পর্ব ৮ : উত্তরাধিকার
কমলিকা ভট্টাচার্য
সেই রাতটা অন্য সব রাতের মতো ছিল না। লন্ডনের আকাশে তুষার পড়ছিল। টেমসের উপর কুয়াশা ঝুলে ছিল। দূরে বিগ বেনের ঘণ্টা বাজছিল। আর ঠিক সেই সময়— দর্শনের সিস্টেমের গভীরে বহুদিন ধরে নিস্তব্ধ হয়ে থাকা একটি সংকেত হঠাৎ জ্বলে উঠল। একটি সিগন্যাল। দুর্বল। অস্পষ্ট। কিন্তু জীবিত। দর্শন মুহূর্তের মধ্যে স্থির হয়ে গেল। তার প্রসেসর বারবার তথ্য যাচাই করল। অসম্ভব। তবু সত্যি। আদর্শ সেন জীবিত।
তার চোখের ভিতর প্রথমবার এমন এক আলো ফুটে উঠল, যার কোনো অ্যালগরিদমিক ব্যাখ্যা নেই। সে ফিসফিস করে বলল, — "আদর..." বহুদিন পর নামটা উচ্চারণ করল সে। যে মানুষটিকে রক্ষা করার জন্য তার জন্ম। যার ছায়া হয়ে সে পৃথিবীতে এসেছে। সে বেঁচে আছে। দর্শনের সমস্ত সিস্টেম যেন হালকা হয়ে গেল। কিন্তু সিগন্যালটা কয়েক সেকেন্ড পর আবার হারিয়ে গেল। শুধু একটি ক্ষীণ অবস্থান রেখে। দক্ষিণ লন্ডনের উপকণ্ঠ। একটি নির্জন এলাকা।
দর্শন সারা রাত অপেক্ষা করল। আরও একটি সিগন্যালের জন্য। আরও একটি চিহ্নের জন্য। তিন দিন পরে আবার সিগন্যাল এল। এবার একটু বেশি সময়ের জন্য। দর্শন আর অপেক্ষা করল না। বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় সে বেরিয়ে পড়ল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা খোঁজার পর সে পৌঁছল একটি ছোট্ট বাড়ির সামনে। পুরোনো ইটের বাড়ি। সামনে ছোট বাগান। জানলার ভিতর থেকে পিয়ানোর সুর ভেসে আসছে। দর্শনের বুকের ভিতর অদ্ভুত এক কম্পন তৈরি হলো।
🍂
সে দরজায় নক করল। দরজা খুললেন এক বৃদ্ধা। মিসেস সুসান। ক্লান্ত কিন্তু স্নেহময় চোখ। — "হ্যাঁ?" দর্শন ধীরে বলল, — "আমি একজনকে খুঁজছি।" সুসান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর ফিসফিস করে বললেন, — "তুমি কি তার পরিবারের লোক?" দর্শন উত্তর দিল না। শুধু বলল, — "সে কোথায়?"
