জ্বলদর্চি

আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস /দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে

আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস 

দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 

আজ ৮ই সেপ্টেম্বর, আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। সাক্ষরতা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যায়। আসুন এই সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই।
মানুষের জীবনে আলো শুধু সূর্যের আলো নয়, জ্ঞানের আলোও মানুষের অস্তিত্বকে আলোকিত করে। যে চোখ অক্ষর চিনতে শেখে, সে শুধু একটি শব্দ পড়তে শেখে না, সে ধীরে, ধীরে নিজের অধিকার, নিজের সম্ভাবনা এবং নিজের পৃথিবীকে চিনতে শেখে, তাই সাক্ষরতা কেবল অক্ষরজ্ঞান নয়, এটি মানুষের আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার অন্যতম ভিত্তি। এই সত্যকে সামনে রেখে প্রতি বছর ৮ই সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালিত হয়।
🍂

১৯৬৬ সালে ইউনেস্কো ৮ই সেপ্টেম্বর দিনটিকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, বিশ্বের মানুষকে সাক্ষরতার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করা এবং এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে শিক্ষা ও জ্ঞানের অধিকার থেকে কেউ বঞ্চিত না হয়। সময়ের সঙ্গে সাক্ষরতার ধারণাও বিস্তৃত হয়েছে। একসময় শুধু পড়তে, লিখতে ও সাধারণ হিসাব করতে পারাকেই সাক্ষরতা বলা হতো। আজকের পৃথিবীতে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল মাধ্যম, তথ্য যাচাই, আর্থিক জ্ঞান এবং দৈনন্দিন জীবনে জ্ঞানকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করার ক্ষমতা। সাক্ষরতা মানুষের জীবনের দরজা খুলে দেয়। একজন নিরক্ষর মানুষ অনেক সময় নিজের নাম লিখতে পারেন না, কোনো সরকারি নথি বুঝতে পারেন না, ওষুধের নির্দেশ পড়তে পারেন না কিংবা নিজের অধিকার সম্পর্কে জানতে পারেন না, ফলে তিনি সহজেই অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। বিপরীতে, একজন শিক্ষিত ও সচেতন মানুষ নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করেন। তিনি প্রশ্ন করতে শেখেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শেখেন এবং নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারেন।
সাক্ষরতার সঙ্গে দারিদ্র্য দূরীকরণেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। শিক্ষা একজন মানুষকে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দেয়, কর্মসংস্থানের পথ খুলে দেয় এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হতে সাহায্য করে। বিশেষ করে নারীর সাক্ষরতা একটি পরিবারের সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একজন শিক্ষিত মা শুধু নিজের জীবনকেই বদলে দেন না, পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষার ভিতও শক্ত করে দেন। তাই সাক্ষরতা আসলে একটি প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে এগিয়ে চলা আলোর শিখা।
তবে, শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেই সাক্ষরতার লক্ষ্য পূরণ হয় না। শিক্ষা হতে হবে অর্থবহ, জীবনমুখী ও সবার নাগালের মধ্যে। সমাজের প্রান্তিক মানুষ, দরিদ্র পরিবার, প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশু এবং যারা নানা কারণে শিক্ষার সুযোগ থেকে দূরে রয়েছে, তাদের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়াই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি, যারা একসময় পড়াশোনার সুযোগ পাননি, তাদের জন্য প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। আজ আমরা ডিজিটাল যুগে বাস করছি। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, ফলে বর্তমান সময়ে সাক্ষরতার অর্থ আরও গভীর। শুধু লেখা পড়তে পারলেই যথেষ্ট নয়, কোন তথ্য সত্য, কোনটি বিভ্রান্তিকর তা বিচার করার ক্ষমতাও প্রয়োজন। প্রযুক্তিকে নিরাপদ ও দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করার জ্ঞানও আধুনিক সাক্ষরতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়। এটি আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন রাখে, আমাদের চারপাশে এমন কেউ কি আছেন, যিনি এখনও অক্ষরের জগত থেকে দূরে? এমন কোনো শিশু কি আছে, যে অর্থের অভাবে বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না? এমন কোনো প্রাপ্তবয়স্ক কি আছেন, যিনি সুযোগের অভাবে পড়তে শেখেননি? যদি থেকে থাকেন, তবে সাক্ষরতার প্রকৃত আন্দোলন এখনও শেষ হয়নি। একটি বই একজন মানুষের হাতে তুলে দেওয়া কখনও, কখনও তার হাতে একটি নতুন ভবিষ্যৎ তুলে দেওয়ার মতো। একটি শিশুকে অক্ষর শেখানো মানে শুধু তাকে পড়তে শেখানো নয়, তাকে স্বপ্ন দেখতে শেখানো। একজন প্রাপ্তবয়স্ককে নিজের নাম লিখতে শেখানো মানে তার আত্মবিশ্বাসের দরজায় প্রথম কড়া নাড়া।
আমাদের মনে রাখতে হবে, সাক্ষরতা দয়া নয়, অধিকার। শিক্ষা কোনো বিশেষ শ্রেণির সম্পদ নয়, এটি প্রত্যেক মানুষের মৌলিক অধিকার এবং উন্নত সমাজের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। রাষ্ট্র, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই নিরক্ষরতার অন্ধকার দূর করা সম্ভব।
আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক, জ্ঞানকে নিজের মধ্যে আটকে না রেখে অন্যের কাছেও পৌঁছে দেব, কারণ একটি প্রদীপ থেকে হাজার প্রদীপ জ্বালালে প্রথম প্রদীপটির আলো কমে যায় না, বরং চারপাশ আরও আলোকিত হয়ে ওঠে। সাক্ষরতার আলোয় আলোকিত মানুষই পারে নিজের ভাগ্য বদলাতে, সমাজকে বদলাতে এবং শেষ পর্যন্ত একটি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে, তাই আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের সত্যিকারের বার্তা একটাই, অক্ষর শেখার মধ্য দিয়ে শুরু হোক আত্মমুক্তির পথ, আর শিক্ষার আলোয় গড়ে উঠুক বৈষম্যহীন মানবিক পৃথিবী।

Post a Comment

1 Comments

  1. বিদ্যাসাগরের কথা বললেন না?

    ReplyDelete