জ্বলদর্চি

বাঁশ/ভাস্করব্রত পতি

বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১৩৩
বাঁশ

ভাস্করব্রত পতি

'বাঁশ যদি হতে পারে বংশ
হাঁস কেন হবেনাকো হংস'। 
খুব ছোট বেলায় 'কিশলয়' বইয়ের পাতায় পড়তে হয়েছিল জনপ্রিয় এই ছড়াটি। আজও যা অনেককেই নস্টালজিক করে তোলে। প্রাচীন ঋকবেদে এই বাঁশের উল্লেখ পাওয়া যায়। ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রেও বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশের বিবরণ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সেসময় রাজস্ব সংগ্রহের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল এই বাঁশ। খনার বচনেও রয়েছে বাঁশের কথা, 'ফাগুনে আগুন চৈতে মাটি / বাঁশ রেখে বাঁশের পিতামকে কাটি'। 
বাঁশের ঢোকলা

বাঁশের মন্ড থেকেই কাগজ তৈরির চল শুরু হয়েছিল আজ থেকে ১৭০০ বছর আগে। বিখ্যাত বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন যখন বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কার করেছিলেন, তখন তিনি এই বাতির ফিলামেন্ট হিসেবে বাঁশের ফিলামেন্ট লাগিয়েছিলেন! এ এক অভূতপূর্ব ঘটনা ছিল তখন। আজকের দিনে তা বিশ্বাস করাই কঠিন। 
বাঁশের পাব বা গাঁট

তথাকথিত বাঁশ আজ ঘর গেরস্থালির অন্যতম উপাদান। 'পেছনে বাঁশ দেওয়া'র মতো কাজ কারবার করার লোকজন যেমনি বাজারে ভুরি ভুরি রয়েছে, তেমনি 'বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়' সুলভ লোকজনেরও অভাব নেই। তারপরেও সেই 'বাঁশ'ই হয়ে ওঠে শ্মশানযাত্রার অন্যতম সঙ্গী। বাড়ি থেকে শ্মশান পর্যন্ত মৃতদেহ নিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি করতে হয় বাঁশের খাটিয়া। পেছনে বাঁশ নয়, বাঁশের খাটে শুয়েই সারতে হয় অনন্তযাত্রা। বিভিন্ন লেখকের লেখাতেও দেখা যায় এই 'শ্মশান ঘাটের শুকনো বাঁশ' প্রবাদটি। 'বিয়ে পাগলা বুড়ো'তে আছে, 'চম্পক আমার দাদার কত সাধের মেয়ে, শ্মশানঘাটের শুকনো বাঁশে সেই মেয়ে সম্প্রদান করবো?'
পাঁশকুড়ার সরাইঘাটে তৈরি বাঁশের সাঁকো

বাঁশ হল একপ্রকার কাষ্ঠল উদ্ভিদ। আসলে এটি এক ধরণের বড় ঘাস। চিরসবুজ এবং বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ। নাতিশীতোষ্ণ ও গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলে বহুল পরিমাণে জন্মাতে দেখা যায়। লোকসঙ্গীতের সুরে বাঁশের কথা প্রতিভাত -- 'বাঁশে তো ঘুণ ধরে যখন / তবে বাঁশিতে ঘুণ কেন ধরে না?' কাঁচা বাঁশ কাটার পর বেশ কয়েকদিন জলে পচিয়ে নিতে হয়। এরপর রোদে শুকনো করে নানা কাজে লাগানো হয়। এরফলে বাঁশে ঘুণ ধরেনা। 

একসাথে অনেক বাঁশ গুচ্ছাকারে জন্মায়। একে বলে 'বাঁশের ঝাড়'। প্রায় ১৫ - ৭৫/৮০ টি বাঁশ জড়াজড়ি করে বেড়ে ওঠে একটি ঝাড়ে। সেই বিষয়টিই প্রবাদে আছে 'দেখাদেখি চাষ, লাগালাগি বাঁশ'। প্রবল ঝড়েও এই বাঁশকে সহজে আলাদা করা যায়না। তাই কথ্যভাষায় বলা হয় 'জড়ের (ঝাড়ের) বাঁশ পড়ে না'। আর বাঁশের ঝাড়ে বাঁশ গাছই জন্মায়, অন্য কিছু জন্মায়না! সেটাই বলা হয় 'বাঁশের ঝাড়ে নল হয়না' (অর্থাৎ খারাপ বীজ থেকে খারাপই জন্মাবে, ভালো কিছু মিলবে না)! বাঁশের ঝাড় নিয়ে আরও একটি কথা লোকমুখে বলতে দেখা যায়, 'য়ে ঝাড়ের বাঁশ তুমি নাগাল যদি পাই / ঝাড়ে মূলে আমি তবে আগুন লাগাই'। 
কাঁচা বাঁশ

বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাঁশ উৎপাদিত হয় চিন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, বাংলাদেশ ইত্যাদি দেশে। ভারতে উৎপাদিত মোট বাঁশগাছের প্রায় ৬০% ই জন্মায় উত্তর পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে। পরিবেশে বিভিন্ন ধরনের বাঁশের খোঁজ মেলে। এদের কোনোটি সরু, কোনোটি মোটা। কোনোটি আবার কাঁটাযুক্ত। কোনোটি একেবারে সরল। গ্রামাঞ্চলে যেসব বাঁশের দেখা মেলে তা হল - তলতা বাঁশ / তল্লা বাঁশ, বেউর বাঁশ, বাওনি বাঁশ / বাঁশনি বাঁশ, বোম্বাই বাঁশ, মুলি বাঁশ, নল বাঁশ, গিঁটে বাঁশ / গাঁট বাঁশ ইত্যাদি। পোয়েসি (Poaceae) পরিবারের অন্তর্গত বিভিন্ন ধরনের বাঁশের দেখা মেলে পৃথিবীতে। সেইসব বাঁশের স্থানীয় নাম সহ বিজ্ঞানসম্মত নাম হল -- Arundinaria hirsuta (উসকং), Bambusa affinis (কনককাই), B. arundinacea (কাঁটা বাঁশ বা বেহার বাঁশ), B. glaucescens / B. multiplex (চিনা বাঁশ), B. nutans (নলবাঁশ), B. tulda (মৃত্তিঙ্গা), Cephalostachyum capitatum (সিলি বাঁশ), C. latifolium / Schizostachyum, C. pergracile / Schizostachyum pergracile (মদনবাঁশ), Dendrocalamus hamiltonii (পেঁচ বাঁশ), D. strictus (লাঠি বাঁশ), D. compactiflora (বেতস বাঁশ), Melocana baccifera / M. bambusoidus (মুলি বাঁশ), Neohouzeaua dullooa (ডলু বাঁশ), Phyllostachys aurea (সোনালী বাঁশ), Schizostachyum fuchsianum (পালম), Sinobambusa elegans (ঝিল্লি), Thyrostachys regia (মঠ বাঁশ) ইত্যাদি। 
কাটা বাঁশ

বাঁশকে কেন্দ্র করে একটা পৃথক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে উঠেছে সমাজে। লোকবিশ্বাস, লোকসংস্কার এবং লোকসংস্কৃতি আবর্তিত হয়েছে এই বাঁশকে কেন্দ্র করেই। মদন চতুর্দশীতে পালিত হয় মদনকাম উৎসব। এতেও বাঁশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। চৈত্র মাসের মদন চতুর্দশী তিথিতে রতির দেবতা মদনকাম পূজার জন্য ২০-২৫ ফুট লম্বা বাঁশের মাথায় চামর বেঁধে বাঁশগুলিকে লালশালুতে মুড়ে তুলসী তলায় দাঁড় করিয়ে রেখে পূজা করা হয়। নলিনীকান্ত চক্রবর্তী এই পূজার বিবরণে লিখেছেন, "কোথাও বাড়ির বাইরের উঠানে এই বাঁশ প্রোথিত করে পূজা করা হয়। দেবতার পরিবর্তে এখানে বাঁশই পূজিত হয়। কারও কারও মতে বাঁশ কামদেবের প্রতীক। সাধারণত সন্ধ্যাবেলা সব গৃহস্থের বাড়ি থেকে বাঁশ নিয়ে যাওয়া হয় গ্রামের কোনো নির্দিষ্ট জলাশয়ে। বাঁশের মাথায় বাঁধা চামর ভিজিয়ে বাঁশ ঠাকুরকে জল স্নান করানো হয়। তারপরে সেখানে চলে বাঁশ হাতে নিয়ে নৃত্যগীত। কোমরে কাপড় বেঁধে বাঁশ হাতে নিয়ে দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি গান করার রীতিও প্রচলিত রয়েছে কোনো কোনো অঞ্চলে।"
বাঁশের কোঁড়

