জ্বলদর্চি

আমি কেন লিখি /তনুশ্রী ভট্টাচার্য্য


আমি কেন লিখি 

তনুশ্রী ভট্টাচার্য্য 

শোনা বলা পড়া ও লেখা --- মানুষের এই চারটি স্বজাত দক্ষতা এবং এরা একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। শেষ দক্ষতাটি বাকী তিনটির ফলশ্রুতি। আদিকাল থেকেই মানুষ এই লেখার দক্ষতাটি আয়ত্ত্ব করতে চেয়েছে যেটির মাধ্যমে সে তার ভাবনার বিভিন্ন স্তরকে বিভিন্ন আঙ্গিকে চিরস্থায়ী ভাবে প্রকাশ করার সুযোগ পায়। লিপির জন্মকালের  পূর্বে কেবল সংকেতের মাধ্যমেই গুহাগাত্রে মানুষ লিখেছে।  সে যা দেখত তার সঙ্গে  কল্পনা মিশিয়ে ।আলতামিরা গুহায় বাইসনের ছবি  প্রাক্ ঐতিহাসিক যুগের নিদর্শন। উদ্দেশ্য  আজকের যুগের থেকে কিচ্ছু আলাদা নয় --নিজেকে প্রকাশ।
এখন প্রশ্ন এই প্রকাশ  কত প্রকারের এবং কি তার  ভিত্তি, কি তার‌ শৈলী, কি তার লক্ষ্য, কি তার উদ্দেশ্যে বিধেয়  ইত্যাদি ইত্যাদি।   'আমি কেন লিখি' --- একটি মৌলিক প্রশ্ন যার হাজার একটা উত্তর দিয়েছেন যুগে যুগে সাহিত্যিক প্রাবন্ধিক কবি গদ্যকার গল্পকার --সকলেই। যে কোনো নন্দনতত্ত্বের প্রাথমিক ভিত্তিভূমিতেই প্রোথিত হয়ে আছে এই অনুসন্ধান --- কেন লিখি, কেন আঁকি, কেন গাই, কেন নাচি, 
এমনকি কেন বেড়াতে যাই বা কেন মাটির পুতুল বানাই বা কেন পটচিত্র  আঁকি, কেন গরম লোহা ঢেলে মূর্তি বানাই, ব্রোঞ্জের  ওপর কারুকার্য করি বা পাথর কুঁদে 'মা ছেলের' সৃষ্টি করি,কেন শক্ত  কাঠ খোদাই করে  নরম মায়াবী রমণী মূর্তি তৈরী করি। 

              সত্যজিৎ রায়  বিজ্ঞাপনের ছবি আঁকতেন, পাশ্চাত্য সংগীতের  সমঝদার, কল্পবিজ্ঞানের   শ্রেষ্ঠ লেখক, শিশু সাহিত্যের দিকপাল  --- তবুও তিনি সিনেমা করতে গেলেন কেন ? কারণ এত গুলির প্রয়োগ তিনি সিনেমায় করতে পারার সুযোগ আছে জানতেন এবং তিনি পারতেন। অর্থাৎ নিজেকে প্রকাশ। নিজের ভাবনার  মননের বোধের  ধারা সবার কাছে তুলে ধরা । শুধু নিজে জানা নয় অপরকে জানানো একটি উদ্দেশ্য। নিজেকে প্রকাশ কথাটার মধ্যে আত্মকেন্দ্রিক  ভাবনা থেকে যায় । শুধুই কি নিজেকে প্রকাশ ? না কি মানুষের সঙ্গে, সমাজের বৃহত্তর ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়া, এবং অপর প্রান্তের হালহকিকত  জানার জন্যেও নিজেকে  তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরী। 
তাই একজন সৃষ্টিশীল মানুষ কেন সৃষ্টি কাজে ব্যাপৃত থাকেন তার যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা খোঁজার কোনো কারণ আছে বলে আমার মনে হয় না। এটি  একটি মানসিক গঠন, অভ্যাস, তাগিদ,  আত্মবিশ্লেষণ, আত্ম অনুসন্ধান এবং নিছক  ভালোবাসা যেটা না করে থাকা যায় না---  নিজের সঙ্গেই কেন বা  শিল্পের সঙ্গেই কেন।

 আমি কেন লিখি ---   এটা কি একটা প্রশ্ন ? না কি এটা একটি অন্বেষণের ধারা? আমি  ভেবে দেখি নি  কোনোদিন কেন‌ লিখি। আমি  পড়তে ভালোবাসি।  আমার পছন্দের নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর প্রচুর বই পড়ি। আর প্রচুর পড়ি বলেই   পড়ার সঙ্গে  সঙ্গেই সেই বিষয়টির  নানা দিক খুলে যায়, নানা প্রশ্ন মনের মধ্যে ভিড় করে আসে ,নানা ফাঁক আছে বুঝতে পারি, নানা সূত্র বেরিয়ে আসে , বিভিন্ন লেখার অনুষঙ্গ   ফিরে ফিরে আসে , --- আর তখনই নিজের অজান্তে  লিখতে বসে যাই। লিখতে লিখতে নতুন বিষয়ের মধ্যে ঢুকে যাই । 

