তৃতীয় খণ্ড
পর্ব ২: ইসলামাবাদ শহরে
কমলিকা ভট্টাচার্য
ইসলামাবাদ শহরটাকে দূর থেকে শান্ত মনে হয়। বিমানের জানলা দিয়ে তাকালে মনে হয় যেন কোনো নিখুঁত নকশার উপর দাঁড়িয়ে আছে এই শহর—পরিপাটি রাস্তা, সমান্তরাল গাছের সারি, নির্দিষ্ট দূরত্বে সাজানো আলো। কোনো বিশৃঙ্খলা নেই, কোনো তাড়াহুড়ো নেই। সবকিছু নিয়ন্ত্রিত, স্থির, পরিমিত। কিন্তু অনির্বাণ জানে—এই নীরবতা আসলে এক ছদ্মবেশ। এই শহরে শব্দের থেকেও ভয়ংকর জিনিস হল নীরবতা। কারণ এখানে প্রতিটি নীরবতার পিছনে লুকিয়ে থাকে নজরদারি। প্রতিটি ছায়ার পিছনে থাকে সন্দেহ।
বিমানটা যখন ধীরে ধীরে নীচে নামছিল, অনির্বাণ জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিল স্থির চোখে। তার বুকের ভিতর একটা অদ্ভুত চাপ জমছিল—যেন এই শহরের মাটিতে পা রাখার আগেই তার অতীত তাকে টেনে ধরছে। পাশে বসে থাকা ইরা তার দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল, “এখনও সময় আছে। আমরা ফিরে যেতে পারি।”
ঋদ্ধিমান তাদের দুজনের কথোপকথন চুপ করে শুনছিল। সে কিছু বলল না। শুধু অনির্বাণের দিকে তাকিয়ে রইল। এই মানুষটাকে সে বহু বছর ধরে চেনে। একজন বিজ্ঞানী হিসেবে, একজন শিক্ষক হিসেবে, একজন স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে। কিন্তু আজ যে মানুষটাকে সে দেখছে, সে অন্য কেউ। এ যেন একজন অপরাধী—যে নিজের শাস্তি নিজেই বেছে নিয়েছে।
বিমানবন্দরে নামার পর থেকেই তাদের অভিনয় শুরু হয়ে যায়। তাদের পরিচয় এখন আর অনির্বাণ, ইরা বা ঋদ্ধিমান নয়। তারা এখন অন্য মানুষ। অন্য নাম, অন্য পাসপোর্ট, অন্য ইতিহাস। তারা এসেছে একটি আন্তর্জাতিক নিউরোটেকনোলজি কনফারেন্সে যোগ দিতে—এটাই তাদের সরকারি পরিচয়। এই মিথ্যার আড়ালেই লুকিয়ে আছে তাদের সত্যিকারের মিশন।
নাতাশা।
হোটেলে পৌঁছে ঘরের দরজা বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গেই ইরা যেন বদলে গেল। তার চোখের ভিতর কাজের তীক্ষ্ণতা ফিরে এল। সে ল্যাপটপ খুলে দ্রুত কাজ শুরু করল। স্ক্রিনে একের পর এক ডেটা ভেসে উঠতে লাগল—স্যাটেলাইট ম্যাপ, সিকিউরিটি লেয়ার, তাপমাত্রার গ্রিড, নজরদারি ক্যামেরার অবস্থান।
ঋদ্ধিমান জানলার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। এটা তার পুরোনো অভ্যাস। সে সবসময় বেরোনোর পথ আগে খুঁজে রাখে। কারণ সে জানে—যে কোনো মিশনে ঢোকার থেকে বেরিয়ে আসাটাই বেশি কঠিন।
ইরা হঠাৎ বলল, “পেয়ে গেছি।”
অনির্বাণ এগিয়ে এল।স্ক্রিনে একটা বিল্ডিং দেখা যাচ্ছে। বাইরে থেকে দেখতে সাধারণ—আধুনিক, কাঁচের দেওয়াল, সাদা আলো।
“এখানেই,” ইরা বলল।“এখানেই ওকে রাখা হয়েছে।”স্ক্রিনের নীচে একটা নাম জ্বলজ্বল করছে।
Facility 47.
অনির্বাণের বুকের ভিতরটা হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল। নামটা যেন কোনো জায়গার নয়—কোনো পরীক্ষাগারের নম্বর।“তুমি নিশ্চিত?” সে জিজ্ঞেস করল।
ইরা মাথা নাড়ল। “এটা একটা মেডিকেল রিসার্চ সেন্টার হিসেবে রেজিস্টার্ড। কিন্তু আসলে এটা একটা ব্ল্যাক সাইট। এখানে কোনো সরকারি নজরদারি নেই। যা খুশি করা যায়।”
ঋদ্ধিমান ধীরে বলল, “মানে—এখানে মানুষ হারিয়ে গেলে কেউ খুঁজবে না।”
ঘরের ভিতর নীরবতা নেমে এল।
সেই রাতেই তারা প্রথমবার গেল।
ভিতরে নয়।দূর থেকে।
শুধু দেখার জন্য।গাড়ির ভিতরে বসে অনির্বাণ তাকিয়ে ছিল Facility 47-এর দিকে। বাইরে থেকে এটা একটা সাধারণ ভবন। কাঁচের দেওয়ালে আলো পড়ে চকচক করছে। কোথাও কোনো অস্ত্রধারী প্রহরী নেই। সবকিছু স্বাভাবিক।কিন্তু অনির্বাণ বুঝতে পারে—এই স্বাভাবিকতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভয়।তার মনে হয়—নাতাশা ওর ভিতরেই আছে।
শ্বাস নিচ্ছে।নিঃশব্দে।অপেক্ষা করছে।হয়তো।
অথবা হয়তো আর অপেক্ষাও করছে না।“অনির্বাণ।”
ঋদ্ধিমানের কণ্ঠস্বর তাকে ফিরিয়ে আনে।“নিজেকে সামলাও।”
অনির্বাণ বুঝতে পারে—তার হাত কাঁপছে।সে চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নেয়।
“আমি ঠিক আছি,” সে বলে।
কিন্তু সে জানে—সে ঠিক নেই।
হঠাৎ ইরা বলে ওঠে, “ওটা দেখো।”
একটা কালো গাড়ি গেটের সামনে এসে থামল। গাড়িটায় কোনো নম্বর প্লেট নেই। গেট খুলে গেল সঙ্গে সঙ্গে—যেন গাড়িটাকে চেনা। গাড়িটা ভিতরে ঢুকে গেল। গেট আবার বন্ধ হয়ে গেল।
সব আবার আগের মতো।
নীরব।অস্বাভাবিকভাবে নীরব।
ঋদ্ধিমান ধীরে বলল, “ওরা কিছু লুকোচ্ছে।”অনির্বাণের চোখ স্থির হয়ে গেল।
সেই মুহূর্তে সে সিদ্ধান্ত নিল।
“আমরা কাল ভিতরে ঢুকব।”
ইরা তাকাল। “এত তাড়াতাড়ি?”