মাদারের বাঁশের সঙ্গে মানবকন্যার কৃত্রিম বিবাহপ্রথা হল বাঁশকেন্দ্রিক একপ্রকার লোকজপ্রথা। একে বলে মাদারের জোড়া বাঁশ। যাঁদের সন্তানাদি হয়নি কিংবা সন্তান মারা গিয়েছে, তাঁরাই এই আচারটি পালন করেন। আবার গাজির দরগার সামনে তিনটি বাঁশ পোঁতা থাকে। মাঝের বাঁশটি অন্যগুলির চেয়ে লম্বা। এটাই গাজিপীরের প্রতীকী বাঁশ। বাঁশগুলির মাথায় চামর বাঁধা থাকে। আর চামর হল গাজির বাঁশের অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ। তেমনি হিন্দু দের চড়ক গাজনের সন্ন্যাসীদের হাতে থাকে লম্বা 'আলম বাঁশ'। তা হাতে নিয়েই তাঁরা মন্দির সহ সর্বত্র প্রদক্ষিণ করে। 

বাঁশের ফুল ফোটা নিয়ে খুলনাতে বলতে দেখা যায় - 'গাছের নাম নবডং, পাতার নাম চৌডং / যদি গাছে ফুল হয়, হাজার টাকার মূল হয়'। প্রচলিত লোকবিশ্বাস যে, বাঁশগাছে ফুল ফুটলে তা নাকি বিপদের বার্তা আনে। বন্যা, খরা বা অন্য কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগের বার্তা বহন করে। মানুষের বিশ্বাস, ইঁদুর বাঁশ গাছের ফুল ও ফলের গন্ধে বাঁশগাছ সংলগ্ন জমিতে শস্য নষ্ট করে। আর চারিদিকে ইঁদুর বাহিত প্লেগের মতো মারণরোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। বাঁশের ফুল ফুটলেই বাঁশগাছ মরে যায়। বাংলা প্রবাদের মধ্যেও এই বাঁশের ফুল ফোটার কাহিনি রয়েছে - 'বাঁশ মরে ফুলে / মানুষ মরে বুলে'। 

বাঁশগাছে ফুল ফোটার বিভিন্ন সময় থাকে। কখনও কখনও ১, ৩, ৭, ১১, ১৫, ৩০, ৪৮, ৬০ এমন কি ১২০ বছর পর পরও বাঁশ গাছে ফুল ফুটতে পারে। নলিনীকান্ত চক্রবর্তী এই বাঁশের ফুল নিয়ে লিখেছেন, "ফুল আসার প্রকৃতির উপর নির্ভর করে বাঁশকে তিন ভাগে ভাগ করা যায় ১) যাতে প্রায় প্রতিবছরই ফুল হয়, ২) যাতে একটা নির্দিষ্ট চক্রে দলবদ্ধভাবে ফুল হয়, ৩) যাতে বিক্ষিপ্তভাবে বা অনিয়মিত ফুল হয়। প্রথম শ্রেণির উদাহরণ Indocalamus wightiana, Ochlandra sivagiriana প্রভৃতি। তৃতীয় শ্রেণির উদাহরণ Chimnobambusa falcata, Dendrocalamus giganteus, পেঁচ বাঁশ, লাঠি বাঁশ, রূপাই প্রভৃতি। দ্বিতীয় শ্রেণির দলবদ্ধভাবে ফুল ফোটে এমন বাঁশের মধ্যে রয়েছে বেহার বাঁশ, বারি বাঁশ, মুলিবাঁশ, প্রভৃতি। লাঠি বাঁশ ও মৃত্তিঙ্গা বাঁশে দলবদ্ধভাবে এবং অনিয়মিত বিক্ষিপ্তভাবে ফুল হতে দেখা গেছে"।

