জ্বলদর্চি

লাদাখ : মন ভালো করা এক দেশ/পঞ্চম পর্ব/কলি সাহু চৌধুরী

ইন্দাস উপত্যকা, থিকসে মনাস্ট্রির বারান্দা থেকে।

লাদাখ : মন ভালো করা এক দেশ
পঞ্চম পর্ব
কলি সাহু চৌধুরী

লাদাখ এই পৃথিবীতে একটি অনন্য স্থান, আর নুব্রা উপত্যকা লাদাখে বর্ণময় ছবির মতো!! নীল-সবুজ-বাদামী-কালো... হাজার হাজার শেডের নানা রঙের আলোয় তোমার চোখ যাবে ভরে,  আর তুমি শুধু ভুলে যাও বাকি পৃথিবীর কথা। আর তার সাথে যদি যোগ করি, 
নুব্রা থেকে তুরতূকের যাত্রা এক অসাধারণ আকর্ষণ। রাজকীয় হিমালয় ঘাটের বুক চিরে এগিয়ে চলা এই রাস্তার প্রতিটি বাঁক যেন নতুন এক সৌন্দর্যের দরজা খুলে দেয়। লেহ উচ্চ পাস থেকে একমাত্র  পথটি কয়েকটি ছোট্ট ছোট্ট গ্রামের মধ্য দিয়ে তুরতূকের দিকে এগিয়ে গেছে,  হঠাৎই সামনে খুলে যায় বিশাল উপত্যকার অপূর্ব বিস্তৃতি—যে দৃশ্য এক মুহূর্তের জন্যও চোখ ফেরাতে দেয় না।
থিকসে মনাস্ট্রি

লাদাখে যাওয়ার আগেই কোথায় কোথায় ঘুরব, তার একটা তালিকা তৈরি করছিলাম।  দেখলাম যে ,গত কয়েক বছরের প্রায় সব পর্যটকের ভ্রমণসূচিতেই তূরতুক গ্রামের নাম রয়েছে। বেশিরভাগ মানুষই নুব্রা ভ্যালি থেকে সকালে বেরিয়ে সারাদিন ঘুরে আবার সন্ধ্যার মধ্যে ফিরে আসেন। তাই আমাদেরও খুব ইচ্ছা ছিল এই ইতিহাস আর প্রকৃতিতে ভরা ছোট্ট গ্রামটিকে নিজের চোখে দেখার। ১৯৭১ এ পাকিস্তান এর সাথে যুদ্ধের সময় তুরতূক গ্ৰামটি ভারতের অধিকারে আসে।
আমাদের সফরসূচিতে নানারকম সংযোজন - বিয়োজন ঘটিয়ে চূড়ান্ত একটা লিস্ট তৈরী তো হল, 17th june তূরতক যাব ঠিক হল, হঠাৎ আমার ছেলে দুম করে বলে বসল, তূরতুক cancel  করতে হবে, ওই দিন দুপুর 12 টা থেকে তার important meeting আছে, আর specially ওই এরিয়া তে net connection  থাকবে না। নুব্রা ভ্যালির হোটেলে ফোন করলাম, তাঁরা ও একই কথা বললেন নুব্রাতে যদিও connection  পাওয়া যাবে কিন্তু ওই জায়গায় একেবারেই নয়, risk  নেওয়া যাবে না।
লেহ পৌঁছে ও আমরা খোঁজখবর করলাম, লেহর হোটেল থেকে ও বলল না ওখানে নেট থাকে না। অগত্যা ঠিক হল আমার ছেলে যাবে না হোটেলে বসে meeting করবে আমরা ঘুরে আসব, কিন্তু আমার কিছুতেই ভালো লাগছিল না ছেলে কে ছেড়ে যেতে।  শেষে ও বলল খুব closed friend একজন group এর manage করে নেবে বলেছে।
থাং গ্রামের কাঁটাতারের বেড়া, দূরে পাকিস্তানের গ্রাম।

