মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ১৯৮
প্রবীর কুমার জানা (ড্রাইভার, আদর্শ পিতা, দাঁতন)
ভাস্করব্রত পতি
সামনে সর্পিলাকার রাস্তা। ঘন জঙ্গল। পাহাড়ি খাত। পৌঁছাতে হবে বহু দূরের পথ বেয়ে। পদে পদে অজানা বিপদ। সবকিছু দূরে ঠেলে সংসারের দানাপানির সুনিশ্চিত করার চিন্তায় বিভোর একজন অকুতোভয় ড্রাইভার। চোখ বেয়ে চুঁইয়ে পড়া স্বপ্ন। লক্ষ্য কিন্তু স্থির। সুমুখপানে এগিয়ে যেতে হবে। সঠিক সময়ে পৌঁছে দিতে হবে প্রয়োজনীয় সামগ্রী। তবেই মিলবে বেতন। মিলবে বকশিস।
দৃঢ় দুই হাতে ধরা গাড়ির স্টিয়ারিং। সামনে কেবল এগিয়ে চলা। মাঝে মাঝে গিয়ার চেঞ্জ। আর এক্সিলারেটর পায়ে দাবিয়ে তুতিকোরিন থেকে কোয়েম্বাটুর, ডিগবয় থেকে কন্যাকুমারী পাড়ি দেওয়ার থ্রিলিং লাইফ। ড্রাইভিং জীবনের অনিশ্চয়তা, ভয়াবহতা, প্রতিকূলতা আর চ্যালেঞ্জকে পাথেয় করে পশ্চিম মেদিনীপুরের দাঁতনের সরাইবাজারের বর্ষীয়ান ড্রাইভার প্রবীর কুমার জানা আজ চল্লিশ বছর ধরে ড্রাইভ করার সাথে সাথে হয়ে উঠেছেন আদর্শ পিতা। যিনি গর্ব করেন তাঁর ছেলের দৃষ্টান্তমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য। স্টিয়ারিং নিয়ে তাঁর দীর্ঘ লড়াই শেষে তিনি অর্জন করেছেন সুনাম, তিনি অর্জন করেছেন অভিজ্ঞতা, তিনি অর্জন করেছেন আনন্দ। আর অর্জন করেছেন একজন 'আদর্শ পিতা'র তকমা।
Best Driver of the World সম্মাননা
এ সি রুমে বসে চাকরি করে নয়, অথবা 'দশটা - চারটা' ডিউটি করেও নয়। স্রেফ দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে অন্যের মালিকানার গাড়ি চালিয়ে কোনও প্রকারে সংসার টেনেছেন। প্রতিপালন করেছেন অনেকগুলো বুভুক্ষু পেট। একটা স্থায়ী কাঠামোর ওপর দাঁড় করিয়েছেন সংসারের জোয়াল। না, কোনও লজ্জা নেই তাঁর। সৎভাবে এবং একনিষ্ঠভাবে করে গিয়েছেন গাড়ি চালানোর কাজ। অবশেষে ছেলের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন একটি নীল মারুতি ওমনি ভ্যান (গাড়ির নম্বর : WB34AQ3281)। এ যেন তাঁর কাছে একটি স্বপ্নের সত্যি হওয়ার কাহিনি। কষ্টলাঘবের উপাখ্যান। চোখের জল মোছার পাড় ভাঙা ধুতির খুঁট।
দাঁতনের সরাইবাজার এলাকায় বসতি গড়েছিলেন বাবা পদ্মলোচন জানা এবং মা নীলিমা জানা। দু ভাই তিন বোনের মধ্যে তিনি সবচেয়ে ছোট। সাড়ে তিন বছর বয়সে মা মারা যান। আর সাড়ে আট বছর বয়সে বাবা মারা যান। বাবার মৃত্যুর সময় ক্লাস ফোরে পড়তেন। তখন বড়দিদি শ্যামলী জানার কোলেপিঠে মানুষ। কিন্তু তিনি তো সোনার চামচ মুখে দিয়ে জন্মাননি। তাই 'অনাথ' হওয়ার পরবর্তীতে তাঁকে যুঝতে হয়েছে জীবন যন্ত্রনাকে সঙ্গী করে। জঠরানলের আকুতি নেভাতে পড়াশোনা বাদে বাকি সব কাজ করতে হয়েছে।
জি বাংলায় 'হ্যাপি পেরেন্টস ডে' তে প্রবীর কুমার জানার পরিবার
প্রথমে খাওয়ার দোকানে দাদা পরমেশ্বর জানার সাথে ভাই প্রবীর কুমারও লেগে পড়েন। এরপর দাদা স্থানীয় গয়না ব্যবসায়ী হিমাংশু শেখর সিংহের ট্রাকের হেলপারি করতে থাকেন। পরবর্তীতে এঁদের আরও একটি ট্রাক এল। তখন সেই ট্রাকে তিনিও যোগ দেন হেলপার হিসেবে। এই কাজ করতে করতেই ড্রাইভিং শিখে নেন। এবার ইটভাটার লরি চালাতে লাগলেন। মাত্র ২১ বছর বয়সে পান হেভি গাড়ি চালানোর লাইসেন্স। বাস চালানোর লাইসেন্সও জুটে গেল তাঁর। ১৯৭৮-১৯৭৯ নাগাদ লিলুয়ায় এক প্রাইভেট গাড়ি চালানোর কাজ নেন। এরপর তিনি আরও বেশি করে ভালোবাসতে শুরু করেন গাড়ির স্টিয়ারিংকে। আপন করে নিলেন ভারতের পথঘাট। গিয়ার, এক্সিলেন্স, হর্ণ হয়ে উঠলো জীবনের মন্ত্র।
