মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ১৯৭
সুধাংশুশেখর পণ্ডা (অধ্যাপক, সমবায় আন্দোলনের নেতা, কাঁথি)
ভাস্করব্রত পতি
আজ জেলা জুড়ে সমবায় সমিতির প্রাধান্য চোখে পড়ার মতো। একসময় সমবায় আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যেসব ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা যেতো, তাঁদের মধ্যে সুধাংশুশেখর পণ্ডার নামোল্লেখ করতেই হবে। কাঁথির সরদাতে ১৯১৯ এর ৪ ঠা নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন মেদিনীপুরের মানুষ রতন সুধাংশুশেখর পণ্ডা। বাবা শিবপ্রসাদ পণ্ডা এবং মা ছিলেন সারদা দেবী।
কাঁথি মডেল হাইস্কুল থেকে ১৯৩৫ এ ম্যাট্রিক পাশ করার পর কাঁথির প্রভাত কুমার কলেজ থেকে ১৯৩৭ সালে আই. এ. পাশ করেন। এরপর কলকাতার রিপন কলেজে স্নাতক স্তরে ভর্তি হন গণিত বিষয় নিয়ে। এখানে ১৯৩৯ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪১ সালে গণিত বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ভর্তি হন আইন বিষয়ে। কিন্তু তা শেষ করতে পারেননি।
আইনের পাঠ অসমাপ্ত রেখেই কলকাতা জেনারেল পোষ্ট অফিসে অ্যাকাউন্ট্যান্ট পদে নিযুক্ত হন। শুরু করেন জীবনের প্রথম কর্মজীবন। এই চাকরিও ছেড়ে দেন একসময়। এরপর খাদ্য সংগ্রহ বিভাগের মুখ্য পরিদর্শকের চাকরী পান সুধাংশুশেখর পণ্ডা। কিন্তু মেধাবী এই মানুষটি এইসব চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়ে ১৯৪৬ সালে নিজের এলাকায় কাঁথি প্রভাত কুমার কলেজে গণিত বিষয়ের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৮৪ পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে এই কাঁথি প্রভাত কুমার কলেজে অধ্যাপনা করেন সুচারুভাবে। কর্মজীবনের শেষ প্রান্তে এসে একবার কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন একজন যোগ্য সংগঠক, স্থিতধী শিক্ষক এবং তীক্ষ্ণধী সঞ্চালক। শিক্ষাক্ষেত্র ছাড়াও তাঁর কর্মতৎপরতা ছিল রাজ্য এবং আন্তঃরাজ্য সমবায় আন্দোলনের বেলাভূমিতে। সমবায় আন্দোলনের অন্যতম খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁকে আখ্যায়িত করা যায়।
কাঁথির বিখ্যাত কাজলা কৃষি উন্নয়ন সমিতি সহ আরও নানা প্রতিষ্ঠান তাঁর হাতেই নতুন জীবন পেয়েছে। যেগুলি কিনা আজ মেদিনীপুর জেলার আর্থসামাজিক অবস্থার নিয়ন্ত্রক হয়ে দাঁড়িয়েছে বলা যায়। তাঁর উদ্যোগেই কন্টাই কার্ড ব্যাঙ্ক, কাঁথি থানা মার্কেটিং সোসাইটি প্রাধান্য বিস্তার করেছিল।
নিজের দক্ষতা, সংগঠন পরিচালনার ক্ষমতা এবং নিত্যনতুন ভাবনার উপর ভরসা করে তিনি তাঁর প্রাধান্য বুঝিয়ে দিয়েছেন। একসময় তাঁকে হিজলী সমবায় পরিবহন সংস্থার (HCTS) সম্পাদক করা হয়েছিল। যা কিনা অচিরেই এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ পরিবহন সংস্থা হিসেবে গড়ে উঠেছিল তাঁর সক্রিয় উদ্যোগ এবং সহযোগিতায়।
স্টেট কো অপারেটিভ ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদেও আসীন ছিলেন। সাংগঠনিক মুন্সিয়ানা এবং সমবায় সম্পর্কে ব্যুৎপত্তির দরুন তাঁকে রাজ্য সমবায় সভাপতি পদে আসীন করা হয়। শুধু সমবায় সমিতি নয়, এই মানুষটি ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিলেন তখনকার বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অন্যতম কর্ণধার এবং উপদেষ্টামণ্ডলীর প্রধান। তাঁর হাতেই প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠেছিল কাঁথি মডেল হাইস্কুল, কাঁথি হরিসভা হাইস্কুল, এগরা সারদা শশিভূষণ কলেজ, পারুলিয়া হাইস্কুল, কাঁথি হিন্দু বালিকা হাইস্কুল, বাহিরী ব্র্যাডলি বার্ট হাইস্কুল ইত্যাদি।
একদিকে গণিতের অবোধ্য অঙ্ক আর জটিল সমাধান নির্ভুলভাবে ছাত্র ছাত্রীদের কাছে উপস্থাপন করার দক্ষতা আর অন্যদিকে দক্ষ হাতে সংগঠন পরিচালনা করার ক্ষমতা - তাঁকে মেদিনীপুরের বুকে এক অসামান্য সম্মানীয় ব্যক্তির তকমা দিয়েছে। গণিতের পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি, সংস্কৃত সাহিত্যেও অসামান্য ব্যুৎপত্তি, জ্ঞান, পারদর্শিতা এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল মেদিনীপুরের এই বাগ্মী মানুষটিকে। এই মহান মানুষটির মৃত্যু হয় ১৯৯৭ এর ৮ ই মে।
🍂
0 Comments