জ্বলদর্চি

আশির দশকের মানুষ/কমলিকা ভট্টাচার্য

আশির দশকের মানুষ

কমলিকা ভট্টাচার্য 

আশির দশকে জন্মানো মানুষগুলো
বোধহয় শেষ সেই প্রজন্ম—
যারা শৈশবকে
ডিলিট করেনি,
বরং বুকের ভাঁজে
পুরোনো চিঠির মতো রেখে দিয়েছে।
তাদের ছেলেবেলা ছিল—
বৃষ্টির জলে ভেসে যাওয়া কাগজের নৌকা,
দুপুরের ঘুম ভাঙানো
দূরের রেডিও-গান,
আর সন্ধ্যা নামলেই
জানালায় মায়ের মুখ—
যেন পৃথিবীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আলো।
তখন সুখ
কোনও পাসওয়ার্ড জানত না,
দুঃখেরও কোনও স্ট্যাটাস ছিল না;
মানুষের চোখই ছিল
সবচেয়ে দ্রুত সংবাদপত্র।
বন্ধুর মন খারাপ মানে
তার পাশে বসে থাকা,
পাশের বাড়ির অসুখ মানে
নিজের রান্নাঘর থেকে
এক বাটি গরম ভাত চলে যাওয়া—
সহমর্মিতা তখন
কোনও বড় শব্দ ছিল না,
ছিল প্রতিদিনের অভ্যাস।
তারা ভালোবাসাকে
‘সেন্ড’ করে অপেক্ষা করেনি,
ভালোবাসার জন্য
পোস্টম্যানের সাইকেলের ঘণ্টা শুনেছে।
তাদের অভিমান
ছিল আলমারির গোপন তাকে রাখা
একখানা নীল খাম—
খোলা যায়,
ফেলে দেওয়া যায় না।
আজ পৃথিবী
আঙুলের এক স্পর্শে
হাজার জানালা খুলে দেয়,
তবু আশির দশকের মানুষগুলো
মাঝে মাঝে খুঁজে ফেরে
সেই একটি জানালা—
যেখান দিয়ে
বিকেল ঢুকত ধীরে,
আর মানুষ বেরিয়ে যেত
আরও ধীরে।
সময় তাদের
অনেক কিছু শিখিয়েছে—
কীভাবে হারাতে হয়,
কীভাবে ব্যস্ত থাকতে হয়,
কীভাবে নিজের ক্লান্তি
হাসির আড়ালে রেখে দিতে হয়।
তবু তাদের ভিতরে
একটি পুরোনো উঠোন আজও বেঁচে আছে—
সেখানে সন্ধ্যা নামলে
কেউ দরজা বন্ধ করে না,
কেউ কারও খোঁজ নিতে
কারণ খোঁজে না।
হয়তো এটাই
আশির দশকের মানুষের শেষ উত্তরাধিকার—
নিজেরা একটু ভেঙে গেলেও
অন্যের জন্য
একটু ছায়া হয়ে থাকা।
সময় বদলেছে,
মানুষ বদলেছে,
শুধু তাদের বুকের ভিতর
একটি ছোট্ট রেডিও
আজও খুব আস্তে বাজে—
সেই হারিয়ে যাওয়া দিনের গান,
যার কোনও ‘রিপ্লে’ নেই,
শুধু আছে
ফিরে ফিরে মনে পড়া।
************
জেন-জেড

