে চাপিয়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে নিয়ে যাওয়া হত! সময় বদলেছে, সীমান্ত বন্ধ হয়েছে, সেই বাণিজ্যও থেমে গেছে। কিন্তু ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে এই উটগুলোর বংশধরেরা আজও হান্ডারের বুকে বেঁচে আছে। এখন তারা আর মাল বহন করে না, বরং পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষকে সেই ইতিহাসের একটু ছোঁয়া অনুভব করায়।
আর যে বালির ওপর দিয়ে আমরা চলছিলাম, সেটাও কোনও সাধারণ মরুভূমি নয়। হাজার হাজার বছর ধরে শায়ক আর নুব্রা নদী পাহাড় ভেঙে বালি এনে এখানে জমা করেছে। সেই বালির স্তর থেকেই তৈরি হয়েছে হান্ডারের এই বিখ্যাত কোল্ড ডেজার্ট। একদিকে বরফে ঢাকা কারাকোরাম পর্বতমালা, অন্যদিকে সোনালি বালির ঢেউ—প্রকৃতির এমন অদ্ভুত মিলন খুব কম জায়গাতেই দেখা যায়।
উটের পিঠ থেকে নামার পরও বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ভ্রমণের কিছু কিছু অভিজ্ঞতা ছবি হয়ে ক্যামেরায় বন্দি হয়, আর কিছু অভিজ্ঞতা নিঃশব্দে মনের ভেতর আজীবনের জন্য থেকে যায়!
যাই হোক, নুব্রার সেই সুন্দর সকালটাকে বিদায় জানিয়ে আমরা এবার রওনা দিলাম প্যাংগং লেকের উদ্দেশ্যে। আজও অনেকটা পথ যেতে হবে। কিন্তু লাদাখে একটা কথা খুব সত্যি—এখানে গন্তব্য যতটা সুন্দর, তার থেকেও অনেক সময় পথটা আরও বেশি সুন্দর।
গাড়ি যত এগোচ্ছিল, ততই বদলে যাচ্ছিল পাহাড়ের রং, আকার আর চারপাশের দৃশ্য। কোথাও বিশাল ধূসর পাহাড়, কোথাও লালচে-বাদামি, কোথাও আবার সূর্যের আলো পড়ে পাহাড়গুলো যেন সোনার মতো ঝলমল করছে। রাস্তা কখনও একেবারে পাহাড়ের গা ঘেঁষে, কখনও আবার অনেক নীচে নেমে গেছে। চারদিকে এমন নিস্তব্ধতা, শুধু আমাদের গাড়ির শব্দ আর মাঝে মাঝে সেনাবাহিনীর বিশাল ট্রাকের গর্জন।
এই পুরো রাস্তা জুড়েই ভারতীয় সেনাবাহিনীর উপস্থিতি চোখে পড়ছিল। একের পর এক বড় বড় আর্মির ট্রাক যাচ্ছে। কোথাও আবার বর্ডার রোডস অর্গানাইজেশনের কর্মীরা পাহাড় থেকে গড়িয়ে আসা বিশাল পাথর সরিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করছেন। মাঝে মাঝে করমা ভাইয়া পুরনো দিনের গান চালিয়ে দিলেন।
পথে কয়েকবার ছোট্ট ধাবায় গাড়ি থামিয়ে চা খেলাম। ঠান্ডার মধ্যে ধোঁয়া ওঠা চা যেন নতুন করে শক্তি জোগাচ্ছিল। আবার শুরু হল পথ চলা।
একসময় রেজাং লা- তে থামলাম এই জায়গাটার নাম শুনলেই বুকের ভেতর এক অন্যরকম অনুভূতি জেগে ওঠে। কারণ এই মাটিতেই ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অন্যতম বীরত্বগাথা রচিত হয়েছিল।
নুব্রা ভ্যালিতে দুই কুঁজওয়ালা উট।
শূন্যের অনেক নিচে তাপমাত্রা, প্রবল তুষারপাত আর প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও ১৩ কুমায়ুন রেজিমেন্টের অল্প কয়েকজন জওয়ান শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়াই করেছিলেন। সংখ্যায় অনেক কম হয়েও তাঁরা দেশের জন্য যে আত্মত্যাগ করেছিলেন, তা আজও ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইতিহাসে গর্বের সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
রেজাং লা ওয়ার মেমোরিয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল,শহিদদের সাহস, আত্মত্যাগ আর দেশপ্রেমকে সঙ্গে নিয়ে এই পাহাড়গুলো আজও যেন সেই বীরত্বের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখান থেকে বিদায় নেওয়ার সময় মনটা অজান্তেই শ্রদ্ধায় নত হয়ে গিয়েছিল, । কিছুক্ষণ সেখানে কাটিয়ে আবার এক কাপ গরম চা খেয়ে রওনা দিলাম। সেদিন রেজাং লা পেরিয়ে এরপর আরও কিছুটা এগিয়ে কর্মা ভাইয়া হঠাৎ গাড়ির গতি কমিয়ে দূরের একটা পাহাড় দেখালেন। প্রথমে কিছুই বুঝতে পারিনি। তারপর ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম, পাহাড়ের গা বেয়ে একটা কালো পিচের রাস্তা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কর্মা ভাইয়া বললেন, করোনা মহামারির সময় চীনারা সীমান্তের ওপারে অনেকটা এলাকা পর্যন্ত রাস্তা তৈরি করেছে। এত দূর থেকেও সেই রাস্তা চোখে পড়ছিল,