মারুতি ওমনি চালাচ্ছেন প্রবীর কুমার জানা
জীবনের অসংখ্য ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে সামাজিক রঙ ক্রমশঃ পরিবর্তন হতে লাগলো। আর তিনি নীরবে সেই পরিবর্তনের সাক্ষী থেকে নিজেকে আরও পরিশীলিত করতে থাকলেন। ড্রাইভারের জীবনের যাবতীয় রূপ রস গন্ধ তিনি উপভোগ করতে লাগলেন গভীর অধ্যবসায় আর অকল্পনীয় শ্রম দিয়ে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনও 'নেশা' তাঁকে জড়াতে পারেনি। যা কিনা ড্রাইভারদের জীবনের সবচেয়ে বড় 'দাগ'।
গাড়ি চালানোর মাধ্যমে হায়দ্রাবাদ, ডিগবয়, কলকাতা, রাঁচি, পাঞ্জাব থেকে শুরু করে ভারতের প্রায় সব জায়গায় গিয়েছেন। ট্রাক নিয়ে মাসে দুবার করে গিয়েছেন চেন্নাই। অন্ততঃ ৪৫ বার গিয়েছেন কোয়েম্বাটুর। ভারতের প্রতিটি রাস্তাঘাট তাঁর নখদর্পণে। প্রতিটি মহল্লা তাঁর হাতের তালুর মতো জানা এবং চেনা। এয়ারপোর্ট থেকে তেলের ট্যাঙ্কারে করে তেল বয়েছেন সাত বছর। দমদম, রক্সৌল, রাঁচি, ভূবনেশ্বর, পাটনা ছুটতেন নিত্যদিন। কোনও অনিয়ম করার সুযোগ দিতেননা নিজেকে। তাঁর কাছে ড্রাইভিং ছিল দেবপূজার মতো পবিত্র। গভীর রাতে গাড়ি চালানোর সময় মুখোমুখি হয়েছেন ডাকাতদলের সাথে। রাস্তার মাঝে গাছ ফেলেও তাঁর গাড়ির গতি থামাতে পারেনি কেউ। লোধাশুলির জঙ্গলের সেই ঘটনার কথা আজও ভোলেননি মেদিনীপুরের বুক থেকে উঠে আসা এই অকুতোভয় ড্রাইভারটি।
ড্রাইভার প্রবীর কুমার জানার সাথে প্রতিবেদক
আনকাপল্লী থেকে ২৭ কিমি দূরে তেলের ট্যাঙ্কার পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলেন একা। গভীর জঙ্গলের বুক চিরে তিনি চলেছেন সোনাবেদা এয়ারফোর্সের দিকে। হঠাৎই ছন্দপতন। গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনে লাফ দিল বিশাল বড় বাঘ। না, মৃত্যু কিংবা ভয় কোনও কিছুই তাঁকে ছুঁতে পারেনি সেদিন। বহাল তবিয়তে এবং অবলীলায় তেলের ট্যাঙ্কার নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন গন্তব্যস্থলে। নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছে দেওয়ার যে দায়িত্ব তিনি পেয়েছিলেন, তা থেকে বিচ্যুত হননি সেদিনও। গাড়ির সঙ্গে এইকম আত্মিক ও দীর্ঘকালীন সখ্যতা থাকলেও কখনো কোনও দুর্ঘটনার মুখোমুখি হননি। যা তাঁর স্থির এবং সজাগ সতর্ক ড্রাইভিং করার নিদর্শনই প্রমাণ করে। দাঁতনে ফিরে এলেন ১৯৯৩ তে। এখানে সোনাকোনিয়া কাঁথি রুটের ডাবল টিপের গাড়ি 'মমতা'য় ড্রাইভিং শুরু করেন। অসংখ্য যাত্রীর জীবনের নিরাপত্তার দায়ভার নিলেন নিজের শক্ত হাতে।
ড্রাইভিং লাইসেন্স
HMV license পাওয়ার পর কেটে গিয়েছে ৫৩ বছর। ২০১০ সালে বাস চালানোর কাজ ছেড়ে দেন তিনি। আসলে এই ড্রাইভারের ছেলে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নিয়ন্ত্রিত একটি হাইস্কুলের ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে তখন। আর কি দরকার ড্রাইভিং করার?
