বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১২০
মধুমঞ্জরী
ভাস্করব্রত পতি
"প্রত্যাশী হয়ে ছিনু এতকাল ধরি,
বসন্তে আজ দুয়ারে, আ মরি,
মরি,ফুলমাধুরীর অঞ্জলি দিল ভরি
মধুমঞ্জরীলতা।
কতদিন আমি দেখিতে এসেছি প্রাতে-
কচি ডালগুলি ভরি নিয়ে কচি পাতে
আপন ভাষায় যেন আলোকের সাথে
কহিতে চেয়েছে কথা।।"
স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই ফুলের নামকরণ করেছিলেন মধুমঞ্জরী। কুঞ্জ তৈরির জন্য এটি অন্যতম একটি আদর্শ গাছ। হিন্দিতে বলে রঙ্গন কা বেল। বাংলায় মধুমালতীও বলে। একে ইংরেজিতে বলে Chinese honeysuckle, Burma Creeper বা Rangoon Creeper। এছাড়াও মুম্বাই এলাকায় পরিচিত লাল চামেলী, বারমাসি নামেও। গ্রামবাংলায় অনেকে একে মাধবীলতা নামে আখ্যায়িত করলেও এটি মাধবিলতা নয়। বরং একে মধুমালতী বলা হয়ে থাকে। Combretaceae পরিবারভুক্ত এই ফুলের বিজ্ঞানসম্মত নাম -
Quisqualis indica
Combretum ঈন্দিচুম
মধুমঞ্জরীর আদি বাসস্থান দক্ষিণ আফ্রিকা এবং মালয়েশিয়া। পরবর্তীতে ভারতে নিয়ে এসে রোপণ করা হয়েছে। এই লতা জাতীয় গাছটি গ্রীষ্মমন্ডলীয় এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ভারত, মালয়েশিয়া, বার্মা এবং ফিলিপাইনসের নদী তীরবর্তী ঝোপঝাড়, বাগানে বহুল পরিমাণে জন্মায়।
🍂
মধুমঞ্জরী ফুল বেশ সুগন্ধি। এরা গুচ্ছাকারে ফোটে। সকালে বেশ তরতাজা দেখালেও দুপুর গড়ালেই ঝামলে যায়। সাদা, লাল এবং কমলা রঙের ফুলগুলি বেশ সুন্দর দেখতে। ফুলের রঙ সাদা থেকে ক্রমশঃ পরিবর্তিত হয়। পাঁচটি করে পাঁপড়ি থাকে। বাড়ির বাগানে, প্রাচিরের গায়ে, গেটের গায়ে লাগানো হয় এই গাছ। চৈত্রের শেষ দিক থেকে বেশি বেশি ফুল ফোটা শুরু হলেও সারা বছর বিভিন্ন সময়ে অল্পবিস্তর ফুল ফুটতে দেখা যায়। তখন থোকা থোকা আকারে বাড়ির সামনে ঝুলে থাকে। এক অপূর্ব মোহময়ী দৃশ্য তৈরি করে।
থোকা থোকা ঝুলছে মধুমঞ্জরী ফুল
"আমার দুয়ারে এসেছিল নাম ভুলি
পাতা ঝলমল অঙ্কুরখানি তুলি,
মোর আঁখি পানে চেয়েছিল দুলি দুলি
করুণ প্রশ্নরতা।
তার পরে কবে দাঁড়ালো যে দিন ভোরে
ফুলে ফুলে তার পরিচয়লিপি ধরে
নাম দিয়ে আমি নিলাম আপন ক’রে-
মধুমঞ্জরী লতা হলেও এদের ডালপালা বেশ শক্তপোক্ত হয়। একটু পুরোনো হয়ে গেলে ডালপালা মোটা হয়ে যায়। সহজে ছেঁড়া বা ভাঙা যায়না। যত বেশি পুরোনো হবে তত বেশি শক্তপোক্ত হয়ে যায়। ২.৫ - ৮ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। ডাল থেকে চারা তৈরি করা যায়। গাছের তলাতেই বীজ পড়ে আপনা আপনি অনেক চারাগাছ জন্মায়। ডালের গায়ে কাঁটা থাকে। কাণ্ডের মধ্যাংশ ফাঁপা। একে বলে গর্ভকাষ্ঠ। পাতাগুলো বিপরীত দিকে সাজানো থাকে।
“তব প্রাণে মোর ছিল যে প্রাণের প্রীতি,
ওর কিশলয় রূপ নেবে সেই স্মৃতি,
মধুর গন্ধে আভাসিবে নিতি নিতি,
সে মোর গোপন কথা।
অনেক কাহিনী যাবে যে সেদিন ভুলে,
স্মরণ চিত্ত যাবে উন্মুলে;
মোর দেওয়া নাম লেখা থাক ওর ফুলে, মধুমঞ্জরী লতা।”
1 Comments
খুব ভালো লাগলো। এ ফুল আমারও বড় পছন্দের।
ReplyDelete