 যাক স্বস্তি!! পরদিন আরাম করে বেরোতে বেরোতেই আমাদের ১০ টা বেজে গেল, যে রাস্তায় হান্ডার গ্ৰামে গিয়েছে সেই রাস্তা ধরে কিছুটা এগিয়ে এসে শায়ক নদীর তীর ধরে বামে মোড় নিয়েছে যে রাস্তা সোজা এগিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর থোসে এয়ারবেস ক্যাম্পের পাশ দিয়ে একেবারে উত্তরে সোজা তুরতূক!!  নুব্রা থেকে তুরতূক যাওয়ার রাস্তার নৈসর্গিক শোভার কোন তুলনা হয় না ।
🍂
এই সেই থোইসে এয়ারবেস। আমরা পৌঁছানোর মাত্র এক সপ্তাহ আগেই এখানে সেনাবাহিনীর একটি বাস গভীর খাদে পড়ে গিয়েছিল। সেই দুর্ঘটনায় কয়েকজন জওয়ান শহিদ হয়েছিলেন। রাস্তার এক পাশে এখনও উল্টে পড়ে থাকা বাসটি দেখা যাচ্ছিল। আমার স্বামী আমাকে সেটার দিকে ভালো করে তাকাতেও বারণ করেছিলেন। সত্যিই মনটা খুব ভারী হয়ে গিয়েছিল। ভাবছিলাম, দেশের নিরাপত্তার জন্য কত বড় ত্যাগ স্বীকার করেন আমাদের জওয়ানরা।  থোইসে এয়ারবেসের কাছে গিয়েও করমা ভাইয়া আমাদের ছবি তুলতে মানা করলেন। বললেন, এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকা, তাই এখানে ফটোগ্রাফি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আমরা তাঁর কথা মেনে শুধু চোখ ভরে জায়গাটা দেখলাম, আর মনে মনে দেশের সেই বীর জওয়ানদের প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম।
ইন্দো-পাকিস্তান বর্ডার।