ওরা নাকি স্ক্রিনের সন্তান—
আঙুলের ডগায় পৃথিবী,
চোখের পাতায় নীল আলো,
তবু বুকের ভিতর
কত অন্ধকারের সঙ্গে
প্রতিদিন ওদের বোঝাপড়া।
ওরা প্রশ্ন করে—
পুরোনো দেওয়ালে টাঙানো
‘এভাবেই চলে আসছে’
নামক জীর্ণ ক্যালেন্ডারটাকে
ছিঁড়ে ফেলে।
মনে একটা প্রশ্ন - 
পৃথিবীটা যেমন পেয়েছি,
তেমনই কি রেখে যাব?
ওরা চাকরি চায়,
কিন্তু জীবনের বিনিময়ে নয়;
ভালোবাসা চায়,
কিন্তু নিজের পরিচয় বন্ধক রেখে নয়।
ওদের স্বপ্নগুলো
কখনও রিলের পনেরো সেকেন্ড,
কখনও রাত জাগা সার্চ-বার,
কখনও আবার
নিঃশব্দে আঁকা এমন এক ভবিষ্যৎ—
যার ঠিকানা এখনও
গুগলও জানে না।
ওরা দ্রুত হাঁটে,
কারণ পৃথিবীটা দ্রুত বদলাচ্ছে;
আবার হঠাৎ থেমেও যায়—
কারণ সব দৌড়ের শেষে
কোথায় পৌঁছতে হয়,
সেটা ওরা নিজেরাই ঠিক করতে চায়।
হয়তো ওরা নিখুঁত নয়—
কিন্তু কোন প্রজন্মই বা ছিল?
ওরা শুধু
পুরোনো পৃথিবীর দরজায় দাঁড়িয়ে
নতুন পৃথিবীর চাবিটা ঘোরাচ্ছে।
ওদের মুঠোফোন
শুধু যন্ত্র নয়—
একটি ছোট্ট জানালা,
যার ওপারে পৃথিবীটা
একসঙ্গে কাছে,
আবার আশ্চর্য দূরে।
ওরা ভালোবাসে
‘লাস্ট সিন’ দেখে,
অভিমান জমায়
‘টাইপিং…’ শব্দের নিচে,
আর কখনও কখনও
একটি নীল টিক
দুই মানুষের মাঝখানে
একটি সম্পূর্ণ নীরবতার মতো দাঁড়িয়ে থাকে।
ওদের স্বপ্নেরও
বাফারিং হয়—
তবু ওরা অপেক্ষা করে না;
স্বপ্ন আটকে গেলে
নতুন উইন্ডো খুলে ফেলে।
ওরা পুরোনো বিশ্বাসের
ধুলো ঝাড়ে না,
প্রয়োজনে তাকেই
রিসাইকেল বিনে পাঠিয়ে দেয়।
কখনও ওরা অতিরিক্ত তাড়াহুড়োয়,
কখনও অতিরিক্ত একা;
হাজার ‘ফলোয়ার’-এর মাঝেও
নিজের ছায়াটাকে খুঁজে বেড়ায়।
তবু—
এই প্রজন্মকে বুঝতে গেলে
ওদের স্ক্রিনটা নয়,
স্ক্রিন নিভে যাওয়ার পর
ওদের চোখের দিকে তাকাতে হবে।
কারণ সেখানে
এখনও এমন এক পৃথিবী জেগে আছে—
যে পৃথিবীর সফটওয়্যার
ওরা নিজেরাই লিখতে চায়।
ওরা জেন-জেড—
পৃথিবীর শেষ সংস্করণ নয়,
বরং মানুষের
পরবর্তী ‘আপডেট’।
**†***********

ক্যানভাস বদল

একদিন দেখি—
বাবার হাতের ঘড়িটা
ছেলের কবজিতে,
মায়ের আলমারির শাড়িতে
মেয়ের উৎসবের গন্ধ।

গতকালও
যে শিশুটি বাবার আঙুল ধরে
রাস্তা পার হতো,
আজ সে-ই বলে—
“বাবা, সাবধানে হাঁটো।”

মায়ের মুখের ভাঁজে
কখন যে দুপুরের বদলে
সন্ধ্যা নেমে এসেছে,
আমরা বুঝিনি।

প্রজন্মেরা কি তবে
নদীর মতো আসে?
না—
তারা আসে ঘাসের ডগায়
শিশির বদলানোর মতো,
একটি ঋতু আরেকটি ঋতুকে
ছুঁয়ে দিয়ে চলে যায়,
কোনও শব্দ না করে।

যে প্রজন্মকে আমরা
‘পরের প্রজন্ম’ বলতাম,
তারা আসলে
আমাদেরই ফেলে আসা
আগামীকাল।
আর আমরা?
আমরা দাঁড়িয়ে আছি
দুই কালের মাঝখানে—
এক হাতে অতীতের উষ্ণতা,
অন্য হাতে ভবিষ্যতের শীতল আলো।

