হাতের লেখায় বাংলা লিখতে আমি বরাবরই ভালবাসি। আমার নাকি হাতের লেখা খুব সুন্দর। অন্তত যাঁরা দেখেছেন তাঁরা তাই বলে থাকেন। ছোট এক মফঃস্বল শহরে অতি সাধারণ বাংলা মাধ্যমের কর্পোরেশন স্কুলে পড়ে মানুষ আমি। সেই স্কুলে সেই সময় হাতের লেখা অভ্যাস করাতেন স্যার। আমাকে বাড়িতে যিনি পড়াতে আসতেন তাঁর হাতের লেখা ছিল মুক্তোর মত। তিনি আমাকে বাংলা ও ইংরেজি দুই হাতের লেখাই প্র্যাকটিস করাতেন। রুল টানা খাতাগুলো তে উনি লিখে দিয়ে চলে যেতেন “আতা গাছে তোতা পাখি”, অথবা “The cow eats grass”. আর আমার হোমওয়ার্ক থাকতো পুরো পাতাতে ওই বাক্যগুলো বারবার লেখা; লিখে অভ্যাস করা; তাতে যতটা নিখুঁত আর সুন্দর হয় আর কি! বাস্তবে হতো ঠিক উল্টো! কাগজের ওপর পেন্সিল আর রবার এর অত্যাচার এবং লেখা অভ্যাস করার সময় অতন্দ্র প্রহরীর মতো সামনে আমার মায়ের বসে থাকা - এই দুয়ের যুগপৎ অবস্থানে আমার শিশুমনে মনে হতো যে পৃথিবীর যাবতীয় দুঃখ দুর্দশা হাতের লেখা অভ্যাস করার মধ্যে লুকিয়ে আছে এবং পৃথিবীতে একমাত্র আমি সেই দুর্ভাগ্যের অধিকারী।
এহেন পরিবেশ থেকে যে কি করে আমার হাতের লেখা সুন্দর হলো সেটা আমার স্থূল মস্তিষ্কে না বোধগম্য হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমি নিজেও পরবর্তী কালে বড় হয়ে কম অবাক হইনি।
যাইহোক, এ তো গেল ছোটবেলা আর মেজবেলার কথা। এখন তো বড়বেলায় বিরাজ করছি। এখন তো আমরা এমন একটা সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি যখন হাতে কিছু লিখলে আশেপাশের লোক কিরকম একটা দৃষ্টি নিয়ে তাকায়; যেন বলতে চায় “লোকটার মাথায় কি হালকা গণ্ডগোল আছে? মোবাইল থাকলে আবার হাতে কেউ লেখে নাকি! পাগল মনে হয়!”
তো যাই হোক, আমি একটু পাগলাটে গোছের ই মানুষ। মোবাইলে তো টাইপ করা, লেখা তো নয়! লেখা আর টাইপ করা কি এক নাকি? টাইপ তো আলাদা স্কুলে গিয়ে শিখতে হয়। মাধ্যমিকের পর বাবা বলেছিলেন টাইপ শিখতে, লেখা শিখতে তো বলেননি! আমিও টাইপ শেখার স্কুলে ভর্তি হয়ে গেছিলাম। রেমিংটন এর মেশিন এ বোতামগুলো তর্জনী দিয়ে আঘাত করলে বোতামের সাথে যুক্ত লিভার গুলো নাচতে শুরু করতো আর কাগজে কার্বন পেপার এর নিচে অক্ষর গুলো ছাপা হতো।
যাক, মূল প্রসঙ্গে ফিরি!
আজকাল বুড়ো বয়েসে এসে মনে হয় পাগলামিটাই স্বাভাবিক। তাই লিখতে থাকি। হাবি জাবি লিখতে থাকি। এই এখন যেমন লিখছি। মাথা বা মুন্ডু নেই, আর কিছু আছে কিনা জানি না। বাঙালি উৎসবের দিন এলে আমার পাগলামিটা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। এই যেমন ভাষা দিবস বা বিজয় দশমী। পাগলরা নিজের পাগলামি বুঝতে পারে না, বা বুঝলেও খুশিমনেই পাগলামি করে। আমিও সেই দলের ই সদস্য।
তো হলো কি, গত বছর এক কাণ্ড ঘটলো।
ভাষা দিবসের দিনে ফাউন্টেন পেন দিয়ে লিখতে বসেছি। হাতের লেখায় লিখলাম “ যতদিন বাঁচবো বাংলা বলব, লিখব ও পড়ব। বাংলা ভাষাকে ভালবাসব। আমার মাতৃভাষা বাংলার জন্য আমি গর্বিত।”
তো শুধু লিখলেই তো হলো না, সোশ্যাল মিডিয়া তে না দিলে তো চলে না আজকাল। আজকাল সোশ্যাল মিডিয়া মনে হয় মানুষের জীবনে অক্সিজেন এর পরেই দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ জিনিষ। ওটা ছাড়াও নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসবে। একটু সময় পেলেই হালকা করে রীল দেখে নাও, দুজন অচেনা সুন্দর বা সুন্দরী মানুষকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাও; বেশ একটা “কিছু করলাম” ধরনের সন্তুষ্টি কাজ করে। তারপর মেসেঞ্জার এ হালকা কথাবার্তা শুরু।
এই না না, আমার কথা বলছি না, এরকম আজকাল হয় তাই বলছি আর কি!
