নারীবিদ্বেষ ও নর-নারীর দেশ
শুভশ্রী রায়
ইসরোর এক কর্মচারী তাঁর স্ত্রীকে খুন করেছেন, তিনি চলে যাওয়ার পরে বিধবা স্ত্রীর কী হবে তাই ভেবে! এই নৃশংস ঘটনা নিয়ে প্রবল চর্চা হচ্ছে। অনেকে আবার এটাকে ভালোবাসা বলছেন। আমার মতে এটা কখনোই ভালোবাসা নয়, আসলে তিনি মনে করেন তাঁর অবর্তমানে স্ত্রীর বেঁচে থাকা নিরর্থক। এই ধরণের লোক নিজের স্ত্রীকে এবং সমস্ত মেয়েকেই বোধবুদ্ধিহীন জড়পিণ্ড বলে মনে করে। মূল কথা, এই লোকটি প্রবল মিসোজিনিস্ট। স্ত্রীকে সত্যিই ভালোবাসলে তাঁর জন্য টাকাপয়সা ঠিকঠাক রেখে যাওয়ার কথা ভাবতেন যাতে তাঁর অবর্তমানে স্ত্রীর আর্থিক অসুবিধা না হয়। খুন করতেন না। তাছাড়া, তিনি নিশ্চয় দেখেছেন- শত শত মেয়ে বিধবা হওয়ার পরে জীবনের স্বাভাবিকতায় বেঁচে থাকছে। বিপত্নীক হওয়ার পরে পুরুষেরাও বেঁচে থাকেন। এমন কি অসময়ে সন্তান হারানো বাবা-মা বুকে পাথরের মতো শোক নিয়ে প্রতি মুহূর্তে দীর্ঘশ্বাস ফেলেও বেঁচে থাকেন।
মৃত্যু কারুর ইচ্ছাধীন নয় এবং কে কত দিন বাঁচবে, কেউ বলতে পারে না। আমি চলে যাওয়ার পরে আমার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের কী হবে, এমন আশঙ্কা করে কোনো সুস্থ চিন্তার মানুষ তাদেরকে হত্যা করে না।
দেশের নানা প্রান্ত থেকে প্রায়ই মেয়েদের ওপর অ্যাসিড ঢালা এবং প্রেমিকা অন্য সম্পর্কে ঢুকে গেলে বা সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলে তাকে খুন করার খবর আসে। এমন কী প্রেমে প্রত্যাখাত হয়েও খুন-জখম করে দিচ্ছে ক্রুদ্ধ একতরফা প্রেমিক! যাকে ভালোবাসো তাকে খুন করার কথা ভাবছ আবার নিজেকে প্রেমিকও বলছ! শুনে নাও, এটা ভালোবাসা নয় , তোমার মেল ইগো। অন্য দিকে, মেয়েটি খুন হওয়া মাত্র Victim blaming শুরু হয়ে যায় এবং ঘাতক ছেলেটিকে বাহবা জানায় শত শত মানুষ।
🍂
কী করা যাবে, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজও মিসোজিনি এত বেশি প্রবল বলেই, নির্যাতিতা মেয়েদের সমালোচনা শুরু হয়ে যায়। লোকজনের এই বোধটুকুও নেই যে, সামান্য কেন, বড় দোষত্রুটির জন্যও কাউকে খুন করা যায় না। তাছাড়া একটি সম্পর্ক বিরক্তিকর হয়ে উঠলে সেটা ছেড়ে বেরিয়ে আসার মধ্যে লজ্জার কিছু নেই। তা সত্বেও যে সব লোক বৌ-প্রেমিকা-একত্রবাসের সঙ্গীদের খুন করছে বা নৃশংস অত্যাচার করে আধমরা করে দিচ্ছে; তাদের ওপর লোকজনের সহানুভূতি দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছি। কোন্ স্তরের অশিক্ষিত মননের মানুষ বলতে পারে, মেয়েটি অপরাধ করেছে বলে শাস্তি হল খুন! আরে বাবা, মেয়েটি কোনো অপরাধ করেছে কিনা সেটা বিচার করবে আদালত। সত্যিই যদি মেয়েটি "দুশ্চরিত্র" বা প্রতারক হয়, তাহলে তোমার সঙ্গে তার সম্পর্ক ভেঙে গেছে মানে তুমি বেঁচে গেছ।