উদাহরণ দিই একটা---বেশ কয়েকবার  রামায়ণ পড়ে আমার মনে হয়েছে আসলে রামের বনবাসটা চেয়েছিলেন স্বয়ং দশরথ। রামচন্দ্র খুব ভালো পড়ুয়া মেধাবী  ছাত্রর মতো  ছিল যে শুধু বইয়ের  জ্ঞান ছাড়া আর কিছুই জানে না। বাইরের জগত বা ব্যবহারিক জগত সম্বন্ধে যার জ্ঞান এখনো খুবই সীমিত।  বহির্জগতের  সমস্যা সংকুল জীবনে না পড়লে হাতে কলমে রাজ্য চালানো তার পক্ষে কঠিন হয়ে যাবে।   তাই  গুরুগৃহে সব বিদ্যা আয়ত্ত  করার পর পিতা তাকে পাঠালেন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে ।  দন্ডকারণ্যে,  বিন্ধ্য পর্বতের দক্ষিণে অনার্যরা কেমন প্রকৃতির, কেমন তাদের জীবনযাত্রা   ইত্যাদি ইত্যাদি আর্য শাসক হিসাবে রামের জানা খুব জরুরী। অরণ্য প্রকৃতির একটি বৃহৎ অংশ সেই অরণ্য রক্ষা করতে গেলে স্বয়ং রাজাকেই  সেখানে গিয়ে সরেজমিনে দেখে তার সম্বন্ধে ব্যবস্থা  নিতে হবে।  তাই  রাজকার্যে র শিক্ষানবিশ হিসাবে তাকে একেবারে ওপেন ফিল্ডে পাঠিয়ে দিলেন। রামায়ণ পড়তে গিয়ে মনে হোল লক্ষ্মণ সব ভারী ভারী কায়িক পরিশ্রমের কাজ গুলো করে দিচ্ছে, রাম ত এগুলো করছে না। ক্লাসের ফার্স্ট বয় আর লাস্ট বয়ের মতো। ফার্স্ট বয়রা সরস্বতী পুজোয় ফাস্ট ব্যাচে খেতে বসে, লাস্ট বয়রা শেষ পর্যন্ত পরিবেশন করে খাটুনির কাজ গুলো করে। 
এমন ব্যাখ্যা একান্ত আমার নিজের। কোনো আলোচনা পড়ি নি কোথাও।  কিন্তু এই ভাবনা মাথায় ঘুরপাক খেললেই লিখতে ইচ্ছে করে।   এই বিনির্মাণ আমার খুব পছন্দের। নিজের ভাবনাকে মেলে দিতে পারি। পরত খুলতে পারি ।  চিন্তার জট পাকানো আর গোটানো, ছড়ানো আর গোটানো  প্রিয় একটি বিষয় আমার । তুলনামূলক আলোচনায় স্বস্তি পাই।  তাই এগুলো  নিয়ে লিখি। পাঠককে ভাবাতে পারি । কেউ কেউ জানতে চান।  তখন‌ লেখক পাঠক সংযোগ ঘটে সেটি বেশ  আত্মশ্লাঘা  জাগায় এবং আমার পরম প্রাপ্তি। 

তবে এটাও ঠিক  আমি  কেন লিখি র আর একটা উত্তর আছে যে আমি কি  সব লেখাই সব পাঠকের  কাছে পৌঁছে  দেবার জন্য লিখি। ?   হয়তো নয়। এমন কিছু লিখি  যেগুলো  সব রকম পাঠকের জন্য নয় । নিজের সঙ্গে নিজের থাকার জন্যে সে লেখা। ইংরেজী সাহিত্যের ছাত্রী হিসাবে বরাবরই ইংরেজী সাহিত্যের সঙ্গে আমার পাঠকদের পরিচয় করে দেবার একটা তাগিদ অনুভব করি।  এখানে বলে নেওয়া ভালো যে কেন লিখি যেমন একটা প্রতিপাদ্য তেমনি কাদের জন্য লিখি সেটাও একটি নির্বাচিত  ক্ষেত্র। নোবেল পাওয়া কবিদের অল্প সংখ্যক কবিতা হয়তো অনুবাদ করি  এবং অবশ্যই সেগুলো কবিতা প্রেমীদের জন্য। ছোটোদের জন্য ছড়া লিখতে ভালোবাসি।  আমার নিজের পছন্দের ক্ষেত্র প্রবন্ধ। তবে  সম্পাদকের অনুরোধে বিভিন্ন বিষয়ে লিখতে হয় সেখানে সমাজ বিজ্ঞান ইতিহাস সাম্প্রতিক নাড়া দেওয়া বিষয় ঢুকে পড়ে। 
চলচ্চিত্র আলোচনা আমার একটি  বিচরণ ক্ষেত্র। বিশ্ব সিনেমার মাইলস্টোন সিনেমা গুলি দেখি এক  অনুসন্ধিৎসু চোখ ও মন নিয়ে।  মেদিনীপুর ফিল্ম সোসাইটির প্রতিবিম্ব ও চলচ্চিত্র বার্তার সম্পাদক হিসাবে বিভিন্ন চলচ্চিত্রের রিভিউ লিখতে হয়, পড়তে হয় । অনেক সিনেমাপ্রেমী লেখক ও পাঠকের সঙ্গে ভাবের আদান প্রদানে একটি পরিমন্ডল গড়ে উঠেছে। পাঠকের চাহিদা আমাকে লিখিয়ে নেয়। 

তবে শেষে বলতেই হয় --- আমি কেন লিখি --- বিষয়টি  খুবই ব্যক্তিগত। তবে জ্বলদর্চি র মতো অভিজাত পত্রিকায় 
লিখতে স্বচ্ছন্দ বোধ করলাম।  সব কথা হয়তো বলা গেল না। কেন লিখি না জেনেই  হয়তো এত দিন‌ লিখেছি। এবার থেকে লেখার প্রতি আগ্রহ  ভালোবাসার সঙ্গে যুক্তির ক্ষেত্রটিও হয়তো বিবেচনিধীন থাকবে।  সম্পাদক মহোদয়কে ধন্যবাদ জানাই।

🍂

Post a Comment

1 Comments

  1. কমলিকাJuly 11, 2026

    বিনির্মাণ করার বিষয়টি বেশ ভালো লাগলো।🙏

    ReplyDelete