যাইহোক, ওই বাংলা লেখাটা কয়েকটা হোযাটসঅ্যাপ গ্রুপে দিলাম, যাতে লোকজনের মনে হয় যে রবীন্দ্রনাথ, শংকর এর পরের প্রজন্মে ভাষা কে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব টা একমাত্র আমার। দিয়ে অপেক্ষা করছি, দেখা যাক কতগুলো লাল পান আসে আর কতগুলো কাঁচকলা (থাম্বস আপ)!
🍂
মিনিট দশেক পরে একটা টুং করে শব্দ। একটা অচেনা নম্বর থেকে একটা মেসেজ “তাহলে আমি বাংলা ভাষাই হবো, তাহলে আপনার ভালবাসা পাবো তো?”
কে লিখছে?? কি লিখেছে এটা? চক্ষু চড়কগাছ আমার! আমাকে লিখেছে? ভুল করে অন্য কাউকে লিখতে গিয়ে আমাকে লিখেছে নাকি !
নম্বর টা গ্রুপ গুলোতে খুঁজে পেলাম না। তার মানে গ্রুপ গুলোর মধ্যে কেউ একজন অন্য একটা নম্বর থেকে মেসেজ টা লিখেছে। ডিপি তে একটা সুন্দর পদ্মফুলের ছবি। কে রে বাবা!! ওহাটসঅ্যাপ এ উত্তর দিলাম ও তার পরের কিছু কথোপকথন:
কিছু মনে করবেন না, আপনাকে ঠিক চিনতে পারলাম না
এখন তো চেনার দরকার নেই, আগে প্রশ্নটার উত্তর তো দিন
কিন্তু না চিনে না জেনে কি করে বলি বলুন?
চিনে জেনে তো এতদিন বললেন; এবার একটু না চিনে না জেনে বলেই দেখুন না! মনে নেই, বিভূতিভূষণের “অচেনার আনন্দ” ?
না মানে…আপনি পুরুষ না মহিলা সেটাই তো বুঝতে পারছি না।
মহিলা
কোন গ্রুপে আছেন?
আপনার উত্তর ইতিবাচক হলে সব জানতে পারবেন
আমাকে তো বেশ মুশকিলে ফেললেন। কি বলি বলুন তো
আপনার জীবনে কি অন্য কোনো সমস্যাই নেই? শুধু এই উত্তরটা দিতে এত সমস্যা?
না, আসলে সংসারী মানুষ তো, সেই আর কি !
আমিও সংসারী। সংসারী মানুষদের ভালবাসা পাবার অধিকার নেই?
সে তো সংসারের মানুষদের কাছ থেকে?
ভালবাসা আবার মানুষ ভেদে আলাদা হয় নাকি? আমি তো জানি হয় না। ভালবাসা তো আর রং নয়, যে বলব ওর ভালবাসা লাল, ওর টা সাদা , ওরটা সবুজ …
হ্যাঁ তা তো ঠিক
তাহলে ?? এত সময় নিচ্ছেন কেন?
না ভাবছি আর কি ?
বুঝেছি, আপনি ভাবতে থাকুন। ভাষা দিবসের দিনে উত্তর পেলে কিন্তু আপনার ভালবাসা দান ও প্রাপ্তি দুটোই হতো এই বিশেষ দিনে। ঠিক আছে। ভালো থাকবেন। নমস্কার। ইতিবাচক উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম কিন্তু।
ব্যাস, আর কোনো মেসেজ নেই। সব চুপচাপ।
ভাষা দিবসে ভাষার প্রতি ভালবাসার মেসেজ যে অন্য মানুষকে ভালবাসার ডালি হাতে হাজির করবে সেটা কে জানত! ধন্য হোক মাতৃভাষা আর ভালবাসা। ১৪ ই ফেব্রুয়ারি আর ২১ শে ফেব্রুয়ারি; এক সপ্তাহের শুরু আর শেষ; মানুষের ভালবাসা দিয়ে শুরু আর শেষ মাতৃভাষার ভালবাসা দিয়ে। আসলে মানুষ, ভাষা আর ভালবাসা এটা প্রেম নামক ত্রিভুজের তিনটি বিন্দু।
2 Comments
বাহ ! সাধারণ কথাও কত সুন্দর করে লেখা যায়,সেটা লেখাটা পড়ে বুঝলাম।
ReplyDeleteখুব ভালো লাগলো।আরো লিখুন।
অনেক ধন্যবাদ। নিশ্চয়ই লিখব।
Delete