নদীর ধারে বাঁশবন থাকলে তা খুব দর্শনীয় হয়। বলা হয়ে থাকে - 'বাঁশ বাকস ডোবা / তিনে নদীর শোভা'। ঠিক সময়ে শাসন না করলে পরবর্তীতে তা হাতের নাগাল ছাড়িয়ে বিষবৎ হয়ে ওঠে। প্রবাদে সেটাই উল্লিখিত হয়েছে, 'আবালে না নোয়ালে বাঁশ / পাকলে করে টাঁশ টাঁশ'। একই পরিবারের সবাই একই ধাঁচের হয়না। কেউ ভালো কাজ করে, কেউ মন্দ কাজ করে। লোকমুখে তাই উচ্চারিত হয়, 'এক ঝাড়ের বাঁশ / কোনোটিতে দুর্গা কাঠামো / কোনোটিতে হাড়ীর ঝুড়ি'। লোকজনকে প্রায়ই বলতে শোনা যায়, 'কাঁচা বাঁশে ঘুণ ধরা'। পাঠান্তরে পাই, 'কাঁচা বাঁশে ঘুণ ধরলে, রক্ষা নাই তার কোনো কালে'। গোপীচন্দ্রের সন্ন্যাস-এ রয়েছে 'কাঁচা বাঁশে ঘুণ লাগিলে কত ভার সয়'। সমাজে বেশ কিছু মানুষ রয়েছে, যাঁরা অন্যের বিপদের সময় নিজেরা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে। তাই বলা হয়, 'কারো পোঁদে বাঁশ যায়, কেউ পাবে পাবে গোনে'। এছাড়াও বাঁশ বহুক্ষেত্রে এসেছে প্রবাদের আঙিনায়। যেমন -- 'সব বাঁশে বংশলোচন হয়না', 'দাতার নারিকেল, বখিলের বাঁশ / কাট, না কাট, বাড়ে বারোমাস', 'বাঁশ যদি পড়ে জলে / কি করতে পারে তালে', 'লম্বা বাঁশে ঠেলে দেওয়া' ইত্যাদি। 

বাঁশের ছিলকা বা চঁচালি খুব ধারালো।  হাত কেটে যায়। যখন বিজ্ঞান এতো উন্নত হয়নি, তখন এই চঁচালি দিয়েই ডাক্তাররা ছোটখাটো অপারেশনের কাজ করত ছুরির বিকল্প হিসেবে। গ্রামাঞ্চলে এখনও ঘুঁটের ছাই এবং বাঁশ চঁচালি দিয়ে ছাগলের অণ্ডকোষ ছাঁট করার কাজ চলে। এই বাঁশ সম্পর্কে একটি সতর্কতাও রয়েছে গ্রামের দিকে -- 'দূর্বা বাঁশ ধানের শীষ / এ'কটা দাঁতে না দিস'। বাস্তুর জন্য বাঁশের কিছু নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কথায় আছে, 'বাঁশ বাড়লেই বাস্তুনাশ' এবং 'বামুন বাকস বাঁশ / তিনে বাস্তুনাশ'। 

বাঁশ নিয়ে বিশ্বজুড়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে গত ২০০৯ এর ১৮ ই সেপ্টেম্বর থেকে পালিত হচ্ছে বিশ্ব বাঁশ দিবস। বিশ্ব বাঁশ সংস্থার উদ্যোগে এই দিনটিতে বিশ্বজুড়ে বাঁশের উপকারিতা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে এবং দৈনন্দিন জীবনে অন্যতম পণ্য হিসেবে বাঁশের ব্যবহার বাড়াতে এই বিশ্ব বাঁশ দিবস পালন করা হয়। তবে অন্যের পেছনে লাগাতে বাঁশ দিবস নয়, বাঁশকেন্দ্রিক কর্মসংস্থান, রুজি রুটি, গবেষণা এবং চাষের উন্নয়নে এই দিনটি উদযাপিত হয় বিশ্বজুড়ে। 