আর একত্রবাস পাপ, অপরাধ কিছুই নয়। একত্রবাস জীবন যাপন নিয়ে একটি জুটির সিদ্ধান্ত মাত্র। তর্কের খাতিরে যদি বলা হয় একত্রবাস পাপ, তাহলে ছেলেটিও তো পাপ করছিল। কিন্তু তার দিকে অতগুলো আঙুল ওঠে না। পাপটাপ সব মেয়েদের হয় কিনা! পুরুষ তো জন্মসূত্রে উচ্চ স্তরের পবিত্র প্রাণী।
রমরম করে কন্যাভ্রূণ হত্যা, বৌ পোড়ানো, পণের জন্য অত্যাচার সব কিছুর মূলে এই মিসোজিনি যা শিক্ষিত-অশিক্ষিত মানুষের মনে এখনো গেড়ে বসে আছে। নারীকে ভেতর ভেতর ঘৃণা করে বেশিরভাগ মানুষ। এমন কী, বহু সংখ্যক নারীও মিসোজিনিস্ট। তাঁদের কেউ কেউ আবার উকিল এবং সব ব্যাপারে মেয়েদেরই দোষ দেখছেন আর প্রচার পাওয়ার লোভে চিৎকার করে টিভির চ্যানেলে এবং সোশাল মিডিয়ায় মেয়েদের নামে খারাপ কথা বলছেন। শত সহস্র মিসোজিনিস্ট তাঁর ভুলভাল বকবক শুনে হাততালিও দিচ্ছে।
আর এখন বারবার বলা হ'চ্ছে, মেয়েরা নাকি অ্যালামনি পাওয়ার লোভে বিয়ের নামে ব্যবসা খুলে বসেছে। এর চেয়ে বড় মিথ্যা কমই হয়। আমাদের দেশে বেশিরভাগ ডিভোর্সের মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। মাসে কুড়ি হাজার খোরপোষ চাইলে দু' হাজার জোটে কিনা সন্দেহ কারণ বিচারক সব বিষয় বিবেচনা করে তারপর খোরপোষের পরিমাণ ধার্য করে দেন। তাতে অনেক সময় লেগে যায়। অতএব যে টাকা পাওয়া যাবে বলে নিশ্চয়তা নেই, সেই খোরপোষের জন্য মেয়েরা ব্যবসা খুলে বসেছে; এমন হতেই পারে না। একটা দুটো অসৎ মেয়ের জন্য সমস্ত ডিভোর্সী মেয়ের নামে দোষ দেওয়া যায় না।
লক্ষ্যণীয়, একের পর অমীমাংসিত মামলা নিয়ে আদালত ভারাক্রান্ত। তার পরে উকিলদের মোটা ফিজ দেওয়া সমস্ত ডিভোর্সী তথা বিবাহবিচ্ছেদকামী মেয়ের পক্ষে সম্ভব হয় না। সব মিলিয়ে দু' একটি ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে ন্যায্য খোরপোষ আদায় করার জন্য ডিভোর্সী মেয়েদের অনেক কষ্ট পেতে হয়। পড়ে পড়ে মার খেলে, অপমানের মধ্যেও বিবাহিত স্ত্রী হয়ে থেকে গেলে হয়তো এটা সহ্য করতে হত না।