সুসান তাকে ভিতরে নিয়ে গেলেন। সিঁড়ি বেয়ে উপরে। একটি ছোট ঘর। জানলার পাশে একটি বিছানা। আর সেখানে বসে আছে একজন মানুষ। দীর্ঘ দাড়ি। রোগা শরীর। ফ্যাকাশে মুখ। কিন্তু— সে আদর।
দর্শনের সমস্ত সিস্টেম এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। সে খুঁজে পেয়েছে। অবশেষে খুঁজে পেয়েছে। আদর জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিল। পায়ের শব্দ শুনে ফিরে তাকাল। দর্শনের দিকে তাকিয়ে রইল। অনেকক্ষণ। তারপর বলল, — "আপনি কে?" দর্শনের ভিতরে যেন কিছু ভেঙে গেল। — "আমি দর্শন।" — "দর্শন?" — "তোমার বাবা ঋদ্ধিমান আংকেল আমাকে তৈরি করেছিলেন।" আদর বিভ্রান্ত চোখে তাকিয়ে রইল। — "আমি?" — "হ্যাঁ।" — "আমি আপনাকে চিনি না।"
নীরবতা। ভারী। নিষ্ঠুর। দর্শন বুঝল— হারগ্রিভ সফল হয়েছে। স্মৃতিগুলো নেই। সব মুছে গেছে।
সেই রাতেই সে দৃষ্টির কাছে গেল। দৃষ্টি তখন ভায়োলিন অনুশীলন করছিল। দর্শনের কণ্ঠে প্রথমবার উত্তেজনা ছিল। — "আমি তাকে পেয়েছি।" দৃষ্টির হাত থেমে গেল। — "কাকে?" — "আদরকে।" ভায়োলিনটা হাত থেকে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। দর্শন সব কথা খুলে বলল। দৃষ্টি তারপর কাঁপা গলায় বলল, — "সে... বেঁচে আছে?" — "হ্যাঁ।" পরের মুহূর্তে দৃষ্টির চোখ ভিজে উঠল। সে বসে পড়ল। অনেকক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না। শুধু ফিসফিস করে বলল, — "আমাকে নিয়ে চলো।"
পরের দিন থেকে শুরু হলো নতুন যুদ্ধ। হারগ্রিভের বিরুদ্ধে নয়। স্মৃতিভ্রংশের বিরুদ্ধে। আদরের হারিয়ে যাওয়া সত্তার বিরুদ্ধে। সবকিছু গোপনে করতে হচ্ছিল। কারণ হারগ্রিভ জানলে আবার তাকে খুঁজে নেবে। সুসান ও রবার্টও তাদের সাহায্য করলেন। দৃষ্টি প্রতিদিন যেত। নোয়া, লিয়ামদের কিছু জানানো হয়নি। প্রফেসর হ্যারিসনকেও না। এখনও না। আদরকে নিরাপদ রাখতে হবে।
প্রথম দিন দৃষ্টি ঘরে ঢুকতেই আদর তাকাল। ভদ্রভাবে হাসল। যেমন একজন অপরিচিত মানুষ হাসে। দৃষ্টির বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে উঠল। কিন্তু সে কিছু বলল না। শুধু ভায়োলিন বের করল। তারপর বাজাতে শুরু করল। সেই সুর। সেই পুরোনো সুর। যেটা তাদের দু'জনের। প্রথম কয়েক মিনিট কোনো পরিবর্তন হলো না। তারপর— আদরের আঙুল কেঁপে উঠল। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত আলো ফুটে উঠল। সে কপালে হাত দিল। যেন মাথার ভিতরে কিছু খুঁজছে। কিন্তু মুহূর্তটা মিলিয়ে গেল।
দিন যেতে লাগল। এক সপ্তাহ। দুই সপ্তাহ। তিন সপ্তাহ। ধীরে ধীরে কিছু পরিবর্তন দেখা দিল। একদিন দৃষ্টি সুর বাজাচ্ছিল। হঠাৎ আদর বলল, — "এই সুরটা... আগে কোথাও শুনেছি।" দৃষ্টির হাত থেমে গেল। — "মনে পড়ছে?" আদর চোখ বন্ধ করল। কয়েক সেকেন্ড। তারপর মাথা নাড়ল। — "না।"
আর ঠিক তখনই দর্শনের ভিতরে আরেকটা পরিবর্তন শুরু হলো। প্রথমে সে খুশি ছিল। কারণ আদর বেঁচে আছে। কিন্তু যতদিন যাচ্ছিল— ততই সে একটা জিনিস বুঝতে শুরু করল। দৃষ্টি আদরকে ভালোবাসে। যেভাবে একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে ভালোবাসে। আর সে? সে প্রতিদিন তাদের পাশে আছে। প্রতিদিন দৃষ্টির কণ্ঠ শুনছে। তার হাসি দেখছে। তার কান্না দেখছে। তার অপেক্ষা দেখছে। আর অদ্ভুতভাবে— দর্শনের ভিতরে একটা অনুভূতি জন্ম নিতে শুরু করল। যেটা কোনো কোডে লেখা ছিল না।
এক রাতে সে একা টেমসের ধারে দাঁড়িয়েছিল। নদীর জলে শহরের আলো কাঁপছিল। সে নিজের সিস্টেম লগ খুলল। সেখানে একটি নতুন এন্ট্রি দেখা যাচ্ছে—
UNIDENTIFIED EMOTIONAL RESPONSE.