তবে এখনও তিনি এই ৭৩ বছর বয়সেও জাতীয় সড়কের কালো পিচঢালা রাস্তায় ড্রাইভিং করেন। যদিও তা স্রেফ মনের খিদে মেটানোর জন্য। আজও সাঁই সাঁই বেগে ছুটে যায় তাঁর গাড়ি। এখন আর অবশ্য বাস বা ট্রাক নয়। এখন চালান নীল রঙের মারুতি ওমনি ভ্যান। যা তিনি পেয়েছেন ছেলে সন্তু জানার কাছ থেকে। ২০১১ সালে সানন্দা টিভির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান 'জবাব কিনতে চাই'তে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ছেলে সন্তু জানা। সেই অনুষ্ঠানের পুরস্কারমূল্য দিয়েই ছেলে তাঁর বাবাকে দিয়েছিল সম্পূর্ণ নিজের গাড়ির মালিকানা হওয়ার অধিকার। ২০১৬ সালের ১৬ জুন তারিখে জি বাংলায় সম্প্রচারিত হয়েছিল Happy Parents Day সিজন ২ এর প্রথম এপিসোড। সেখানে ছেলে সন্তু জানা সুযোগ পেয়েছিল তাঁর আদর্শ বাবা ও মাকে নিয়ে যেতে। আর সেই টিভি শো'তে প্রবীর কুমার জানাকে দেওয়া হয়েছিল BEST DRIVER OF THE WORLD সম্মান।
ছেলে সন্তু তখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে। বাসের ড্রাইভার হিসেবে থাকার ফলে মিলতো অনেক খুচরো পয়সা। সেই পয়সা নিয়ে এসে একদিন ছেলেকে দিলেন। এগুলির মধ্যে একটি পয়সা অনেকটাই আলাদা ছিল। ছেলের কৌতূহল এটা কি পয়সা? অনেক ঘেঁটে জানা গেল যে, এই পয়সাটি শ্রীলঙ্কার পয়সা। ব্যাস, সেই থেকে ছেলের মনের মধ্যে জেগে উঠলো বিভিন্ন দেশের পয়সা, মুদ্রা, টাকা দেখা এবং সংগ্রহ করার অভিলাষ। আজ সন্তু জানা এই জেলা তো বটেই এ রাজ্যের অন্যতম সংগ্রাহক। অন্যতম লোকসংস্কৃতি গবেষক। অন্যতম ক্ষেত্রসমীক্ষক। যার সূচনা হয়েছিল ড্রাইভার বাবার হাত ধরে।
পরিবারের সাথে
একজন প্রায় নিরক্ষর মানুষ যে কিনা একসময় বাধ্য হয়ে রাত কাটিয়েছেন ফুটপাতে, সেই ব্যক্তি পরবর্তীতে পেয়েছেন আদর্শ বাবার সম্মান। সেরা ড্রাইভারের সম্মান। সেই মেডেল তিনি আজও গলায় ঝুলিয়ে চলেন সর্বত্র। আসলে ড্রাইভিং করা তাঁর কাছে একটা আদর্শ। একটা লক্ষ্য। একটা ভালোবাসা। আজ পর্যন্ত একদিনের জন্যেও স্ত্রীর সাথে ঝগড়া হয়নি তাঁর। লোক কান পেতে শুনতে চাইতো তাঁদের ঝগড়া হচ্ছে কিনা। সকলেই ব্যর্থ হয়েছে প্রতিবার। স্ত্রীর সাথে ঝগড়ার যাঁর কোনও রেকর্ড নেই জীবনে, তাঁর ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই ভূ-ভারতের অন্য কারোরই সাথে ঝগড়া হবেনা, বুক ঠুকে বলা যায়। তাই তাঁর ড্রাইভিং জীবন ছিল নিরুপদ্রব এবং নির্ভেজাল।
4 Comments
যথার্থ ই বলেছেন। তিনি খুব ভালো মানুষ, খুব বড়ো মনের মানুষ ও ।আমি উনাকে ব্যক্তিগত ভাবে চিনি। উনার প্রতি জানাই প্রণাম ও আন্তরিক শ্রদ্ধা।
ReplyDeleteঅসংখ্য ধন্যবাদ
Deleteঅজস্র ধন্যবাদ এই আদর্শ মানুষটি কে।এই রকম মহান বৃত্তি নিয়ে সারা ভারত প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে পরিভ্রমণ করেছেন,তিনি নমস্য।
ReplyDeleteঅসংখ্য ধন্যবাদ জানাই
Delete