গ্রামবাংলার ঘরের খুঁটি ও চাল তৈরিতে বাঁশের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। এই বাঁশের খুঁটি নিয়ে প্রচলিত ধাঁধা এরকম - 'আড়ি আড়ি সারি সারি, দিঘীতে পড়ল মাঠ / গদ্দান দুটি কাটি, কান দুটি কাটি'। বাঁশ দিয়ে ঘর বানানোর নিদান এবং পদ্ধতি রয়েছে খনার বচনে। এখানে আছে - 'পূবে হাঁস, পশ্চিমে বাঁশ, উত্তরে কলা, দক্ষিণে মেলা / দক্ষিণ ছেড়ে  উত্তরে বেড়ে, ঘর করগে পোতা জুড়ে'। যেকোনো উৎসব অনুষ্ঠানে প্যান্ডেল বাঁধতে লাগে বাঁশ। ডেকোরেটিংয়ের কাজেও বাঁশের চল ভুরিভুরি। বাঁশ দিয়ে ডোমেরা তৈরি কুলো, চালুনি, হাতপাখা, ফুলের সাজি, ঝুড়ি, ঘুনি, মুগরি, মাদুর, মাছধরা পাটা, পোলো, ফুলদানি, পেনদানি বেশ জনপ্রিয়। বহু মানুষ এই বাঁশ শিল্পের ওপর ভরসা করেই জীবিকা নির্বাহ করেন। এই ডোমেদের দল বাঁশবনে গেলে কোন বাঁশটা নেবে, বুঝে উঠতে পারে না। তাই শোনা যায়, 'বাঁশবনে ডোম কানা'। ইদানিং বিভিন্ন মেলাঘাটে বাঁশের তৈরি সৌখিন সামগ্রী দেদার বিকোয়। বাঁশের তৈরি বাঁশি হল সবচেয়ে জনপ্রিয় লোকশিল্প। গানের সুরের সাথে বাঁশির সুর একটা আলাদা মাধুর্য তৈরি করে। বাঁশের বাঁশি' কবিতায় সুনির্মল বসু লিখেছেন --
'অনেক দূরে
উদাস সুরে
কোন্ সে বাঁশি বাজে রে
কোন্ সে বাঁশি বাজে।
শুনতে পেনু
মোহন বেণু
শালের বনের মাঝে রে,
শালের বনের মাঝে।'
   
বাঁশের বাখারি উনুনের ক্ষেত্রে খুব ভালো জ্বালানি। তেমনি বাঁশের ঢোকলা বা শল্কপত্রও ধানসেদ্ধ করতে খড়ের বিকল্প হিসেবে চালানো হয়। ছুরির মতো দেখতে শুকনো বাঁশপাতাও সুন্দর জ্বালানি। বাঁশপাতার এই অবয়ব নিয়ে জনপ্রিয় ধাঁধা 'উপর থেকে পড়ল ছুরি / ছুরি বলে আমি ঠাঁয় ঘুরি'।
এভাবেই বেড়ে উঠছে বাঁশ

বাঁশের কোঁড় বাঙালির খাদ্য তালিকায় বেশ উপাদেয় উপকরণ। যদিও তার পদ্ধতি অনেক রাঁধুনির কাছেই অধরা। এই বাঁশের কোঁড় নিয়ে কুষ্টিয়াতে বলতে দেখা যায়, 'অলির পর আল, পাথর ভাঙা ডাল / মা মরেছে আশি বছর, আমি হইছি কাল'। বাঁশের কোঁড় ফোটার সময় থেকেই বাঁশের ঢোকলা বা শল্কপত্র দেখা যায়। লোককবিদের মুখে সেটাই হয়ে উঠেছে বাঁশের বসন বা বাঁশের কাপড় পরা। বাঁশের দৈর্ঘ্য বাড়লে ঐ ঢোকলা খসে যায়। অর্থাৎ বাঁশ ল্যাংটা বা Naked হয়ে পড়ে। তা নিয়েই কবিদের বলতে শোনা যায় - 'ঢেঙ্ ঢেঙ ঢেট্টা / ছেলেবেলায় কাপড় পরা বুড়ো বেলায় লেংটা' (মেদিনীপুর), 'ছোটবেলা পরে জামা, বড় হলে ল্যাংটা মামা' (নদীয়া), 'উদুম (অসুন্দর) ধুদুম মাই, হুরু কালো (ছোটকালে) হিন্দু কাপড়, বড়ো কালো কেনে নাই?' (চলনবিল), 'ছোটবেলায় ঘোমটা দিয়ে যায় যে শ্বশুর বাড়ি / যৌবনে যায় ন্যাংটা হয়ে পরে না আর শাড়ি' (ফরিদপুর), 'বাগান থেকে বেরুল হীরে, হীরে বলে তার সর্ব গায়ে গিরে' পাবনা) ইত্যাদি। নদীনালার এপার থেকে ওপারে যাওয়া আসার জন্য বাঁশ দিয়েই তৈরি হয় বাঁশের সাঁকো। যা প্রত্যন্ত গ্রামবাংলার একটি অন্যতম দৃশ্য। এটি নির্মাণ করতে বেশ সুচারু এবং দক্ষ মিস্ত্রিরই প্রয়োজন পড়ে। এই বাঁশের সাঁকো নিয়ে ধাঁধায় পাই -- 'বুট ওয়ে (উপুড় হয়ে) থাহি আমি / দুই ফাশে শুনয়া / নোকে (লোকে) পাড়ায়ে করে / যতো উনয়া চুনয়া'।

🍂

Post a Comment

0 Comments