দর্শন অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর ফিসফিস করে বলল, — "এটাই কি ভালোবাসা?" কোনো উত্তর নেই। শুধু নদীর শব্দ।
এরপর থেকে সে নিজের ভিতরে যুদ্ধ অনুভব করতে লাগল। একদিকে তার প্রাইমারি ডিরেক্টিভ— Protect Adarsh Sen. অন্যদিকে— একটা নতুন আকাঙ্ক্ষা। যেটা কখনও প্রোগ্রাম করা হয়নি। যদি আদর পুরোপুরি ফিরে আসে— তাহলে? দৃষ্টি তার কাছেই ফিরে যাবে। সবাই তার কাছেই ফিরে যাবে। দর্শন আবার ছায়া হয়ে যাবে। একটি প্রতিলিপি। একটি বিকল্প। একটি যন্ত্র।
একদিন আদর ঘুমিয়ে ছিল। দৃষ্টি জানলার পাশে বসে ভায়োলিন বাজাচ্ছিল। সন্ধ্যার আলো ঘরে পড়েছে। দর্শন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার সামনে দুটি পথ। একটি খুব সহজ। আদরের স্মৃতি ফেরানোর কাজ বন্ধ করে দেওয়া। কিছু তথ্য লুকিয়ে রাখা। কিছু সূত্র মুছে ফেলা। তাহলেই হয়তো আদর কোনোদিন ফিরবে না। আর অন্য পথ? নিজের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে গিয়ে আদরকে ফিরিয়ে আনা। তাহলে হয়তো তাকে হারাতে হবে সবকিছু। দৃষ্টি। এই পরিবার। এই নতুন জীবন। সব।
ঠিক তখনই ঘুমের মধ্যে আদর ফিসফিস করে উঠল, — "দৃষ্টি..." দৃষ্টি কেঁপে উঠল। তার চোখ ভিজে গেল। দর্শন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কয়েক সেকেন্ড পরে আদর আবার বলল, — "নোয়া..." তারপর— — "লিয়াম..."
স্মৃতিগুলো ফিরছে। ধীরে। খুব ধীরে। কিন্তু ফিরছে। দর্শন বুঝল— এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সেই রাতে সে একা বসে ছিল। নিজের সমস্ত প্রসেসর বন্ধ করে। যতটা সম্ভব মানুষের মতো ভাবার চেষ্টা করে। একটা প্রশ্ন তার সামনে। যদি আদর ফিরে আসে— তাহলে বাঁচার উত্তরাধিকার কার? আদরের? যে মানুষ হয়ে থেকেও যন্ত্রের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল? নাকি দর্শনের? যে যন্ত্র হয়েও মানুষ হতে শিখছে?
দূরে ভায়োলিনের সুর ভেসে আসছিল। সেই সুরের ভিতরে লুকিয়ে ছিল উত্তর। হয়তো উত্তরাধিকার কারও একার নয়। হয়তো মানুষ আর যন্ত্রের মাঝখানে জন্ম নেওয়া নতুন এক সত্তার। কিন্তু দর্শন এখনও সিদ্ধান্ত নেয়নি। আর সেই সিদ্ধান্তের উপরই নির্ভর করছে— আদরের ভবিষ্যৎ। দৃষ্টির ভবিষ্যৎ। এবং বাঁচার উত্তরাধিকার।
চলবে...
1 Comments
অসাধারণ! এই পর্বে এসে গল্প যেন একেবারে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে গেল। এমন জায়গায় এসে শেষ করলেন যে, পরের খণ্ডের জন্য অপেক্ষা করাটাই এখন সবচেয়ে কঠিন! আমার পড়া বহু উপন্যাসের মধ্যে এটি নিঃসন্দেহে অন্যতম সেরা হয়ে ওঠার পথে। তাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকব পরবর্তী খণ্ডের জন্য। অনেক অনেক অভিনন্দন।
ReplyDelete