পথে আরও একটু এগিয়ে থামলাম 'জব তক হ্যায় জান' সিনেমার শুটিং স্পটে। অনেক পর্যটকের গাড়ি দাঁড়িয়ে। সবাই ছবি তুলছে, চারপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করছে। আমরাও কিছুক্ষণ সেখানে কাটিয়ে সেই মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করলাম।
এবার বুঝতে পারছিলাম, প্যাংগং আর খুব বেশি দূরে নয়। বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। পাহাড়ের রংও বদলাতে শুরু করেছে। হঠাৎ এক বাঁক ঘুরতেই দূরে প্রথমবার চোখে পড়ল প্যাংগং লেক।
সত্যি বলতে, সেই মুহূর্তটা কোনওদিন ভুলতে পারব না।
দূর থেকে মনে হচ্ছিল, যেন পাহাড়ের কোলে কেউ এক টুকরো পান্না বসিয়ে দিয়েছে। যতই কাছে যাচ্ছিলাম, ততই তার রং বদলে যাচ্ছিল। কোথাও পান্না সবুজ, কোথাও নীল, কোথাও আবার ফিরোজা। পাহাড়ের গায়ে পড়ে থাকা বিকেলের শেষ সোনালি আলো সেই জলের ওপর এমনভাবে পড়ছিল যে মনে হচ্ছিল কল্পনার স্বর্গের কোনও দৃশ্য দেখছি।
অনেক জায়গা ঘুরেছি, অনেক সুন্দর দৃশ্য দেখেছি। কিন্তু প্যাংগংকে প্রথম দেখার সেই অনুভূতি আজও ভাষায় প্রকাশ করতে পারি না। কিছু সৌন্দর্য শুধু দেখা নয় অনুভব করতে হয়। আর প্যাংগং ঠিক তেমনই—যে একবার নিজের চোখে দেখেছে, সে কোনওদিন ভুলতে পারবে না। একটু একটু করে সন্ধ্যা নেমে আসছে। একেবারে প্যাংগং লেকের ধারে আমাদের হিমালয়ান উডেন কটেজ—সেদিনের রাতের ঠিকানা। ব্যাগপত্র রেখে আর এক মুহূর্তও দেরি করিনি, সোজা চলে এলাম লেকের কাছে।
সূর্য তখন বিদায়ের শেষ মুহূর্তে। তার সোনালি আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে, আর সেই সঙ্গে প্যাংগং লেকের জলেরও রূপ বদলাচ্ছে, একটু আগের পান্না সবুজ রং কখন যে গভীর নীলে মিশে গেল, মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে প্রকৃতির রং, বুঝতেই পারলাম না। চোখের সামনে ঘটে চলেছে এক অনির্বচনীয় রূপান্তর। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন নিঃশব্দে তার দিনের শেষ ছবিটা এঁকে চলেছে। আর আমরা নিঃশব্দে সেই বিস্ময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। কী দেখছি —সত্যিই ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কিছু কিছু সৌন্দর্য শুধু অনুভব করা যায়, শব্দে তাকে ধরা যায় না।
দূরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি স্পিডবোট লেকের বুক চিরে এগিয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের জন্য নিথর নীল জলের নিস্তব্ধতা ভেঙে আবার সব আগের মতো শান্ত। এদিকে পর্যটকেরা সবাই ব্যস্ত সেই ক্ষণিকের সৌন্দর্য ক্যামেরাবন্দি করতে। কিন্তু মনে হচ্ছিল, এই দৃশ্য কি কোনো ক্যামেরায় ধরা যায়? এই অনুভূতি তো শুধু হৃদয়েই জমা রাখা যায়।
আমরা আজ আছি, কাল চলে যাব। আবার কেউ আসবে, কেউ ফিরে যাবে। কিন্তু এই পাহাড়, এই প্যাংগং লেক, এই অনন্ত নৈসর্গিক সৌন্দর্য্—কোনো কিছুর জন্যই তারা থেমে থাকে না। কেউ দেখুক বা না দেখুক, কেউ মুগ্ধ হোক বা না হোক, বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ তারা একই রকম স্থির, একই রকম সুন্দর। মানুষের জীবন ক্ষণিকের, কিন্তু প্রকৃতির সৌন্দর্য চিরন্তন। সেই চিরন্তনের সামনে দাঁড়িয়ে সেদিন শুধু মনে হচ্ছিল—এমন কিছু মুহূর্ত জীবনে একবারই আসে, আমরা শুধু ভাগ্যবান কয়েকজন মানুষ, যারা জীবনের এক অপূর্ব সন্ধ্যায় নীল প্যাংগং লেকের রঙ বদলের সেই মায়াবী খেলার কয়েকটা মুহূর্ত ধার নিয়ে সারাজীবনের জন্য হৃদয়ে জমা রেখে দিলাম।
