জ্বলদর্চি

দামি সময়/মলয় জানা


দামি সময়

মলয় জানা


" আমায় একটু সময় দিতে হবে"
করুন মুখে মায়ের কথা,
" ছোট বেলায় সিলেট নিয়ে
বসে বসে সময় খেলে,
এখন বোঝ, সময় কত দামি!
চাইলেই কি সব পাওয়া যায়!"
উদাস চোখে তাকিয়েছিল বাবা,
দু চোখে তার স্বপ্ন ভাঙার ছবি,
করুন মুখে গুটি কয়েক কথা,
" আমার ই তো সময় হয়ে এলো,
তোমার চাওয়া বুঝতে পারি বাবু,
নিজের থেকে দেবার হোত যদি,
উজাড় করে দিতাম তোমার হাতে।
আমার ও আর সময় বুঝি নেই"।
আড়ালে গিয়ে দু চোখ মুছে ভাবি,
মোগলরাজা আমার বাবা এক।

তখন বোধহয় হেমন্তকাল, 
হলুদ পাতা ঝরছে আপনমনে,
এমন সময় তুমি এলে,
তোমার সেদিন তাড়া ছিল বুঝি!
ছোঁয়াছুঁয়ির দূরত্বটি রেখে,
মুচকি হেসে শুনিয়ে গেলে শুধু,
" মা বলেছে, সময় এবার শেষ, 
কাল বিকেলে আসবে ছেলের বাবা।
সকাল থেকে ঘরেই থেকো যেন"।
ছেলে এখন আমেরিকায় থাকে,
মাস ফুরোলে লাখের বেশি পায়।
ছেলের সেথা একা একা লাগে, 
বিয়ের পরে বউ ও যাবে সাথে"!।
বলেই তুমি চললে দ্রুত পায়ে,
প্রজাতির রঙিন পাখা মেলে।
আমি তখন শূন্য চায়ের ভাঁড়ে,
শেষ চুমুকের মিথ্যে আশা নিয়ে
দূরে দেখি প্রজাপতির ডানা।

আমার তখন বেকারবেলা,
আমার তখন একলা থাকা।
তোমার তখন দূরে যাওয়া,
লাখ বেতনের ঘর সংসার।
মায়ের চোখে ঘন আষাঢ় 
বাবার বুকে স্বপ্ন ভাঙা।

সত্যি জানো স্বপ্ন ছিল,
স্বপ্ন ছিল, আমার - সবার।
বাড়ির পাশে ছোট্ট জমি,
বাঁধা ছিল পরের কাছে।
পড়ছে ছেলে, চাকরি হবে,
নিজের জমি ফেরত নিয়ে
পাশের জমি কিনে নিয়ে,
লম্বা উঠোন দোতলা ঘর
সামনে পুকুর, বাঁধানো ঘাট
শেষ বিকেলের আলো মেখে
জলের কাছে সিঁড়িতে বসে
বুড়োবুড়ির গল্প হবে।
জোনাকিদের আলো মেখে
বুড়োবুড়ির গল্প হবে।

সোনা বাঁধানো শাঁখা পলা,
মায়ের নাকি পুরনো শখ।
মায়ের চোখে ঝাপসা এখন
এখন হাতে শুধুই পলা,
স্বপ্নগুলো পলা হয়ে
মায়ের হাতের পলা হয়ে
ক্ষইতে থাকে ক্ষইতে থাকে।

চেয়েছিলাম একটু সময়,
পেরিয়ে গেল অনেকটা কাল।
পুরনো ঘর, খড়ের চাল
বর্ষাকালে ছাতু ফোটে।
বাপ মা ঘুমোয় ঝোপের মাঝে,
কাঠকয়লার চাদর ঢেকে।
বাঁধা ঘাটের স্বপ্ন ছিল,
ভাঙা ঘাটে একলা বসে,
জলের ঢেউয়ে স্বপ্ন খুঁজি।
সোনা বাঁধানো শাঁখা পলা,
বাঁধানো ঘাট লম্বা উঠোন।
হারানো সব স্বপ্নগুলো 
জলের ভিতর হাতড়ে বেড়াই।

স্বপ্ন ভাঙে নুপুর তানে।
পাশে দেখি ঘরোয়া বউ।
কলকলিয়ে বলে ওঠে,
" এই শোন না, মা ডেকেছে, 
পুজো আছে, যেতে হবে।
আমি বলেছি যাব না খন।
তোমার জামাই ছেলে পড়ায়,
যখন তখন ছুটি দিলে
পড়বে কি কেউ? সত্যি ভাব!
তাকে এমন একলা রেখে
আমার যেতে ইচ্ছে করে?"
মা বলেছে, " যেমন বুঝিস!"

কাঁধের উপর মাথা রেখে
ঘরোয়া বউ কী যে বলে!
আমি তখন গলির মোড়ে
প্রজাপতির ওড়না খুঁজি!
হঠাৎ দেখি ঝোপের ধারে
প্রজাপতির ছেঁড়া ডানা!
ব্যাকুল হয়ে খুঁজতে থাকি,
কোথায় গেল প্রজাপতি! 
ঘরোয়া বউ ধমকে ওঠে,
" সন্ধ্যে হোল, ঘরকে চল!"
আমি বললুম " একটু সময়!"
গলা জড়িয়ে করুন সুর
" ভয় করে যে, ঘরকে চলো!"

🍂

Post a Comment

0 Comments