ডাইনে শায়ক নদী সঙ্গ দিতে দিতে চলেছে, দুইপাশে প্রকৃতির মায়াবী যাদু, জায়গায় জায়গায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে পর্যটকরা ফটো তুলেছেন, মাঝেমধ্যেই মনে হচ্ছে,এই দূর্গম পাহাড়ী জায়গায় প্রকৃতির বুক চিরে এত সুন্দর রাস্তায় ছুটে চলেছে গাড়ি, আর এই আশ্চর্য প্রকৃতির রূপ ফেসবুক অথবা নেট মাধ্যমে দেখা আর নিজের চোখে দেখার মধ্যে আকাশ পাতাল তফাৎ তো হবেই। 
তূরতুক গ্রাম লাদাখের একেবারে উত্তর প্রান্তে, শায়ক নদীর তীরে এবং কারাকোরাম পর্বতমালার সুউচ্চ শৃঙ্গের কোলে অবস্থিত। লে শহর থেকে প্রায় ২০৫ কিলোমিটার দূরে এবং Pakistan সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে এই গ্রাম। এতটাই সীমান্তের কাছে যে পথে যেতে যেতে মাঝেমধ্যেই সেনাবাহিনীর উপস্থিতি চোখে পড়ে। পাহাড়, শায়ক নদী আর নির্জন রাস্তা—সব মিলিয়ে  ভীষণ সুন্দর। পাহাড়ের কোলে ছোট্ট, শান্ত এই গ্রামটাকে আসলেই চিনতে হলে গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে হেঁটেই ঘুরতে হয়। আমরাও অনেকটা সময় গ্রামের অলিগলি ধরে হেঁটেছিলাম, পাথর বিছানো সরু রাস্তা, ছোট ছোট সেতু, পাহাড়ি ঝরনার জল, আর দু'পাশে পপলার, উইলো, খুবানি (Apricot) ও আখরোটের গাছ—সব মিলিয়ে গ্রামের পরিবেশ ছিল একেবারে অন্যরকম। এই উইলো গাছ থেকেই দেশেলাই এর কাঠি তৈরি হয়। উইলো কাঠ দিয়ে ক্রিকেট ব্যাট তৈরি হয়, পরে কাশ্মীর গিয়ে অনন্তনাগ জেলায় ব্যাট তৈরির কারখানা দেখেছি। গ্রীষ্মকালে গাছে ঝুলে থাকা পাকা খুবানি দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি গ্রামের মানুষ শুকনো খুবানি, আখরোট ও স্থানীয় নানা জিনিস বিক্রি করেন। 
হাঁটতে হাঁটতেই পৌঁছে গেলাম ইয়াবগো প্যালেসে। ছোট্ট এই প্রাসাদটি একসময় বালতিস্তানের ইয়াবগো রাজবংশের রাজাদের বাসস্থান ছিল। আজও রাজপরিবারের উত্তরসূরিরা প্রাসাদের একটি অংশে বসবাস করেন, আর অন্য অংশটি ছোট্ট একটি সংগ্রহশালা হিসেবে দর্শনার্থীদের জন্য খোলা। সেখানে রাজপরিবারের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিস, পুরনো ছবি, অস্ত্র, পোশাক আর ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখে মনে হচ্ছিল, যেন কয়েকশো বছরের পুরনো ইতিহাসের পাতায় একটু উঁকি দিয়ে এলাম। ফুলে ভরা উঠোন আর শান্ত গ্রাম্য জীবন। গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা ঝরনার স্বচ্ছ ধারা আর তার ওপর কাঠের ছোট ছোট সেতুগুলো ছবির মতো সুন্দর। তুরতুকে রয়েছে কয়েকটি পুরনো মসজিদ, যার মধ্যে প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এখানকার স্থাপত্যে বালতি সংস্কৃতির ছাপ স্পষ্ট দেখা যায়।  আমরা  মিউজিয়ামের ভেতরে কার্পেট বিছানো সুন্দর একটি বসার জায়গায় কিছুক্ষণ বসে বিশ্রাম নিলাম। একটু পরেই গ্রামের সরল-সাদাসিধে মানুষজন আমাদের হাতে তুলে দিলেন এক কাপ গরম কাবা চা (Kahwa)। লাদাখের এই বিখ্যাত ঐতিহ্যবাহী চা অতিথি আপ্যায়নের অন্যতম পরিচয়। কেশর, দারচিনি, এলাচ, বাদাম ও নানা সুগন্ধি মশলার স্বাদে তৈরি এই চা শরীর যেমন গরম রাখে, তেমনি মনও ভরে দেয়। কাবা চা যে পাত্রে পরিবেশন করা হয়, সেটিও চোখে পড়ার মতো সুন্দর। ছোট্ট ধাতব কেটলি আর নকশা করা বাটি-আকৃতির পাত্রে চা পরিবেশন করা হয়। দেখতে এতটাই আকর্ষণীয় যে, চা খাওয়ার আগে সেই পাত্রটাই বেশ কিছুক্ষণ ধরে দেখছিলাম।
গ্রামের ভেতরে ঘুরতে ঘুরতে  চোখে পড়ে দূরে কারাকোরাম পর্বতমালার বিশাল পাহাড়, সবুজ উপত্যকা, তূরতুক শুধু সুন্দর একটি পাহাড়ি গ্রাম নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক টুকরো ইতিহাস। ১৯৭১ সালের Indo-Pakistani War of 1971-এর আগে এই গ্রাম Pakistan-এর অন্তর্গত ছিল। যুদ্ধের পর এটি India-র অংশ হয়ে যায়। একদিনে সীমান্ত বদলে গেল, কিন্তু মানুষের ঘর, স্মৃতি আর আত্মীয়-স্বজন তো আর বদলে যায় না। তাই তূরতুককে অনেকেই বলেন—একটি গ্রাম, যে নিজের দেশ হারিয়েছে।