প্যাংগং লেকের ধারে আমাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল একটি সুন্দর উডেন কটেজে। চারদিকে পাহাড়, সামনে নীল প্যাংগং, আর তার মাঝখানে ছোট্ট কাঠের কটেজ—দেখেই মন ভরে গিয়েছিল। রাতে বাইরে তাপমাত্রা মাইনাসে নেমে গিয়েছিল, কিন্তু ঘরের ভিতরে ছিল বেশ আরামদায়ক ব্যবস্থা। মোটা মোটা কম্বল ছিল, তাই কনকনে ঠান্ডাও তেমন কষ্ট দিতে পারেনি।
সারাদিনের দীর্ঘ পথ, পাহাড়ি রাস্তার ক্লান্তি আর এত সৌন্দর্য দেখার আনন্দ—সব মিলিয়ে শরীর তখন একেবারে অবসন্ন। তার মধ্যেই গরম গরম, খুবই সুস্বাদু রাতের খাবার পেলাম। এত দূরের, এত দুর্গম জায়গায় এমন ভালো খাবার সত্যিই আশা করিনি। খাওয়া শেষ করেই আর এক মুহূর্ত দেরি করিনি। মোটা কম্বলের তলায় ঢুকে পড়লাম। বাইরে বরফশীতল হাওয়া বইছিল, আর আমরা গভীর নিশ্চিন্ত ঘুমে তলিয়ে গেলাম।
অনেকেই আগে থেকে বলেছিলেন, প্যাংগংয়ের এত উচ্চতায় রাতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যেতে পারে। তাই সাবধানতার জন্য আমাদের গাড়িতেও অক্সিজেন সিলিন্ডার রাখা ছিল। তবে ভগবানের আশীর্বাদে আমাদের কারওই তার প্রয়োজন পড়েনি। নিশ্চিন্তে রাতটা কেটে গেল।
কিন্তু আসল বিস্ময়টা অপেক্ষা করছিল পরের সকালে।
ভোরের প্রথম আলোয় ঘুম ভাঙতেই আর বিছানায় থাকতে পারলাম না। কটেজের দরজা খুলে সামনে দাঁড়াতেই যেন নিঃশ্বাস আটকে গেল। ধীরে ধীরে সূর্যের প্রথম সোনালি আলো ছুঁয়ে দিচ্ছে প্যাংগং লেকের নীল জল। চোখের সামনে মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে লেকের রং—কখনও আকাশি নীল, কখনও গাঢ় নীল, কোথাও আবার সবুজের আভা। দূরে বরফে ঢাকা পাহাড়গুলোও যেন সূর্যের আলোয় নতুন করে জেগে উঠছে।
কিন্তু আসল বিস্ময়টা যেন অপেক্ষা করছিল পরের সকালের জন্য। ভোরের প্রথম আলোয় ঘুম ভাঙতেই আর এক মুহূর্তও বিছানায় থাকতে পারলাম না। তাড়াতাড়ি কটেজের দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়াতেই মনে হলো, যেন প্রকৃতি ধীরে ধীরে নিজের সবচেয়ে সুন্দর রূপটা আমাদের সামনে মেলে ধরছে।
পূর্ব দিগন্তে সূর্য তখন মাত্র উঁকি দিচ্ছে। তার প্রথম সোনালি কিরণ আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছে প্যাংগং লেকের স্বচ্ছ নীল জল। আর সেই সঙ্গে শুরু হলো এক অপূর্ব রঙের খেলা। মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে লেকের রং—কখনও আকাশি নীল, কখনও গভীর নীল, আবার কোথাও পান্না সবুজের মায়াবী আভা, যেন প্রকৃতি নিজের হাতে রঙতুলি দিয়ে প্রতি মুহূর্তে নতুন করে আঁকছে এক অনবদ্য ছবি। দূরে বরফে ঢাকা পাহাড়গুলোও ধীরে ধীরে সূর্যের আলোয় সোনালি আভা মেখে জেগে উঠছিল। চারদিক নিস্তব্ধ ,বরফ ঠান্ডা হাওয়ার স্পর্শ ,সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, সময় যেন থেমে গেছে।
এক কাপ গরম চা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপচাপ লেকের দিকে তাকিয়ে বসে ছিলাম। কোনো তাড়া নেই, কোনো শব্দ নেই—শুধু প্রকৃতির সঙ্গে এক অদ্ভুত কথোপকথন।
নীল জল, বরফে মোড়া পাহাড় আর এমন নির্মল ভোরের সোনালি আলো—জীবনে অনেক সুন্দর দৃশ্য দেখেছি, কিন্তু প্যাংগং লেকের এই অপার্থিব সৌন্দর্যের সামনে দাঁড়িয়ে সেই মুহূর্তটুকু উপভোগ করাই যেন আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
ক্রমশ:
0 Comments