রাত গভীর হল। হোটেলের ঘরে ফিরে সবাই চুপচাপ। অনির্বাণ জানলার পাশে এসে দাঁড়াল। ইসলামাবাদ শহরটা বাইরে থেকে শান্ত, স্থির। রাস্তার আলো নিঃশব্দে জ্বলছে, দূরে পাহাড়ের রেখা অন্ধকারে মিশে গেছে। অথচ এই শান্তির আড়ালেই কোথাও বন্দী হয়ে আছে নাতাশা। তার মাথায় বারবার একটা প্রশ্ন ফিরে আসছে—নাতাশা কি এখনও তাকে চিনবে? নাকি তার চোখে সে শুধু একজন বিশ্বাসঘাতক? সে কি এখনও অপেক্ষা করছে? নাকি অপেক্ষা করাও ছেড়ে দিয়েছে? অনির্বাণ চোখ বন্ধ করল। তার মনে হল—এই শহরের বাতাসেও যেন অপরাধবোধের গন্ধ। ঠিক সেই সময় হঠাৎ ইরার ল্যাপটপ থেকে একটা তীক্ষ্ণ নোটিফিকেশনের শব্দ ভেসে এল। শব্দটা এতটাই অপ্রত্যাশিত যে তিনজনেই চমকে উঠল। ইরা দ্রুত স্ক্রিনের দিকে তাকাল, তারপর তার মুখের রং ধীরে ধীরে বদলে গেল। তার চোখ বড় হয়ে উঠল, ঠোঁট শুকিয়ে গেল। সে ফিসফিস করে বলল, “অসম্ভব…” ঋদ্ধিমান সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এল। “কি হয়েছে?” তার গলায় সতর্কতা। ইরা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে স্ক্রিনের ডেটার দিকে তাকিয়ে রইল, যেন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। তারপর খুব ধীরে বলল, “Facility 47 থেকে একটা সিগন্যাল বেরিয়েছে।” অনির্বাণের বুকের ভিতরটা ধক করে উঠল। সে প্রায় দৌড়ে এসে স্ক্রিনের সামনে দাঁড়াল। “কিসের সিগন্যাল?” তার গলায় শুকনো আতঙ্ক। ইরা এবার কষ্ট করে বলল, “নিউরাল অ্যাক্টিভিটি সিগন্যাল।” ঘরের ভিতর বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। শব্দহীন একটা চাপ তিনজনের বুকের উপর বসে রইল। অনির্বাণ অনুভব করল তার হাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। সে ধীরে বলল, “মানে?” ইরা এবার তার দিকে তাকাল। তার চোখে স্পষ্ট ভয়। আর সেই ভয়ের ভিতর লুকিয়ে আছে এক অবিশ্বাস্য সত্য। সে ফিসফিস করে বলল, “মানে—কেউ জেগে উঠেছে।” অনির্বাণের হৃদস্পন্দন যেন কানে বাজতে লাগল। সময় থেমে গেল। তার ঠোঁট কাঁপল। বহু কষ্টে সে একটা শব্দ বের করল—“কে?” ইরা কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে, প্রায় নিঃশ্বাসের মতো স্বরে বলল—“নাতাশা।” সেই মুহূর্তে অনির্বাণ বুঝতে পারল—এটা শুধু একটা সিগন্যাল নয়। এটা একটা আহ্বান। অন্ধকারের ভিতর থেকে কেউ তাকে ডাকছে। এতদিন পরে। এত কষ্টের পরে। আর সে জানে—এই ডাক সে উপেক্ষা করতে পারবে না। কারণ কিছু সম্পর্ক কখনও শেষ হয় না। তারা শুধু অপেক্ষা করে—সঠিক সময়ের জন্য।
4 Comments
কি মুশকিলেই না পড়েছে অনির্বান
ReplyDelete😊থ্যাঙ্ক ইউ।
Deleteকৌতুহল বেড়ে গেল। দ্বিতীয় বার ইস্লামাবাদ খুব শান্ত শহর - বাক্যটার প্রয়োজন ছিল না।
ReplyDeleteঠিক বলেছেন,তবে প্রয়োজন ছিল কিন্তু একটু অন্যভাবে লিখতে হতো ইসলামাবাদ না লিখে।অনেক ধন্যবাদ ভুলটা ধরিয়ে দেওয়ার জন্য।
Delete🙏