এই মাঝখানের নামই বোধহয়—
সময়।

আমরা ভাবি—
সময় বুঝি ঘড়ির কাঁটায় হাঁটে।
আসলে সে হাঁটে
চুলের রুপোলি হয়ে,
দেওয়ালের ছবির রং ফিকে করে,
পুরোনো গানের সুরে
একটি নতুন কণ্ঠ বসিয়ে।
তাকে ধরতে গেলে
শুধু বাতাস হাতে আসে।
তবু কী আশ্চর্য—
যে জিনিসটাকে
ধরে রাখা যায় না,
সেই-ই তো
আমাদের সবচেয়ে গভীর উত্তরাধিকার।

এক প্রজন্ম
অন্য প্রজন্মকে কিছু দেয় না—
শুধু নিঃশব্দে
একটি প্রদীপ এগিয়ে দেয়।
আলোটা একই থাকে না,
হাতটাও নয়—
শুধু অন্ধকারের ভিতর
আলো যাওয়ার পথটুকু
থেকে যায়।
সময় বোধহয় তাই—
অদেখা এক শিল্পী,
যে আমাদের জীবনকে
প্রতিদিন একটু একটু করে আঁকে,
আর ছবি শেষ হওয়ার আগেই
ক্যানভাস বদলে দেয়।
***********"
পরে

স্বপ্নগুলো ছিল
জানালার ধারে রাখা কাচের পুতুল—
ছুঁতে ইচ্ছে করত,
তবু প্রতিদিন বলতাম,
“আজ নয়, পরে…”

জীবনের খাতায়
দায়িত্বের অঙ্ক মিলতে মিলতে
ইচ্ছেগুলো হয়ে গেল
পুরোনো চিঠির মতো—
ঠিকানা আছে,
শুধু পাঠানোর সময় নেই।

যে নদী একদিন
সমুদ্র ছুঁতে চেয়েছিল,
তাকে আমরা বাঁধ দিয়ে বলি—
“এইটুকুই তো যথেষ্ট!”

এভাবেই কত আকাশ
ছাদের নিচে ছোট হয়ে যায়,
কত পাখি
নিজের ডানাকেই ভুলে থাকে।

অথচ জীবন তো
ফেরার ডাক দেয় না বারবার—
তাই স্বপ্নকে খুব বেশি
‘পরে’ বলে রেখো না;
কখন যে ‘পরে’
নিঃশব্দে ‘কখনও নয়’ হয়ে যায়,
তা কেউ জানে না।
🍂

Post a Comment

6 Comments

  1. 🥲মন খারাপ হয়ে গেল কবিতাগুচ্ছ পড়ে। এই পৃথিবী কী আমরাই বানিয়েছি আমাদের লোভ আমাদের নির্বুদ্ধিতা আমাদের নির্জীব ক্লৈব্য দিয়ে? লেখিকার লেখা কোন ভান ছাড়াই নির্মম ছুরির মত লাইন দিয়ে কেটে কেটে তুলে এনেছে সেই সত্য। তাঁকে অভিনন্দন । তাঁর লেখা ও মনন পাঠককে লিয়ে যায় অনন্য উচ্চতায় আরো এমন লেখা আসুক ।

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাSeptember 10, 2026

      আপনাদের মত পাঠক কজন,আর নিজেদের ভুল, সত্যটাকে মেনে নেওয়ার মত সাহস আজ কজনের আছে।
      সবাই আত্মগরিমায় মগ্ন।
      চেষ্টা করব আরও লেখার।প্রণাম নেবেন।

      Delete
  2. শ্যামল মজুমদারSeptember 09, 2026

    এতো আমরা ক্রমশঃ যন্ত্রমানবতায় উত্তরণের এক উত্তরাধিকার রেখে যাচ্ছি। বিপন্ন উত্তরাধিকার।

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাSeptember 10, 2026

      একদম ঠিক বলেছেন।আজকের এই প্রজন্ম আমাদের নিজেদের হাতে বোয়া বীজের ফসল।তাদের দোষ দিয়ে কি হবে? প্রকৃতি থেকে সমাজ সব শেষ করে তাদের হাতে তুলে দিয়ে যাচ্ছি।

      Delete
  3. তিনটে কবিতার সুর এক। শুধু এটুকুই বলব
    স্বপ্ন দেখার ইচ্ছেটাকে হারিয়ে ফেলোনা
    স্বপ্ন দেখার ইচ্ছে আমার এখনো গেল না...

    ReplyDelete
  4. কমলিকাSeptember 10, 2026

    স্বপ্নটুকুই বাঁচা।

    ReplyDelete