অন্য দিকে খোরপোষ চাওয়ার কারণও থাকে। বিবাহবিচ্ছেদের পর মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গে চাকরি পেয়ে যাবে এমন নিশ্চয়তা নেই। ব্যবসা করে স্বনির্ভর হতেও সময় লাগে। তাছাড়া টাকা তো লাগেই। তত দিন তার সন্তানদের মুখে ভাত যোগাবে কে? সন্তানদের পড়াশোনার খরচই বা কোথার থেকে আসবে? এই কারণেই অ্যালামনি চাওয়া হয়। সেই ব্যবস্থাও আইনের মধ্যেই রয়েছে কারণ আইন প্রণেতারা সমাজে মেয়েদের প্রকৃত অবস্থান বিবেচনা করে আইন প্রণয়ন করেছিলেন। তাঁরা জানতেন সব মেয়ের বাবা-মা বিত্তবান নয় এবং সব মেয়ের পৈতৃক সম্পত্তি থাকে না।
আসলে বহু সংখ্যক মেয়ে আজকাল পড়ে পড়ে মার খাচ্ছে না, বিয়েটাকেই জীবনের সবচেয়ে বড় পরিণতি বলে মনে করছে না; এতেই নারীপুরুষ নির্বিশেষে মিসোজিনিস্টদের ভারি রাগ, ভারি রাগ। সমাজে পুরুষের নিরঙ্কুশ প্রাধান্য আস্তে আস্তে কমে যেতে পারে, এটা এমন ইঙ্গিত যে! কিন্তু মিসোজিনিস্টরা তো সব সময় চায়, সমাজে পুরুষের নিরঙ্কুশ প্রাধান্য অটুট থাকুক।
এরা নারীকে দুর্বল অমানুষ বলে মনে করে। অথচ আমাদের দেশে কোটি কোটি দরিদ্র মেয়ে হাজারো বাধার সঙ্গে লড়াই করে সংসার চালায়। প্রতি নিয়ত বঞ্চিত হয়েও সংসারে অশান্তি করে না। বরঞ্চ আরো কষ্ট করে। সে সব কিন্তু মিসোজিনিস্টদের চোখে পড়ে না।
শত বছরের অশিক্ষার শেকল ছিঁড়ে ফেলে আমাদের মেয়েরা পড়াশোনা শিখেছে। সমস্ত ক্ষেত্রে ক্রমাগত প্রতিষ্ঠিত হ'চ্ছে। সে সবও মিসোজিনিস্টদের চোখে পড়ে না। তারা শুধু নারীকে একটা মাংসপিন্ড বলে মনে করে, যাকে কোনো রকমে মানুষ করে অল্পবিস্তর লেখাপড়া শিখিয়ে, কিছু টাকাপয়সা খরচ করে বিয়ে দিয়ে ঘাড় থেকে নামিয়ে দেওয়া উচিত।
আশার কথা, আজকাল অনেক বাবা-মা মেয়েকে বোঝা বলে মনে করছেন না, তাকে নিজের মতো চলার শিক্ষা দিচ্ছেন এবং অসুখী বিয়ে থেকে বেরিয়ে আসতে বলছেন। এটা দেখেও মিসোজিনিস্টদের রাগ। কিন্তু এমন বাবা-মায়ের সংখ্যা বাড়ছে, আরো বাড়বে। বাবা-মায়ের সঠিক শিক্ষা ও পরামর্শ পেয়ে বহু সংখ্যক মেয়ে নিজেদের পূর্ণাঙ্গ মানুষ বলে মনে করছে। তারা পরনির্ভর হয়ে থাকতে চাইছে না এবং বিয়েটাকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বলে মনে করছে না। এদের সংখ্যা আরো বাড়ুক। নিশ্চয় এক দিন মিসোজিনিস্টরা কোণঠাসা হয়ে যাবে। হয়তো আমরা সে দিনটা দেখে যেতে পারব না। তাতে কী? আমাদের পরের পরের প্রজন্মের মেয়েরা সেই দিনটা নিশ্চয় দেখতে পাবে; এই আশা রাখি।
0 Comments