তূরতুক থেকে আমরা পৌঁছেছিলাম থাং গ্রামে। এক সময় দাঁড়াতে হলো ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর চেক পোস্ট, এটি indo- pak border এর last village ।
প্রত্যেকের ID জমা নিয়ে sign করে তবেই ওই পাশে ছাড়পত্র মিলল, কিছু দুরেই  এগিয়ে border। আর তারপরেই কাঁটাতারের বেড়া, তার ওপারেই পাকিস্তান। 
আমরা সবাই সেই কাঁটাতারের বেড়ার সামনে দাঁড়িয়ে অনেক ছবি তুললাম। নিজের চোখে এমন একটা জায়গা দেখছি, যেখানে কয়েক পা দূরেই আরেকটা দেশ—ভাবতেই কেমন যেন শিহরণ হচ্ছিল। মাঝখান দিয়ে শান্তভাবে বয়ে চলেছে নদী। নদীর ওপারেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর ব্যারাক, ছোট্ট গ্রাম, ঘরবাড়ি। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট বাঙ্কারও খালি চোখেই দেখা যাচ্ছিল। এত কাছ থেকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত আগে কখনও দেখিনি। এক অদ্ভুত অনুভূতি বারবার মনকে নাড়া দিচ্ছিল। তারপর ঢুকলাম ভারতের শেষ প্রান্তের সেই ছোট্ট রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খেতে। এখানকার বেশিরভাগ খাবারই নিরামিষ।  চেখে দেখলাম এখানকার জনপ্রিয় খাবার খিসির (Khisir)। বুলগুর গম, টমেটো, পেঁয়াজ, ধনেপাতা, লেবুর রস আর হালকা মশলা দিয়ে তৈরি এই ঐতিহ্যবাহী খাবারটির স্বাদ ছিল একেবারেই অন্যরকম—খুবই হালকা, টাটকা আর সুস্বাদু। নতুন কোনও জায়গায় গেলে সেখানকার স্থানীয় খাবারের স্বাদ না নিলে যেন ভ্রমণটাই সম্পূর্ণ হয় না , এসপর মোমো, থুপকা আর গরম চা নিয়ে বসে সামনের দীগন্তে তাকাতেই বিখ্যাত কারাকোরাম পর্বতমালার শৃঙ্গ উঁকি দিচ্ছে । সেখানেই পরিচয় হল মহম্মদ আমান চাচার এবং আরও কয়েকজন স্থানীয় মানুষের সঙ্গে। তাঁদের মুখে শুনলাম দেশভাগের গল্প। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর সীমান্ত বদলে যায়। হঠাৎ একদিন কাঁটাতারের বেড়া দুই দেশকে আলাদা করে দেয়। পরিবারের কেউ থেকে গেল এপারে, আবার স্ত্রী, সন্তান, ভাই কিংবা আত্মীয়রা রয়ে গেল ওপারে। ইচ্ছে থাকলেও আর কোনওদিন একে অপরের কাছে যেতে পারেননি। পরে এই ভারতেই নতুন করে সংসার গড়েছেন, নতুন করে জীবন শুরু করেছেন।
গল্প বলতে বলতে তাঁদের কারও কারও চোখে জল চিকচিক করছিল। এত বছর পরেও সেই বিচ্ছেদের কষ্ট যে আজও মুছে যায়নি, সেটা তাঁদের চোখের ভাষাই বলে দিচ্ছিল। সেই মুহূর্তে বুঝলাম, সীমান্ত শুধু মানচিত্রে একটা দাগ নয়, কত মানুষের জীবনের না বলা গল্প, কান্না আর ত্যাগের সাক্ষী। কেউ কেউ এখানে এক রাত্রি থাকেন , কয়েকটি হোম স্টে আছে। ফিরে আসার আগে আবারও চোখে পড়ল বড় বড় অক্ষরে লেখা— "Thang Village – India's Last Village"। চারদিকে উড়ছে আমাদের মহান ভারতবর্ষের তেরঙ্গা। সেই পতাকার দিকে তাকিয়ে বুকটা গর্বে ভরে উঠছিল। দেশের একেবারে শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, সত্যিই এ এক এমন অভিজ্ঞতা, যা শুধু চোখে দেখা যায় না, হৃদয়ে সারাজীবনের জন্য থেকে যায়।
এবার ফিরে যাওয়া নুব্রাতে, এসে হোটেলে ঢুকে ফ্রেশ হতে না হতেই করমা ভাইয়া ও অন্যান্য ড্রাইভাররা খবর বয়ে আনল কাল সকালে প্যংঙগ লেক পৌছন যাবে না, লেহ ফিরে যেতে হবে, কারন নুব্রা থেকে প্যাংঙগ যাওয়ার রাস্তায় খুব বড় ধ্বস নেমেছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর তরফে জানানো হয়েছে ৪-৫ দিন লাগবে রাস্তা ঠিক হতে। যদি যেতে হয় লেহ ফিরে পরের দিন লেহ থেকে প্যংঙগ লেকে যাওয়া যেতে পারে.....
ক্রমশ:

Post a Comment

1 Comments

  1. Gouri DuttaJuly 04, 2026

    খুব তথ্য সমৃদ্ধ লেখা।

    ReplyDelete